kalerkantho

মঙ্গলবার । ৭ বৈশাখ ১৪২৮। ২০ এপ্রিল ২০২১। ৭ রমজান ১৪৪২

দিল্লির চিঠি

বাংলাদেশে মোদি বিরোধিতায় লাভ কার

জয়ন্ত ঘোষাল   

৫ এপ্রিল, ২০২১ ০৩:৫৬ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



বাংলাদেশে মোদি বিরোধিতায় লাভ কার

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সম্প্রতি বাংলাদেশ সফর করলেন। এই সফরে বেশ কিছু ঐতিহাসিক ক্ষণ জন্ম নিল। কিন্তু ভারত-বাংলাদেশ ইতিবাচক সম্পর্ক সমৃদ্ধ করার প্রয়াসের পাশাপাশি বেশ কিছু বেদনাদায়ক ঘটনারও সাক্ষী হলাম আমরা।

নরেন্দ্র মোদি যখন ঢাকায় গেলেন তখন দেখা গেল বেশ কিছু মৌলবাদী সংগঠন ‘গো ব্যাক মোদি’ স্লোগান তুলল। তারা নরেন্দ্র মোদির বিরুদ্ধে শুধু স্লোগান তোলা নয়, তাঁকে সাম্প্রদায়িকতার জনক আখ্যা দিয়ে বাংলাদেশ ছাড়ার হুমকি দিল। সুদূর অতীতের গোধরাকাণ্ড টেনে এনে অনেকে বললেন, নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে ভারতের মুসলমান সমাজ এই মুহূর্তে নিরাপত্তার অভাববোধে ভুগছে। সুতরাং সেই নরেন্দ্র মোদিকে বাংলাদেশ সরকার কেন এভাবে আতিথেয়তা দিচ্ছে। নরেন্দ্র মোদিকে শেখ হাসিনা আপ্যায়ন করেছেন। মর্যাদা দিয়েছেন। তাঁর বিরোধিতা করে শুধু ঢাকায় নয়, বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বা বিভিন্ন প্রান্তে বিক্ষোভ সংঘটিত করা হলো।

বেশ কিছু মৌলবাদী সংগঠন একইভাবে মোদির বিরোধিতা করেছে। এই তথাকথিত সংগঠনগুলোর মধ্যে আবার বাংলাদেশের মুসলমান সমাজে প্রতিপত্তি বাড়ানোর একটা প্রতিযোগিতা আছে। সেই প্রতিযোগিতার জন্য নরেন্দ্র মোদির বিরোধিতা করার প্রশ্নেও কে কত বেশি পারফরম করতে পারবে তার একটা প্রতিযোগিতাও আমরা ঢাকা শহরে দেখেছি। প্রশ্ন হচ্ছে, যেখানে শেখ হাসিনা দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়ে আওয়ামী লীগের প্রধান কাণ্ডারি হয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ককে আর্থিক ব্যাপারে এবং অন্যান্য সাংস্কৃতিক ব্যাপারে দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যেতে চাইছেন, বাংলাদেশ যখন ধর্মনিরপেক্ষতার পথে হাঁটছে, তখন এই ইতিবাচক প্রবণতার বিরোধিতায় এ রকমভাবে মৌলবাদী কার্যকলাপকে কারা মদদ দিচ্ছে? এর পেছনে কারা আছে? আমরা সাংবাদিক। আমাদের প্রধান কাজ ঘটনার পেছনে কী ঘটনা আছে সেটা জানার চেষ্টা করা। নেপথ্য কাহিনি অনুসন্ধান করতে গিয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যাচ্ছে, ভারতীয় গোয়েন্দারাও নিশ্চিত, এই কার্যকলাপের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা নিয়েছে পাকিস্তান। এই মুহূর্তে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান একদিকে ভারতের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার আহ্বান জানাচ্ছেন। পাকিস্তান নানাভাবে বার্তা দিচ্ছে যে ভারতের সঙ্গে এবার তারা বিষয়গুলো মিটিয়ে নিতে চায়। এমনকি কাশ্মীর নিয়েও একটা নরম মনোভাব পাকিস্তান দেখাচ্ছে। পাকিস্তানের সেনাপ্রধান মাওয়েজা বিবৃতি দিয়ে একটা ইতিবাচক সংকেত দিচ্ছেন। এমন সময়ে পাকিস্তান বাংলাদেশে এমন কেন করছে? তাহলে এটা কী পাকিস্তানের একটা দুমুখী রণকৌশল? দ্বিমুখী মনোভাব? পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র এবং ভারতের কূটনীতিক পণ্ডিতরা বলছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট বাইডেন আসার পর তাঁকে কতটা কাছে পাওয়া যায় তার জন্য পাকিস্তানের একটা প্রয়াস আছে। ট্রাম্প যেভাবে পাকিস্তান বিরোধিতা করেছে, তার জায়গায় বাইডেন আসার পর ভারতও যেমন চাইছে বাইডেনের সঙ্গে সখ্য গড়ে উঠুক, তেমনি পাকিস্তানও চাইছে। সুতরাং বাইডেনের পাশে কে থাকবে বেশি, তা নিয়ে কিন্তু পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যেও একটা প্রতিযোগিতা আছে। সেই প্রতিযোগিতার জন্য ভারতও কিন্তু পাকিস্তান সম্পর্কে আলাপ-আলোচনা বা একটু শান্তি প্রক্রিয়ার কথা ভাবছে। নরেন্দ্র মোদিও বিষয়টি কৌশলগতভাবে নিচ্ছেন। তার কারণ হলো আমেরিকা চায় ভারত-পাকিস্তান বিরোধ থামিয়ে দিয়ে আলোচনায় বসুক।

বাইডেনের পার্টি অর্থাৎ সেটা তো ওবামারই দল। তাঁর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ডেমোক্রেটিক পার্টির মতাদর্শ আমরা জানি। সুতরাং সেদিক থেকে বাইডেন পাকিস্তান সম্পর্কে ট্রাম্পের মতো ওই রকম কট্টর বিরোধিতা, এমনকি চীন সম্পর্কেও কট্টর বিরোধিতার পথে না গিয়ে কিঞ্চিৎ নরম মনোভাব নিয়েও চীনের সঙ্গে আর্থিক সংকট ও সমস্যাগুলো মেটাতে চায়। এর সুযোগটা পাকিস্তান নিতে চায়। কিন্তু এই শান্তি প্রক্রিয়ার পাশাপাশি ইমরান যেটা চান সেটা হলো, বাংলাদেশে পাকিস্তানি কার্যকলাপ বাড়িয়ে, বিশেষ করে যেকোনো ভোটের সময় যদি নরেন্দ্র মোদিকে দুর্বল করা যায়। তাঁকে যদি চাপের মধ্যে ফেলা যায়। বিজেপিবিরোধী অন্য রাজনৈতিক দলকে যদি একটু উসকে দেওয়া যায়, তাহলে দুর্বল মোদি পাকিস্তানের জন্য ভালো। অর্থাৎ একদিকে বাইডেনের কাছে ভালো হওয়া। শান্তি প্রক্রিয়ার পায়রা ওড়ানোর চেষ্টা। অন্যদিকে বাংলাদেশে মোদিকে দুর্বল করে দিয়ে মৌলবাদীদের সাহায্য নিয়ে দুর্বল মোদির সঙ্গে কথা বলার সম্ভাবনাটা বাড়ে। কেননা যেকোনো নেগোসিয়েশন বা দর-কষাকষির জন্য দুর্বল লোক বা দুর্বল ব্যক্তিত্ব কিন্তু অনেক বেশি সহজ। খুব শক্তিশালী লোকের সঙ্গে মধ্যস্থতা করা, রাজনৈতিক বোঝাপড়া করা কঠিন। কেননা দুর্বল হলে সে আলোচনামুখী হয়। দুর্বল না হলে ক্ষমতার এমন দম্ভ হয় যে সে আলোচনামুখী হয় না।

সুতরাং এদিক থেকেও বাংলাদেশকে আবার নতুন উদ্যমে কাজে লাগানোর একটা প্রয়াস পাকিস্তান করছে। আবার পাকিস্তান যেটা করছে সেটা অপারেশনাল। কিন্তু তার পেছনে যে মস্তিষ্কটা কাজ করছে, অনেকে মনে করছেন সেই মস্তিষ্কটা হলো চীন। তার কারণ চীন আজকে মিয়ানমারে নাক গলাতে পেরেছে। ঋণের সুযোগ পাইয়ে দিয়ে শ্রীলঙ্কাকে চাপের মধ্যে রেখেছে। এমনকি ভুটানে চীন কী করেছে তার তো সাক্ষী আমরা। আবার নেপালেও চীন তার ড্রাগনের নিঃশ্বাস এমন ফেলেছে যে সেখানেও আজকে টালমাটাল পরিস্থিতি, যা ভারতের জন্য শুভ ঘটনা নয়। সেই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি নেপালেও তৈরি হয়েছে। এ রকম একটা পরিস্থিতিতে ভারতের সবচেয়ে নিষ্ঠাবান বন্ধু হলো একমাত্র বাংলাদেশ। সেই বাংলাদেশকে যদি কোনোভাবে বিগড়ে দেওয়া যায়, মোদিকে যদি রাগান্বিত করা যায়, গোটা ভারতের মধ্যে যদি বাংলাদেশবিরোধী হাওয়া তৈরি করা যায়, তাহলে সেটা শুধু ইসলামিক জিহাদির লাভ নয়, সেটা কূটনৈতিক দিক থেকে চীন এবং পাকিস্তান অক্ষের লাভ। সুতরাং এই চীন এবং পাকিস্তান অক্ষের লাভটা যাতে না হয়, তার জন্য এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের প্রতি রুষ্ট না হয়ে এই ঘটনার জন্য নরেন্দ্র মোদি অনেক বেশি দায়ী করছেন ওই চীন-পাকিস্তান অক্ষকে। তার সঙ্গে যারা যুক্ত আছে সে ব্যাপারে কিন্তু ভারত এখন যথেষ্ট তৎপর। কেননা এ ঘটনাটা নতুন নয়। এর আগে প্রণব মুখোপাধ্যায়ের মতো বাংলাদেশের বন্ধু, কার্যত অভিভাবক প্রয়াত রাষ্ট্রপতি যখন গেছেন, তখনো এই চিহ্নিত সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী বিরোধিতা করেছে। যখন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং গেছেন তখনো এই ধরনের প্রতীকী কালো পতাকা তারা দেখিয়েছে।

সেই ধারাবাহিকতা কিন্তু বাংলাদেশে অক্ষুণ্ন। তফাত একটাই খালেদা জিয়ার সরকারের সময় এই সাম্প্রদায়িক শক্তিগুলো মদদ পেয়েছে। কেননা জামায়াত খালেদা সরকারের অঙ্গসংগঠন ছিল। আজ কিন্তু শেখ হাসিনা শত চাপের মধ্যে থেকেও নানা কৌশলে এই সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে তাঁর প্রভাব-প্রতিপত্তি এবং বিরোধিতা সব রকমের একটা মিশ্র রাজনীতি মুনশিয়ানার সঙ্গে করেন। কিন্তু কখনোই বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কটাকে তিনি পণবন্দি করেননি। সেটাই এখানে অন্ধকার সুড়ঙ্গের মধ্যে একমাত্র আশার আলো।

সে কারণেই আজকে প্রথম দুটি প্রতিবেশী রাষ্ট্রের মধ্যে যৌথভাবে সেতু নির্মাণ হলো। যৌথভাবে রেললাইনের যোগাযোগ তৈরি হচ্ছে। স্থলসীমান্ত চুক্তি হয়ে গেছে। এমনকি তিস্তা চুক্তি যাতে রূপায়ণ হয় তার চেষ্টায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বদ্ধপরিকর। এ রকম একটা পরিস্থিতিতে শুভেন্দু অধিকারীর মতো নেতা পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে পাকিস্তান এবং বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের আক্রমণ করতে গিয়ে কার্যত বাংলাদেশকেই আক্রমণ করে ফেলেন। তখন সেটা নরেন্দ্র মোদির কূটনৈতিক লাইনের সঙ্গে মেলে না। কিন্তু সেই সময় বিজেপি শীর্ষ নেতৃত্ব এটাকে শুভেন্দু অধিকারীর অত্যন্ত সাময়িক স্থানীয় ক্ষুদ্র রাজনীতির রাগের প্রকাশ বলে মনে করেন। কখনোই সেটা বৃহৎ প্রেক্ষাপটে ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোনো প্রভাব বিস্তার করে না। এই জটিল পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক আরো সচেতনভাবে, আরো দৃঢ়ভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব শুধু রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধানদের নয়। দুটি রাষ্ট্রেরই সাধারণ মানুষের অর্থাৎ আমাদেরও সমান দায়িত্ব।

লেখক : নয়াদিল্লিতে কালের কণ্ঠ’র বিশেষ প্রতিনিধি

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা