kalerkantho

বুধবার । ৯ আষাঢ় ১৪২৮। ২৩ জুন ২০২১। ১১ জিলকদ ১৪৪২

ইতিহাসের শিক্ষা ও আমাদের করণীয়

ড. মো. নাছিম আখতার   

১৭ এপ্রিল, ২০২১ ০৪:১২ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ইতিহাসের শিক্ষা ও আমাদের করণীয়

১৯৫৮ সালে চারটি প্রাণীকে চীন নিজের উন্নয়নের জন্য বাধা হিসেবে চিহ্নিত করে। এই তালিকায় ছিল ইঁদুর, মশা, মাছি ও চড়ুই। বিশেষ করে ইউরেশিয়ান গেছো চড়ুইকে মারার জন্য টার্গেট করা হয়। প্রায় ৬৫ কোটি চড়ুই পাখি নিধন করা হয় সেই সময় চীনে। এর পোশাকি নাম ‘দ্য গ্রেট স্প্যারো ক্যাম্পেইন’। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা রিপোর্টে বলা হচ্ছিল যে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ফসল খেয়ে ফেলে আমাদের চারপাশে বসবাসরত চড়ুই পাখির দল। আর তাই এ সমস্যার সমাধানে দেশ থেকে সব চড়ুই পাখি মেরে ফেলার নির্দেশে সিলমোহর দেন তৎকালীন চীনের সরকার। গণহারে শুরু হলো চড়ুই মারা। কিন্তু ৯৬ লাখ বর্গকিলোমিটার আয়তনের দেশটি থেকে রাতারাতি চড়ুই পাখি বিলুপ্ত করে দেওয়া তো আর যেমন-তেমন কথা না। তাই কিভাবে চড়ুই পাখি মারা যায়, তা নিয়ে রীতিমতো গবেষণা চালানো হয়েছিল। লোকে ড্রাম আর থালা নিয়ে রাস্তায় নেমে পড়ত, চড়ুই দেখলেই বাজানো শুরু করত। প্রবল বাদ্যযন্ত্রের শব্দে ভীত হয়ে পালাত চড়ুই। কিন্তু চারপাশের ক্রমাগত আওয়াজে একসময় দুর্বল হয়ে হৃৎপিণ্ড থেমে যেত ছোট্ট পাখিগুলোর। সে সময় চড়ুই নিধনসংক্রান্ত এক করুণ ঘটনার সাক্ষী ছিল বেজিংয়ে অবস্থিত পোলিশ দূতাবাস। শোনা যায় আশপাশের লোকের আক্রমণে টিকতে না পেরে প্রচুর চড়ুই পাখি দূতাবাসের ভেতরে আশ্রয় নেয়। কিন্তু পোলিশ কর্তৃপক্ষ চীন সরকারের অনুরোধ সত্ত্বেও দূতাবাসের ভেতর চড়ুই নিধনকারীদের ঢোকা নিষিদ্ধ করে। এতে খেপে গিয়ে দূতাবাস ঘিরে হাজার হাজার লোক রাত-দিন ড্রাম বাজাতে থাকে। ড্রামের বিকট শব্দে হার্টফেল করে মারা যায় অনেক চড়ুই। এভাবে টানা দুদিন বাজানোর পর লোকজন সরে গেলে দেখা যায় দূতাবাসের উঠানে এত পরিমাণ মরা চড়ুই পড়ে আছে যে তা অপসারণের জন্য পোলিশদের বেলচা পর্যন্ত ব্যবহার করতে হয়েছিল।

চীনাদের এমন নির্বোধ কর্মকাণ্ডের খেসারত দিতেও বেশি সময় লাগল না। ধেয়ে এলো প্রকৃতির নির্মম আঘাত। প্রথমত, শস্যদানার পাশাপাশি চড়ুই পাখি নানা ধরনের পোকা-মাকড়ও খায়। চড়ুই পাখি বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ায় জ্যামিতিক হারে বেড়ে গেল সেসব পোকা-মাকড়ের সংখ্যা। পঙ্গপালসহ ফসলের ক্ষেত ছেয়ে যেতে লাগল ক্ষতিকর পোকা-মাকড়ে। ফলস্বরূপ যে শস্য বাঁচানোর জন্য এত কিছু করা হলো, সেই শস্য গেল পোক-মাকড়ের পেটে। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই শস্যভাণ্ডার খালি হয়ে গেল। খাদ্য সংকটের মুখে পড়ল কোটি কোটি মানুষ। ‘দি গ্রেট চাইনিজ ফ্যামিন’ নামে পরিচিত এই দুর্ভিক্ষে প্রাণ হারাল প্রায় দেড় কোটি মানুষ। শেষমেশ চীন সরকার সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে কয়েক লাখ চড়ুই আমদানি করতে বাধ্য হয়। এই চড়ুই সারা দেশে ছড়িয়ে দিয়ে চীন আস্তে আস্তে এই প্রাকৃতিক বিপর্যয় সামাল দিতে সক্ষম হয়। সেই সঙ্গে বিদেশ থেকে সর্বোচ্চ চড়ুই পাখি আমদানি করার মতো অদ্ভুত আরেক রেকর্ডেরও জন্ম দেয় চীনের সরকার।

প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা থেকে প্রায়ই গ্রামের দিকে জীবনের প্রাণশক্তি অর্জনের জন্য ঘুরতে যাই। কুল বরই পাকার সময় কুলগাছকে নেট জাল দিয়ে ঢেকে রাখা হয়, যাতে পাখি ফলের ক্ষতি না করতে পারে। এমন মৌসুমের একটি দিনে একটি বাড়ির আঙিনার কুলগাছের নেটের জালে দেখলাম একটি পেঁচাসহ অন্যান্য বেশ কিছু পাখি আটকে আছে এবং মৃত্যুর প্রহর গুনছে। গাছের মালিককে ডেকে বললাম ভাই, পাখিগুলো জাল থেকে মুক্ত করে দেন। আমি আপনাকে ৫০০ টাকা দিচ্ছি। আরো বললাম, পেঁচা তো কুল খায় না, পেঁচা কেন জালে পড়ছে? তিনি বললেন, রাতের অন্ধকারে অসাবধানতাবশত এরাও জালে আটকে যায়। তিনি বললেন, এদের মুক্ত করতে গেলে আমার জাল ছিঁড়ে যাবে। আমি পাখিগুলোর পরিণতি জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, এভাবে ঝুলে থেকে না খেতে পেয়ে একসময় মারা যাবে। সুপ্রিয় পাঠক, এরপর বরই খেতে গেলেই আমার ওই দৃশ্য চোখের সামনে ভেসে ওঠে এবং খাওয়ার স্পৃহা নষ্ট হয়ে যায়।

সম্প্রতি একটি জেলার গ্রামে গিয়ে দেখলাম, পুকুরের ওপরও জাল দিয়ে পাখির মাছ খাওয়া ঠেকানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকার খবরের শিরোনাম দেখলাম ‘বাবুইয়ের ছানার প্রতি নৃশংসতা’। খবরে প্রকাশ, ক্ষেতের ধান খেয়ে ফেলে বলে ক্ষেতের পাশে থাকা তালগাছের বাবুই পাখির বাসা আগুন ধরিয়ে ৩৩টি বাচ্চাসহ পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে। ফল, শস্য, মাছ উৎপাদনের ক্ষেত্রে যদি এমন পদ্ধতি চলতে থাকে, তাহলে চীনের দুর্দশার পুনরাবৃত্তি আমাদের দেশে ঘটতে বেশি সময় লাগবে না। এ বিষয়ে সরকার, বন বিভাগ ও চাষের সঙ্গে সম্পৃক্ত ফসল উৎপাদনে সংশ্লিষ্ট চাষি ও গবেষকরা সমন্বিত চেষ্টা না করলে মহাবিপর্যয় ঘটবে। এ বিষয়ে আমার নির্দিষ্ট কিছু প্রস্তাবনা রয়েছে। প্রত্যেক চাষিকেই বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ফল চাষ করার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট একটি বা দুটি গাছ অরক্ষিত রাখতে হবে। যাতে পক্ষিকুল বিলুপ্ত হয়ে না যায়। পত্রিকায় দেখেছি, গাজীপুরের জাতীয় ভাওয়াল উদ্যানের বনে বন বিভাগের উদ্যোগে বটের চারা রোপণ করা হচ্ছে। যার ফল বন্য জীবজন্তু ও পশু-পাখির প্রিয় খাদ্য। এমন উদ্যোগের পাশাপাশি বনে দেশি জাতের ফলমূল যথা পেয়ারা, জাম, লিচু, বরই, আমড়া ইত্যাদির চারা রোপণ করতে হবে। ফলের উৎপাদনে সঙ্গে যুক্ত গবেষকদের এমন পদ্ধতি বের করতে হবে, যাতে ফসলও রক্ষা পায় এবং জীববৈচিত্র্য বিলীন না হয়ে যায়। রাস্তা, বাঁধ, রেললাইন ইত্যাদির পাশে কাঠের গাছের সঙ্গে ফলদ বৃক্ষ রোপণ জরুরি। প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা না করলে পরিবেশ বিপর্যয়ের ক্ষতি মানুষের জীবন ও জীবিকার ওপরে স্থায়ী প্রভাব ফেলবে। সর্বোপরি পরিবেশ রক্ষায় জনগণের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটাতে হবে। মনে রাখতে হবে সময়ের এক ফোঁড় অসময়ের দশ। যুগে যুগে কবি-সাহিত্যিকদের বর্ণনায় অতুলনীয় প্রাকৃতিক শোভা ও সব দেশের রানি হিসেবে খ্যাত আমাদের প্রিয় সুজলা-সুফলা-শস্য-শ্যামলা মাতৃভূমি যেন তার রূপ, রস, গন্ধ হারিয়ে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে সম্মুখীন না হয়, এ বিষয়ে সর্বদা সজাগ থাকা আমার, আপনার একান্ত দায়িত্ব ও কর্তব্য।

লেখক : উপাচার্য, চাঁদপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়



সাতদিনের সেরা