kalerkantho

শুক্রবার। ৩১ বৈশাখ ১৪২৮। ১৪ মে ২০২১। ০২ শাওয়াল ১৪৪২

বাস-ট্রেন অচল, উড়োজাহাজ সচল

‘জমিনে অশান্তি, আকাশে শান্তি’

চার যাত্রী নিয়ে উড়ল নভোএয়ার

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২২ এপ্রিল, ২০২১ ০৩:২৫ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



‘জমিনে অশান্তি, আকাশে শান্তি’

মধ্যরাতেই সৌদির ফ্লাইট। ছয় হাজার টাকায় প্রাইভেট কার ভাড়া করে কুষ্টিয়া থেকে ঢাকার উদ্দেশে আব্দুর রাজ্জাকের ‘বন্ধুর’ যাত্রা। সঙ্গে তাঁর বৃদ্ধ বাবা। গতকাল বুধবার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামলেন যখন, তখন তপ্ত দুপুর। রাজধানী ঢাকায় কোনো আত্মীয়ের বাসায় গিয়ে বিশ্রামের সুযোগটাও উবে গেছে ‘লকডাউনের’ কারণে। অগত্যা বিমানবন্দরের আঙিনাই ভরসা। বাবা অসুস্থ, তাই রোজা রাখা মানা। বিমানবন্দরের আশপাশে খাবার হোটেলও নেই খোলা। ফলে সামনের সময়টা বিমানবন্দরের বারান্দায় কিভাবে কাটবে সেই দুশ্চিন্তার ছাপ রাজ্জাকের চোখে-মুখে। তিনি ক্ষোভের সুরেই বললেন, ‘জমিনেই যত অশান্তি, আকাশে উড়াল দিলেই শান্তি।’

কুমিল্লা থেকে এসে বিমানবন্দরে থিতু হওয়া আলামিন হোসেনের গল্পটাও অভিন্ন। যাবেন দুবাই। গাড়ি ভাড়া করে কুমিল্লা থেকে সরাসরি বিমানবন্দর। তিনি বলেন, ‘কিচ্ছু করার নাই। কষ্ট হলেও যেতে হবে। আমার সামর্থ্য আছে, তাই গাড়ি ভাড়া করে আসতে পেরেছি। অনেকের কাছে শুনলাম, তারা ব্যাগ কাঁধে তুলে ভেঙে ভেঙে অনেক কষ্ট করে বিমানবন্দরে আসছেন।’

‘লকডাউনের’ কারণে সব ধরনের গণপরিবহন এখনো বন্ধ। তবে দেশে পুরো এবং বিদেশের সঙ্গে আংশিক বিমান চলাচল এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেছে। এতে দুর্ভোগে পড়েছে বিদেশগামী নিম্ন আয়ের মানুষ। গতকাল বুধবার ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সরেজমিনে দেখা যায়, দিনভর বসে আছেন শত শত বিদেশগামী যাত্রী। তাঁদের বেশির ভাগই এসেছেন বিভিন্ন জেলা থেকে। 

গত ১৪ থেকে ২১ এপ্রিল পর্যন্ত সরকারের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক ‘লকডাউনের’ কথা বলা হলেও খোলা রাখা হয়েছে কলকারখানা। এই সময় জরুরি সেবার সঙ্গে সীমিত আকারে ব্যক্তিগত গাড়িও চলাচল করছে। এরই মধ্যে বিশেষ ব্যবস্থাপনায় বেশ কিছু দেশের সঙ্গে ফ্লাইট চালু হয়েছে। গতকাল থেকে খুলে দেওয়া হয়েছে অভ্যন্তরীণ আকাশপথও। নতুন করে এক সপ্তাহের লকডাউন শুরু হয়েছে গত মধ্যরাত থেকে। এই লকডাউন চলবে ২৮ এপ্রিল মধ্যরাত পর্যন্ত।

এদিকে ‘লকডাউনে’ গণপরিবহন না থাকায় ভোগান্তিতে পড়ছেন যাত্রীরা। যাত্রীরা বলছেন, যানবাহনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে নিরাপদ ট্রেন। কিন্তু অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চললে যাত্রীরা বাড়ি থেকে বিমানবন্দরে বা বিমানবন্দর থেকে বাড়িতে পৌঁছাবেন কিভাবে? তাঁদের দাবি, একচেটিয়া গণপরিবহন বন্ধ না রেখে সংক্রমণের ধরন ও এলাকা বুঝে বিধি-নিষেধ আরোপ করতে হবে। নিরাপদ এলাকাকে এসব নিষেধাজ্ঞার বাইরে রাখতে হবে। আবার কঠোর বিধি-নিষেধের মধ্যে অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট চালুর পেছনে যুক্তি খুঁজে পাচ্ছেন না সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে লকডাউনের মধ্যেও কিছু কিছু বিষয়ে ছাড় দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, করোনা সংক্রমণ রোধে একদিকে লকডাউন ছাড়া বিকল্প নেই, অন্যদিকে মানুষের জীবন-জীবিকার বিষয়টাও চিন্তা করতে হচ্ছে সরকারকে। তাই সর্বাত্মক লকডাউনের কথা বলা হলেও সেই পথে হাঁটতে পারছে না সরকার। প্রথম দফার ‘লকডাউন’ শুরুর পর কিছু শিথিলতা আনা হয়েছে। এবার দ্বিতীয় সপ্তাহের ‘লকডাউন’ শেষ হওয়ার আগে আরো কিছু বিষয়, যেমন—সীমিত আকারে দোকানপাট ও গণপরিবহন চালুর ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনা করছে সরকার।

বিমান চালু হলেও ট্রেন কেন চালু হলো না এমন প্রশ্নের জবাবে রেলের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বলেন, ‘ওটা বড় লোকের পরিবহন, তাই নিরাপদ বেশি। ট্রেনের বিষয়ে সরকার এখনো সিদ্ধান্ত নেয়নি।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার এনায়েত উল্যাহ বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে কোনো সিদ্ধান্ত না পেলে বাস চালু হচ্ছে না। এর বেশি কিছু বলারও নেই। তাদের সঙ্গে আমরা কথা বলে যাচ্ছি, ২৮ এপ্রিলের পর বাস চালু হওয়ার একটা সম্ভাবনা আছে।

রেলপথ মন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজন বলেন, ‘বিশেষ প্রয়োজনে হয়তো বিমান চালু করেছে। অনেকেই বিদেশে যাচ্ছে, বিদেশের অনেক প্লেন যেহেতু চালু হয়েছে ওইটার সঙ্গে কানেক্ট করছে। ট্রেন চালু করলে তো আবার স্বাভাবিক হয়ে যাবে সব। ট্রেন-বাস এগুলো ছেড়ে দিলে তো আর কিছু থাকল না। যারা বিদেশে যাবে তারা এলেও নরমাল চলাফেরাকে তো নিরুৎসাহ করা হচ্ছে। ঢাকা থেকে বাইরে যাওয়া বা বাইরে থেকে ঢাকায় আসা, এটা হলে তো গতবারের মতো করোনাভাইরাস ছড়িয়ে যাবে।

পরিবহন বিশেষজ্ঞ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক হাদিউজ্জামান বলেন, করোনার মধ্যে উড়োজাহাজ একটি নিরাপদ যান, এতে কোনো সন্দেহ নেই। কেননা, উড়োজাহাজে প্রতি ঘণ্টায় ২০ থেকে ৩০ বার বাতাস পরিবর্তিত হয়। যেখানে এসি বাস বা ট্রেনে ঘণ্টায় দুই-চারবার বাতাস পরিবর্তিত হয়। তবে মানুষকে যেহেতু বিমানবন্দর পর্যন্ত আসতে হবে এবং অভ্যন্তরীণ রুটের ক্ষেত্রে বিমান থেকে নেমে পরিবহন দরকার।

চার যাত্রী নিয়ে উড়ল নভোএয়ার : এদিকে ১৬ দিন পর গতকাল সকাল থেকে কক্সবাজার ছাড়া দেশের অন্য অভ্যন্তরীণ পথে উড়োজাহাজ চলাচল শুরু হয়েছে। তবে প্রথম দিন যাত্রী ছিল একেবারেই কম। নভোএয়ারের চট্টগ্রামের পথের একটি ফ্লাইটে যাত্রী পেয়েছে মাত্র চারজন। তবে কোনো ফ্লাইট বাতিল হয়নি।

বিমানবন্দর সূত্র জানায়, প্রথম দিন ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস ও নভোএয়ার ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম, সিলেট, যশোর, সৈয়দপুর ও বরিশাল রুটে ফ্লাইট পরিচালনা করছে। রাজধানী ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে তিনটি, সিলেটে দুটি, যশোরে দুটি, সৈয়দপুরে দুটি ও বরিশালে একটি ফ্লাইট পরিচালনা করেছে এই দুটি বিমান সংস্থা। এ ছাড়া রাষ্ট্রায়ত্ত বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস আজ বৃহস্পতিবার থেকে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম, সিলেট, বরিশাল, যশোর ও সৈয়দপুরে ফ্লাইট পরিচালনা করবে।

গত মঙ্গলবার বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) সীমিত পরিসরে বুধবার থেকে ফ্লাইট চলাচলের অনুমতি দেয়। অন্যদিকে ১৭ এপ্রিল থেকে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুর, কাতার ও ওমানে বিশেষ ফ্লাইটগুলো চলছে।

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সূত্র জানায়, ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের উদ্দেশে মাত্র চারজন যাত্রী নিয়ে ছেড়ে গেছে নভোএয়ারের ফ্লাইট। বিমান সংস্থাটির বিপণন প্রধান মেজবাহ উল ইসলাম বলেন, ‘চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় রিটার্ন ফ্লাইটেও মাত্র চারজন যাত্রী ছিলেন।’ লকডাউনে গণপরিবহন না থাকা এবং রাতে নির্দেশনা জারি করে সকালে ফ্লাইট চালুর কারণে যাত্রী কম হচ্ছে বলে জানান তিনি। তিনি বলেন, লকডাউনে গণপরিবহন না থাকায় যাত্রীদের ভোগান্তি হচ্ছে বলেও জানান।

অন্যদিকে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসেও যাত্রী ছিল কম। বিমান সংস্থাটি যশোর ফ্লাইটে ৩২ জন, সিলেট ফ্লাইটে ২৮ জন এবং সৈয়দপুরে ৪৯ জন যাত্রী পেয়েছে। ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের মহাব্যবস্থাপক-জনসংযোগ (জিএম-পিআর) কামরুল ইসলাম বলেন, ‘করোনাকালীন একটি অনিশ্চয়তা থেকে আমরা ফ্লাইট পরিচালনার সুযোগ পেয়েছি। সকালে ফ্লাইটে যাত্রীসংখ্যা কিছুটা কম ছিল। তবে এরই মধ্যে বিকেলের ফ্লাইটগুলোর অনেক টিকিট বিক্রি হয়েছে। এদিকে আজ বৃহস্পতিবার ঢাকা থেকে রাজশাহীর পথে ফ্লাইট শুরু করছে ইউএস-বাংলা।

বেবিচকের চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মফিদুর রহমান বলেন, ‘বুধবার থেকে সীমিত পরিসরে অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট চালু হয়েছে। কঠোরভাবে স্বাস্থ্যবিধি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। বিমান সংস্থাগুলো আপাতত তিন ভাগের এক ভাগ ফ্লাইট পরিচালনা করছে।’



সাতদিনের সেরা