kalerkantho

বুধবার । ২৯ বৈশাখ ১৪২৮। ১২ মে ২০২১। ২৯ রমজান ১৪৪২

বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন

করোনা রোগীদের জন্য দেশে যে ওষুধ হন্যে হয়ে খুঁজছে অনেকে

অনলাইন ডেস্ক   

২০ এপ্রিল, ২০২১ ২১:৩৫ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



করোনা রোগীদের জন্য দেশে যে ওষুধ হন্যে হয়ে খুঁজছে অনেকে

এপ্রিল মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহের কথা। ঢাকার বাসিন্দা সৌরভ সাহার বাবা করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে ছিলেন। রোগীর অবস্থা বিবেচনা করে চিকিৎসকরা তার শরীরে একটি ওষুধ প্রয়োগের সিদ্ধান্ত নেন। সেই ওষুধের নাম একটেমরা। 

টসিলিজুমাব গ্রুপের একটি ইনজেকশন হচ্ছে 'একটেমরা'। টানা তিন দিন এই ইনজেকশন জোগাড়ের জন্য শহরের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরেছেন সৌরভ সাহা। শেষ পর্যন্ত এই ওষুধের আমদানিকারক এবং পরিবেশন রেডিয়েন্ট থেকে এটি ক্রয় করতে সক্ষম হন তিনি। সৌরভ সাহা বলেন, এই ওষুধের জন্য সেখানে দীর্ঘ লাইন। বহু মানুষ অপেক্ষা করছিল এটি কেনার জন্য। কিন্তু তাদের ওষুধ দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছিল। বিদেশ থেকে আসতে সময় লাগছিল। 

এই ওষুধ তার বাবার শরীরে প্রয়োগের পর শরীর কিছুটা ইতিবাচক সাড়া দিয়েছিল। ফলে চিকিৎসকদের পরামর্শে দ্বিতীয় ডোজে প্রয়োজন হয়ে পড়ে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দ্বিতীয় ডোজের ওষুধ সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি সৌরভ সাহার পক্ষে। এরই মধ্যে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে তার মৃত্যু হয় তার বাবার। সাহা বলেন, ‘ডাক্তাররা বলেছিলেন, যদি দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া যেত তাহলে হয়তো ওনার সম্ভাবনা থাকত। কিন্তু সময়মতো সেটা তো আর সংগ্রহ করতে পারিনি।’ 

এই ওষুধের এত চাহিদা কেন?

টসিলিজুমাব ওষুধটি মূলত আর্থ্রাইটিস বা বাত রোগের ওষুধ। কিন্তু সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখা গেছে, টসিলিজুমাব ওষুধটি কভিড-১৯-এ আক্রান্ত গুরুতর রোগীদের অনেকের ক্ষেত্রে জীবন রক্ষাকারী হিসেবে কাজ করছে। বাংলাদেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ শুরুর পর, এপ্রিল মাসের শুরু থেকে টসিলিজুমাব ওষুধের প্রচুর চাহিদা তৈরি হয়েছে বাংলাদেশে।

এই ওষুধের উৎপাদক সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বিশ্বখ্যাত রোশ কম্পানি। বাংলাদেশে এই ওষুধ আমদানি করে রেডিয়েন্ট বিজনেস কনসোর্টিয়াম। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, বাংলাদেশে প্রতি তিন থেকে চার দিন পরপর সুইজারল্যান্ড থেকে এই ওষুধ আসে। প্রতিবার ২০০-২৫০ ভায়েল ওষুধ আসে। কিন্তু এই সময়ের মধ্যে তিন গুণ চাহিদা তৈরি হয়েছে বলে চিকিৎসক এবং হাসপাতাল সূত্রগুলো বলছে। বাংলাদেশে করোনায় আক্রান্ত বিপুলসংখ্যক রোগীর সংকটাপন্ন অবস্থা তৈরি হওয়ার কারণে বিপুল পরিমাণে 'টসিলিজুমাব' ওষুধের বিপুল চাহিদা তৈরি হয়েছে।

ঢাকার বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের কভিড-১৯ নিবিড় পরিচর্যা ইউনিটের কনসালট্যান্ট সাজ্জাদ হোসেন বলেন, করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার পরে অনেকের ফুসফুসের ভেতরে একটা বড় ধরনের ঝড় তৈরি হয়। সেটা ঠেকানোর জন্য এই ওষুধ প্রয়োগ করা হয়। যাদের ফুসফুস ৬০ শতাংশের বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় তাদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি বিবেচনা করে এই ওষুধ প্রয়োগ করা হয়। এটা একটা সাপোর্টিভ ট্রিটমেন্ট। এটা দিলেই যে ভালো হয়ে যাবে তা নয়। আমাদের এখানে এবারের করোনাভাইরাসের যে ভ্যারাইটি হয়েছে, সেখানে আক্রান্তদের মধ্যে অনেকের ফুসফুস চার থেকে পাঁচ দিনের মধ্যে দুর্বল হয়ে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, এই ওষুধের কিছু গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে, তবে সেটা সবার ক্ষেত্রে নয়। এটার পর্সেন্টেজ খুব কম। রোগীর অবস্থা পর্যালোচনা করে এই ওষুধ প্রয়োগ করতে হবে।

রোশ বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, কভিড-১৯ মহামারির সময় বিশ্বজুড়ে টসিলিজুমাব ওষুধটির চাহিদা বেড়েছে। রোশ বাংলাদেশ জানিয়েছে, একটেমরা ওষুধটি কভিড-১৯ রোগীদের চিকিৎসার জন্য প্রথম ব্যবহার করা হয় চীনে ২০২০ সালের মার্চ মাসে। এরপর আরো কিছু দেশ একই রকম পদ্ধতি অনুসরণ করে।

রোশ বাংলাদেশ বলছে, করোনা মহামারির কারণে বিশ্বজুড়ে একদিকে এই ওষুধের চাহিদা তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে উৎপাদন সীমাবদ্ধতার কারণে সরবরাহে সংকট তৈরি হয়েছে।

কারণ বায়োটেক ওষুধের উৎপাদন, বিতরণ এবং রক্ষণাবেক্ষণ জটিল ও সময়সাপেক্ষ কাজ। সে জন্য এই ওষুধের সংকট তৈরি হয়েছে বলে জানায় রোশ বাংলাদেশ। তার পরেও এই সংকটের সময় ওষুধটির সর্বোচ্চ সরবরাহ নিশ্চিত করার চেষ্টা চালানো হচ্ছে বলে জানায় রোশ বাংলাদেশ।

ব্যয়বহুল ও কালোবাজারের বিপদ 

সৌরভ সাহা জানান, তারা বাবার জন্য একটেমরা ওষুধটি নির্ধারিত বিক্রয় কেন্দ্র থেকে ৬০০ গ্রামের একটি ভায়েল ক্রয় করেছিলেন ৬৫,০০০ টাকায়। কিন্তু এরপর তার বাবার জন্য দ্বিতীয় ভায়েল প্রয়োজন হলে নির্ধারিত বিক্রয় কেন্দ্রে সে ওষুধ আর পাওয়া যায়নি। এ জন্য তিনি বিভিন্ন মানুষকে অনুরোধ করেছিলেন। শেষ পর্যন্ত ফেসবুকে একটি গ্রুপে এই ওষুধ বিক্রির খবর জানতে পারেন। কোনো উপায় না পেয়ে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন সৌরভ সাহা।

ফেসবুকভিত্তিক সে বিক্রেতারা জানান, ভারত থেকে তারা এই ওষুধ নিয়ে আসেন। সৌরভ সাহা বলেন, যেখানে আমি আগে ৬০০ গ্রাম কিনেছি ৬৫,০০০ টাকায়; কিন্তু তারা আমার কাছে ৪০০ গ্রামের দাম চেয়েছিল দেড় লাখ টাকা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওষুধ প্রযুক্তি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক আ.ব.ম. ফারুক বলেন, হাসপাতাল কিংবা অনুমোদিত বিক্রয়কেন্দ্র থেকে এই ওষুধ না কিনলে যথেষ্ট বিপদ হতে পারে। কারণ বায়োটেক প্রযুক্তির ওষুধ হওয়ার কারণে 'একটেমরা' ওষুধ সংরক্ষণ করতে হয় মাইনাস ২০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায়। এই তাপমাত্রা বজায় না থাকলে ওষুধটি কার্যকর হবে না। তাপমাত্রা একটু এদিক-সেদিক হলে ওষুধটি উল্টো রোগীর জন্য বিপদ হতে পারে। তখন হয়তো চিকিৎসকরা ভাবতে পারেন, এত ভালো একটা ওষুধ দেওয়ার পরও কাজ হলো না কেন।



সাতদিনের সেরা