kalerkantho

শুক্রবার। ৩১ বৈশাখ ১৪২৮। ১৪ মে ২০২১। ০২ শাওয়াল ১৪৪২

৩২ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ ধ্বংসের ষড়যন্ত্র

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১১ এপ্রিল, ২০২১ ০২:৩৭ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



৩২ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ ধ্বংসের ষড়যন্ত্র

আগামীকাল সোমবার প্রথমবারের মতো ভোক্তাপর্যায়ে তরল পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দাম ঘোষণা করবে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। সকাল সাড়ে ১১টায় ভার্চুয়াল ব্রিফিংয়ের মাধ্যমে এ ঘোষণা করা হবে।

এ বিষয়ে এলপিজি আমদানিকারকরা বলছেন, এলপিজির মূল্য বেঁধে দেওয়া অনেক কঠিন। এর পরও এলপিজি অপারেটররা সরকারের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানায়। সরকার এর দাম বেঁধে দিলে তারা গ্রহণ করবে। তবে এ জন্য যৌক্তিক বিষয়গুলো বিবেচনা করতে হবে এবং এ খাতের বিনিয়োগ নিরাপদ করতে হবে। ৩২ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ এবং লাখ লাখ মানুষ এ শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। এখন এই বিনিয়োগ ধ্বংসের ষড়যন্ত্র চলছে। এ খাতের ব্যবসায় স্বাস্থ্যকর পরিবেশ প্রয়োজন।

বসুন্ধরা এলপি গ্যাস কম্পানির হেড অব ডিভিশন (সেলস) প্রকৌশলী জাকারিয়া জালাল বলেন, ‘আমরা কি এলপিজির মূল্য নির্ধারণের বিষয়গুলো বিবেচনা করছি? বিশ্বের অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের মতো বাংলাদেশেও জ্বালানিস্বল্পতা রয়েছে। দেশে জ্বালানির চাহিদা ও সরবরাহের ক্ষেত্রে যে ব্যবধান দেখা যাচ্ছে, এর বড় কারণ মূল্যবান এই সম্পদের অভাব এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের সীমিত উেসর ওপর নির্ভরতা।’

জাকারিয়া জালাল বলেন, বাংলাদেশ সরকার এরই মধ্যে বাসা-বাড়িতে ব্যবহারের জন্য মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫-৭ শতাংশকে প্রাকৃতিক গ্যাসলাইনে যুক্ত করতে পেরেছে। দেশে ব্যবহার হওয়া মোট প্রাকৃতিক গ্যাসের ১০-১২ শতাংশ যাচ্ছে গৃহস্থালিতে। বর্তমানে দেশে জ্বালানির সংকট খুবই আলোচিত একটি বিষয়। ফলে সরকার এরই মধ্যে বাসা-বাড়িতে গ্যাস সংযোগ বন্ধ করে দিয়েছে। বর্তমানে মানুষ তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) ব্যবহারের ব্যাপারে অনেক বেশি সচেতন হচ্ছে। ফলে বাসা-বাড়িতে প্রাকৃতিক গ্যাসের বিকল্প হিসেবে মানুষের কাছে সবচেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছে এখন এলপিজি। এর পাশাপাশি বাণিজ্যিক ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানেও এই গ্যাসে আগ্রহ বাড়ছে।

এই প্রকৌশলী বলেন, যেহেতু দেশের প্রাকৃতিক গ্যাস কমে যাচ্ছে, তাই শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো নির্বিঘ্ন গ্যাস সরবরাহ পেতে ক্রমেই এলপিজির দিকে যাচ্ছে। পাশাপাশি এলপিজি এখন সেসব স্থানে সরবরাহ করা হচ্ছে, যেখানে স্বাভাবিক গ্যাস সংযোগ নেই কিংবা থাকলেও অপ্রতুল। এভাবে এলপিজি এখন দেশের একটি অপরিহার্য পণ্য হয়ে উঠেছে। দেশে এলপিজি সরবরাহের প্রায় ৮০-৮৫ শতাংশই যাচ্ছে বাসা-বাড়ি ও শিল্প-কারখানায়।

এলপিজি ব্যবসার সাঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা বলছেন, সহজলভ্যতার কারণে দেশে এলপিজির ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। এই গ্যাসে কার্বন নিঃস্বরণ যেমন কম, তেমনি এর বিচিত্র ব্যবহার এবং পরিবহনেও সুবিধা রয়েছে। এলপিজি পুরোপুরি আমদানিনির্ভর গ্যাস (৯৮ শতাংশের বেশি)। ফলে বেশির ভাগ এলপিজি টার্মিনাল মোংলা ও চট্টগ্রাম বন্দরে গড়ে তোলা হয়েছে। দেশে এলপিজি সরবাহের শুরুর দিকে এই শিল্প অনেক উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে গেছে। প্রথম অবস্থায় এই খাতের উদ্যোক্তাদের অনেক প্রতিকূলতা মোকাবেলা করতে হয়েছে। কিন্তু গত এক দশক ধরে এই খাতে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি আসছে। ২০১৩ সালে দেশে বছরে এলপিজির চাহিদা ছিল ৮০ হাজার এমটি। বর্তমানে সেই চাহিদা ১২ লাখ এমটি ছাড়িয়ে গেছে।

এই শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, ২০২৫ সাল নাগাদ দেশে এলপিজির চাহিদা ২৫ লাখ এমটিতে পৌঁছাবে এবং ২০৩০ সাল নাগাদ পৌঁছাবে ৩৫ লাখ এমটিতে। এতে বোঝা যাচ্ছে, আগামী চার-পাঁচ বছরে মূল্যবান এই জ্বালানির চাহিদা বেড়ে দ্বিগুণ হবে। ফলে বাংলাদেশ সরকারও সক্রিয়ভাবে এই এলপিজির ব্যবহারে সহযোগিতা করে যাচ্ছে। এলপিজি বোতলের জন্য সরকার এরই মধ্যে ৫৬ প্রতিষ্ঠানকে লাইসেন্স দিয়েছে। ২৮ অপারেটর এই বাজারে বর্তমানে কাজ করছে।

সংশ্লিষ্টরা বলেন, আমরা আমাদের সামষ্টিক অর্থনীতির দিকে তাকালে দেখি, দেশের অর্থনীতি প্রায় ৬.৫ শতাংশ হারে বার্ষিক প্রবৃদ্ধিতে এগিয়ে যাচ্ছে। এতে মানুষের জীবনমানও বাড়ছে। শহর থেকে শুরু করে গ্রামের মানুষও এখন এলপিজি ব্যবহার করছে। কিন্তু এই খাতের টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য সঠিক পরিকল্পনা ও আদর্শ নীতি প্রয়োজন। গত পাঁচ বছরে অপারেটররা এই খাতে প্রায় ৩২ হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ করে ফেলেছে। এই খাতে বিনিয়োগের এ ধারা অব্যাহত রাখা প্রয়োজন। এই শিল্পের স্থিতিশীলতার জন্য মূল্য নির্ধারণের বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যে ২৮টি এলপিজি কম্পানি এই খাতে কাজ করছে, তাদের মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে অনেক কারণ কাজ করে। অনেক সময় এলপিজি সিলিন্ডার যে দামে কম্পানি বাজারে সরবরাহ করে এবং ভোক্তাদের দেয় তা কম্পানির মার্কেট শেয়ার ও বিক্রিতে প্রভাব ফেলে।

বেশির ভাগ বিশেষজ্ঞ মনে করেন, দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে এলপিজি যথেষ্ট সস্তা। এর বড় কারণ, কম্পানিগুলোর মধ্যে বাজার ধরার তুমুল প্রতিযোগিতা। দেশে এলপিজি আমদানিনির্ভর হলেও এতে সরকারের কোনো ভর্তুকি নেই, যেখানে প্রতিবেশী ভারতের বাসা-বাড়িতে ব্যবহারে উচ্চ ভর্তুকি দেওয়া হয়। এমনকি ভারতের মতো এত বিশাল বাজারে মাত্র তিনটি প্রতিষ্ঠান ভোক্তাদের এলপিজি সরবরাহ করে।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) ভোক্তা পর্যায়ে এলপিজির দাম বেঁধে দেওয়ার পদক্ষেপ নিয়েছে। এ জন্য গত ১৪ জানুয়ারি তারা গণশুনানিরও আয়োজন করে। কিন্তু এলপিজির দাম নিয়ন্ত্রিত হয় না, বরং আন্তর্জাতিক বাজারের কারণে এর মূল্য ওঠা-নামা করে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় পরিবহন ও বিতরণ খরচ এবং কম্পানিগুলো ও তাদের ডিলারদের লাভের বিষয়টি। ফলে অনেক বিষয় এ বাজারকে প্রভাবিত করে।

যেসব কারণ এলপিজির বাজার প্রভাবিত করে : ১. যে কম্পানি পরিবেশকদের ভালো সুবিধা দেয়, তারা খুচরা বিক্রেতাদের দেয় আর এভাবে ছাড়া পায় ভোক্তারাও। ফলে যে কম্পানি যত ছাড় দেবে, মার্কেটে তাদের অবস্থানই জোরালো হবে। এমন প্রতিযোগিতার কারণে দেশে এলপিজি অনেক সস্তা। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান বাজার ধরার জন্য মুনাফাও করছে না। এমন অবস্থায় অর্থশূন্য হয়ে পড়ে অনেক কম্পানি বিনিয়োগও তুলে নিতে চাইছে।

২. কম্পানিগুলো সিলিন্ডারে ভর্তুকি দিচ্ছে। ফলে পরিবেশক, খুচরা বিক্রেতা ও ভোক্তারাও কম দামে পাচ্ছে। বর্তমানে একটি সিলিন্ডারের উৎপাদন খরচ দুই হাজার ২০০ টাকা। অথচ নতুন একটি সিলিন্ডার বিক্রি হয় ৭০০-৮০০ টাকা।

৩. এলপিজির দাম বৃদ্ধিতে ভ্যাট ও করও বড় ভূমিকা রাখে। নতুন সিলিন্ডারে ৫ শতাংশ ভ্যাট ও প্রতিটি রিফিলে ৭ শতাংশ ভ্যাট দিতে হয়।

৫. সিলিন্ডার পরিবহনেও অনেক খরচ পড়ে। সেই সঙ্গে বিতরণ খরচ তো আছেই।

৬. গভীর সমুদ্রবন্দরের সংকট তো আছেই। এই অবকাঠামো সংকটের কারণে এলপিজি পরিবহন খরচ বেড়ে যায়।

৭. ছোট জাহাজে পরিবহনের কারণে জাহাজ ভাড়াও বেশি দিতে হয়।

৮. আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির দামে ওঠা-নামার প্রভাব পড়ে বাংলাদেশের বাজারেও। কম্পানিগুলোকে আন্তর্জাতিক চুক্তির দর অনুসরণ করতে হয়।

৯. বাংলাদেশে অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের তুলনায় ব্যবসা পরিচালনা খরচ তুলনামূলক অনেক বেশি। এটিও এলপিজির দাম বৃদ্ধিতে প্রভাব ফেলে।

১০. নিয়ন্ত্রণগত ও আইনগত খরচ বাবদ সরকারকে বড় অঙ্কের অর্থ দিতে হয় এলপিজি কম্পানিগুলোকে। বিইআরসি, বিপিসি, বিএসটিআইসহ ২১টি প্রতিষ্ঠান এলপিজি বিষয়ে সংশ্লিষ্ট রয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলোও দামে প্রভাব ফেলে।

এলপিজির দাম কেমন হতে পারে জানতে চাইলে বিইআরসির চেয়ারম্যান মো. আব্দুল জলিল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দাম এখনই বলতে চাচ্ছি না। তবে এলপিজির দাম সবার দিক বিবেচনা করেই ঠিক করা হয়েছে।’

গণশুনানিতে সরকারি ও বেসরকারি কম্পানিগুলো প্রতি কেজি এলপিজির দাম প্রায় ৭২ টাকা করে একটি অভিন্ন দাম নির্ধারণের সুপারিশ করে। কমিশন গঠিত মূল্যায়ন কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী সরকারি কম্পানির সাড়ে ১২ কেজি এলপিজির দাম হয় ৯০২ টাকা এবং বেসরকারি কম্পানিগুলোর দাম হয় ৮৬৬ টাকা। কিন্তু সরকারি কম্পানি তাদের বর্তমান মূল্য ৬০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭০০ করার জন্য কমিশনের কাছে প্রস্তাব করেছে। আর মূল্যায়ন কমিটি আরো ২০০ টাকা বাড়িয়ে প্রতি সিলিন্ডার ৯০২ টাকা এবং বেসরকারি কম্পানিগুলোর জন্য এক হাজার ২৬৯ টাকা থেকে কমিয়ে ৮৬৬ টাকা নির্ধারণ করার সুপারিশ করে।

ওই সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে সরকারি গ্যাসের দাম কেন বাড়বে এমন প্রশ্ন তুলেছিলেন জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্টরা। তার ব্যাখ্যাও দিয়েছে কমিশন। তখন মূল্য নির্ধারণ কমিটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, এক দেশে দুই রকম মূল্য থাকা ঠিক নয়। দুই দিক সমান রাখতেই প্রতি কেজি ৭২ টাকা নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়।



সাতদিনের সেরা