kalerkantho

বুধবার । ৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮। ১৯ মে ২০২১। ৬ শাওয়াল ১৪৪

করোনা নিয়ন্ত্রণে কঠোর হতে হবে

এম হাফিজউদ্দিন খান   

১৬ এপ্রিল, ২০২১ ০৪:৫৩ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



করোনা নিয়ন্ত্রণে কঠোর হতে হবে

আজ এক বছরের বেশি হলো দেশ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে। কাগজে-কলমে ২০২০ সালের মার্চ থেকে সংক্রমণ শুরু হয়। এখন ২০২১ সালের এপ্রিলের মাঝামাঝিতে এসে আমরা দেখছি এর দ্বিতীয় ঢেউ এবং তা প্রথম ঢেউয়ের চেয়েও তীব্র। প্রশ্ন হচ্ছে, দ্বিতীয় ঢেউ এত তীব্র হলো কেন? প্রথম ঢেউ থেকে আমরা কি যথেষ্ট শিক্ষা নিতে পেরেছি? মহামারি নিয়ন্ত্রণে আমরা বিগত এক বছরে স্বাস্থ্য প্রশাসন ও জনপ্রশাসনের সমন্বয়হীনতা দেখেছি। এক ধরনের উদাসীনতা ও সিদ্ধান্তহীনতাও দেখেছি। জনগণের বেপরোয়া মনোভাবও লক্ষ করেছি। তবে আজকের পরিস্থিতির জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী আমাদের আত্মতুষ্টি। সরকার এবং জনগণ উভয়ের দিক থেকেই আত্মতুষ্টিটা দেখা গেছে। এখন একদিকে ক্রমবর্ধমান কভিড রোগীর চিকিৎসার চাহিদা মেটানো, আরেক দিকে সংক্রমণের গতি কমিয়ে আনা জরুরি হয়ে পড়েছে। আগের ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়াটাও জরুরি।

দেশে প্রথম কভিড সংক্রমণের পর আমরা দেশবাসী দেখলাম, আমাদের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় মোটেও প্রস্তুত ছিল না। বরং সব কিছু ঠিক আছে বলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সবাইকে হতবুদ্ধি করল। সংক্রমণের বিস্তার ঠেকাতে শুরুতে দ্রুত ও বেশি পরিমাণে টেস্ট ও ট্রেসিংয়ের মাধ্যমে শনাক্ত ও সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের আলাদা করা, আক্রান্তদের চিকিৎসায় মানুষকে আশ্বস্ত করা, চিকিৎসক-নার্সদের প্রস্তুত রাখা—এসব ঠিকঠাকমতো করতে না পারায় প্রশ্নের মুখে পড়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। তখন টেস্ট কিটের অভাব নিয়ে তীব্র সমালোচনা হয়। ফলে শনাক্ত ও সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের আইসোলেশন ও কোয়ারেন্টিন করতে না পারায় ভাইরাসটির দ্রুত লাগাম টানা যায়নি। এরপর কভিড রোগী বাড়তে থাকায় চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত সুরক্ষাসামগ্রীর (পিপিই) অভাব ও অনিয়ম নিয়ে মারাত্মক সমালোচনা হয়। করোনা সন্দেহে হাসপাতালে ভর্তি বা চিকিৎসা দিতে অনীহা প্রকাশ করায় অনেক সাধারণ রোগীর বিনা চিকিৎসায় মারা যাওয়ার মর্মান্তিক খবরও সংবাদপত্রে দেখেছি। সব কিছু মিলে একটা ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটি লক্ষ করা যায়।

পরবর্তী সময়ে কিছুটা সময় লাগলেও সমস্যাগুলো কাটিয়ে ওঠা গেল। কিন্তু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বড় বড় দুর্নীতির খবর বের হওয়ায় আরেক ধরনের অস্বস্তি দেখা গেল। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও ঔষধ প্রশাসনের অনিয়মের খবর সংবাদপত্রে আসতে থাকল। যা-ই হোক, আস্তে আস্তে মৃত্যুর সংখ্যা কমে এলো। সংক্রমণের হারও কমে এলো। এমনকি মৃতের সংখ্যা পাঁচজনে নেমে এলো। তখন সরকার এবং জনগণ—আমাদের সবার মধ্যে একটা ভাব চলে এলো যে আমরা সব জয় করে ফেলেছি। এ ধরনের একটা প্রচারও লক্ষ করা গেছে। অথচ একই সময়ে সংবাদপত্রে দেখা যাচ্ছে, কমবেশি সব দেশেই করোনার দ্বিতীয় ঢেউ চলছে বা আসছে। আমরা যেহেতু বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন নই এবং দ্বিতীয় ঢেউ আমাদেরও আসতে পারে—এ কথাটা আমরা বেমালুম ভুলে গেলাম। ফলে মৃত্যু ও সংক্রমণ এখন দিন দিন বাড়ছে। এরই মধ্যে মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় ১০ হাজারে পৌঁছে গেছে।

এখানে সরকারের তরফ থেকে যেসব উদ্যোগ নেওয়া উচিত ছিল, তার একটা হলো মানুষকে সচেতন করা। কিন্তু এ ব্যাপারে পর্যাপ্ত প্রচেষ্টা দেখা যায়নি। বড় ধরনের প্রচার-প্রপাগান্ডার দরকার ছিল, মানুষকে বোঝানোর দরকার ছিল—সেদিকে কারো ভ্রুক্ষেপ আছে বলে মনে হয়নি। ফলে মাস্ক পরা ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার মতো সচেতনতা মানুষের মধ্যে তৈরি হয়নি। এ জন্য জনপ্রতিনিধি, বিশেষ করে স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিদের ব্যবহার করা দরকার হলেও তা করা হয়নি। টিকা ছাড়া করোনা নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে প্রধান অস্ত্রই হলো মাস্ক ব্যবহার। এর পরই সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার গুরুত্ব। অনেককে জিজ্ঞেস করার পর আমি জেনে অবাক হলাম যে বেশির ভাগ মানুষ মাস্ক পরা ও সামাজিক দূরত্বের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে ভালো করে জানেই না। শুক্রবার মসজিদে গিয়ে দেখেছি, কেউ কিচ্ছু মানতে চায় না। মানুষকে মানানোও যায় না। দূরত্ব রাখতে চাইলেও সম্ভব হয়নি। মসজিদে ১০ শতাংশ মুসল্লির মুখেও মাস্ক দেখিনি।

এই সব ঢিলেঢালা পরিস্থিতি ও বেপরোয়া মনোভাব দেশে করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউ আসার পরিবেশ তৈরি করেছে। এর মধ্যেই জানা যাচ্ছে দ্বিতীয় ঢেউয়ে করোনাভাইরাসের দক্ষিণ আফ্রিকান ধরনও (ভেরিয়েন্ট) বিপজ্জনক হতে পারে। আবার হাসপাতালে বেড নেই, আইসিইউ খালি নেই। রোগী বেড়ে যাওয়ায় অক্সিজেনেরও মারাত্মক ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। কোথাও কোথাও একজন রোগীকে ১০ মিনিট অক্সিজেন দেওয়ার পর আরেকজনকে ১০ মিনিটের জন্য দেওয়া হচ্ছে। গত বছর যখন প্রথম সংক্রমণ শুরু হলো, বিশেষ করে মে, জুন ও জুলাইয়ের দিকে, তখনো অক্সিজেনের অভাব দেখা যায়। এখন অক্সিজেনের প্রয়োজন আরো বেড়ে গেছে, বেডের চাহিদাও বেড়ে গেছে এবং আরো বাড়তে পারে। কিন্তু এবারও পূর্বপ্রস্তুতির অভাব দেখা যাচ্ছে।

এই ভয়াবহ পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার গত ৫ এপ্রিল থেকে এক সপ্তাহের জন্য দেশের লকডাউনের আদেশ জারি করে। মুখে লকডাউন বলা হলেও কাগজে-কলমে তা ছিল ‘বিধি-নিষেধ’। কিন্তু এক সপ্তাহও বিধি-নিষেধ পুরোপুরি টিকল না। দুই দিন পরই প্রথমে মহানগরীতে গণপরিবহন চালু করা হলো। চার দিনের মাথায় ৯ এপ্রিল থেকে সকাল-সন্ধ্যা দোকানপাট খোলা রাখার অনুমতি দেওয়া হয়। ফলে একটা শিথিল লকডাউন দেখা গেল। এমন এক লকডাউন দেওয়া হলো যেখানে বইমেলা খোলা থাকল, বাংলাদেশ গেমসের মতো বড় খেলার ইভেন্ট চালু থাকল। বড় বড় কারখানা খোলা থাকল। রাস্তাঘাটে মানুষের ভিড় আগের মতোই দেখা গেল। কিন্তু এভাবে শিথিল লকডাউন দিয়ে বা বিধি-নিষেধ আরোপ করে কি সংক্রমণ কমিয়ে আনা যায়? এই পরিস্থিতিতে কভিড-১৯ সংক্রান্ত জাতীয় পরামর্শক কমিটি বলছে, অন্ততপক্ষে ১৪ দিন একটানা সব কিছু বন্ধ রাখতে বা কঠোরতম লকডাউন দিতে হবে। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে গত শুক্রবার জানানো হলো, ১৪ এপ্রিল থেকে এক সপ্তাহের কঠোর লকডাউন দেওয়া হবে। অর্থাৎ এবারও সরকার বিশেষজ্ঞ কমিটির পরামর্শ ঠিকমতো শুনল না।

জাতীয় কমিটি বলছে, একটানা ১৪ দিন সব কিছু বন্ধ রাখলে মানুষের শরীরে থাকা জীবাণুগুলোর আর বিস্তার ঘটবে না। সরকারকে সেটাই করতে হবে। যেহেতু বেশিদিন লকডাউন দিয়ে রাখা সম্ভব নয়, তাই যে কদিন দেওয়া হয় তা যেন কঠোরভাবে মানা হয়। সরকার হয়তো ব্যবসা-বাণিজ্য তথা মানুষের অর্থনৈতিক ক্ষতির কথা ভেবে এক সপ্তাহের বেশি লকডাউনে যেতে চাচ্ছে না; কিন্তু এটাও বুঝতে হবে যে ক্ষতি তো সব দেশেই হচ্ছে। মানুষের জীবন তো আগে। জীবন না বাঁচিয়ে গার্মেন্ট কম্পানি রক্ষা, ব্যবসায়ীদের দোকানপাট খোলা রাখা, পহেলা বৈশাখ বা ঈদকেন্দ্রিক ব্যবসা—এসব তো প্রধান হতে পারে না। এর আগেও লক্ষ করেছি কভিডসংক্রান্ত কমিটির পরামর্শ ঠিকঠাকমতো মানা হয়নি। কমিটি গঠনের পর থেকেই তাদের সঙ্গে নীতিনির্ধারকদের একটা সমন্বয়হীনতা রয়েছে বলে মনে হয়েছে। তাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা না করেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে।

এখন যেটা করার দরকার, সরকারকে কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হবে। রাজনীতি বা জনতুষ্টি নয়, সরকারকে জনরক্ষার দিক চিন্তা করতে হবে। কঠোর সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য সব শ্রেণি-পেশার মানুষের সহযোগিতা নিতে হবে। সব দল, সিভিল সোসাইটি, গণমাধ্যম—সবার সহযোগিতা নিতে হবে। সবচেয়ে বড় বিষয়, স্থানীয় সরকারের যাঁরা আছেন, যাঁদের সঙ্গে জনগণের প্রত্যক্ষ যোগাযোগ হয়, সেই উপজেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভার জনপ্রতিনিধিদের সহযোগিতা নিতে হবে। কঠোর লকডাউন বাস্তবায়নের জন্য সিভিল প্রশাসন যথেষ্ট। তবে একেবারেই প্রয়োজন হয়ে পড়লে সেনাবাহিনীকে কাজে লাগানো যেতে পারে। মনে রাখতে হবে, সংক্রমণের তীব্রতা কমিয়ে আনতে শুধু লকডাউন বাস্তবায়নই যথেষ্ট নয়, সার্বিক ও সমন্বিত প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে।


লেখক : তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা

অনুলিখন : আফছার আহমেদ



সাতদিনের সেরা