kalerkantho

বুধবার । ৮ বৈশাখ ১৪২৮। ২১ এপ্রিল ২০২১। ৮ রমজান ১৪৪২

সরকারবিরোধীদের নয়া কৌশল

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী   

৬ এপ্রিল, ২০২১ ০৪:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



সরকারবিরোধীদের নয়া কৌশল

২০২০ সালের সেপ্টেম্বর-অক্টোবর থেকে কয়েকটি ধর্মীয় সংগঠন বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল ও ভাস্কর্যবিরোধী বক্তব্য দিয়ে ওয়াজ মাহফিলে উত্তেজনা ছড়াতে থাকে। তারা ভাস্কর্যকে ইসলামবিরোধী বলেও ফতোয়া দিতে থাকে। কেউ কেউ হুমকি দিয়ে বলেছিলেন যে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভেঙে ফেলা হবে, বুড়িগঙ্গায় ফেলা দেওয়া হবে। মূলত বঙ্গবন্ধুর জন্মশত বছর উপলক্ষে বেশ কিছু জায়গায় ম্যুরাল এবং ভাস্কর্য নির্মাণের কাজ চলছিল। এটিকে উপলক্ষ করে ধর্মীয় সংগঠনগুলো ওয়াজ মাহফিল, ইউটিউব এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাস্কর্যবিরোধী অপপ্রচার জোরদার করে। অথচ বাংলাদেশে প্রায় চার দশক ধরে জিয়াউর রহমানের বেশ কিছু ভাস্কর্য শোভা পাচ্ছে। কিন্তু এসব সংগঠন, আলেম ও ওয়াজকারীদের কখনো জিয়াউর রহমানের ভাস্কর্য ইসলামবিরোধী বলে ফতোয়া দিতে শোনা যায়নি। কিন্তু যেই বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নির্মাণের বিষয়টি এলো তখনই ইস্যুটি নিয়ে ওয়াজ মাহফিলসহ সামাজিক গণমাধ্যমে মানুষের মধ্যে ধর্মীয় আবেগ ছড়িয়ে উত্তেজিত করার একটি উদ্যোগ পরিলক্ষিত হলো। তখনই রাজনীতি সচেতন মহল যে বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করতে শুরু করে, তা হলো বঙ্গবন্ধুর জন্মশত বছর এবং স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী উদযাপনের কর্মসূচিতে বাধাগ্রস্ত করার জন্য কোনো না কোনো রাজনৈতিক মহল এসব ধর্মীয় গোষ্ঠী ও ব্যক্তিকে ব্যবহার করতে যাচ্ছে বলে মনে হতে থাকে। সেই সময় বিএনপি এবং এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ কিছু ছোট ছোট রাজনৈতিক দল সরকারের বিরুদ্ধে করোনা সংক্রমণ দমাতে ব্যর্থতা, দুর্নীতি, আওয়ামী লীগদলীয় নেতাকর্মী, ধর্ষণ, সিলেট, কক্সবাজারসহ কয়েকটি জায়গায় সংঘটিত কিছু হত্যাকাণ্ড ও ধর্ষণের ঘটনার বিরুদ্ধে মানববন্ধন, প্রেস ক্লাবকেন্দ্রিক কিছু কর্মসূচি পালনের মাধ্যমে সরকারের বিরুদ্ধে ‘গণজোয়ার’ সৃষ্টির কথা জানানো হয় এবং ২০২০ সালের ডিসেম্বরের মধ্যেই সরকার উত্খাত হবে বলে দাবি করা হয়। সেই সময় বেশকিছু যুগপৎ কর্মসূচি বিএনপিসহ ছোট ছোট বাম ও বিএনপির ঘনিষ্ঠ সংগঠন প্রদান করতে থাকে।

সরকারের পক্ষ থেকে সব অপরাধী ও অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছিল। সে কারণে বিএনপিসহ ছোট ছোট দলগুলোর দাবির পক্ষে জনমত গঠিত হয়নি। তবে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছিল হেফাজতে ইসলামসহ ধর্মীয় নামধারী রাজনৈতিক ও সামাজিক কিছু শক্তিকে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ইস্যুতে মাঠে নামানো হয়েছে এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে বিএনপি-জামায়াতসহ ২০ দলের কয়েকটি সংগঠন, মাহমুদুর রহমান মান্নার নাগরিক ঐক্য, ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর সঙ্গে থাকা কিছু ব্যক্তি এবং বাম নামধারী কিছু কিছু সংগঠন সরকারের বিরুদ্ধে সংগঠিত হওয়ার ক্ষেত্র তৈরি করছিল। ২০২১ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীকে সামনে রেখে এসব সংগঠন নতুন ইস্যু হিসেবে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র  মোদির ঢাকায় ২৬ মার্চ তারিখে আগমনকে কেন্দ্র করে দ্বিতীয় ইস্যু নির্ধারণ করে। ভারতবিরোধী সেন্টিমেন্টে সস্তা কিছু কথা দিয়ে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য প্রথমে হেফাজতে ইসলামকে মাঠে নামানো হয়। মোদিবিরোধী উত্তেজনা ছড়াতে কওমি মাদরাসাগুলোকে ব্যবহার করার কৌশল গঠন করে। এ ক্ষেত্রে চট্টগ্রামের হাটহাজারী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ঢাকাসহ বেশ কিছু জায়গায় ২৬ মার্চ তারিখে তীব্র সাংঘর্ষিক কিছু ঘটনা সংঘটিত করা হয়। হাটহাজারীতে পুলিশ ফাঁড়ি, ভূমি অফিসসহ কয়েকটি স্থানে অগ্নিসংযোগ ও হামলা চালানো হয়। ঢাকায় ২৬ মার্চ হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে জামায়াত-শিবির, নুরুল হক নুরুর সমর্থকসহ আরো বেশ কিছু ব্যক্তি ও গোষ্ঠী সংঘর্ষে অংশগ্রহণ করে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়ও অনুরূপ ঘটনা ঘটে। সেদিন ঢাকায় নরেন্দ্র মোদির উপস্থিতিতে সুবর্ণ জয়ন্তীর  সমাপনী অনুষ্ঠান চলছিল। বোঝাই যাচ্ছিল ঢাকায় বড় ধরনের অঘটন ঘটানোর বেশ পরিকল্পনা নিয়েই হেফাজতে ইসলাম এবং অন্যান্য নামে-বেনামে সংগঠনের নেতাকর্মীদের রাস্তায় নামানো হয়েছিল। বেশ কিছু বাম ছাত্রসংগঠন, রাজনৈতিক দলও পৃথকভাবে মোদিবিরোধী মিছিল বের করেছিল। মোদির ঢাকায় আগমনকে হেফাজত, বিএনপি, জামায়াত, ভাসানী অনুসারী সংগঠন, বাম রাজনৈতিক দল যেসব সমালোচনায় প্রতিবাদ করছিল তা রাষ্ট্রাচারবিরোধী বললেও কম বলা হয়। কেননা নরেন্দ্র মোদি ভারতের সরকারপ্রধান। তাঁকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে সরকারপ্রধান হিসেবে, বিজিপি নেতা হিসেবে নয়। তিনি বিজিপিপ্রধানও নন। মুক্তিযুদ্ধে ভারতের ভূমিকা যারা অস্বীকার করবে তারা ১৯৭১ সালের পাকিস্তান সরকারের প্রচারণারই সঙ্গে একাত্ম হয়ে যায়। ভারত সরকারের উপস্থিতি ছাড়া দক্ষিণ এশিয়ার অন্য চার রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানের উপস্থিতি স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীকে তেমন গৌরবান্বিত করত না। বিরোধীপক্ষ সেটি মনে মনে কামনা করেছিল এবং হেফাজতসহ বিভিন্ন সংগঠনকে ২৬ মার্চ তারিখ রাস্তায় নামিয়ে একটি নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি তৈরি করতে চেয়েছিল।

বিএনপি কৌশলে ২৩ ও ২৪ তারিখে সংবাদ সম্মেলন করে করোনার প্রকোপ বৃদ্ধির প্রসঙ্গ তুলে সুবর্ণ জয়ন্তীর অনুষ্ঠান বাতিল করার দাবি জানায়। বিএনপি যখন এই দাবি জানায় তখন বাকি ছিলেন একমাত্র ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির উপস্থিতি। বিএনপি কৌশলে মোদির অনুষ্ঠান যাতে না ঘটে সেটি দাবি করছিল। একই সঙ্গে এ কথাও বলছিল যে করোনার প্রকোপ দেখে বিএনপি তার নিজস্ব দলীয় অনুষ্ঠান বন্ধ করে দিয়েছে। মূলত ১০ দিনের স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী ও বঙ্গবন্ধুর জন্মশত বছরের আয়োজন, যা প্যারেড গ্রাউন্ডে অত্যন্ত সীমিতসংখ্যক দর্শক-শ্রোতার ও বিদেশি অতিথির উপস্থিতিতে আয়োজন করছিল। তাতে পৃথিবীর প্রায় সব উন্নত রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের ভিডিও বার্তা এবং উপস্থিত পাঁচ প্রতিবেশী রাষ্ট্র ও সরকারের বক্তব্যে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের যে ভাবমূর্তি বিশ্বব্যাপী তৈরি হয়েছে, তাতে এ কথাই প্রমাণিত হয় যে বাংলাদেশ এখন একটি উন্নয়নশীল, আত্মমর্যাদাসম্পন্ন এবং বিশ্বের সব রাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্ব, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার জন্য প্রয়োজনীয় রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এই প্রশংসাসূচক বক্তব্যগুলো প্যারেড গ্রাউন্ডের আয়োজন থেকে মিডিয়ার কল্যাণে দেশবাসী জানতে ও শুনতে পেরেছে। সরকারবিরোধী মহলের এসব প্রশংসাসূচক বক্তব্য হয়তো গাত্রদাহের সৃষ্টি করছিল। তারা সব সময় দাবি করে থাকে আওয়ামী লীগ একটি দেশবিরোধী রাজনৈতিক দল, এমনকি বিএনপি আওয়ামী লীগকে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী দলও বলে দাবি করে থাকে। কিন্তু খুব ভালো করে পরিসংখ্যান নিলে যে তত্ত্বটি জানা যায়, তা হলো আওয়ামী লীগের মোট ২১ বছরের শাসনামলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের মোট ৭৩ শতাংশ অর্জিত হয়েছে। অন্যদিকে বাকি ২৯ বছরের অর্জন মাত্র ২৭ শতাংশ। আওয়ামী লীগের গত ১২ বছরের শাসনামলে দেশে যেসব মৌলিক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে তার ফলেই বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে মধ্যম আয়ের এবং উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হওয়ার চূড়ান্ত অনুমোদন লাভ করেছে।

আমাদের বিরোধী দলগুলো মুজিব শতবর্ষ, স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী, ভারতসহ অন্যান্য দেশের সরকারপ্রধানদের উপস্থিতি এবং বিশ্বনেতাদের বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা শুনতে মোটেও প্রস্তুত ছিল না। সে কারণেই তারা নানা কর্মসূচি আগে থেকেই প্রদান করছিল এবং স্বাধীনতার ৫০ বছর এবং বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে বিভিন্ন ধরনের বিকৃত উত্তেজনাকর বক্তব্য প্রদান করছিল।

২৬ মার্চ তারিখ পরিকল্পিতভাবে একটি সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি দেশে সৃষ্টি করতে চেয়েছিল। সামাজিক গণমাধ্যমে নানা ধরনের গুজব ও মিথ্যা রটনা প্রচার শুরু করা হয়েছিল। সরকার তাত্ক্ষণিকভাবে ফেসবুক শ্লথ করে রেখেছিল। ফলে বিভ্রান্তি ছড়ানোর কৌশল বিরোধীদের ততটা কাজে আসেনি। সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী ২৮ তারিখ একটি হরতাল আহ্বান করে। বিএনপি এই হরতাল সমর্থন করে না বলার পরও যৌক্তিকতা এবং নৈতিক সমর্থন প্রদান করে। বিএনপির বক্তব্যে যেসব স্ববিরোধিতা স্পষ্ট হয়েছিল, সেটি বাস্তবে হরতাল সমর্থনেরই প্রমাণ পাওয়া যায়। ২৮ তারিখ চট্টগ্রাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ঢাকাসহ আরো কয়েকটি জায়গায় হেফাজতের হরতালে জোরজবরদস্তির ঘটনা ঘটে। সেখানে হেফাজতের উপস্থিতির পাশাপাশি জামায়াত-শিবির এবং অপরিচিত তরুণদের অংশগ্রহণও দৃশ্যমান ছিল। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় যে তাণ্ডবলীলা সংঘটিত করা হয়েছিল তা নজিরবিহীন। ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ঢাকা এবং নোয়াখালীতে সাংবাদিকদের ওপর বড় ধরনের আঘাত নেমে এসেছিল। বিএনপি যদিও বলেছিল যে তারা করোনা প্রকোপের কারণে সব অনুষ্ঠান ও কর্মসূচি স্থগিত করেছে; কিন্তু ২৯ তারিখে তারা প্রেস ক্লাবে এক সমাবেশে পুলিশি নির্যাতনের প্রতিবাদ করেছে। কিন্তু ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চট্টগ্রামের হাটহাজারী এবং ঢাকার যাত্রাবাড়ীর ঘটনাবলির কোনো প্রতিবাদ করেনি। একইভাবে বাম রাজনৈতিক দলগুলোরও পুলিশি নির্যাতন, মানুষ হত্যা ইত্যাদি নিয়েই সোচ্চার হতে দেখা গেছে। কিন্তু ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ বিভিন্ন জায়গার তাণ্ডবের কোনো প্রতিবাদ করেনি।

সরকারের বিরুদ্ধে উল্লিখিত ছোট-বড় শক্তিগুলো কখনো ধর্মীয় ইস্যু, কখনো ভারত বিরোধিতার ইস্যু, আবার কখনো অন্যান্য ইস্যু নিয়ে দেশে অস্থিরতা তৈরি করতে সচেষ্ট থাকবে। সরকার কিভাবে জনগণকে আস্থায় নিয়ে এসব অস্থিরতা মোকাবেলা করবে—সেটি সরকারের নীতি ও কৌশলের বিষয়। কিন্তু দেশের উগ্র ডান-বাম স্বাধীনতাবিরোধী, সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী এবং হঠকারী শক্তিগুলো নয়া ও নয়া কৌশলে আগামী দিনগুলোতে রাজনীতিতে শুধু উত্তপ্তই নয়, সরকার হঠানোরও নানা রকম কৌশল অবলম্বন করবে—এটি সম্পূর্ণরূপে স্পষ্ট হয়ে গেছে।

লেখক : ইতিহাসের অধ্যাপক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা