kalerkantho

সোমবার । ২৯ চৈত্র ১৪২৭। ১২ এপ্রিল ২০২১। ২৮ শাবান ১৪৪২

সর্বোচ্চ মৃত্যু ও শনাক্ত

নিজস্ব প্রতিবেদক    

৭ এপ্রিল, ২০২১ ০২:৫৪ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



সর্বোচ্চ মৃত্যু ও শনাক্ত

কভিডে আক্রান্ত এই নারীকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। কোথাও ঠাঁই না পেয়ে মুগদা হাসপাতালে নেওয়া হয়, সেখানেও শয্যাসংকট। শেষ পর্যন্ত অবশ্য তাঁকে ভর্তি নেওয়া হয়। গতকাল তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

স্বাস্থ্যবিধি ও সতর্কতা মানার ক্ষেত্রে হেলাফেলা করার মধ্যেই এক দিনের হিসাবে করোনাভাইরাসে সর্বোচ্চ মৃত্যু ও শনাক্তের রেকর্ড গড়ল দেশ। গতকাল মঙ্গলবার সকাল ৮টা পর্যন্ত পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টার হিসাবে সর্বোচ্চ ৬৬ জনের মৃত্যু ও সাত হাজার ২১৩ জন শনাক্ত হয়েছে। এক দিনে পরীক্ষাও হয়েছে সবচেয়ে বেশি, ৩৪ হাজার ৩১১ জনের। আর সর্বোচ্চ মৃত্যু ঢাকাতেই থাকছে। গতকাল মৃতদের মধ্যে ৫৪ জনই মারা গেছেন ঢাকা বিভাগে। এর আগে গত বছরের ৩০ জুন দেশে মৃত্যু হয়েছিল ৬৪ জনের।

বিশেষজ্ঞরা বিষয়টিকে ‘ভয়ানক অবস্থা’ আখ্যায়িত করে সামনে পরিস্থিতির আরো অবনতি হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন। এ ক্ষেত্রে হাসপাতালে রোগীর ঠাঁই না হওয়া ও মৃত্যু ঠেকানোর মতো কার্যকর আর কোনো পন্থা হাতে থাকছে না বলেও মত দিয়েছেন কেউ কেউ। ফলে এখনই সবাইকে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ও সামাজিক সুরক্ষায় নজর দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। গতকালও ঢাকা ও ঢাকার বাইরে বিভিন্ন হাসপাতালে আইসিইউ কিংবা জেনারেল বেড না পেয়ে পথে পথে ঘুরতে হয়েছে অনেক রোগীকে। কেউ কেউ মারাও যাচ্ছে। আর আজ এমন পরিস্থিতির মধ্যেই পালিত হবে বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস। বিশেষজ্ঞরা এমন পরিস্থিতিকে মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য সবচেয়ে বিপর্যয় বলে মনে করছেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এ পর্যন্ত দেশে করোনায় আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছে ছয় লাখ ৫১ হাজার ৬৫২ জন। এর মধ্যে সুস্থ হয়েছে পাঁচ লাখ ৫৮ হাজার ৩৮৩ জন ও মারা গেছে ৯ হাজার ৩৮৪ জন। গতকাল এক দিনে সুস্থ হয়েছে দুই হাজার ৯৬৯ জন।

বাংলাদেশ মেডিসিন সোসাইটির সভাপতি ও মুগদা মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. আহমেদুল কবীর কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কেবল মুগদা হাসপাতালেই নয়, এখন কোনো হাসপাতালেই আর রোগীর ঠাঁই হচ্ছে না। হাসপাতালগুলো ভরে আছে রোগীতে। আরো রোগী বাড়ছে। তাদের কপালে কী পরিণতি হবে, সেটা ভাবতেও কষ্ট লাগে।’

ওই বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘আমরা ভয়ানক পরিস্থিতির দিকে যাচ্ছি। মানুষ কিছুই মানছে না, চারদিকে মৃত্যু দেখেও সতর্ক হচ্ছে না। সংক্রমণ প্রতিরোধ করতে না পারলে, স্বাস্থ্যবিধি না মানলে সামনে আরো ভয়ানক পরিণতি আসছে, যা ঠেকানো কঠিন হবে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা এবার বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবসে মানবস্বাস্থ্যের সবচেয়ে বড় বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে সময় অতিক্রম করছি। এটা একই সঙ্গে মানবিক বিপর্যয়ও।’

গতকাল দুপুরে মুগদা হাসপাতালের ফটক দিয়ে আহাজারি করতে করতে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় একজন বয়স্ক পুরুষ রোগীকে নিয়ে বেরিয়ে যান দুই নারী। জানতে চাইলে হাসপাতালের ফটকে কর্তব্যরত নিরাপত্তাকর্মী বলেন, ‘ওই রোগীকে এখানে নিয়ে আসা হয়েছিল ভর্তির জন্য, কিন্তু আমাদের এখানে বেড খালি নাই, তাই অন্য কোনো হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছে।’

এর আগে রাজধানীর ধানমণ্ডিতে আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতালের সামনেও প্রায় একই দৃশ্য দেখা যায়। রোকসানা আহম্মেদ নামের একজন মধ্যবয়সী নারী তাঁর শ্বাসকষ্টে ভোগা স্বামীকে ওই হাসপাতালে নিয়ে আসেন। কিন্তু সেখানে ঢুকে জানতে পারেন, করোনা ইউনিটে কোনো বেডই খালি নেই। ফলে তিনি গুলশানের আরেকটি হাসপাতালের দিকে রওনা দেন।

এ সময় কান্নার সঙ্গেই রোকসানা বলেন, ‘হায় হায়, এ কী অবস্থা হলো, আমার স্বামী তো পথেই মারা যাবে, হাসপাতালে তো রোগী ধরছে না, কী হবে এখন! কেউ কোথাও একটা বেডের ব্যবস্থা করে দেন প্লিজ!’ আশপাশের লোকজন শুধুই তাকিয়ে দেখছিল ওই নারীর আহাজারি আর তাঁর স্বামীর শ্বাসকষ্টের দুর্বিষহ যন্ত্রণার প্রকাশ।

গতকাল ঢাকার কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল, মুগদা জেনারেল হাসপাতাল, কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালসহ সব কয়টি সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউ ও জেনারেল বেড—কোনোটিতেই খালি পাওয়া যায়নি। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে কয়েকটি বেড খালি দেখা যায়। তবে সেখানেও কোনো আইসিইউ বেড খালি নেই। এমনকি অনেক হাসপাতালেই পর্যাপ্ত অক্সিজেনও মিলছে না। যদিও গতকাল রাজধানীর মহাখালীতে উত্তর সিটি করপোরেশনের মার্কেটে এক হাজার ২৫০ বেডের একটি কভিড হাসপাতাল স্থাপনের কাজ পরিদর্শন করেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী জাহিদ মালেক। এ সময় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. এ বি এম খুরশীদ আলমসহ দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা তাঁর সঙ্গে ছিলেন। এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল শাখার পরিচালক ডা. ফরিদ উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নতুন পাঁচটি হাসপাতাল ও দুটি ফিল্ড হাসপাতালের কাজ চলছে। আশা করি, দ্রুত সময়ের মধ্যেই কিছুটা সংকট কাটানো যাবে। তবে এখন যেভাবে সংক্রমণ বাড়ছে, তাতে শেষ পর্যন্ত কী অবস্থা দাঁড়ায় সেটা বোঝা যাচ্ছে না।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুসারে গতকাল ঢাকার ১০টি সরকারি ও ৯টি বড় হাসপাতালের মধ্যে শুধু শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে ছয়টি ও ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে একটি আইসিইউ বেড ছাড়া আর কোথাও কোনো আইসিইউ বেড খালি নেই। জেনারেল বেডের মধ্যে কুর্মিটোলা হাসপাতালে ১৫০ জন, রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতালে ৫১ জন, মুগদা হাসপাতালে ছয়জন অতিরিক্ত রোগী ছিল। সব মিলিয়ে ঢাকার সরকারি হাসপাতালের দুই হাজার ৫৫৫টি জেনারেল বেডের মধ্যে মাত্র ৪৯টি খালি দেখা যায়।

এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টার হিসাবে মারা যাওয়া ৬৬ জনের মধ্যে ৩৯ জন পুরুষ ও ২৭ জন নারী; এর মধ্যে সর্বোচ্চ ৪১ জন ছিলেন ষাটোর্ধ্ব বয়সের। বাকিদের মধ্যে ৫১-৬০ বছরের ১৭ জন, ৪১-৫০ বছরের পাঁচজন, ৩১-৪০ বছরের দুজন ও ২১-৩০ বছরের একজন; যাঁদের মধ্যে ঢাকায় মারা গেছেন ৫৪ জন, চট্টগ্রামে চারজন, রাজশাহীতে তিনজন, খুলনা ও বরিশালে দুজন করে এবং সিলেটে একজন। এর মধ্যে ৬৪ জন হাসপাতালে ও দুজন বাড়িতে মারা গেছেন। এই তথ্য অনুসারে এবারও ঢাকায়ই সর্বোচ্চ মৃত্যু ঘটছে। আর সংক্রমণও সর্বোচ্চ ঘটছে ঢাকায়। আবার ঢাকার বাইরে যারা আক্রান্ত হচ্ছে, তাদের মধ্যে বেশির ভাগই ঢাকা থেকে গেছে বলেও জানা গেছে ঢাকার বাইরের বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা