kalerkantho

শুক্রবার। ৩১ বৈশাখ ১৪২৮। ১৪ মে ২০২১। ০২ শাওয়াল ১৪৪২

করোনায়ও থেমে নেই আ. লীগে খুনোখুনি

► শেষ দুই মাসে ১১ খুন, গুলিবিদ্ধ ৩০
► মহামারি শুরুর পর ১১ মাসে নিহত ২৩, আহত সহস্রাধিক

তৈমুর ফারুক তুষার   

২২ এপ্রিল, ২০২১ ০২:৫১ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



করোনায়ও থেমে নেই আ. লীগে খুনোখুনি

করোনার দুঃসময় সামাল দিয়ে অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে গলদঘর্ম প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার। করোনাকালে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সাধারণ মানুষের পাশে থাকতে নির্দেশনা দিয়েছেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা। তার পরও মহামারিকালে ব্যক্তিস্বার্থের নেশায় মত্ত দলটির বহু বেয়ারা নেতাকর্মী। তাঁদের বেপরোয়া আধিপত্য বিস্তারের দ্বন্দ্বে নেতাকর্মীদের ঝরছে রক্ত। করোনার দুর্যোগ শুরুর পরও প্রায় প্রতি মাসেই দেশের কোথাও না কোথাও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষে জড়িয়ে ঝরাচ্ছেন প্রাণ।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গেল দুই মাসে দেশের বিভিন্ন এলাকায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের আধিপত্য বিস্তারের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে কমপক্ষে ১১ জন নিহত এবং দেড় শতাধিক নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন অন্তত ৩০ জন। এই এপ্রিলেই এখন পর্যন্ত খুন হয়েছেন তিনজন। গত বছরের মার্চে করোনা সংক্রমণ শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ বিবাদে সহস্রাধিক মানুষ আহত হয়েছেন। হতাহতদের মধ্যে আওয়ামী লীগ এবং এর সহযোগী সংগঠন যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীর সংখ্যাই বেশি।

জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘আওয়ামী লীগ একটি বড় দল। দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতায়। নানা ফাঁকফোকর দিয়ে অনেকে গত কয়েক বছরে দলে অনুপ্রবেশ করেছে। এরা আদর্শিক কারণে দল করে না। নিজেদের ব্যবসা-বাণিজ্য ও স্বার্থ উদ্ধারে মত্ত থাকে। এদের বিরুদ্ধে আমরা সচেতন আছি। সব সময়ই চেষ্টা করছি এদের কঠোর হাতে দমন করতে। এদের কারণে দলের ক্ষতি হয়। করোনাকালে যেখানে মানুষ সংযত থাকবে সেখানে নিজেদের মধ্যে এসব আত্মঘাতী সংঘর্ষ দুঃখজনক।’

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম বলেন, ‘আওয়ামী লীগ এবং এর সহযোগী সংগঠনের নেতারাই করোনাকালে সবচেয়ে বেশি মানবিক কাজে যুক্ত আছে। এর মধ্যে দু-এক জায়গায় হয়তো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটতে পারে। তৃণমূল পর্যায়ে যে ঘটনাগুলোর (অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষ) কথা শোনা যাচ্ছে এগুলোর সবটার সত্যতা নেই, আমি তা বলব না। কিন্তু সবার দলীয় পরিচয় কতটুকু সত্য তা বিবেচনার দাবি রাখে।’

গত সোমবার নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নুরনবী চৌধুরীকে দলীয় প্রতিপক্ষ হামলা চালিয়ে গুলিবিদ্ধ ও দুই পা ভেঙে দেয়। এর ঘণ্টাখানেক পরই সাংস্কৃতিক সম্পাদক নুরুজ্জামান স্বপনের ওপরও হামলা করা হয়। উপজেলাটিতে দীর্ঘদিন ধরেই নিয়মিত সংঘর্ষে জড়াচ্ছে দলটির দুই পক্ষ। সম্প্রতি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের বাড়িতেও ককটেল হামলা হয়েছে। গত ১৫ এপ্রিল আওয়ামী লীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষে অন্তত আটজন আহত হয়। এর আগে ৯ মার্চ উপজেলার বসুরহাটে সংঘর্ষে একজন প্রাণ হারায়, ১৫ জন গুলিবিদ্ধসহ আহত হয় অন্তত ৪০ জন। এর আগে ১৯ ফেব্রুয়ারি ওই দুই পক্ষের সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে একজন মারা যায়। বসুরহাটের মেয়র ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের ছোট ভাই আবদুল কাদের মির্জার সঙ্গে নোয়াখালী আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক একরামুল করিম চৌধুরী ও ফেনীর সংসদ সদস্য নিজাম হাজারীর দ্বন্দ্বে এসব সংঘর্ষ ঘটছে।

এদিকে গত ১০ এপ্রিল বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জের দক্ষিণ উলানিয়ার সুলতানী গ্রামে হামলায় নিহত হয় দুইজন। দক্ষিণ উলানিয়া ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন ঘিরে আওয়ামী লীগের বিরোধে এই হামলার ঘটনা ঘটে। একই ঘটনায় গত ১৩ মার্চ এবং গত ৪ ডিসেম্বর দুই পক্ষে বড় ধরনের সংঘর্ষে বেশ কয়েকজন আহত হয়েছিল।

গত ১১ এপ্রিল সিরাজগঞ্জের কামারখন্দে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সংঘর্ষে ১০ জন আহত হয়। উপজেলার ঝাঐল ইউনিয়নের চালা গ্রামে এই সংঘর্ষের নেপথ্যে ছিল উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সদস্য করিম সেখ ও স্থানীয় ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সহসভাপতি আশরাফ আলীর আধিপত্যের দ্বন্দ্ব।

গত ১০ এপ্রিল কুষ্টিয়ার খোকসার কামারভোগ গ্রামে আওয়ামী লীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষে আহত হয় ১০ জন। ৭ এপ্রিল নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে আওয়ামী লীগে আধিপত্যের জেরে চৌমুহনী রেললাইন এলাকায় সংঘর্ষে ১৬ জন আহত হয়।

১ এপ্রিল পাবনার সাঁথিয়ার গৌরিগ্রাম ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের কমিটি গঠন নিয়ে বিরোধে সংঘর্ষের ঘটনায় একজন নিহত ও ১০ জন আহত হয়। গত ২৪ মার্চ চুয়াডাঙ্গা সদরের তিতুদহ ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক জাহাঙ্গীর মল্লিককে হত্যা করে তাঁরই দলীয় প্রতিপক্ষ। ৬ মার্চ চট্টগ্রামের বায়েজিদ বোস্তামির আরেফিননগর এলাকায় অভ্যন্তরীণ কোন্দলে ছাত্রলীগ নেতা ইমন রনি নিহত হন।

গত ১ মার্চ রাতে মানিকগঞ্জের সিংগাইরে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ফারুক হোসেন মিরুকে কুপিয়ে আহত করা হয়। পরদিন তিনি ঢাকার জাতীয় অর্থোপেডিক (পঙ্গু) হাসপাতালে মারা যান। বেশ কিছুদিন ধরেই ফারুকের সঙ্গে সিংগাইর সরকারি কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি মোল্লা মোহাম্মদ দুলালের আধিপত্য বিস্তারের দ্বন্দ্ব চলছিল। সেই দ্বন্দ্বের জেরেই খুন হন ফারুক।

গত ২৪ ফেব্রুয়ারি নড়াইলের লোহাগড়া ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা বদর খন্দকারকে কুপিয়ে হত্যা করে তাঁরই দলীয় প্রতিপক্ষ। একই দিন চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় আধিপত্য বিস্তারের দ্বন্দ্বে খুন হন খাগড়িয়া ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বেলাল উদ্দিন। ১৯ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের আনোয়ারায় অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জেরে ছাত্রলীগকর্মী আশরাফ উদ্দীনকে কুপিয়ে হত্যা করেন প্রতিপক্ষের নেতাকর্মীরা।

গত ১৩ ফেব্রুয়ারি বগুড়ার ধুনটে আওয়ামী লীগের দুই পক্ষের নেতাকর্মীরা সংঘর্ষে জড়ান। স্থানীয় সংসদ সদস্য হবিবর রহমান এবং ধুনট উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি টি আই নুরুন্নবী তারিকের অনুসারীদের মধ্যে সংঘর্ষে ২৫ জন নেতাকর্মী আহত হন।

গত ৭ ফেব্রুয়ারি নাটোরের সিংড়ার ডাহিয়া ইউনিয়নে কম্বল বিতরণ করতে যান আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহেমদ পলক। সেই অনুষ্ঠানে চেয়ারে বসা নিয়ে বিবাদের জেরে অনুষ্ঠান শেষে সংঘর্ষে জড়ায় ডাহিয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি এম এম আবুল কালাম ও সাধারণ সম্পাদক মামুনুর রশিদের সমর্থকরা। এতে আহত হয় সাতজন।

গত ১৩ জানুয়ারি ঝিনাইদহের শৈলকূপার কবিরপুরে নির্বাচনী দ্বন্দ্বে প্রতিপক্ষের হামলায় নিহত হন উমেদপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক লিয়াকত হোসেন বল্টু।

গত বছরের ১১ ডিসেম্বর পাবনার অনন্ত বাজার এলাকায় খুন হন আওয়ামী লীগ নেতা ও ইউপি সদস্য বকুল শেখ। ১২ নভেম্বর চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে যুবলীগকর্মী মারুফ চৌধুরী মিন্টুকে কুপিয়ে হত্যা করে তাঁরই সংগঠনের প্রতিপক্ষের কর্মীরা। গত ১১ নভেম্বর কুমিল্লার ঢাকা-চট্টগ্রাম পুরাতন মহাসড়কের পুরান চৌয়ারা ধনপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কাছে যুবলীগ নেতা জিল্লুর রহমান চৌধুরীকে কুপিয়ে হত্যা করে তাঁরই দলীয় প্রতিপক্ষ। ৫ নভেম্বর নোয়াখালী সদরের এওজবালিয়া ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় একজন। ওই সংঘর্ষে আহত হয় ২২ জন।

গত ১৭ অক্টোবর ময়মনসিংহের গৌরীপুর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক মাসুদুর রহমান শুভ্রকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। গত ৬ সেপ্টেম্বর পাবনার সুজানগরে আওয়ামী লীগের সংঘর্ষে ১৫ জন গুলিবিদ্ধসহ ২৫ জন আহত হয়। পরের সপ্তাহে কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়ায় সংঘর্ষে আহত হয় ১০ জন। গত ২ আগস্ট পটুয়াখালীর বাউফলে কোন্দলের জেরে যুবলীগকর্মী রুমান তালুকদার ও ছাত্রলীগকর্মী ইসরাতকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। গত ২৬ জুন সিরাজগঞ্জে ছাত্রলীগের সহসম্পাদক এনামুল হক বিজয়কে কুপিয়ে আহত করে তাঁরই সংগঠনের নেতাকর্মীরা। পরে ৫ জুলাই চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান বিজয়। গত ৫ জুন বগুড়ার শাজাহানপুরের শাকপালা এলাকার একটি মসজিদে প্রবেশের মুহূর্তে বগুড়া স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আবু হানিফ মিস্টারকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় এক যুবলীগ নেতা ও তাঁর ঘনিষ্ঠ ১২ জনের নামে মামলা করে মিস্টারের পরিবার।

গত ২৭ মে নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারের কালাপাহাড়িয়া এলাকায় আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে একজন নিহত ও ১০ জন আহত হয়। গত ২৪ মে পটুয়াখালীর বাউফলে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও পৌর মেয়রের অনুসারীরা সংঘর্ষে জড়ায়। এ সংঘর্ষে এক যুবলীগ কর্মী নিহত ও ১০ জন আহত হয়।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্যমতে, এ বছরের প্রথম তিন মাসে (জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি-মার্চ) আওয়ামী লীগ এবং এর সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলোর মধ্যে ৩৩টি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। আওয়ামী লীগের সঙ্গে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ২০টি সংঘর্ষে ছয়জন নিহত ও ৪০০ জন আহত হয়। আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুবলীগের নেতাকর্মীদের পাঁচটি সংঘর্ষে ২১ জন আহত হয়। আওয়ামী লীগের সঙ্গে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের তিনটি সংঘর্ষে একজন নিহত ও দুজন আহত হয়। যুবলীগের অভ্যন্তরীণ দুটি সংঘর্ষে ১১ জন আহত হয়। ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ তিনটি সংঘর্ষের ঘটনায় দুজন নিহত ও ১০ জন আহত হয়।

আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের গত মেয়াদেও অভ্যন্তরীণ কোন্দলে বহু নেতাকর্মী হতাহত হয়। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের এক প্রতিবেদন অনুসারে, আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে ২০১৬ সালে মারা যায় ৮৩ জন। ২০১৫ সালে মারা যায় ৩৩ জন।



সাতদিনের সেরা