kalerkantho

শুক্রবার । ২৪ বৈশাখ ১৪২৮। ৭ মে ২০২১। ২৪ রমজান ১৪৪২

নাশকতায় ঘুরেফিরে মামুনুলের নাম

►সমঝোতায় হেফাজতের তিন দাবি, বন্ধ কর্মসূচি
► হেফাজতকেও তিন ধরনের নির্দেশনা
► আরেক নেতা গ্রেপ্তার

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২১ এপ্রিল, ২০২১ ০২:৫০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



নাশকতায় ঘুরেফিরে মামুনুলের নাম

হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মোহাম্মদ মামুনুল হক ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে নাশকতার সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন। গত ২৮ মার্চ ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে নাশকতা হয়েছে তাঁর প্রত্যক্ষ ইন্ধনে। এ ছাড়া গত বছর মোহাম্মদপুরের জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়া মাদরাসা ও এর আশপাশের মসজিদ নিয়ন্ত্রণ করতে অনুসারীদের দিয়ে হামলা চালিয়েছেনও তিনি। হামলা আর উসকানি ছড়ানোর উদ্দেশ্য ছিল রাষ্ট্রক্ষমতা দখল। ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি), তেজগাঁও অপরাধ বিভাগ, অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) তদন্ত সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

গেল এক সপ্তাহে গ্রেপ্তার হওয়া হেফাজতের ৯ নেতার মধ্যে মুফতি ফকরুল ইসলাম গত সোমবার ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। সর্বশেষ গতকাল মঙ্গলবার ঢাকা মহানগর সহসভাপতি ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা কোরবান আলী কাসেমীকে গ্রেপ্তার করেছে ডিবি।

এসব নেতা ডিবির জিজ্ঞাসাবাদে কর্মসূচির সঙ্গে মামুনুল সম্পৃক্ত বলে তথ্য দিয়েছেন। গত বছর মোহাম্মদপুরের মাদরাসায় মামুনুলের সহযোগীদের হামলার সিসি ক্যামেরার ফুটেজও পেয়েছে পুলিশ। রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে তাবলিগকেন্দ্রিক বিরোধে হামলার কথা স্বীকার করেছেন মামুনুল। তিনি উসকানি ছড়ানোর দায় এড়িয়ে যাচ্ছেন। তবে তিন বিয়ের বিষয়টি তিনি গতকালও অকপটে স্বীকার করেছেন। সিদ্ধিরগঞ্জের মামলায় মামুনুলকে রিমান্ডের আবেদন করা হবে বলে জানিয়েছেন সিআইডির কর্মকর্তারা।

এদিকে কোণঠাসা হেফাজতের নেতারা গত সোমবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেখা করে সমঝোতার জন্য গ্রেপ্তার বন্ধ করাসহ তিনটি প্রধান দাবি তুলে ধরেছেন। বিনিময়ে তাঁরা কোনো কর্মসূচি না দিয়ে শান্ত থাকবেন বলেও আশ্বস্ত করেছেন। অন্যদিকে হেফাজত নেতাদের বিবৃতি দিয়ে নাশকতার জন্য দুঃখ প্রকাশ, সংগঠনে রাজনৈতিক নেতাদের অপতৎপরতা বন্ধ করাসহ তিনটি নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে গতকাল পর্যন্ত সমঝোতার কোনো আশ্বাস মেলেনি।

গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে সিআইডির প্রধান ও অতিরিক্ত আইজিপি ব্যারিস্টার মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘নারায়ণগঞ্জের মামলায় তাঁর (মামুনুল) সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। তিনি একটি মামলায় রিমান্ডে আছেন। সেটি শেষ হলে আমরা তাঁকে রিমান্ডে নেব।’

সিআইডির কর্মকর্তারা বলেন, নারায়ণগঞ্জের দুটি, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ১৫টি, কিশোরগঞ্জের দুটি, চট্টগ্রামের দুটি এবং মুন্সীগঞ্জের দুটি মামলার তদন্তভার পেয়েছে সিআইডি। গত ২৮ মার্চ হরতালের সময় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সিদ্ধিরগঞ্জে গাড়িতে অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুরসহ ব্যাপক তাণ্ডব চালায় হেফাজতে ইসলামের অনুসারীরা। এতে সিদ্ধিরগঞ্জ থানার দুটি মামলা পেয়েছে সিআইডি, যার একটি মামলায় মামুনুলের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে।

তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) হারুন অর রশিদ বলেন, ‘উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়ে মাদরাসার কোমলমতি শিক্ষার্থীদের মাঠে নিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের চেষ্টা করেছিলেন মামুনুল। এ ছাড়া তাবলিগের সাদপন্থীদের মারধরের কথা স্বীকার করেছেন তিনি। জোশের কারণে ওয়াজ মাহফিলে বিশিষ্ট নাগরিকদের নিয়ে মানহানিকর বক্তব্য দিয়েছেন বলেও স্বীকার করেছেন মামুনুল।’

সূত্র জানায়, গতকালও ডিবি ও তেজগাঁও বিভাগের কর্মকর্তারা কয়েক দফায় মামুনুলকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি ইসলামের অপব্যাখ্যা দিয়ে উসকানি ছড়াননি বলে দাবি করেন। সরকার হটানো নয়, সরকারের সঙ্গে হেফাজতের সম্পর্ক আগের মতোই বলে দাবি তাঁর। তবে তাঁর ডাকে নাশকতার দায় প্রসঙ্গে তিনি নিশ্চুপ ছিলেন। তিন স্ত্রীর ব্যাপারে কথা বলেছেন অকপটে। দুজন সাক্ষী রেখে কাবিননামা ছাড়াই দুই বিয়ে করলেও স্ত্রীদের সঙ্গে চুক্তি ছিল তাঁর। ভরণ-পোষণের জন্য মাসে ১৫ হাজার টাকা করে দিতেন মামুনুল। জান্নাত আরা ঝর্ণা তাঁর ব্যক্তিগত ছবি তুলে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন বলে মন্তব্য করেন তিনি। তবে ডায়েরিতে ঝর্ণার ক্ষোভের কারণ জানা নেই বলে দাবি করেন তিনি।

ডিবির যুগ্ম কমিশনার মাহবুব আলম জানান, গতকাল বিকেলে বাসাবো এলাকা থেকে ২০১৩ সালের একটি মামলায় মাওলানা কোরবান আলীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আজ তাঁকে আদালতে তোলা হবে।

গত ১৪ এপ্রিল লালবাগ থেকে গ্রেপ্তারের পর পাঁচ দিনের রিমান্ড শেষে গত সোমবার ঢাকার মহানগর হাকিম আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবাবন্দি দিয়েছেন মুফতি ফকরুল ইসলাম। শাপলা চত্বরে নাশকতার মামলায় জবানবন্দি দেওয়া ফকরুল ঘটনার সময় হেফাজতের ঢাকা মহানগরের প্রচার সম্পাদক ছিলেন। জবানবন্দিতে তিনি বলেছেন, মামুনুল হকসহ ৪৩ নেতা শাপলা চত্বরে নাশকতায় জড়িত। নেতৃত্ব দিয়েছেন তৎকালীন মহাসচিব আল্লামা জুনাইদ বাবুনগরী। ফকরুলের ভাষ্যমতে, ৫ মের সেই সহিংসতায় তৎকালীন বিএনপি ও জামায়াতের একাধিক শীর্ষস্থানীয় নেতা অর্থ সহায়তা দিয়েছিলেন। সহিংসতায় অংশ নিয়েছিলেন বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীরাও। 

মসজিদ-মাদরাসা দখল : তদন্তে তথ্য মিলেছে, মোহাম্মদপুরের জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়া মাদরাসায় নিজস্ব প্রভাব প্রতিষ্ঠা করে নিয়ন্ত্রণ করছেন মামুনুল হক। তাবলিগ জামাতের জুবায়েরপন্থী মামুনুল হক ও তাঁর সহযোগীরা মোহাম্মদ সাদপন্থীদের ওপর হামলা চালায়। তারা পাশের সাত গম্বুজ মসজিদের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। ২০২০ সালের ৬ মার্চ সেখানে হামলার ঘটনায় দায়ের করা মামলায়ই রিমান্ডে আছেন মামুনুল। মামলার বাদী জি এম আলমগীর শাহিন সাদপন্থী। ঘটনার সিসি ক্যামেরার ফুটেজ জব্দ করেছে পুলিশ। সেখানে আসামি ওমর, ওসমান, শহিদ, আনিস ও জহিরের মসজিদে ঢুকে হামলা চালানোর প্রমাণ মিলেছে। তাঁরা সবাই মামুনুল হকের ঘনিষ্ঠ। রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে মামুনুল সাদপন্থীদের বিতাড়িত করার কথা স্বীকার করেছেন।

সমঝোতায় তিন দাবি আর নির্দেশনা : সূত্র জানায়, গত সোমবার দিনে হেফাজতের মহাসচিব নূরুল ইসলাম জেহাদীর নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের প্রতিনিধিদল মালিবাগে এসবির কার্যালয়ে গিয়ে শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেখা করে। পরে রাতে হেফাজতের ১২ নেতা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ধানমণ্ডির বাসায় যান। এসব সাক্ষাতে মূলত তিনটি দাবি প্রাধান্য পায়। সেগুলো হলো—ঢালাও গ্রেপ্তার বন্ধ, সাম্প্রতিক সময়ে সংঘটিত ঘটনাগুলোর সঠিক তদন্ত এবং কওমি মাদরাসা খুলে দেওয়া। নেতারা দাবি করেন, হেফাজত রাজনৈতিক দল নয়, একটি সংগঠন। সরকারের সঙ্গে হেফাজতের বিরোধ নেই। সরকার রাজনৈতিক বিবেচনায় এখন গ্রেপ্তার করছে, গ্রেপ্তার নেতাকর্মীদের মুক্তি চান তাঁরা। রমজান মাসে কওমি মাদরাসাগুলোতে দান-সদকার কারণে বেশি আয় হয়। এই সময় মাদরাসা বন্ধ থাকলে গরিব শিক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই মাদরাসা খুলে দেওয়ার দাবি জানান তাঁরা। পুলিশের গোয়েন্দারা তাঁদের অবস্থান স্পষ্ট করতে নাশকতার ব্যাপারে সাংগঠনিক বিবৃতি দেওয়ার পরামর্শ দেন। হেফাজত নেতাকর্মীরা যদি নাশকতা না চালান, তবে জামায়াত-শিবিরসহ বহিরাগত কারা চালিয়েছে—সে ব্যাপারে বিবৃতিতে উল্লেখ থাকতে হবে। হেফাজত নিজেদের রাজনৈতিক সংগঠন দাবি না করলেও কয়েকটি ইসলামী দল হেফাজতের মাধ্যমে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে কর্মসূচি দিচ্ছে। এসব নেতাকে বাদ দেওয়ার মাধ্যমে সংগঠনকে অরাজনৈতিক করতে হবে। তৃতীয়ত, কওমি মাদরাসাগুলোর শিক্ষা বোর্ড বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের (বেফাক) পরিচালনার ব্যবস্থা ঢেলে সাজাতে হবে। সেখানে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিও রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। আলোচনা করে এসব ব্যাপারে পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানান হেফাজত নেতারা। এরপর বিকেলে হেফাজতের আমির জুনাইদ বাবুনগরী বক্তব্য দিলেও পুরোপুরি অবস্থান নিশ্চিত করেননি। তবে এ বক্তব্যকে ইতিবাচকভাবে দেখে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে বলে জানায় সূত্র।

রাতের সাক্ষাতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হেফাজত নেতাদের বলেন, ঢালাওভাবে নয়, সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে ভিডিও ফুটেজ দেখে জবানবন্দি নিয়ে সহিংসতায় জড়িতদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে আলাপে তাঁরা দাবি পূরণের আশ্বাস পাননি। দুই বৈঠকেই হেফাজত নেতারা কর্মসূচি না দিয়ে শান্ত থেকে সমঝোতা চাইছেন বলে জানান। হেফাজতের প্রচার সম্পাদক জাকারিয়া নোমান বলেন, ‘আমরা গ্রেপ্তার বন্ধের দাবি করেছি। সরকার আমাদের ভুল বুঝছে, সেটা বলার চেষ্টা করেছি। গত ২৬ মার্চ হেফাজতের কোনো কর্মসূচি ছিল না। কারা সেদিন মিছিল ও ভাঙচুর করেছে, সেটা তদন্তের দাবি করেছি।’



সাতদিনের সেরা