kalerkantho

বুধবার । ২৯ বৈশাখ ১৪২৮। ১২ মে ২০২১। ২৯ রমজান ১৪৪২

বঙ্গবন্ধু নৌকা জাদুঘর : দক্ষিণবঙ্গের ইকোট্যুরিজমের রেনেসাঁ

মোস্তাইন বিল্লাহ   

৩১ মার্চ, ২০২১ ০৪:১৯ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



বঙ্গবন্ধু নৌকা জাদুঘর : দক্ষিণবঙ্গের ইকোট্যুরিজমের রেনেসাঁ

সপ্তম শতকে চীনা পর্যটক হিউয়েন সাং বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখে বিমোহিত হয়ে বলেছিলেন, ‘A sleeping beauty emerging from mists and water.’ উপকূলীয় জেলা বরগুনার ক্ষেত্রে এই উক্তিটি যথার্থ বলা যায়। বাংলাদেশের দক্ষিণে সুন্দরবনের অদূরে অবস্থিত এই জেলার আয়তন ১৯১৯.২৭ বর্গকিলোমিটার। শতাধিক নদী-খালসহ জেলার বুক চিড়ে প্রবাহিত হয়েছে তিনটি বড় নদী পায়রা, বিশখালী ও বলেশ্বর। এই তিনটি নদীর সঙ্গে বঙ্গোপসাগরের সঙ্গমস্থলসহ জেলায় রয়েছে দীর্ঘ ৩৯ কিলোমিটার উপকূল ও একাধিক সমুদ্রসৈকত। দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন টেংরাগিরিসহ রয়েছে ২০ হাজার হেক্টর ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল, বিহঙ্গ দ্বীপ, আলোর দ্বীপসহ ছোট-বড় অনেক দ্বীপ।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে দেশের প্রথম আধুনিক ও স্বয়ংসম্পূর্ণ নৌকা জাদুঘর ‘বঙ্গবন্ধু নৌকা জাদুঘর’ নির্মাণ করেছে বরগুনা জেলা প্রশাসন। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়সংলগ্ন ০.৮ একর জায়গাজুড়ে ১৬৫ ফুট দীর্ঘ ও ৩০ ফুট প্রস্থের নৌকার আদলে নির্মিত এই জাদুঘরটি দূর থেকে দেখলে মনে হয় যেন একটি বড় নৌকা পানিতে ভেসে আছে। ৭৫ ফুট আকৃতির মূল ভবনের এই নৌকা জাদুঘরের প্রতিটি গলুইয়ের দৈর্ঘ্য ৪৫ ফুট। স্বয়ংসম্পূর্ণ এই জাদুঘরে রয়েছে দেশ-বিদেশের নানা আকৃতির শতাধিক নৌকার অনুকৃতি বা মিনিয়েচার, একটি নৌকা গবেষণা কেন্দ্র, আধুনিক লাইব্রেরি, বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধ কর্নার এবং শিশুদের বিনোদনের জন্য বিভিন্ন রাইডের ব্যবস্থা। এ ছাড়া সম্প্রতি ৯ডি থিয়েটার, স্যুভেনির বিক্রয় কেন্দ্র, ক্যাফে ইত্যাদি সংযোজন হচ্ছে। বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস তথা ১০ জানুয়ারি ২০২১ তারিখে দর্শনার্থীদের জন্য জাদুঘরটি উন্মুক্ত করা হয়। এই জাদুঘরের ওয়েবসাইটের (www.boatmuseumbarguna.com) মাধ্যমে পর্যটকরা বঙ্গবন্ধু নৌকা জাদুঘরটির বর্ণনা, দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে যাতায়াত ও জেলা প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগের উপায়সহ জাদুঘরটির বিভিন্ন ছবি ও ভিডিও উপভোগ করতে পারছে।

প্রাচীনকাল থেকে পৃথিবীর বৃহত্তম বদ্বীপ নদীমাতৃক বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান বাহন হিসেবে নৌকা ব্যবহৃত হচ্ছে। মহান মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযানে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যবহৃত নৌকা ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্মৃতি বহন করে। বরগুনা জেলার নামকরণের যে একাধিক জনশ্রুতি রয়েছে, তার প্রায় সবই নৌকার সঙ্গে সম্পৃক্ত। কালের বিবর্তনে নৌকা এখন খাল-নদী-সাগরে তেমন দেখা না গেলেও বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট ও রাজনীতিতে এবং আমাদের মহান মুক্তিসংগ্রামে নৌকা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। একসময় নৌকা শুধু যানবাহনই নয়, মালাপত্র এক স্থান থেকে অন্য স্থানে আনা-নেওয়া, সুন্দরবন থেকে কাঠ সংগ্রহ, নদী ও সাগরে মৎস্য শিকারসহ বহুল কাজে ব্যবহৃত হতো। নৌকা নিয়ে গবেষণা বা এর সংরক্ষণে এযাবৎকালে তেমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে সে শূন্যতা পূরণে বরগুনার বঙ্গবন্ধু নৌকা জাদুঘর কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে মনে করে জেলা প্রশাসন।

বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নানা ধরনের নৌকা রয়েছে। কালের পরিক্রমায় এসব নৌকা হারিয়ে যাচ্ছে। এই হারিয়ে যাওয়া নৌকার স্মৃতি ধরে রাখতে জাদুঘরে নৌকার মিনিয়েচার সংরক্ষণ করা হয়েছে। এ ছাড়া নৌকা জাদুঘরের মাধ্যমে বদ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০ বাস্তবায়নসহ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্মৃতিধারণ, বাংলাদেশের চিরায়ত লোকজ ঐতিহ্য সংরক্ষণ, তরুণ প্রজন্মের কাছে নৌকার অতীত ঐতিহ্য তুলে ধরা হয়েছে। সর্বোপরি জেলার পর্যটনশিল্প বিকাশের কার্যকর এক উদ্যোগের সফল বাস্তবায়ন করা হয়েছে এই বঙ্গবন্ধু নৌকা জাদুঘর প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে।

জাদুঘরে সংরক্ষিত একেকটি নৌকা শুধু একেকটি মিনিয়েচার নয়, বরং প্রতিটি নৌকা একেকটি অঞ্চলের অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও সময়কে বর্ণনা করছে। গোঘী নৌকার কথাই ধরা যাক, একজন সৌন্দর্যপিপাসু পর্যটক কিংবা অনুসন্ধিত্সু গবেষক যখন ভাটি নৌকা দেখবেন, তখন তাঁর চোখের সামনে ভাসবে ঊনবিংশ ও বিংশ শতকের সিলেট, সুনামগঞ্জ ও ময়মনসিংহের হাওরবেষ্টিত জনপদের কথা। ভাটি অঞ্চলের এসব নৌকার সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভাটিয়ালিগানের আবহ, যে গানের কথাগুলো মূলত মাঝি, নৌকা,  দাঁড়, গুণ ইত্যাদি ঘিরে রচিত হয়। গানের কথায় উঠে আসে হাওরবেষ্টিত জনপদের মানুষের জীবন, প্রেম, ভালোবাসা, বিরহ, ব্যাকুলতা ইত্যাদির এক বাস্তব সম্মিলন। বঙ্গবন্ধু নৌকা জাদুঘরে স্থান পাওয়া ১০০টি নৌকা এভাবেই একেকটি অঞ্চল ও সময়ের কিংবদন্তি বহন করে চলছে।

বিশ্বব্যাপী মহামারি করোনাভাইরাসের কারণে বৈশ্বিক পর্যটনশিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এরই মধ্যে বিভিন্ন দেশের পর্যটনশিল্প এই ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। বাংলাদেশের পর্যটনশিল্পকেও করোনাভাইরাস সংক্রমণের কারণে সৃষ্ট ক্ষতি পুনরুদ্ধারে বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কাজ করতে হবে। কিন্তু বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে যেকোনো শিল্পের জন্য জলবায়ু পরিবর্তনের কথা বিবেচনায় নিতে হয়। কেননা উপকূলীয় অঞ্চল জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক অভিঘাতের সম্মুখীন হতে যাচ্ছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পেলে বহু মানুষকে তাদের বর্তমান আবাস ও কৃষিনির্ভর জীবিকা বদল করতে হবে। তাই জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবেলায় জেলার পর্যটনশিল্পের বিকাশ উত্তম বিকল্প ভাবা যেতে পারে। বরগুনা জেলায় বিদ্যমান পর্যটনকেন্দ্রগুলো; যেমন—মোহনা পর্যটনকেন্দ্র, ছয় কিলোমিটার দীর্ঘ শুভসন্ধ্যা সমুদ্রসৈকত, দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ টেংরাগিরি ও হরিণঘাটা, নৃতাত্ত্বিক রাখাইনদের শিল্পকে বিকাশের পাশাপাশি দেশের সর্বোচ্চ ওয়াচ টাওয়ার বরগুনা জেলায় নির্মাণ করা যেতে পারে, যার নাম হবে বঙ্গবন্ধু ওয়াচ টাওয়ার। ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের মতো ঝুঁকিপূর্ণ সময়ে সমুদ্রে মাছ আহরণকারী ট্রলারগুলো বঙ্গবন্ধু লাইট হাউসকে লক্ষ্য করে যথাসময়ে নিরাপদ অবস্থানে ফিরে আসতে পারবে। বঙ্গবন্ধু নৌকা জাদুঘরকে কেন্দ্র করে সারা দেশে নবোদ্যম তৈরি হয়েছে। জাদুঘরকে উপজীব্য করে উদ্যমী যুবকরা বরগুনার আশপাশে গড়ে তুলছে ছোট ছোট পর্যটনকেন্দ্র। আশপাশের জেলা থেকে পর্যটকসমাগম ক্রমেই বেড়ে চলেছে। ভৌগোলিকভাবে বরগুনা জেলাটি ঠিক কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকত ও সুন্দরবনের মাঝখানে অবস্থিত। এটি অনেকাংশেই নিশ্চিত যে পদ্মা সেতু নির্মাণ সম্পন্ন হলে রাজধানী ঢাকা থেকে বরগুনায় পৌঁছতে সময় লাগবে মাত্র পাঁচ-ছয় ঘণ্টা। তখন এই অঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থার একটি আমূল পরিবর্তন ঘটবে। ফলে একজন দেশি কিংবা বিদেশি পর্যটককে শুধু কুয়াকাটা অথবা সুন্দরবন দেখেই ফিরে যেতে হবে না, বরং একই সঙ্গে অতি অল্প সময় ও খরচে প্রকৃতির কাছাকাছি সৈকত, সংস্কৃতি, সুন্দরবন, সমুদ্র ও দ্বীপমালার অপার্থিব সৌন্দর্যের রস আস্বাদন করতে পারবে। টেলিফোন ও সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে দর্শনার্থীরা বঙ্গবন্ধু নৌকা জাদুঘর সম্পর্কে জানতে চাচ্ছে, ঘুরতে আসছে এবং প্রশংসা করছে। জাদুঘরের পরিদর্শন বইটি দেখলেই বিষয়টি স্পষ্টতর হয়ে ওঠে। বলা যায়, বঙ্গবন্ধু নৌকা জাদুঘরকে কেন্দ্র করে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পর্যটন খাত বহুদূর এগিয়ে যাবে। বঙ্গবন্ধু নৌকা জাদুঘর দক্ষিণাঞ্চলের পর্যটন হাব হিসেবে কাজ করবে। কেননা একজন পর্যটক খুব সহজেই বঙ্গবন্ধু নৌকা জাদুঘর দেখার পাশাপাশি জাদুঘরসংলগ্ন ডিসিঘাট থেকে সহজেই বিহঙ্গ দ্বীপ, রাখাইনপল্লী, বঙ্গবন্ধু আইল্যান্ড পর্যন্ত ভ্রমণ করতে পারবে। এখান থেকেই পর্যটকরা সহজেই সুন্দরবন, শুভসন্ধ্যা এবং কুয়াকাটা সি-বিচে ভ্রমণ করতে পারবে, পারবে অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে, এমনকি  আমাদের এই বঙ্গবন্ধু নৌকা জাদুঘর সংলগ্ন ডিসিঘাট থেকে সহজেই একদিকে যেমন দ্বীপ জেলা ভোলা ভ্রমণ করা সম্ভব, তেমনি অন্যদিকে সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাটের সুন্দরবনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করা যাবে। আমাদের এই বঙ্গবন্ধু নৌকা জাদুঘর দ্রুত দক্ষিণাঞ্চলের পর্যটন হাব হিসেবে কাজ করবে, তা সহজেই অনুমেয়। এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের সার্বিক উন্নয়ন পরিকল্পনাগুলোর পাশাপাশি পর্যটন মহাপরিকল্পনায় দেশের দক্ষিণাঞ্চলের ইকোট্যুরিজমকে সমন্বয়ের মাধ্যমে রূপকল্প ২০৪১ বাস্তবায়ন সম্ভব।

লেখক : বর্তমান জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, নারায়ণগঞ্জ এবং
সাবেক জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, বরগুনা
[email protected]



সাতদিনের সেরা