kalerkantho

বুধবার । ২৯ বৈশাখ ১৪২৮। ১২ মে ২০২১। ২৯ রমজান ১৪৪২

অতিমারির কালে নববর্ষে নবচিন্তা

আবুল মোমেন   

১৪ এপ্রিল, ২০২১ ০৫:২৬ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



অতিমারির কালে নববর্ষে নবচিন্তা

একসময় বাংলা বছরের হিসাবেই চলত গ্রামের জীবন, মূল কারণ গ্রামবাংলা কৃষিপ্রধান। কৃষির সূত্রেই ফসলি সন হিসাবে এই সৌরবর্ষ গণনা শুরু হয়। শুরুটা হয়েছিল দূরদর্শী ও দক্ষ মোগল বাদশাহ আকবরের সময় ৯৬৩ হিজরিতে। হিজরি সনের সঙ্গে মিল রেখে বাংলা সনও শুরু হয়েছিল একলাফে ৯৬৩ থেকে। তবে হিজরি চান্দ্রমাস হওয়ায় কালে কালে সৌরবর্ষের সঙ্গে বছর গণনায় পার্থক্য হয়ে গেছে। আজ বাংলা ১৪২৮ সন শুরু হলেও এখন হিজরি ১৪৪২ সন চলছে।

নাগরিক সমাজ বাংলা সনের দিকে এতটা নজর দেয়নি বহুকাল। এ দেশে আধুনিক নগরের পত্তন ও নাগরিক সমাজের বিকাশের শুরু ইংরেজ আমলে, ১৬৯০ খ্রিস্টাব্দে, তারা কলকাতা নগরীর পত্তন করার পর থেকে। তবে সঠিক অর্থে নাগরিক সমাজের উদ্ভব ও নাগরিক জীবনের সূচনা হয় অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগে। পুরনো সমাজ চলেছে পঞ্জিকার প্রভাবে—তার মূল ভিত্তি জ্যোতির্বিজ্ঞান ও জ্যোতিষশাস্ত্র। চাঁদ, সূর্য ও নক্ষত্রমণ্ডলীর অবস্থানের ওপর হিসাব কষে শুভাশুভ, তিথিলগ্ন ইত্যাদির বিচার হতো। এতে বিজ্ঞান ছাপিয়ে ভূয়োদর্শনই (অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান) বেশি স্থান করে নিয়েছে। আজও বিষয়টি এ রকম।

প্রসঙ্গটা একটু বাড়িয়ে নিয়ে জানাই অনেক সমাজদার্শনিকের বিচারে পশ্চিমা সভ্যতা, অন্য সভ্যতা, বিশেষত প্রাচ্যের উন্নত সভ্যতার সমাজকে ছাপিয়ে যেতে ও প্রভাবিত করতে পেরেছে যেসব কারণে, তার অন্যতম হলো ঘড়ির আবিষ্কার ও ব্যবহার। তারা সময়ের যে বৈজ্ঞানিক বিভাজন প্রয়োগ করেছে, তা সময় জ্ঞাপনে সেকেন্ডের মাপে পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট, তদুপরি এই পরিমাপ ও সুনির্দিষ্ট স্পষ্ট সময় নির্ধারণকে সর্বজনীন করেছে। সে তুলনায় আমাদের প্রহর, দণ্ড বা মুহূর্তের মাপ সুনির্দিষ্ট নয়, তাই মানুষের ধারণায় জনে জনে তফাত হয়। মুহূর্ত বলতে যদিও আমরা বুঝি পলকমাত্র সময়; কিন্তু অভিধানে বলা হয়েছে, এর স্থায়িত্ব ৪৮ মিনিট। আর আমাদের বর্ষপঞ্জি ছিল পরিবর্তনশীল এবং নির্দিষ্ট পণ্ডিতদের বক্তব্যের মুখাপেক্ষী, যাঁরা আবার সব সময় একমত থাকতেন না।

বলা বাহুল্য, কাজকর্মের বিস্তার ও দক্ষতার জন্য ঘড়িই উত্তম। এখানে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর হস্তক্ষেপ করার আগে স্কুলের সাপ্তাহিক ছুটিও নির্দিষ্ট ছিল না। তিথি নক্ষত্রের ভিত্তিতে ছুটি নির্ধারিত হতো বলে এক মাসের সঙ্গে অন্য মাসের মিল হতো না। নাগরিক জীবন চলে বাঁধা নিয়মে—এখানে সুসংবদ্ধভাবে ব্যবহার করতে হবে সময়কে—তার ক্ষুদ্রতম নির্দেশক সেকেন্ড থেকে মিনিট, ঘণ্টা, দিন, সপ্তাহ, মাস হয়ে বছর পর্যন্ত। ইংরেজরা ঘড়ি আর গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার প্রবর্তন করে সেই সুবিধা নিয়ে এলো। পঞ্জিকা আটকে গেল হিন্দু ধর্মের পূজা-অর্চনার মধ্যে, বাংলা সন-তারিখ গ্রামীণসমাজে।

এদিকে নাগরিক জীবনের প্রভাব উত্তরোত্তর বেড়েছে, বিশেষত শিক্ষার প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে। রেলগাড়ি এলো, ঘড়ি এলো, মানুষের চলাচল বাড়ল, নির্ধারিত সময় ও দিনক্ষণ ধরে চলার তাগিদ জোরদার হলো। শহরে-গ্রামে, চাকরি-কৃষিতে সংযোগ চলতে থাকল। এতে যেটা বাস্তবসম্মত, অধিকতর কর্মদক্ষ তার প্রভাব বাড়তেই থাকল। এভাবে বাংলা ক্যালেন্ডারের ব্যবহারও সীমিত হয়ে গেল।

১৯৪৭-এর দেশভাগের পরে পঞ্চাশের দশকে প্রতিবেশী ভারতবর্ষে বিশিষ্ট বাঙালি বিজ্ঞানী আমাদের ঢাকার সন্তান মেঘনাদ সাহা বাংলা দিনপঞ্জিকে আরো বিজ্ঞানসম্মত ও কর্মদক্ষ করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তিনি তখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওয়াহেরলাল নেহরুর অনুরোধে কেন্দ্রে তাঁর একজন উপদেষ্টা। কিন্তু তাঁর প্রস্তাবে পশ্চিমবঙ্গের রক্ষণশীল পণ্ডিতরা আগ্রহ দেখাননি। তবে ষাটের দশকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহকে প্রধান করে বাংলা দিনপঞ্জি সংস্কারে গঠিত কমিটি ড. সাহার প্রস্তাবকে ভিত্তি করে বাংলা মাসের দিন নির্ধারণ ও সামঞ্জস্য সাধনের কাজটি করে। এই কমিটিতে হিন্দু শাস্ত্রবিদরাও ছিলেন এবং তাঁদের সম্মতিতেই সংস্কার হয়েছিল। তবে তখনো তা চালু করা যায়নি। সেটি চালু হয়েছে অনেক পরে স্বাধীন বাংলাদেশে। এখন ইচ্ছা করলে আমরা ইংরেজি ক্যাল্লোরের (অর্থাৎ গ্রেগরিয়ান ক্যাল্লোর) পরিবর্তে বাংলা দিনপঞ্জি ব্যবহার করতে পারি। এতে কিছু অভ্যাসের পরিবর্তন ঘটাতে হবে; কিন্তু বাস্তবে তেমন অসুবিধা হবে না। যদি সত্যি আমরা ইংরেজির পরিবর্তে বা পাশাপাশি বাংলা দিনপঞ্জি কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে চাই, তবে এটির ব্যাবহারিক মূল্য বা গুরুত্ব বাড়াতে হবে। সে ক্ষেত্রে আমি কয়েকটি প্রস্তাব দিতে চাই—

১. চাকরিজীবীদের বেতন পরিশোধ করা হবে বাংলা মাসের হিসাবে।

২. স্কুলের শিক্ষাবর্ষ হবে বৈশাখ-চৈত্র। জলবায়ু পরিবর্তনের একালে বৈশাখ মাসে ক্লাস চালু রেখে জ্যৈষ্ঠ মাসে গ্রীষ্মের ছুটি দেওয়া যাবে।

৩. অর্থবছরও বাংলা বছর অনুযায়ী নির্ধারণ করা যায়।

এই তিনটি সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রীয়ভাবে গ্রহণ করলে সবার জীবনে বাংলা ক্যাল্লোর ব্যবহার অনিবার্য হয়ে উঠবে। প্রয়োজনে অন্যান্য ছোটখাটো পরিবর্তন মানুষ আপনিই করে নেবে।

যাঁরা ভাবছেন আন্তর্জাতিক যোগাযোগের সমস্যা হবে, তাঁদের আশ্বস্ত করে বলতে চাই, মানুষ তার প্রয়োজনের কোনো কাজ বাদ রাখে না। সে দুটি ক্যাল্লোর ব্যবহারে অভ্যস্ত হয়ে যাবে, এখনো যেমন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এভাবেই অভ্যস্ত হয়েছেন। মুসলিমপ্রধান এ দেশে সব ধর্মীয় পর্ব হিজরি ক্যাল্লোর ধরেই চলে, যদিও তার ব্যাপক ব্যবহার কখনো এ দেশে হয়নি। তবু এক অর্থে দেশে তিনটি দিনপঞ্জির চল তো আছে।

তবে বাংলা নববর্ষে উৎসবের রং আর সুর লেগেছে গত শতাব্দীর ষাটের দশকে বাঙালি জাতীয়তাবাদের জোয়ারের সময়। বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি মানুষের মধ্যে তখন যে আবেগ সৃষ্টি হয়, তাতে নববর্ষ উদযাপনের রেওয়াজ তৈরি হয়ে যায়। এই দুঃখী-দরিদ্র এবং বারবার হোঁচট খাওয়া জাতি কোনো একটি উপলক্ষে আনন্দে মেতে উঠতেই চায়। ছোটখাটো উপলক্ষও তারা হাতছাড়া করে না। সেখানে বাংলা নববর্ষ তো একটি বড় উৎসবের উপলক্ষই। ক্রিকেট দল বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেই যে সংবর্ধনা পেয়েছিল, তা পশ্চিমের কোনো ক্রিকেট খেলুড়ে দেশে কল্পনাই করা যাবে না। এ দেশে কোনো কোনো খেলোয়াড় পাঁচ ম্যাচে একটি ফিফটি হাঁকিয়ে বীরের সম্মান পান, যা অন্য দেশের ব্যাটসম্যানের জন্য আশাব্যঞ্জক ভবিষ্যতের ইঙ্গিতই দেবে না। আমরা নিজেদের জন্য পছন্দমতো মানদণ্ড খাড়া করে নিই।

এই দৃষ্টান্তটি টানলাম এটি বোঝাতে যে এ দেশের ছেলে-বুড়ো সবাই উৎসবের উপলক্ষ খুঁজে ফেরে। তৈরি উপলক্ষ পেলে তা হাতছাড়া করবেই না। আর মুসলমান হলেও সে-ও তো বাঙালি। বাঙালিত্ব আর মুসলমানিত্বের বিরোধ যে তৈরি করা মেকি, ভ্রান্ত দর্শন ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ষাট-সত্তরের দশকে বুঝতে পেরেছিল এ দেশের মানুষ। সেই থেকে নববর্ষ ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে বাঙালির প্রধান সর্বজনীন উৎসব।

উৎসব বাণিজ্যও বটে। তার কলেবর যত বাড়বে, বাণিজ্যের পরিসরও তত বড় হবে। বাজার অর্থনীতির রমরমা চলবে আর নববর্ষের উৎসব তাতে রং ছড়াবে না, তা তো হবে না। দিন দিন নববর্ষের অর্থনীতি ফুলেফেঁপে উঠছে। কাঠমোল্লার অবস্থান থেকে মানুষের এই আনন্দ-উচ্ছ্বাসের মর্ম বোঝা সম্ভব হবে না। এর জন্য সমাজ ও ইতিহাসের বিবর্তনের কার্যকারণ ও প্রক্রিয়াগুলো অনুধাবন করতে হবে।

দুর্ভাগ্যের বিষয়, পর পর দুই বছর করোনার অতিমারির গহ্বরে তলিয়ে গেল নববর্ষের উৎসব। এ উপলক্ষে যে বাণিজ্য হয় তার ক্ষতি ব্যক্তি, সমষ্টি ও জাতীয় পর্যায়ে প্রভাব ফেলছে। আশা ছাড়া মানুষ বাঁচতে পারে না। তাই দুঃসময় কেটে সুসময় আসবে অচিরেই—এমন প্রত্যাশায় বুক বাঁধা ছাড়া গত্যন্তর নেই। তবে মানুষ সহজে হার মানার পাত্র তো নয়, এই বাধাকে চ্যালেঞ্জ ধরে নিয়ে নিশ্চয় বিকল্প কোনো আয়োজনের কথা ভাববে। বলা হচ্ছে, মানুষের কারণেই এই গ্রহ, মানুষসহ প্রাণিকুলের জন্য এত সমস্যা তৈরি হচ্ছে। তাহলে মানুষকে জীবনপ্রণালী ও জীবনধারা নিয়ে নতুন চিন্তায় নামতে হবে। নববর্ষ সেই যুগান্তরের শুভ চিন্তার উদ্বোধনের দিন হতে পারে।

বাংলা নববর্ষ আজ আমাদের লৌকিক উৎসব, ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে একসঙ্গে জাতি হিসেবে উদযাপনের উপলক্ষ। মহামারির দুর্যোগ কেটে সুদিন ফিরে আসুক, নববর্ষের দিনে ব্যক্তি ও জাতির জন্য শুভ ও সুন্দরের প্রার্থনা জানাব।

লেখক : সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠক



সাতদিনের সেরা