kalerkantho

শনিবার । ২৫ বৈশাখ ১৪২৮। ৮ মে ২০২১। ২৫ রমজান ১৪৪২

হেফাজতের হরতালে তাণ্ডবকারী কারা

এস এম আজাদ ও বিশ্বজিৎ পাল বাবু   

৩১ মার্চ, ২০২১ ০২:৫৫ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



হেফাজতের হরতালে তাণ্ডবকারী কারা

ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ বিভিন্ন স্থানে সহিংসতার ঘটনায় গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত ১৯টি মামলা হয়েছে। পাঁচ জেলায় হওয়া এসব মামলায় কয়েক হাজার অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। কিন্তু পুলিশ এখন পর্যন্ত হামলাকারীদের শনাক্ত করতে পারেনি। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফর ঘিরে হেফাজতে ইসলামসহ কয়েকটি সংগঠনের ডাকে দেশের অন্য কয়েকটি স্থানে বিক্ষোভ চলাকালে সহিংসতা হলেও হাটহাজারী ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ব্যাপক তাণ্ডব চালান হেফাজতের কর্মীরা। কিন্তু আসামিদের মধ্যে হেফাজতের কোনো নির্দেশদাতার নাম নেই।

পুলিশ সন্দেহ করছে, নাশকতার পেছনে সন্ত্রাসীগোষ্ঠী জড়িত। হেফাজতে ইসলামের নামে হরতাল-কর্মসূচি হলেও প্যান্ট-শার্ট, টি-শার্ট পরা অনেক হামলাকারীকে এসব স্থানে অংশ নিতে দেখা গেছে। কয়েকটি স্থানে ঢাল হিসেবে মাদরাসার শিশু শিক্ষার্থীদের সামনে রাখা হয়।

তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ধারণা, একটি ‘সন্ত্রাসী অপশক্তি’ সহিংস অবস্থা তৈরি করতে তাণ্ডব চালিয়েছে। এসব নাশকতায় অন্তত ১৩ জন নিহত হয়েছে। সাংবাদিক, পুলিশসহ পাঁচ শতাধিক আহত এবং শত শত কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।

স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী এবং জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ উদযাপন উপলক্ষে গত ২৬ মার্চ দুই দিনের সফরে আসেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।

ওই দিনই চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে হেফাজতের সহিংসতায় চারজন এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় একজন নিহত হয়। ঢাকায়ও সহিংসতার ঘটনা ঘটে। পরদিন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বিক্ষোভের সময় আরো পাঁচজন নিহত হয়। এর পরদিন গত রবিবার হরতাল কর্মসূচি পালনের সময় ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ব্যাপক তাণ্ডব চলে। এতে তিনজন প্রাণ হারায়। জেলা পরিষদ কার্যালয়, পৌরসভা কার্যালয়, ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ সংগীতাঙ্গন, প্রেস ক্লাব, মন্দির, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের বাড়িতে হামলা ও আগুন দেওয়া হয়। এর আগে রেলস্টেশনে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। নারায়ণগঞ্জে সাতজন গুলিবিদ্ধসহ অন্তত ২০ জন আহত হয়। এ ছাড়া ঢাকার মতিঝিল-পল্টন, সিলেট, হবিগঞ্জের আজমেরীগঞ্জে, কিশোরগঞ্জ ও মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখানে সহিংসতার ঘটনা ঘটে।

পুলিশ জানিয়েছে, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় তাণ্ডবের ঘটনা তদন্তে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর থানায় পাঁচটি ও আশুগঞ্জ থানায় দুটি মামলা হয়েছে। প্রতিটি মামলাতেই অজ্ঞাতনামা অন্তত আট হাজার জনকে আসামি করা হয়েছে। তবে ৯ জন নিহত হওয়ার ঘটনায় কোনো মামলা হয়নি। ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলওয়ে স্টেশন ও সোনার বাংলা ট্রেনে হামলার ঘটনায়ও গতকাল বিকেল নাগাদ মামলা হয়নি।

এসব ঘটনায় স্থানীয় সংসদ সদস্য, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পুলিশের বিরুদ্ধে নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ এনেছেন। পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘পুলিশ সাধ্য অনুযায়ী চেষ্টা করেছে।’  

গতকাল ছেলে বউকে নিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরে তাণ্ডবের চিত্র দেখতে বেরিয়েছিলেন রেহেনা বেগম। ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ পৌর মিলনায়তন ও শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ভাষা চত্বরে দাঁড়িয়ে কথা হচ্ছিল শহরের মেড্ডার ওই নারীর সঙ্গে। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সবই তো শেষ। আর বাকি রইল কী। মানুষ এত খারাপ হতে পারে, ভাবা যায় না।’

হরতালের দিন জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শাহাদৎ হোসেন শুভনের বাসভবনের একটি ঘরে আগুন দিলে সেখানে থাকা কোরআন শরিফ পুড়ে যায় বলে নিশ্চিত করেছেন ওই নেতা। 

শ্রীশ্রী আনন্দময়ী কালীবাড়িতে হামলা হয় তিন দফা। পূজারি জীবন ভট্টাচার্য জানান, প্রথম দফায় হরতাল সমর্থনকারীরা এসে হামলা চালায়। তাদের একজনের হাতে থাকা বালতিতে পাউডারজাতীয় কিছু ছিল।

গতকাল প্রেস ক্লাবের কর্মসূচি থেকে কার্যালয় ও সাংবাদিকদের ওপর হামলার নিন্দা জানিয়ে হেফাজতে ইসলামের সংবাদ বর্জনের ঘোষণা দেওয়া হয়। পাশাপাশি জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও পুলিশ সুপারের (এসপি) প্রত্যাহার দাবি করা হয়।

চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে সংঘর্ষের ঘটনায় এখনো মামলা হয়নি। জেলা পুলিশ সুপার এস এম রশীদুল হক জানান, আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন।

ঢাকায় তিন দিনে নাশকতার ঘটনায় তিনটি মামলায় কয়েক হাজার অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। গত ২৫ মার্চ মতিঝিল থানায় ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের নেতাকর্মীদের আসামি করা হলেও সেখানে নাম নেই কারো। শুক্রবারের সংঘর্ষের ঘটনায় যাত্রাবাড়ী থানায় একটি মামলায় তিন-চার হাজার অচেনা ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। হরতালের দিন সংঘর্ষে পল্টন থানায় পাঁচ-ছয় হাজার অচেনা ব্যক্তিকে আসামি করে মামলা হয়েছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের যুগ্ম কমিশনার (ডিবি) মাহবুব আলম বলেন, ‘হেফাজতে ইসলামের ঘাড়ে বন্দুক রেখে অন্য সন্ত্রাসীগোষ্ঠী বা অপশক্তি এই তাণ্ডবে শামিল হয়েছে বলে আমরা অনুমান করছি। কিছু কিছু ক্ষেত্রে আমরা প্রমাণও পাচ্ছি।’ তিনি জানান, সিসি ক্যামেরা ফুটেজ, ভিডিও ফুটেজ, বিভিন্ন টেলিভিশনের ফুটেজ ও ছবি দেখে হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে কারা জড়িত ছিল তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

আমাদের সিদ্ধিরগঞ্জ (নারায়ণগঞ্জ) প্রতিনিধি জানান, সিদ্ধিরগঞ্জের সাইনবোর্ড মোড় থেকে শিমরাইল এলাকা পর্যন্ত ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে সহিংসতার ঘটনায় সাতটি মামলা হয়েছে। প্রত্যেক মামলায় ২০-২৫ জনের নাম উল্লেখসহ চার-পাঁচ শ জনকে আসামি করা হয়েছে বলে জানান সিদ্ধিরগঞ্জ থানার ওসি মশিউর রহমান। এ ছাড়া রূপগঞ্জ থানায় ছাত্রদলের চার নেতার নাম উল্লেখ করে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। সোনারগাঁ সার্কেলের এএসপি মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ওই নাশকতার ঘটনায় ছাত্রদল জড়িত বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে।

সিলেট অফিস জানায়,  হরতালের দিন সংঘর্ষের ঘটনায় সন্দেহভাজন ১৬ হেফাজতকর্মীর নাম উল্লেখ এবং অজ্ঞাতনামা ১৫০-২০০ জনকে আসামি করে মামলা হয়েছে।

হবিগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, আজমিরীগঞ্জে দায়ে করা মামলায় সন্দেহভাজনক ২৬ হেফাজতকর্মীর নাম রয়েছে। এ ছাড়া আরো চার শতাধিক অচেনা ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে।

এদিকে হরতালের সময় সিরাজদিখানে পুলিশের ওপর হামলায় মামলা প্রক্রিয়াধীন বলে জানান সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার রাজিবুল ইসলাম।



সাতদিনের সেরা