kalerkantho

শুক্রবার। ৩১ বৈশাখ ১৪২৮। ১৪ মে ২০২১। ০২ শাওয়াল ১৪৪২

দিল্লির চিঠি

আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার প্রসঙ্গ

জয়ন্ত ঘোষাল   

১৯ এপ্রিল, ২০২১ ০৩:৩৭ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার প্রসঙ্গ

আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়ে এখন গোটা দুনিয়ায় আলাপ-আলোচনা শুরু হয়ে গেছে। প্রেসিডেন্ট বাইডেন জানিয়ে দিয়েছেন, আগামী ১১ সেপ্টেম্বর মার্কিন সেনা আফগানিস্তান থেকে সরে আসবে। এখন এই সেনাবাহিনী আফগানিস্তান থেকে সরে এলে ভারতে এবং সামগ্রিকভাবে এই উপমহাদেশে কী প্রভাব পড়বে তা নিয়ে নয়াদিল্লি এবং ঢাকায়ও আলাপ-আলোচনা শুরু হয়ে গেছে। তার কারণ একদিকে যেমন বাইডেন সেনা প্রত্যাহার করে নেওয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছেন। আবার অন্যদিকে বিভিন্ন গোয়েন্দা সূত্রে ঢাকা এবং নয়াদিল্লির কাছে খবর আসছে যে আফগানিস্তানই শুধু নয়, সামগ্রিকভাবে পাকিস্তানে এবং এই উপমহাদেশের বিভিন্ন রাষ্ট্রে তালেবানি জঙ্গি তৎপরতা আবার বাড়তে শুরু করেছে। পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই বেশ কিছু জায়গায় সক্রিয় হয়ে উঠেছে। চীন এবং পাকিস্তানের অক্ষ দৃঢ় থেকে দৃঢ়তর হচ্ছে। সুতরাং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই সেনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তকে ভারত ঠিক কিভাবে নিচ্ছে, তার কী প্রভাব পড়তে পারে, সেসব নিয়ে আলাপ-আলোচনা শুরু হয়ে গেছে।

ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ কূটনীতিকদের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করছিলাম। আলোচনা করতে গিয়ে প্রথমে যেটা জানতে পারলাম, পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্কর, পররাষ্ট্রসচিব হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল বিভিন্ন স্তরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাইডেন প্রশাসনের সঙ্গে যথেষ্ট যোগাযোগ রাখছেন। জয়শঙ্কর নিজেই দীর্ঘদিন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ছিলেন। শ্রিংলাও ছিলেন। তার ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারত ধারাবাহিকভাবে একটা সুসম্পর্ক রক্ষা করে চলেছে। বাইডেন সেনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তটা ঘোষণা করার আগে ভারতের কূটনীতিকদের সঙ্গে বিভিন্ন স্তরে আলাপ-আলোচনা করেছে বলে জানতে পারলাম। দ্বিতীয়ত, ভারতীয় কূটনীতিকরা বলছেন, এই সেনা প্রত্যাহারের বিষয়টা কিন্তু আদৌ অপ্রত্যাশিত বা নতুন কোনো ঘটনা নয়। মে মাসে সেনা প্রত্যাহারের সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। মে মাসেই সেনা প্রত্যাহারের কথা ছিল। বরং বাইডেন এই সময়সীমা মে মাস থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাড়িয়ে কিছুটা আরো বেশি লিজ দিয়েছেন। কিন্তু বাইডেন নির্বাচনের আগে থেকেই বারবার বলেছেন, তাঁর দলের নীতি হলো আফগানিস্তানে মার্কিন সেনা আর রাখাটা তাঁর অগ্রাধিকার নয়। সেখান থেকে তুলে নেওয়াটাই তিনি অনেক দিন আগে থেকেই বলেছেন। সত্যি কথা বলতে কী, ওবামাও কিন্তু তিনবার সেনা প্রত্যাহারের কথা ঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু তিনি নানা কারণে প্রত্যাহার করতে পারেননি। ট্রাম্পও কিন্তু বারবার এই সেনা প্রত্যাহারের কথা ঘোষণা করেছেন। কিন্তু পারেননি। আসলে বুশ আফগানিস্তানকে এপিসেন্টার করে সন্ত্রাসবাদ দমনের লড়াই শুরু করেছিলেন। তারপর তিনি মূল লড়াইটা ইরাকে নিয়ে চলে যান। আফগানিস্তান কম গুরুত্ব পায়। বুশের পর ওবামা আসেন, তখন ইরাকের যুদ্ধের অবসান হয়ে গেছে। তিনি তখন আফগানিস্তানে মার্কিন সেনার জয়লাভের অগ্রাধিকার দিয়ে সেখানে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে ওবামা ও ট্রাম্প সেনা প্রত্যাহারের চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু পারেননি। ভারতীয় কূটনীতিকরা বলছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টরা চেষ্টা করেন কিন্তু পারেন না। এমনকি বাইডেন এত কথা বলেও মে মাস থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই সেনাবাহিনীকে রাখার আয়ু বাড়িয়েছেন। এর একটা অন্যতম বড় কারণ হচ্ছে, মার্কিন সেনাবাহিনী কিন্তু আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহারের পক্ষে নয়। কেন নয় তার একটা মস্তবড় কারণ হলো, আমেরিকান সেনারা যাঁরা আফগানিস্তানে আছেন, তাঁরা কিন্তু ওখান থেকে আসতে চাইছেন না। তার কারণ সেনাবাহিনীর বেতন ওখানে থাকার জন্য যথেষ্ট বেশি। তাঁরা বলেন, ‘বোনাস-স্যালারি’। তাঁরা নানা রকমের প্রণোদনা পাচ্ছেন। অথচ সেখানে এখন কার্যত যুদ্ধ নেই বললেই চলে। গত বছরে ৩৬৫ দিনে আফগানিস্তানে মার্কিন সেনাবাহিনীর মাত্র ১০ জন সেনা নিহত হয়েছেন। যেটা একটা যুদ্ধের জন্য কিছুই নয়। অথচ ওখানে প্রতিবছর ৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মার্কিন রাজকোষ থেকে ব্যয় করতে হচ্ছে। সত্যি কথা বলতে, ওবামা থেকে ট্রাম্প সবাই কিন্তু ধাপে ধাপে ওখান থেকে অনেক দিন ধরেই সেনা প্রত্যাহার শুরু করে দিয়েছিলেন। সুতরাং এমন নয় যে সেনা প্রত্যাহার হয়নি। এখন ওখানে রয়েছে তিন হাজার ট্রুপস। এই তিন হাজার ট্রুপস তোলা হবে কি না বা এটা আরেকটু কমিয়ে দিয়ে বাইডেন মার্কিন সেনাবাহিনীর চাপের মুখে আবার সেটাকে পিছিয়ে দেবেন কি না সেগুলো দেখার বিষয়। ভারতীয় কূটনীতিকদের সঙ্গে কথা বলে বুঝলাম যে ভারত এবারে এই সেনাকে রাখার ব্যাপারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওপরে বড় চাপ সৃষ্টি করতে চাইছে এমন নয়। তার কারণ ভারত বাংলাদেশ এবং অন্যান্য প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে এই বিষয়টি নিয়ে আলাপ-আলোচনা করছে। ভারতে যে পারসপেকটিভ থেকে সাউথ ব্লক দেখছে, সেটা হচ্ছে প্রথমত পুলওয়ামা আক্রমণের পর নরেন্দ্র মোদি পাকিস্তানকে উচিত শিক্ষা দিতে পেরেছেন। তার পর থেকে এখনো পর্যন্ত মোদি কিন্তু তাঁর পাকিস্তান নীতিতে কোনো পরিবর্তন আনেননি। উল্টো পাকিস্তানের সেনাপ্রধান বাজোয়া ভারতের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার কথা বলেছেন। কিন্তু ইমরান খান আবার সেনাবাহিনীর সেই প্রস্তাবকে কার্যত প্রত্যাখ্যান করেছেন। সেই কারণে ভারত পাকিস্তানের এই সেনাবাহিনী বনাম রাজনৈতিক প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ কলহে কী অবস্থান নেবে, কী নেবে না, তা নিয়ে যখন নিজেরাই ঝগড়ায় মত্ত। তখন নরেন্দ্র মোদির অবস্থান হলো, পাকিস্তান নিয়ে আর কোনো মাথা ঘামানোরই দরকার নেই। অর্থাৎ পাকিস্তানের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা শুরু করার ব্যাপারে নরেন্দ্র মোদির আলাদা করে কোনো রকম উৎসাহ নেই। কোনো ট্র্যাক-২, ট্র্যাক-৩ অর্থাৎ চোরাপথে কূটনীতির যে সম্পর্ক গড়ে তোলা, এসব পথে নরেন্দ্র মোদি হাঁটতেই চাইছেন না। কোনো দূত পাঠিয়ে ইমরানের সঙ্গে বোঝাপড়া করা, এসব পথে নরেন্দ্র মোদি একেবারেই অনভ্যস্ত। উল্টো কাশ্মীরে ৩৭০ ধারা উচ্ছেদ হয়ে যাওয়ার পর এখন কাশ্মীরেও যে ধরনের নিয়ন্ত্রণ ভারত সরকারের রয়েছে, তাতে খুব বড় ধরনের ঘটনা এখন পাকিস্তানের পক্ষে কাশ্মীরে করা সোজা নয়। বাইডেন আসার পর পাকিস্তানও কিন্তু বাইডেনের মন জয় করার জন্য মরিয়া। সুতরাং পাকিস্তান বাইডেনের মন জয় করবে, তারপর ভারতের সঙ্গে কী রণকৌশল নেবে, কতটা যুদ্ধের পথে যাবে সেসব ঠিক হবে। এখনো প্রাথমিকভাবে বাইডেন প্রশাসন নতুন। তাই পাকিস্তান বুঝে উঠতে পারছে না ঠিক কোন পথে আমেরিকা যাবে।

বাইডেন কেন আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহার করতে চান? তার একটা বড় কারণ হলো, আমেরিকা মনে করছে আফগানিস্তানে এই মুহূর্তে যতই জঙ্গি তৎপরতা বাড়ুক, খুব বড় থ্রেট সেখান থেকে এখন উত্থিত হবে না। তার কারণ আফগানিস্তানে জঙ্গি সংগঠনগুলোর মধ্যে হাক্কানি গ্রুপ, যেটা আইএসআই দ্বারা পরিচালিত হয়, তারা অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে। আফগান যে জাতীয়তাবাদী তালেবানি গোষ্ঠী, তারা অনেক বেশি সক্রিয়। উগ্র টেরিকি গোষ্ঠী ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। এই কাজটা করতে ভারতীয় এজেন্সিরাও অনেকটা সফল হয়েছে। আফগান গোষ্ঠীরা তালেবানি একটা জাতীয়তাবাদী সরকার গঠনের চেষ্টা করছে। তাদের জঙ্গি কার্যকলাপের সঙ্গে ভারত নানাভাবে যোগাযোগ রাখছে। সুতরাং অতীতের যে আফগানিস্তান-পাকিস্তান নীতি, সেই নীতিতেও কিন্তু বেশ কিছু পরিবর্তন এসেছে। সেই কারণে আমেরিকাও মনে করছে আফগানিস্তানের থেকেও অনেক বড় বিপদ হলো চীন। চীনের সঙ্গে লড়াইয়ে বাইডেন যে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে চাইছেন এমন নয়। চীনের সঙ্গে আমেরিকার মূল লড়াইটা হলো বাণিজ্যের লড়াই। সেই বাণিজ্যের লড়াইয়ের জন্য আমেরিকাকে এখন অনেক বেশি প্রযুক্তির পথে যেতে হবে। চীন প্রযুক্তিগতভাবে এগিয়ে গিয়ে সস্তায় নানা রকমের গ্যাজেট এবং প্রযুক্তির মধ্য দিয়ে আমেরিকারকে কোণঠাসা করেছে। বাইডেনের দল সেই নীতিটা নিয়ে যে এগোতে চাইছে সেটা নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই। এমনকি ওবামা তাঁর আত্মজীবনীতেও বারবার যে চীন সফরের কাহিনি শুনিয়েছেন, সেখানেও বলেছেন টেকনোলজিতে চীনকে পরাস্ত করতে হবে। সেই কারণে বাইডেন প্রতিরক্ষা খাতে খরচ কমিয়ে দিয়ে টেকনোলজি বা প্রযুক্তির উন্নয়নের খাতে বাড়িয়ে দিয়ে চীনের সঙ্গে মোকাবেলার পথে যেতে চাইছেন। সেই কারণে আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহার করাটা তিনি উচিত কাজ বলে মনে করছেন। এ রকম একটা পরিস্থিতিতে আমেরিকা নিজের স্বার্থ দেখবে সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ভারতের সার্বভৌম রাষ্ট্রের যে স্বার্থ, তাতে কি আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহার করে নেওয়াটা সত্যি সত্যি ভালো হবে? যতই আমরা বলি না কেন, সম্পূর্ণ প্রত্যাহার হয়ে গেলে কিন্তু আখেরে ক্ষতি হতে পারে। এখন শেষ পর্যন্ত এটাই দেখার, বাইডেনও মুখে যতই বলুন ওবামা বা ট্রাম্প যেটা পারেননি, তিনি কি সেপ্টেম্বর মাসে সত্যি সত্যি সেটা পারবেন? নাকি নানা দিক থেকে আবার চাপ আসবে। প্রতীকী অর্থে সেনা আবার থেকে যাবে। এখন তিন হাজার ট্রুপস আছে। পরিমাণ কিছু কমে যেতে পারে। কিন্তু সম্পূর্ণ সেনা প্রত্যাহার করে নিলে জঙ্গিদের মানসিক শক্তি মনস্তাত্ত্বিকভাবে শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে। সেটা ভারত এবং বাংলাদেশ তথা এই উপমহাদেশের জন্য সুখবর না-ও হতে পারে, অনেক কূটনীতিক এমনটাও মনে করেন। শেষ পর্যন্ত সেপ্টেম্বর মাসে কী হয় সেটাই এখন দেখার।

লেখক : নয়াদিল্লিতে কালের কণ্ঠ’র
বিশেষ প্রতিনিধি



সাতদিনের সেরা