kalerkantho

বুধবার । ২৯ বৈশাখ ১৪২৮। ১২ মে ২০২১। ২৯ রমজান ১৪৪২

বিশেষ লেখা

নিজেকে নিজে বাঁচান

ইমদাদুল হক মিলন   

১১ এপ্রিল, ২০২১ ০২:৪৮ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



নিজেকে নিজে বাঁচান

করোনার এখনকার পরিস্থিতির কথা আমরা সবাই জানি। ভয়ংকর রূপ ধারণ করেছে। আক্রান্ত এবং মৃত্যুর সংখ্যা প্রতিদিনই বাড়ছে। হাসপাতালগুলোতে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। অসহায় স্বজনরা আক্রান্ত প্রিয়জন নিয়ে এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছুটছেন। তাঁদের অসহায়ত্ব সহ্য করা যায় না। টেলিভিশনে প্রতিদিন মানুষের অসহায়ত্বের চিত্র দেখছি আমরা। খবরের কাগজে পড়ছি মানুষের ব্যথা-বেদনা আর অসহায়ত্বের কথা। আবার অন্যদিকে দেখছি অন্যচিত্র। কঠোর বিধি-নিষেধ আরোপের পরও মানুষ যেন তা তোয়াক্কাই করছে না। মাস্ক পরতে চাইছে না। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে চাইছে না। গণপরিবহন চালু করে দেওয়ার পর নিষেধাজ্ঞার ধার ধারলেন না কোনো যাত্রী। দোকানপাট খুলে দেওয়ার পর মানুষ হয়ে উঠল আরো বেপরোয়া। নিউ মার্কেট বা অন্য মার্কেটগুলোতে হাজার হাজার মানুষ। গতকাল আমাদের কালের কণ্ঠ’র শেষ পৃষ্ঠার ওপরের দিকে একটি ছবি ছাপা হয়েছে। নিউ মার্কেটে প্রবেশের সময় নিরাপত্তাকর্মী দুজন মানুষকে মাস্ক পরার অনুরোধ করছেন। নিরাপত্তাকর্মীর কথা তাঁরা পাত্তাই দিচ্ছেন না। অথচ করোনায় যিনি স্বজন হারান বা যিনি আক্রান্ত হন তিনি জানেন ব্যাপারটা কতটা হৃদয়বিদারক, কতটা কষ্টের।

আমি আমার বড় ভাইকে হারালাম ফেব্রুয়ারির ৭ তারিখে। ২৭ দিন করোনার সঙ্গে যুদ্ধ করলেন তিনি। বড় হাসপাতালে চিকিৎসা নিলেন। তার পরও ফিরে এলেন না। আমার চেয়ে মাত্র চার বছরের বড় ছিলেন। জীবনে একটান সিগারেট খাননি। এক চুমুক মদ খাননি। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তেন। হজ করেছেন। অতি নিয়ম মানা স্বাস্থ্যসচেতন লোক। রাত ৯টায় ঘুমিয়ে পড়তেন। ভোরবেলা উঠে ফজরের নামাজ পড়ে চলে যেতেন হাঁটতে। বছর দশেক আগে ডায়াবেটিস ধরা পড়ল। কঠোরভাবে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রেখে চলতেন। কনস্ট্রাকশনের বিজনেস করতেন। সেই মানুষ করোনার কাছে হেরে যাবেন, এ আমরা কখনো ভাবিইনি।

প্রিয়জন যে হারায় সে বোঝে বেদনাটা কত গভীর। গত এক বছরে বহু প্রিয়জন আমাদের ছেড়ে গেছেন। আমরা আর কাউকে হারাতে চাই না। কিন্তু চারদিকে যে অবস্থা দেখছি, বিশেষ করে ঢাকা শহর আর চট্টগ্রাম শহরে যে অবস্থা দেখছি, সাধারণ মানুষ যদি নিজেকে নিজে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ না করে, নিজেকে নিজে বাঁচানোর চেষ্টা না করে, তাহলে সামনের দিনগুলো নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। এখনই অনেকখানি গেছে। সরকার কঠোর বিধি-নিষেধ আরোপ করেও যখন দেখল মানুষ কথা শুনছে না, নিজের জীবনের তোয়াক্কা করছে না, তখন কঠিন লকডাউনের সিদ্ধান্তে যাচ্ছে।

লকডাউন দিয়েই কী মানুষ বাঁচানো যাবে, যদি মানুষ নিজে সচেতন না হয়? এই মুহূর্তে নিজে সচেতন না হওয়া ছাড়া একজন মানুষও নিরাপদ নয়। করোনা মোকাবেলা করতে হলে, করোনার হাত থেকে বাঁচতে হলে নিজেকে নিজে রক্ষা করুন। নিজেকে নিজে বাঁচান। এ-ই একমাত্র পথ। করোনা মোকাবেলার জন্য যা করণীয় ব্যক্তি পর্যায় থেকে তা করুন। নিজে সচেতন হোন, পরিবারের সদস্যদের সচেতন করুন, চারপাশের মানুষকে সচেতন করুন। ঘরের বাইরে গেলে অবশ্যই মাস্ক পরবেন। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখবেন। সাবান-পানি দিয়ে ২০ সেকেন্ড হাত ধোবেন। নাক মুখ চোখে অপ্রয়োজনে হাতই দেবেন না। হাত দেওয়ার আগে সাবধানতা অবলম্বন করবেন। বাড়িতে অবশ্যই গরম পানির ভাপ নেবেন। অর্থাৎ করোনা মোকাবেলার জন্য যা যা করণীয় তাই করুন। যদি সচেতন না হোন, যদি এই কাজগুলো না করেন, তাহলে কেউ আপনাকে রক্ষা করতে পারবে না। আক্রান্ত আপনি হবেনই। সুতরাং নিজেকে নিজে বাঁচান।

পাশাপাশি এও আমরা বুঝি, লকডাউনে সাধারণ জীবিকার মানুষ, দিন আনা দিন খাওয়া মানুষের কষ্টের সীমা থাকে না। তাদের জন্য অবশ্যই সরকারি কোনো ব্যবস্থাপনা থাকতে হবে। মানুষকে খাইয়ে বাঁচিয়ে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। পেটে ভাত না থাকলে মানুষের কিছু করার থাকবে না। অর্থাৎ সর্বাত্মক সচেতন থেকে, মানুষ যাতে অনাহারে না থাকে সেই ব্যবস্থা করতেই হবে। কালের কণ্ঠে লেখা হয়েছে, ‘নেতাদের মধ্যে এবার করোনা আতঙ্ক বেশি’। আতঙ্কিত হলে তো চলবে না। সচেতনতার সঙ্গে রাখতে হবে সাহস। যে যার জায়গা থেকে নিজেকে ও অন্যমানুষকে বাঁচানোর কাজ করতে হবে। ভয়কে জয় করতে হবে। নেতারা আতঙ্কিত হলে সাধারণ মানুষ কার কাছে ভরসা পাবে? এই গভীর সংকট ও বিপদে নিজেকে আমরা নিজে রক্ষা করব। নিজে নিজেকে বাঁচাব আর রবীন্দ্রনাথের সেই কথাটি মনে রাখব, ‘বিপদে আমি না যেন করি ভয়’। গভীর সচেতনতার মধ্য দিয়ে করোনা মহামারি থেকে অবশ্যই আমরা বেরিয়ে আসব।



সাতদিনের সেরা