kalerkantho

বুধবার । ২৯ বৈশাখ ১৪২৮। ১২ মে ২০২১। ২৯ রমজান ১৪৪২

সেলাই করা খোলা মুখ

অনন্তর কেন এমন অকালে অনন্তযাত্রা

মোফাজ্জল করিম   

১০ এপ্রিল, ২০২১ ০৩:৫৭ | পড়া যাবে ১৪ মিনিটে



অনন্তর কেন এমন অকালে অনন্তযাত্রা

সময় : ১৯৫৫ সালের এক হেমন্তসন্ধ্যা। স্থান : মাইজদীকোর্ট শহর। নোয়াখালী জেলার সদর দপ্তর।

বর্তমান মাইজদীকোর্ট শহর দেখে কেউ কল্পনাও করতে পারবে না তখন ওই জেলা শহরটি দেখতে কেমন ছিল। শহর তো নয়, যেন বর্তমান শহরের কঙ্কাল। আসলে উনিশ শ চল্লিশের দশকের শেষভাগে মেঘনার তীরে অবস্থিত সেই আমলের উভয় বাংলার সেরা সুন্দরী নগরীদের অন্যতম ছিল নোয়াখালী। শহরটি মেঘনার ভাঙ্গনে অবিশ্বাস্য দ্রুততায় নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়ার পর প্রায় ১২-১৪ মাইল উত্তরে মাইজদীতে স্থানান্তরিত হয় জেলা সদর। অফিস-আদালত, স্কুল, ব্যবসা-বাণিজ্য প্রায় সবই গড়ে ওঠে মাইজদীতে। আর যেহেতু কোর্ট-কাচারি স্থাপিত হলো মাইজদীতে, তাই ওই জনপদের নামের সঙ্গে ‘কোর্ট’ সংযুক্ত হয়ে এই নবপ্রতিষ্ঠিত শহরের নাম হয়ে গেল মাইজদীকোর্ট। আর দিন গুজরানের মতো টিনের চাল, টিনের/তরজার বেড়া, কোথাও খড়ের চাল তরজার বেড়ার বাড়ি-ঘর-দুয়ার উঠল সেই নিরাভরণ সদ্যোজাত শহরে। বাস্তুভিটার মাটির প্রয়োজনে শহরের বুক চিরে কাটা হলো খাল, আর এখানে-সেখানে খনন করা হলো পুকুর। মেঘনাগর্ভে হারিয়ে যাওয়া নোয়াখালীসুন্দরীর সে কী করুণ পরিণতি। পঞ্চাশের দশকে দু-চারটি আধাপাকা সরকারি স্থাপনা ব্যতীত বাটি চালান দিয়েও সারা শহরে ইট-পাথরের ঘরবাড়ি খুঁজে পাওয়া যেত কিনা সন্দেহ। আর লোকসংখ্যা? কত আর হবে, আন্দাজ করি বড়জোর হাজার পঁচিশেক। বর্তমানে যে মাইজদীকোর্ট নামক সুপরিকল্পিত, নাগরিক সুযোগ-সুবিধা সংবলিত শহরটি গড়ে উঠেছে তার যাত্রা শুরু হয়েছে তো এই সেদিন : বোধ করি ষাটের দশকে বা তারও পরে। পঞ্চাশের দশকে হৃতসর্বস্ব মাইজদীকোর্ট শহরটি যাঁরা দেখেছেন তাঁরা উদ্গত দীর্ঘনিঃশ্বাস চেপে বাষ্পাকুল নয়নে নিশ্চয়ই স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েন। অন্তত আমি তো পড়ি। ১৯৫৪-৫৬ সময়কালে দুই বছর মাইজদীকোর্ট শহরের বাসিন্দা ছিলাম আমরা। আমি টিনের চালবিশিষ্ট আধাপাকা একতলা এল-প্যাটার্নের নোয়াখালী জিলা স্কুল থেকে ৫৬ সালে ম্যাট্রিক—বর্তমান এসএসসি পাস করি। আজকের নিবন্ধের শুরুতে সামান্য স্মৃতিরোমন্থন সেই সময়কার।

২.

১৯৫৫ সালের সেই হেমন্তসন্ধ্যায় আমাদের বাসার কাছের কল্যাণ হাই স্কুলের একটু দক্ষিণে শহরের খোয়া ওঠা একমাত্র তথাকথিত রাজপথটির ওপরে ২০-২৫ হাত লম্বা পুলের রেলিংয়ের ওপর বসে গল্প করছিলাম আমি ও আমার জানি দোস্ত সহপাঠী মোশাররফ। আমরা তখন ক্লাস টেনে পড়ি। আমাদের নির্দোষ আলাপচারিতার মাঝখানে হঠাৎ বাইসাইকেলে চড়ে সেখানে এসে হাজির হলেন প্রায় ছয় ফুট লম্বা দশাসই চেহারার কৃষ্ণকায় এক পুলিশ কর্মকর্তা। তাঁকে দেখেই আমরা চিনলাম : ইনি হচ্ছেন নোয়াখালী সদর থানার ভীতিসঞ্চারক থানা সাব ইন্সপেক্টর (টিএসআই) অর্থাৎ টাউন দারোগা সাহেব। সাইকেল থেকে ‘ভূমিষ্ঠ’ হয়েই তাঁর প্রশ্ন : এই তোমরা এখানে বসে কী করছ? কারা তোমরা? সন্ধ্যা হয়েছে কখন, আর তোমরা এখনো বাসায় যাওনি? ইত্যাকার প্রশ্নবাণে জর্জরিত আমি ঢোক গিলতে গিলতে কোনোমতে পিতৃপরিচয় দিয়ে বললাম, আমরা দুজনেই জিলা স্কুলের ছাত্র। আর ওই দেখা যায় রাস্তার ধারেই আমার বাসা। আমরা বিকেলে স্কুল মাঠে বল খেলে এসে এখানে বসে একটু গল্প করছি। ‘গল্প করছ? রাস্তার ওপর বসে গল্প? আর এখন গল্প করার সময়? যাও, বাসায় গিয়ে হাত-মুখ ধুয়ে পড়তে বসো। আর যেন কোনোদিন সন্ধ্যার পর এভাবে আড্ডা দিতে না দেখি। বুঝেছ?’ বুঝিনি আবার। দারোগা সাহেবের যমদূতের মতো চেহারামুবারক আর তাঁর বাজখাঁই গলার আওয়াজ ততক্ষণে আমাদের ভালো করেই বুঝিয়ে দিয়েছে সন্ধ্যার পর বাসার বাইরে থাকা মস্ত বড় কবিরা গুনাহ। আর আসলে ওই সব দিনে ওই ছোট্ট শহরে ফালতু আড্ডা-ফাড্ডা, খাজুরা আলাপ ইত্যাদি যা হবার পথিপার্শ্বস্থ হাতে গোনা দু-চারটা চায়ের দোকানেই হতো। আর তাতে ছিল বড়দের মনোপলি। স্কুলপড়ুয়া বা লাফাঙ্গা বেকারদের জন্য ওই সব স্থান ছিল আউট অব বাউন্ডস। মাইজদীকোর্ট তখন ছিল না-শহর না-গ্রাম মার্কা একটা জেলা সদর। সেখানে গার্লস স্কুলের মেয়েদের মুখের ওপর সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে বাহাদুরি দেখানো বা মহল্লার মুরব্বিদের সঙ্গে বেআদবি করে ‘মুই কী হনু রে’ মার্কা ভাব দেখানোর কালচার তখনো শুরু হয়নি। আর নোয়াখালী-কুমিল্লা-সিলেট ইত্যাদি জেলা শহরের বড় ভাই যে ঢাকা শহর তাও সেই পঞ্চাশের দশকে এতটা ‘স্মার্ট’ হয়ে ওঠেনি। হবে কী করে। ঢাকায় তো তখন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, খেলাধুলা, হৈ-হুল্লোড, আড্ডা-ইয়ার্কি ইত্যাদি সবই ছিল সদরঘাট-গুলিস্তান নবনির্মিত স্টেডিয়াম কার্জন হল ও ব্রিটিশ কাউন্সিলকেন্দ্রিক। পাড়ায় পাড়ায় ক্লাব ছিল, পাঠাগার ছিল, ছোট ছোট খেলার মাঠ, এমনকি এখন অবিশ্বাস্য মনে হলেও পুকুরও ছিল। শিশু-কিশোররা ধুমসে এগুলো ব্যবহার করত। বিভিন্ন এলাকায় ফুটবল-ক্রিকেট ক্লাব ছিল। তা ছাড়া মুকুল ফৌজ, খেলাঘর ইত্যাদি শিশু-কিশোর সংগঠনের স্থানীয় উদ্যোগী যুবারা ছেলেমেয়েদের শরীরচর্চা, গানবাজনা, অভিনয়, আবৃত্তি ইত্যাদি শেখাতেন। এ ধরনের সংগঠন ঢাকার বাইরেও মোটামুটি সক্রিয় ছিল।

পঞ্চাশের দশকের শেষার্ধে যে ঢাকা শহরের লোকসংখ্যা ছিল টেনেটুনে বড়জোর ১০ লাখের মতে, আজ ৬০-৭০ বছরের ব্যবধানে এখন তা বেড়ে গিয়ে কেউ বলেন দেড় কোটি, কেউ বলেন দুই কোটি হয়ে গেছে। দালানকোঠা যে কত হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। এই অবস্থা কল্পনা করেই বোধ হয় রবীন্দ্রনাথ তাঁর বধূ কবিতায় লিখেছিলেন : ‘ইটের ’পরে ইট,/মাঝে মানুষ-কীট—/নাইকো ভালোবাসা, নাইকো খেলা’। (মানসী কাব্যগ্রন্থ : রচনাকাল ১২৯৫ সাল)। আজ থেকে ১৩২ বছর আগে কবিগুরু কল্পনায় প্রেম-প্রীতি-ক্রীড়া-কৌতুকবিহীন মনুষ্যরূপী শহরবাসী কীটদের যে চিত্রকল্প এঁকে গিয়েছেন তা এতদিনে শুধু জনমিতিতেই সব সীমা অতিক্রম করে যায়নি, মানবিক গুণশূন্যতা এবং হিংসা-বিদ্বেষ-ঘৃণার দিক দিয়েও যেন দ্রুত এই গ্রহকে ধ্বংসের অমোঘ পরিণতির দিকে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের ছোট-বড়-মাঝারি সব জনপদ, শহর-বন্দর-গ্রাম কোনো কিছুই এর ব্যতিক্রম নয়।

৩.

এখন রোজ আমাদের ঘুম ভেঙ্গে শুনতে হয় শুধু খুন-ধর্ষণ-জখম-রাহাজানির কাহিনী। খবরের কাগজের পৃষ্ঠাগুলো যেন অদৃশ্য টকটকে লাল রক্তের আখরে লেখা। দেখতে দেখতে চোখে সয়ে গেছে বলে সে লাল রং আমরা এখন আর দেখতে পাই না। মানুষ হত্যা করছে মানুষকে। কখনো তাত্ক্ষণিক উত্তেজনার মুহূর্তে, ক্রোধের বশবর্তী হয়ে। কখনো কারণে-অকারণে পরস্পর পরস্পরের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়ে। দীর্ঘদিনের শত্রুতাজনিত কারণে পূর্বপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডও সংঘটিত হচ্ছে অহরহ। এসব ঘটনা অস্বাভাবিক কিছু নয়। আদিমকাল থেকেই এ ধরনের সংঘর্ষ-সংঘাত-রক্তপাত-প্রাণসংহার ঘটে আসছে। বরং গুহাবাসের যুগে হিংস্র পশুর আক্রমণ থেকে আত্মরক্ষা এবং পশুবধ করে ক্ষুণ্নিবারণের নিমিত্ত, কিংবা অধিকার-আধিপত্য নিয়ে একে অন্যের সঙ্গে কলহে লিপ্ত হয়ে কাষ্ঠদণ্ড-বংশদণ্ড ও ক্রমে প্রস্তর এবং পরবর্তী পর্যায়ে লৌহনির্মিত অস্ত্র দ্বারা প্রতিপক্ষকে আঘাত করা, হত্যা করা অতি স্বাভাবিক ও মামুলি মনুষ্য আচরণ ছিল সৃষ্টির আদিমকালে। তখন তো আর কোনো আইন-কানুনের বালাই ছিল না, বিচার-বিচারালয়, ফাঁসি-ফাঁসিকাষ্ঠ ইত্যাদি ধারণার সৃষ্টি হয় বহুকাল বহু সহস্র বছর পরে, যখন অনিবারিত অপরাধ দমনের প্রয়োজনীয়তা অনিবার্য হয়ে ওঠে, মানুষ বুঝতে পারে, হত্যা-জখম-সংঘাত-সংঘর্ষের গতিরোধ না করলে একদিন মানবজাতিই বিলুপ্ত হয়ে যাবে পৃথিবী থেকে। তারপর সভ্যতার বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ নিজেই নিজের হাতে-পায়ে পরাল আইন-কানুন, নিয়ম-নীতির নিগড়। যুগ যুগ ধরে চেষ্টা চালাল এই সুন্দর পৃথিবীটাকে মনুষ্য বাসোপযোগী করে গড়ে তোলার। আজ পৃথিবীর সব দেশে সব মানুষ যে দিনশেষে নিরুদ্বেগে নিঃশঙ্কচিত্তে নিজ আলয়ে সুখনিদ্রা যেতে পারে তা সম্ভব হয়েছে প্রত্যেক দেশে কতগুলো সর্বজনস্বীকৃত ও অবশ্যপালনীয় নিয়ম-কানুন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলে। সেই নিয়ম-কানুন মানুষের আদিম প্রবৃত্তিগুলোকে, ষড়রিপুকে দমিয়ে রাখার নির্দেশ দেয়। সকল অবস্থায়, সকল পরিস্থিতিতে আইন নিজ হাতে তুলে নিতে নিষেধ করে, বলে, তুমি আক্রান্ত হয়েছ, নিগৃহীত হয়েছ, তোমার অধিকার ক্ষুণ্ন হয়েছে মনে করছ, ঠিক আছে, তুমি আইনের আশ্রয় নাও, বিচার প্রার্থনা কর। আইনের প্রতিপালকরা তোমার পাশে দাঁড়াবে, শাস্তি দেবে অপরাধীকে, সে শাস্তি হতে পারে জেল-জরিমানা-ফাঁসি। সে অপরাধী যেই হোক, সে যদি সত্যি দোষী হয়ে থাকে আইন তাকে ছাড় দেবে না। এটাই আইনের শাসন। এটাই সব দেশে, সব কালে, সবার কাছে শিরোধার্য হয়ে আছে।...প্রশ্ন : সত্যি? তা হলে বাংলাদেশে...।

থাক, আপাতত প্রশ্নটি অসমাপ্তই থাকুক। বরং যে শৈশব-কৈশোরে ‘সদা সত্য কথা বলিবে,’ ‘গুরুজনকে সম্মান করিবে,’ ‘চুরি করা মহাপাপ,’ ‘বিদ্যা অমূল্য ধন’ ইত্যাদি আপ্তবাক্য শ্রদ্ধেয় শিক্ষকরা ও আব্বা-আম্মা যত্নসহকারে তোতাপাখির মতো মুখস্থ করিয়েছিলেন, যে চিরন্তন বাণীগুলোকে অমেয় অমোঘ বলে আশৈশব জেনে আসছি, মেনে আসছি, সেগুলো কি অচল মুদ্রার মতো এখন বাতিল হয়ে গেছে কিনা, নাকি প্রাসঙ্গিকতা হারিয়ে ফেলেছে সে বিষয়ে একটু আলোকপাত করা যাক। কেন? প্রথমত, এগুলোর কথা আজকাল আর কেউ বড় একটা বলেটলে না, বিদ্যালয়ের পুঁথি-পুস্তকেও এগুলো অনুপস্থিত। এখন ‘সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি/সারাদিন আমি যেন ভালো হয়ে চলি’-কে হাম্পটি ডাম্পটি এসে তাড়িয়ে দিয়ে গেঁট হয়ে ‘স্যাট অন আ ওয়াল’। দ্বিতীয়ত, এখন আর ‘লেখাপড়া করে যে, গাড়িঘোড়া চড়ে সে’ কথাটা সঠিক বলে মনে করে না কেউ। বরং ‘লেখাপড়া করে যে, গাড়িচাপা পড়ে সে’ এটাই বিশ্বাস করে লোকে। গাড়িঘোড়া চড়তে হলে বা বাড়ি-গাড়ির মালিক হতে হলে লেখাপড়ার চাইতে কেউকেটা কারো লেজ ধরতে জানাটা, চোঙ্গা ফুঁকতে পারাটা বেশি জরুরি। তৃতীয়ত, —এবং সবচেয়ে বড় অভিজ্ঞানটি হচ্ছে, —সততা, সাধুতা ইত্যাদি শব্দগুলো উঠতে-বসতে, ঘরে-বাইরে, মাঠে-ময়দানে কপচাতে কপচাতে মুখে ফেনা তুলে ফেলতে হবে, কিন্তু ভুলেও কখনো এগুলো আমল করা চলবে না। ‘মুখে শেখ ফরিদ, বগলে ইট’ হতে হবে অঘোষিত নীতি। আর্তজনের হিতের কথা মুখে বলতে হবে, কাজ করতে হবে ঠিক উল্টো।...ইত্যাদি, ইত্যাদি।

৪.

আমি জানি, পঞ্চাশের দশকের, ষাটের দশকের বয়ান শুনতে একবিংশ শতাব্দীর শিশু-কিশোরদের মোটেই ভালো লাগবে না। তারা বলবে, আপনারা তখন ছিলেন গৃহপালিত শিশু, আপনাদের ছিল না টিভি, মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ এটসেটারা এটসেটারা। আপনারা ছিলেন কুয়োর ব্যাঙ, আপনারা কুয়োর বাইরেও যে একটা পৃথিবী আছে তা জানতেনই না। মানলাম, নাতি-নাতনিরা, মানলাম। কিন্তু গৃহপালিতই বল আর ফার্মের মোরগই বল, আমাদের যা ছিল তার অনেক কিছুই কিন্তু তোমাদের নেই। তোমরা একটা খেলার মাঠের জন্য মাথা কুটে মরো, পাও না। মা-বাবা, ভাইবোনের সঙ্গসুখে, তাদের প্রীতির বন্ধনে যে কী স্বর্গসুখ তা তোমরা অনেকেই জানো না। কারণ তোমরা এবং তোমাদের মা-বাবা তো সারাক্ষণ নিজেদের ধান্ধায়, নিজেদের জগত নিয়ে ব্যস্ত। সে জগতে কারো কাছে ফেসবুক-ইন্টারনেট-মোবাইল-জিএফ-বি-এফ, কারো কাছে ক্লাব-পার্টি, টাকা বানানো ইত্যাদি পরিবারের অন্যদের সঙ্গসুখ থেকে বেশি আকর্ষণীয়, বেশি লোভনীয়। আমাদের ছেলেবেলায় মা যখন সময়ে-অসময়ে বলেছেন, ‘যা তো বাবা, একটু বাজারটা করে আন, ঘরে তরি-তরকারি মাছ-গোশত কিছু নেই’, আমরা তখন মাকে খুশি করতে পারব বলে আনন্দে নাচতে নাচতে বাজারের ব্যাগ হাতে দোলাতে দোলাতে বাজারে গেছি। আর তোমাদের অনেকেই বাজারে যাওয়া মানে তোমাদের ‘প্রেস্টিজ পাংচার’ হওয়া মনে কর। আমরা সন্ধ্যার সঙ্গে সঙ্গে বাসায় ফিরতাম, কোনো টাউন দারোগা দাবড়ানি দিক আর না দিক। আর তোমরা রাত ১২টা-১টা পর্যন্ত কোনো রেস্টুরেন্টে বা কারো বাসায় হৈ-হুল্লোড়ে মেতে থেকে, উল্টোপাল্টা খাওয়া-দাওয়া করে নিজের আস্তানায় ফিরলে (বা সে রাতে একেবারে না ফিরলে) কেউ কিছু বলে না। কারণ তোমাদের জীবনে ডিসিপ্লিন নামক শব্দটির সংজ্ঞাই তোমরা পাল্টে দিয়েছ। আর সে সবক অনেকটাই তোমরা পেয়েছ টিভি নামক একটা আজব বাক্স থেকে, যার নামও আমরা শুনিনি আজ থেকে ৬০-৭০ বছর আগে।

থাক এই প্রসঙ্গ। অনেক গিবত গেয়ে ফেলেছি। সরি! আসলে গত ৩১ মার্চ ‘কালের কণ্ঠের’ শেষ পৃষ্ঠায় ‘সিগারেট নিয়ে তর্কে প্রাণ গেল অনন্তর’ শিরোনামের নাতিদীর্ঘ প্রতিবেদনটি আমার কলজেটাকে মুচড়াতে মুচড়াতে নিয়ে গেল উনিশ শ পঞ্চাশের দশকে, অর্থাৎ আজ থেকে পঁয়ষট্টি বছর আগে, যখন আমিও অনন্তর বয়েসি ছিলাম। তখন আমরা ছিলাম বগুড়া শহরে। তখন আমাদের বন্ধু-বান্ধবদের মধ্যেও মান-অভিমান, ঝগড়াঝাঁটি, এমনকি ছোটখাটো মারামারিও হতো। কিন্তু তাই বলে ছুরি মেরে একেবারে খুন করে ফেলতে হবে? আর খুনি বন্ধু(!) ও তার সাঙ্গোপাঙ্গরা ঘটনার পর গ্রেপ্তার হলেও তাদের মধ্যে নাকি কোনো ভাবান্তর লক্ষ করা যায়নি। যেন কিছুই হয়নি। আশ্চর্য ! ‘কী বিচিত্র এই দেশ সেলুকাস!’

এখন তো জীবন সায়াহ্নে এসে রোজ কত নতুন নতুন অভিজ্ঞতা হচ্ছে, দেখছি-শুনছি কত নতুন কিছু। সম্প্রতি আমদানি হয়েছে এক নতুন সম্প্রদায় বা গোষ্ঠী, যে নামেই ডাকুন না কেন। তবে এরা ইঙ্গ-বঙ্গ নাম নিয়েই পরিচিত হয়ে উঠেছে। নামটি কিশোর গ্যাং। এদের কর্মকাণ্ড সম্বন্ধে পত্রপত্রিকা মারফত পাঠক-পাঠিকা ইতিমধ্যেই থোড়া-বহুত অবহিত আছেন। এককথায় বলা যায়, এরা কোনো দলের ‘বি টিম’ বা ‘আন্ডার নাইনটিনের’ মতো জুনিয়র দল। এখন ব্যাঙাচির রূপ ধরে আত্মপ্রকাশ করেছে, কালে কালে গ্যাঙর গ্যাঙ কোলা ব্যাঙ হয়, না ‘কুলাপানা চককরের’ গোখরা সাপ হয় কে জানে।

কিন্তু এরা এই পথে যাচ্ছে কেন? এর উত্তর পেতে বিশদ গবেষণার দরকার নেই। গোটা সমাজটা যে পথে যাচ্ছে বা হয়তো চলে গেছে, এরাও সেই পথেই হাঁটছে। এখন রোজ রোজ এরা তাদের চোখের সামনে পাড়ায়-মহল্লায়-শহরে-গ্রামে খুন-জখম-ধর্ষণ ইত্যাদি মারাত্মক ক্রাইম (অপরাধ বিজ্ঞানে ইংরেজিতে বলে হেইনাস ক্রাইম) সংঘটিত হতে দেখছে। দেখছে অপরাধীরা ধরা পড়ে না অথবা ধরা পড়লেও শাস্তি হয় না। আরও দেখে, যেকোনো অপরাধ করে টাকা-পয়সা দিয়ে আইনের মুখ বন্ধ করা যায়। সবচেয়ে বড় কথা, এই গ্যাংরিনাক্রান্ত দুর্নীতিপরায়ণ সমাজে ধলো টাকা উপার্জন করা যত কঠিন, কালো টাকা বানানো তত সহজ। অতএব? অতএব অনেস্টি নয়, ডিজঅনেস্টি ইজ দ্য বেস্ট পলিসি।

আমাদের জীবনে উন্নয়নের বিশাল জোয়ার এসেছে সন্দেহ নেই, আধুনিকতার ছোঁয়াও লেগেছে বহু আগে থেকেই। তবে এগুলোর জন্য বড় চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে আমাদের। মনে হচ্ছে উন্নয়নের প্রসব বেদনাটা বড় বেশি তীব্র এবং দীর্ঘায়িত হচ্ছে। পরিবার ভেঙ্গে যাচ্ছে, চিরায়ত কৃষ্টি-সংস্কৃতি দ্রুত অপসৃয়মাণ, মাদকের ছোবলে নীল আমাদের যুবসমাজ। সর্বোপরি সর্বগ্রাসী দুর্নীতির কারণে দেশের অগণিত খেটে খাওয়া মানুষের—আমাদের কৃষক, শ্রমিক, পোশাকশিল্পের কর্মী, বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনকারী তরুণের রক্ত পানি করা শ্রম বৃথা হয়ে যাচ্ছে। স্বাধীনতার ৫০ বছর পরও তাদের জীবনে বইছে না উন্নয়নের সুবাতাস।

৫.

শেষ করতে চাই ‘কিশোর গ্যাংদের’ প্রতি আমাদের ক্ষমাহীন উদাসীনতার উল্লেখ করে। আমাদের রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন, বুদ্ধিজীবী মহল, প্রশাসন—কারো যেন কোনো উদ্বেগ নেই অনন্তদের অকালে ঝরে যাওয়া, জীবনের ঊষালগ্নে বিপথগামী হওয়ার জন্যে। এর কারণ কি তা হলে এই : অনন্তরা কেউই সমাজের উঁচুতলার সন্তান নয়, এরা সবাই নিচুতলার হতদরিদ্র শ্রেণীর মানুষ। এরা বন্ধুর ছুরিকাঘাতে মরুক, আর সড়ক দুর্ঘটনায়ই মরুক, তাতে ওপরতলার মানুষদের সুখনিদ্রায় কোনো ব্যাঘাত হবে না। ‘কি যাতনা বিষে, বুঝিবে সে কিসে, কভু আশীবিষে দংশেনি যারে’।...

হ্যাঁ, বুঝবে সেদিন যেদিন আশীবিষের দংশনে তার আত্মজ বা আত্মজা অনন্তর মতো অনন্তযাত্রা করবে। তবে আমি অবশ্যই তা চাই না, কোনোদিনও না। আমি চাই তাদের শুভবুদ্ধির উদয় হোক, চাই তাদের, ওদের এবং আমাদের সকলের সন্তান এই সুন্দর বাংলাদেশের সুনাগরিকরূপে নিজেকে গড়ে তুলুক। আমি চাই, আমাদের কোটি কোটি শিশু-কিশোরের চলার পথ কণ্টকাকীর্ণ নয়, কুসুমাস্তীর্ণ হোক। কিন্তু আমাদের নিজেদের কারণে তরুণদের, নবীনদের, শিশুদের, কিশোরদের কারণে নয়—ভয় পাই, বড় ভয় পাই, ভবিষ্যতের কথা ভেবে।

লেখক : সাবেক সচিব, কবি
 [email protected]



সাতদিনের সেরা