kalerkantho

শনিবার । ২৫ বৈশাখ ১৪২৮। ৮ মে ২০২১। ২৫ রমজান ১৪৪২

ঢাকায় সংবাদ সম্মেলন

প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিচার চাইল ব্যাংকার মোর্শেদের পরিবার

০ নির্যাতনে চার বছর ধরে অসহায় ছিল পরিবারটি
০মামলার আসামিদের গ্রেপ্তার করলেই প্রমাণ হবে শারুন জড়িত
০বাড়িতে হামলা চালাতে জাবেদ-পারভেজের সঙ্গে আসেন শারুন-বাচ্চু
০কোনো আসামি গ্রেপ্তার না হওয়ায় উৎকণ্ঠায় স্বজনরা

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২৪ এপ্রিল, ২০২১ ১৫:০২ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিচার চাইল ব্যাংকার মোর্শেদের পরিবার

“শারুন চৌধুরী ফোন করে র‍্যাডিসন হোটেলে দেখা করতে যেতে বলেন। আমার স্বামী এতে রাজি না হলে তিনি বলেন—‘তাহলে আমি আসছি।’ এরপর আমাদের বাসায় পারভেজ আর জাবেদ এসে যখন হামলা চালান, তখন শারুন ও বাচ্চু ছিলেন। তাঁরা গাড়িতে বসা ছিলেন। শারুন অব্যাহতভাবে হুমকি দেন। তাঁর নাম করে পারভেজও হুমকি দেন। একে-৪৭ রাইফেলের ছবিসহ কিছু বিতর্ক ছড়িয়ে পড়লে শারুন সামনে না এলেও তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে বাচ্চু ছিলেন সব জায়গায়। ২০১৯ সালের মামলায় তাঁর নাম দিইনি। শারুন প্রভাবশালী। আমাদের নিরাপত্তা কে দেবে? এখনো নাম দিইনি। সঠিকভাবে তদন্ত করা হলে, আসামি ধরা হলে বেরিয়ে আসবে শারুন, বাচ্চুসহ কারা জড়িত।”

প্রভাবশালীদের চাপে আত্মহত্যায় বাধ্য হওয়া চট্টগ্রামের ব্যাংক কর্মকর্তা আবদুল মোর্শেদ চৌধুরীর স্ত্রী ইসরাত জাহান চৌধুরী আজ শনিবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে এক সংবাদ সম্মেলনে এভাবেই তাঁদের অসহায়ত্বের বর্ণনা দেন। তিনি স্বামীর মৃত্যুর জন্য দায়ী বিতর্কিত শারুন চৌধুরী, চিটাগাং চেম্বারের সাবেক পরিচালক জাবেদ ইকবাল, তাঁর ভাই পারভেজ ইকবাল, নাইম উদ্দিন সাকিব, যুবলীগ নেতা শহীদুল হক চৌধুরী রাসেল ও সাবেক ছাত্রনেতা আরশাদুল আলম বাচ্চুর বিচার দাবি করেন। 

তিনি জানান, ব্যবসা করার জন্য প্রভাবশালী চক্রটি মোর্শেদকে ২৫ কোটি টাকা দিয়েছিল। ওই ২৫ কোটি টাকার জন্য তারা মোর্শেদের কাছ থেকে ৩৫ কোটি টাকা আদায় করে। এর পরও চক্রটি জোর করে অলিখিত চেক ও স্ট্যাম্পে সই নিয়ে আরো ১২ কোটি টাকা দাবি করে। টাকার জন্য তারা নানাভাবে হুমকি দেয়, ফ্ল্যাটে হামলা চালায়। অব্যাহত চাপে অতিষ্ঠ হয়ে মোর্শেদ পরিবার নিয়ে দেশত্যাগ করতে চেয়েছিলেন। চক্রটি তখন পরিবারের সবার পাসপোর্ট কেড়ে নেয়। পুলিশের কাছে অভিযোগ করেও প্রতিকার পাওয়া যায়নি। উল্টো পুলিশের সমঝোতায় চাপ আরো বাড়ে। চার বছর ধরে এমন চাপে দিশাহারা হয়ে গত ৭ এপ্রিল আত্মহত্যার পথ বেছে নেন মোর্শেদ চৌধুরী। ঘটনার পরদিন মামলা হওয়ার পরও পুলিশ প্রভাবশালীদের গ্রেপ্তার করছে না। সংবাদ সম্মেলনে মোর্শেদ চৌধুরীর বৃদ্ধা মা নূর নাহার বেগম ও শিশুকন্যা মোবাশ্বিরা জাহান চৌধুরী জুম প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে এই মৃত্যুর বিচার দাবি করে। 

ইশরাত জাহান চৌধুরী সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘আমার স্বামীর আত্মহত্যার আড়াই সপ্তাহ পার হয়ে গেলেও কোনো এক অদৃশ্য কারণে তথ্য-প্রমাণ থাকার পরও অপরাধীরা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। অথচ তাঁরা বিভিন্নভাবে আমাকে এবং আমার পরিবারকে চাপের মুখে রেখেছেন। যেকোনো সময় শারুন চৌধুরী গংয়ের দ্বারা আমাদের জীবন ও সম্পদহানি হতে পারে।’

সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান, ৮ এপ্রিল তিনি চারজনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতপরিচয় আরো সাত-আটজনকে আসামি করে মামলা করেন। মামলায় চিটাগাং চেম্বারের সাবেক পরিচালক জাবেদ ইকবাল, তাঁর ভাই পারভেজ ইকবাল, নাঈম উদ্দিন সাকিব, যুবলীগ নেতা শহীদুল হক চৌধুরী রাসেলসহ অজ্ঞাতপরিচয় আরো ৮-১০ জনকে আসামি করা হয়।

অভিযোগ করে তিনি বলেন, ‘২০১৯ সালের মে মাসে শারুন চৌধুরী আরো ১০-১২ জন যুবক সঙ্গে নিয়ে আমাদের বাসায় এসেছিলেন। পারভেজ ও জাবেদ ওপরে উঠে দরজা ভাঙেন। নিচে গাড়িতে বসা ছিলেন শারুন ও বাচ্চু। নিচের লোকজন দারোয়ানকে বলেছে, গাড়িতে শারুন-বাচ্চু বসে আছেন। তাঁরা যেন কথা না বলে। বাসায় হামলা হয়েছিল শারুন চৌধুরীর নির্দেশেই।’

সংবাদ সম্মেলনে তিনি প্রশ্ন রাখেন, তাঁর স্বামী মোর্শেদ চৌধুরীর আত্মহত্যার নেপথ্যে থাকা শারুন চৌধুরীকে বাঁচাতেই কি আসামিদের ধরা হচ্ছে না? অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনতে প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেন তিনি।

ইশরাত চৌধুরী বলেন, অতিরিক্ত টাকা পরিশোধের চাপ বাড়তে থাকলে মোর্শেদ আমার কাছে বলেন, ‘আমি আর পারছি না। ওরা আমাকে বাঁচতে দেবে না। ধার করে ওদের এখন টাকা দিতে হচ্ছে। চলো আমরা বিদেশে পালিয়ে যাই।’ টের পেয়ে মোর্শেদকে তাঁদের টর্চার সেলে নিয়ে নির্যাতন করা হয়। তাঁকে জিম্মি করে আমাকে দিয়ে বাসার সবার পাসপোর্ট নেওয়া হয়। নেওয়া হয় স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর। আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে টাকা আত্মসাতের গুজব ছড়িয়ে দেওয়া হয়।’

তিনি বলেন, ‘এই সংসারের মায়া, স্ত্রী-সন্তান, নিজের পজিশন ফেলে একজন মানুষ কোন পর্যায়ে গেলে আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে পারে?’

তিনি আরো বলেন, ‘এক পর্যায়ে আমরা পুলিশের কাছে অভিযোগ জানাই। চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের তত্কালীন উপকমিশনার (ডিসি নর্থ) বিজয় বসাক আমাদের ডেকে পাঠান। সেখানে শারুনের পক্ষে বাচ্চু ছিলেন। তাঁদের কথা শুনে মোর্শেদকে ১২ কোটি টাকা দিয়ে সমঝোতা করতে বলা হয়। বলা হয়, ওই টাকা দিলে আর হামলা হবে না! ডিসির অফিসে চাপ দিয়ে রেজিস্ট্রি স্ট্যাম্পে স্বাক্ষরও করানো হয়।’

হয়রানির বিবরণ দিয়ে ইশরাত বলেন, ‘স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেওয়ার পর ছয় কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। ৩৫ কোটি টাকা দেওয়ার প্রমাণ আমার কাছে আছে। এর পরও ২০১৮ সাল থেকে আটটি মামলা দেওয়া হয়েছে। সব মামলা থেকে আমি খালাস পেয়েছি। আমার স্বামী বেঁচে থাকলে তিনিও খালাস পেতেন।’

তিনি বলেন, ‘এক মাস আগেও বিজয় বসাকের অফিস থেকে টাকার ফয়সালা করতে যেতে বলা হয়। না গেলে ফোর্স পাঠানো হবে বলা হয়। তাঁরা মামলা না করে আদালতে না দিয়ে কিভাবে প্রভাবশালীদের পক্ষ নিয়ে অন্যায়ভাবে হয়রানি করলেন? গত ৬ মার্চ যুবলীগ নেতা রাসেল ফোন করে বলেন, ‘এবার সমস্যা হবে।’ আমার প্রশ্ন ছিল, ‘আপনি তো একটি দলের প্রতিনিধিত্ব করেন। একটা মানুষকে আপনি কিভাবে এমন হুমকি দেন?’

ইশরাত বলেন, ‘আমি চাই এর সুষ্ঠু বিচার হোক। আর যেন কারো এভাবে মরতে না হয়।’ 

সংবাদ সম্মেলনে মোর্শেদ চৌধুরীর মা নূর নাহার বলেন, ‘আমি আমার চার সন্তানকে কষ্ট করে মানুষ করেছি। আমার দুই ছেলের সুখী ও সাজানো পরিবার ছিল। ওদের কারণে আমার ছেলেটা মরে গেল। আরেক ছেলেও মানসিক কষ্টে রয়েছে। আমি আমার ছেলের মৃত্যুর জন্য যারা দায়ী তাদের বিচার চাই।’

শিশুকন্যা মোবাশ্বিরা জাহান চৌধুরী জুম বলেন, ‘আমার পাপা ছিলেন আমার বেস্ট ফ্রেন্ড। আমার পাপাকে ভয়াবহ মানসিক নির্যাতন করা হয়েছিল। যার কারণে আমার পাপা আত্মহত্যা করেছেন। আমি এর বিচার চাই। এ বিচারের জন্য প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চাই।’ 



সাতদিনের সেরা