kalerkantho

রবিবার। ২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮। ১৬ মে ২০২১। ০৩ শাওয়াল ১৪৪২

কঠোর বিধি-নিষেধের প্রথম দুই দিন

রাস্তায় নাস্তানাবুদ সম্মুখযোদ্ধারাও

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৬ এপ্রিল, ২০২১ ০৩:২৪ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



রাস্তায় নাস্তানাবুদ সম্মুখযোদ্ধারাও

সরকারঘোষিত কঠোর বিধি-নিষেধের প্রথম দুই দিনে করোনাকালের সম্মুখযোদ্ধা চিকিৎসক, সাংবাদিক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা পুলিশের হয়রানির শিকার হয়েছেন। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় পেশাগত দায়িত্ব পালনে যাতায়াতকালে স্বাস্থ্যসেবায় যুক্ত ব্যক্তি ও সাংবাদিকদের সঙ্গে পুলিশ বাড়াবাড়ি করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সম্মুখযোদ্ধাদের অনেকেই পুলিশের মামলা ও জরিমানার মুখে পড়েন। আবার কাউকে কাউকে শুনতে হয়েছে আপত্তিকর কথা। গত দুই দিনে নিজেদের ভোগান্তির কথা জানিয়ে ফেসবুকেও অনেকে পোস্ট লিখেছেন, ছবি ও ভিডিও পোস্ট করেছেন। তাঁদের অভিযোগ, চিকিৎসক বা সাংবাদিক পরিচয় জানার পরও পুলিশ তাঁদের নাস্তানাবুদ করে ছেড়েছে।

এদিকে লকডাউন পরিস্থিতিতে চিকিৎসাসেবার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মীদের অনেককেই নানাভাবে হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এ ধরনের হয়রানি কোনোভাবেই কাম্য নয় বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। গত বুধবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জনগণের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে কর্মস্থলে যাতায়াতে সার্বিক সহযোগিতার জন্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে সহযোগিতা করার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ জানায়।

গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন দৈনিক অর্থসূচকের সাংবাদিক হৃদয় আলম। তাঁকে আটকানোর পর সাংবাদিক পরিচয় দিলে একজন কনস্টেবল বলেন, ‘সাংবাদিক! তো আপনার ক্যামেরা কই? ক্যামেরা ছাড়া কিয়ের সাংবাদিক? এইডা কোনো কথা হইল?’

গতকাল সকালে হাওর এলাকার সংবাদ সংগ্রহ শেষে শহরে ফিরছিলেন কালের কণ্ঠ’র সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি শামস শামীম। এ সময় ওয়েজখালী এলাকায় এক পুলিশ সদস্য শামস শামীমকে থামিয়ে তাঁর বাইকের চাবি নিয়ে নেন। শামীম সাংবাদিক পরিচয় দিলে ওই পুলিশ সদস্য ‘মুভমেন্ট পাস’ দেখতে চান। সাংবাদিকরা মুভমেন্ট পাসের আওতার বাইরে জানালে ওই পুলিশ সদস্য বলেন, ‘বেহুদা কথা বাড়াচ্ছেন। কোথায় বলা হয়েছে আপনি লকডাউনের আওতামুক্ত, দেখান। ডিসি, ইউএনও সাহেব বললে বাইকের চাবি ফেরত দেব।’

এ ধরনের ভোগান্তি শুধু ওই দুই সাংবাদিক নন, জরুরি সেবায় যুক্ত আরো একাধিক পেশার মানুষ এমন হয়রানির শিকার হয়েছেন। গতকাল বেশ কয়েকজন সাংবাদিক এবং আগের দিন বুধবার চিকিৎসাসেবায় জড়িত বেশ কয়েকজন পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে হয়রানির মুখে পড়েন।

গত বুধবার সকালে গ্রিন রোডের বাসা থেকে ডা. মোমিনুল ইসলাম সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে যাচ্ছিলেন। তিনি নিজের ভোগান্তির কথা তুলে ধরে ফেসবুকে লেখেন, ‘আজ সকালে অটোরিকশা নিয়ে করোনা হাসপাতালে ডিউটিতে যাওয়ার সময় জাহাঙ্গীর গেটে পুলিশ আটকালে পরিচয় দিই। হাসপাতালের আইডি দেখালে পুলিশ বলে, কসাইগিরি ফলাস? তোর কসাইগিরি বাইর করতেছি। লাত্থি দিয়া পা ভাইঙ্গা দিমু...আরও কিছু ভাষা যা লেখার যোগ্য নয়। মনে হলো যোগ্য সম্মানটাই পেলাম। এ অবস্থায় ডিউটি নিয়ে করণীয় কী? জানতে চাই।’

কুর্মিটোলা হাসপাতালের চিকিৎসক কৃষ্ণা হালদার চিকিৎসকদের একটি গ্রুপে পোস্ট দিয়ে নিজের ভোগান্তির কথা লিখেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘গতরাতে হাসপাতালে নাইট শিফটের ডিউটি ছিল। সকালে আমার গাড়িচালক আমাকে নিতে আসার সময়ে কাওরান বাজারে গাড়ি থামিয়েছে, চালক আমাকে আনতে আসছেন জানানোর পরও পুলিশ মামলা করেছে, সব কাগজপত্র নিয়ে গেছে, গাড়িতে থাকা আমার আইডি কার্ড ছুড়ে মেরেছে। আমি অনেক চেষ্টা করেও গতকাল মুভমেন্ট পাস বের করতে পারিনি। তাহলে আমি কিভাবে কোভিড ডিউটি করবো?’

চিকিৎসক রিয়াজ আহমেদ তমাল তাঁর ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, ‘সকাল সাতটায় গাজীপুরের টঙ্গী কলেজ গেট থেকে টঙ্গী স্টেশন রোডে পুলিশ আটকায়। তখন হাসপাতালের আইডি কার্ড দেখাই। পুলিশ উত্তর দেয়, আমাদেরও বের হওয়া নিষেধ। হাসপাতালে ডিউটি করতে হলে সেখান থেকেই করতে হবে এবং এটাই ফার্স্ট অ্যান্ড লাস্ট ওয়ার্নিং।’

গত বুধবার কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) দায়িত্বে থাকা চিকিৎসক শাহজাদ হোসেন মাসুম ফেসবুক পোস্টে লেখেন, ‘আমার আইসিইউর নার্সদের বহনকারী অধিদফতরের স্টিকারযুক্ত গাড়ি টঙ্গী থেকে আসার সময় আটকে রাখে পুলিশ এবং জানায় মুভমেন্ট পাস ছাড়া যেতে দেবে না। তারা আমাকে কল করলে আমি পরিচালককে জানাই। তারা কোভিড আইসিইউর স্টাফ উল্লেখ করে অনেকবার অনুরোধ করলেও পুলিশ মুভমেন্ট পাস ছাড়া গাড়ি ছাড়বে না বলে জানায়। দুই ঘণ্টা আটকে থাকার পর তারা হাসপাতালে পৌঁছাতে পারেন।’

এদিকে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক ইফতেখারকে গত বুধবার রাতে ফার্মগেটে অ্যাম্বুল্যান্স থেকে নামিয়ে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। তিনি ডিউটি শেষে বাসায় ফিরছিলেন। পরে ওই চিকিৎসক সাত কিলোমিটার হেঁটে রামপুরার বাসায় পৌঁছেন।

স্কয়ার হাসপাতালের চিকিৎসক নাজমুল ইসলামের স্ত্রী চিকিৎসক ইসরাত জাহান এক ফেসবুক পোস্টে লেখেন, ‘আমার হাজব্যান্ড স্কয়ার হসপিটালের কোভিড ইউনিটে কর্তব্যরত। আজ সকাল ৮টা থেকে তার ডিউটি ছিল। আমাদের বাসায় আমার শ্বশুর কোভিড পজিটিভ হওয়ায় আমার হাজব্যান্ড বাসা (মুন্সীগঞ্জ) থেকে নিজেদের গাড়ি নিয়ে ডিউটিতে যাচ্ছেন বেশ কিছুদিন ধরে। সকালে আমাদের গাড়ি সাইনবোর্ডের একটু পরে থামায় এবং ৩ হাজার টাকা জরিমানা করে। আমার স্বামীর সঙ্গে তার কর্মস্থলের আইডি কার্ড ছিল। স্কয়ার হসপিটালের ট্রান্সপোর্ট অবশ্যই মুন্সীগঞ্জ আসবে না। আর হঠাৎ করে একটা অ্যাপ বানিয়ে বললো, মুভমেন্ট পাস নিয়া বাইর হবেন যেখানে তাদের ওয়েবসাইটেই ঢোকাই যায় না। এমতাবস্থায় ডাক্তাররা কি সারাদিন ডিউটি বাদ দিয়ে পাস পাস খেলবে নাকি?’

গত বুধবার বিকেল ৩টার দিকে দৈনিক মানবজমিনের চিত্রগ্রাহক জীবন আহমেদ তাঁর পেশাগত কাজে যাচ্ছিলেন রাজধানীর আগারগাঁওয়ের দিকে। আগারগাঁওয়ের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের পাশে গিয়ে দাঁড়ালে ট্রাফিক পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) মুহাম্মদ মঞ্জুর মোর্শেদ তাঁকে আটকান এবং মামলা দেন।
এ ব্যাপারে জীবন আহমেদ বলেন, ‘ঘটনাস্থলে কয়েকজনকে আটকানো হয়েছিল। আমিও সেখানে যাচ্ছিলাম ছবি তুলতে। প্রথমে আমার কাছে মুভমেন্ট পাস দেখতে চাওয়া হয়। তখন আমি সাংবাদিক পরিচয় দিই। এরপর আমার কাছে ড্রাইভিং লাইসেন্স দেখতে চান। তখন আমি বললাম, ভুলে বাসায় রেখে আসছি। তারপর আমাকে চার হাজার টাকার মামলা দেওয়া হয়।’

এদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, নির্দেশনায় কঠোরভাবে পরিবহন ও চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে বলায় অনেক স্থানে সাংবাদিক, চিকিৎসকসহ জরুরি পেশায় নিয়োজিতদেরও আটকানো হয়। অনেক স্থানে পরিচয়পত্র চাওয়ায় ভুল-বোঝাবুঝির ঘটনা ঘটে।

চিকিৎসক ও সাংবাদিকদের হয়রানির ব্যাপারে পুলিশ সদর দপ্তরের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি-মিডিয়া) হায়দার আলী খান বলেন, ‘এটা হওয়ার কথা নয়। তার পরও যদি কোনো জায়গায় ব্যত্যয় হওয়ার কোনো ঘটনা আমরা জানতে পারি, সঙ্গে সঙ্গে তা সমাধান করছি।’

ডিএমপির বক্তব্য : এদিকে গতকাল ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, যাতায়াতের সময় যাঁরা আইডি কার্ড দেখাতে ব্যর্থ হয়েছেন শুধু তাঁদেরই যাচাই-বাছাই করা হয়েছে। এটি চলমান বিধি-নিষেধের পরিপ্রেক্ষিতে যৌক্তিক একটি বিষয়। করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সরকার নির্দেশিত বিধি-নিষেধ মেনে চলা সব নাগরিকের সমান দায়িত্ব। এসব বিধি-নিষেধ বাস্তবায়নে পেশাদারির সঙ্গে দায়িত্ব পালনে ডিএমপি অঙ্গীকারবদ্ধ। কোনো পুলিশ সদস্য যাতে অপেশাদার আচরণ না করেন, সে জন্য সর্বদা তাঁদের আচরণ তদারকি করা হয়ে থাকে।



সাতদিনের সেরা