kalerkantho

রবিবার । ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮। ১৩ জুন ২০২১। ১ জিলকদ ১৪৪২

দিল্লির চিঠি

পারস্পরিক সম্পর্কে নতুন পথের দিশা

জয়ন্ত ঘোষাল   

২৯ মার্চ, ২০২১ ০৩:৪২ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



পারস্পরিক সম্পর্কে নতুন পথের দিশা

দেখতে দেখতে সাংবাদিকজীবনের ৩৫ বছর কেটে গেছে। এখন বাণপ্রস্থের মালভূমিতে এসে দাঁড়িয়ে আছি। আজকাল মনে হয় যে একটা দেশের সঙ্গে আরেকটা দেশের রাজনীতিতে কূটনৈতিক এবং দুটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের সম্পর্কের নানা রকমের ব্যঞ্জনা যা-ই থাকুক না কেন, আসলে কোথাও একটা রাজনৈতিক সাযুজ্য থেকেই যায়। আবার দেশের ভেতরেও একটা রাজ্যের সঙ্গে আরেকটা রাজ্যের যতই ভেদাভেদ থাকুক না কেন, সে রাজ্যগুলোর রাজনীতির মধ্যেও কোথাও একটা সংযোগসূত্র থাকে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যখন বাংলাদেশের সাতক্ষীরায় গিয়ে যশোরেশ্বরী কালীমন্দিরে পুজো দিলেন, দেখছিলাম, তিনি নিষ্ঠাভরে পাঁচবার মা কালীর চরণে প্রণিপাত হয়ে আশীর্বাদ ভিক্ষা করছেন। পূজারিরা মন্ত্র উচ্চারণ করছেন। তারপর তিনি মন্দির প্রদক্ষিণ করলেন। খোদ বাংলাদেশে এমন একটা ঘটনা নিঃসন্দেহে ঐতিহাসিক। আবার বাংলাদেশেই তিনি যাচ্ছেন মতুয়া সম্প্রদায়ের প্রবর্তকের প্রতিষ্ঠিত মন্দির এবং জন্মস্থানে। নানা রকমের বাধা-নিষেধ ছিল। পরিকাঠামোগত নিরাপত্তাজনিত সমস্যা ছিল। সেসব সমস্যা মিটিয়ে বাংলাদেশ সরকারের সহায়তায় তিনি সেখানে পৌঁছেছেন। বাংলাদেশে যখন এ ঘটনা ঘটছে, ঠিক সেই সময় পশ্চিমবঙ্গের ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচন শুরু হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গ উত্তেজনায় টগবগ করে ফুটছে। ভোটের প্রথম দিনেই নানা রকমের রাজনৈতিক হিংসার ঘটনা চোখে পড়ছে।

অন্যদিকে আরেকটি রাজ্য আসাম। সেখানে ভবঘুরে সাংবাদিকের মতো আমি দেখছি কিভাবে মানুষ তেজপুর থেকে গুয়াহাটি ভোট দিচ্ছেন। ভোটের প্রথম দিনে আমি নিজে ছিলাম আসামে। ভারতের প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফর মুজিববর্ষে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের অর্ধশতবর্ষ পালনের অনুষ্ঠান টিভির পর্দায় দেখছি। অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গে মতুয়া সম্প্রদায় সবচেয়ে বেশি যেখানে থাকে, সেই বনগাঁ সীমান্তে, সেটা বাংলাদেশেরই সীমান্ত, সেই সীমান্তে মানুষ নির্বাচন নিয়ে সরব-সোচ্চার। বিজেপির সংসদ সদস্য মতুয়াদের সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি শান্তনু ঠাকুর প্রধানমন্ত্রীর এই সফরকে ঐতিহাসিক আখ্যা দিয়েছেন।

অতএব আসাম, পশ্চিমবঙ্গ, ভারতের দুটি পৃথক রাজ্য আর সার্বভৌম রাষ্ট্র বাংলাদেশ এই তিনটা প্রান্তকে নানা রাজনীতির সুতায় নিবিড়ভাবে বেঁধেছে।

আরো চিত্তাকর্ষক ঘটনা হলো নাগরিকত্ব বিল। এই নাগরিকত্ব বিল বিজেপির একটা মস্তবড় কর্মসূচি। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বারবার ঘোষণা করেছেন যে সংসদে তাঁরা যখন এই বিলটি এনেছেন, তখন এটি বাস্তবায়িত করতেও তাঁরা বদ্ধপরিকর। পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির একটা মস্তবড় নির্বাচনী প্রচারের হাতিয়ার হতে পারত নাগরিকত্ব বিল। নির্বাচনী ইশতেহারেও সেটা আছে। নির্বাচনী ইশতেহারে একেবারে শুরুতেই বলা হয়েছে যে বিজেপি যদি পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসে, তাহলে ক্যাবিনেটের প্রথম সিদ্ধান্ত হবে নাগরিকত্ব বিলকে বাস্তবায়িত করা। এই নাগরিকত্ব বিলকে বাস্তবায়িত করার মাধ্যমে বাংলাদেশি মুসলিম সম্প্রদায়ের অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করে, তাদের ফেরত পাঠানো। এটা একটা বিজেপির ঘোষিত কর্মসূচি। আর যারা হিন্দু শরণার্থী তাদের অনুপ্রবেশকারী না বলে তাদের এখানে থাকার বন্দোবস্ত করা বা আশ্রয় দেওয়ার ব্যবস্থা হবে। তবে সেটা কোন সাল থেকে শুরু হবে, কিভাবে শুরু হবে, তা নিয়ে কিছু বিতর্ক আছে। কিন্তু বিজেপি সেসব বিতর্কের নিরসন ঘটাতে চায়। মতুয়া সম্প্রদায়েরও একটা দাবি ছিল নাগরিকত্ব বিলটাকে বাস্তবায়িত করা।

নির্বাচনী ইশতেহারে বলা হলেও নাগরিকত্ব আইন আসামে এবং পশ্চিমবঙ্গে দুই জায়গায় দুই রকম পরিস্থিতি। আমি আসামে এসে বিভিন্ন বাজারে দোকানে দেখতে পাচ্ছি, এখানে নাগরিকত্ব আইনের প্রতিবাদে অনেক পোস্টার, অনেক ব্যানার, অনেক লেখালেখি আছে। নাগরিকত্ব আইন কার্যকর হলে এখানে শুধু সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায় নয়, এখানে যারা হিন্দু সম্প্রদায় তাদের কে থাকতে পারবে, কে থাকতে পারবে না, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে।

কেননা আসামের যে জনসমাজ, সেটাও কিন্তু মিশ্র জনসমাজ। এখানে অহমিয়া মানুষ কারা? সেই আইডেনটিটির প্রশ্নটা থেকেই গেছে। এখানে অহমিয়া মানুষদের জনসমাজে বাঙালি শুধু নয়, আদিবাসী সমাজ একটা বড় জনসমাজ। চা বাগানগুলোতে মূলত মুখ্যচরিত্র আদিবাসীরা। এ ছাড়া এখানে নেপালের মানুষও অনেক আছে। তারা অনেক আগে থেকে এখানে এসে থেকে গেছে। তারা একটা প্রজন্ম বা দুটি প্রজন্ম ধরে আছে এমন নয়, এ রকমও আছে বেশ কয়েক প্রজন্ম ধরে এখানে আছে। এখানে অনেক নেপালি মানুষ আছে, যারা নেপালে কখনো যায়নি। সুতরাং তারা নিজেদের অহমিয়া সম্প্রদায়েরই অন্তর্ভুক্ত বলে মনে করে। মাড়োয়ারি সমাজেও কিন্তু অনেক আগে থেকে এখানে আগরওয়াল সমাজের একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে।

এখন সেই কারণে কারা এখানকার নাগরিক, কারা ভারতীয় নাগরিক, কারা বাংলাদেশের নাগরিক সেটা নিয়েও, বিশেষ করে সীমান্তবর্তী জায়গাগুলোতে সমস্যা রয়েছে। বাংলাদেশের প্রতিক্রিয়া এবং আসামের মানুষের প্রতিক্রিয়া অনেক সময় এক হয়ে গিয়ে নাগরিকত্ব বিলের বিরোধিতা করেছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক এগিয়ে নিয়ে যেতে চাইছেন। সেটা ঘটনাচক্রে মুজিববর্ষ। তার সঙ্গে একাত্তরের স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তি উদযাপন। সুতরাং সেটার তো একটা প্রতীকী তাৎপর্য আছে।

কিন্তু এই মুহূর্তে চীন এবং পাকিস্তান যখন ভারতের ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছে, তখন বাংলাদেশের জিও-স্ট্র্যাটেজিক পজিশন খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভারতের কাছে। নরেন্দ্র মোদি অত্যন্ত যথার্থভাবে বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক কূটনৈতিক স্তরে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। আমি তো বরং বারবার, সব সময় মনে করি যে কংগ্রেস-আওয়ামী লীগ একটা সম্পর্ক তৈরি করার জন্য বেশি বদ্ধপরিকর ছিল। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে আওয়ামী লীগ এবং কংগ্রেসের সম্পর্কটাকে একত্রে গাঁথতে চেয়েছিল। নরেন্দ্র মোদি এই সম্পর্কটাকে আরো অনেক বেশি বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক হিসেবে দেখতে চাইছেন। এটা ঠিক বিজেপি-আওয়ামী লীগ বা কংগ্রেস-আওয়ামী লীগের বিষয় নয়, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কটাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য এখানে বাণিজ্য সম্পর্ক দরকার। স্থলসীমান্ত চুক্তি হয়েছে। সম্প্রতি একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সেতুর মাধ্যমে ভারতের ত্রিপুরা থেকে বাংলাদেশের সঙ্গে এই দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন হয়েছে। এই দুটি দেশের মধ্যে নির্মাণ, এটাও তো একটা বিরল ঘটনা। সুতরাং আমদানি-রপ্তানিও কিন্তু বাড়ছে। দুটি দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক, সড়ক পরিবহনের কথা হচ্ছে। এইভাবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই অঞ্চলটাই একজন আরেকজনের হাতে হাত মিলিয়ে অগ্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। সেখানে দুই দেশের মধ্যেই বাধা আছে। যেমন নাগরিকত্ব বিলে বিজেপির অভ্যন্তরীণ রাজনীতি প্রভাব ফেলছে বাংলাদেশের কাছে, শুধু আসামে নয়। আবার অন্যদিক থেকে বাংলাদেশের ভেতরেও কিন্তু বিরোধী গোষ্ঠী নরেন্দ্র মোদিকে ‘গো ব্যাক’ স্লোগান দিয়েছে। তারা পোস্টার লাগিয়েছে। কয়েকটা জায়গায় বিক্ষিপ্ত ঘটনা সম্প্রতি মোদির সফরকালে হয়েছে। হতে পারে সেটা বিচ্ছিন্ন বা ছোট ঘটনা, কিন্তু এই দুই দেশেই একটা বিরোধী শক্তি সক্রিয়। সেখানে আরো শক্ত হাতে নরেন্দ্র মোদি বিষয়টাকে আরো এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। পশ্চিমবঙ্গের ভোটের সময় এই বাংলাদেশ সফরে গিয়ে মতুয়া ধর্মস্থানে যাওয়া নিয়েও অনেক আলোচনা হয়েছে। বলা হয়েছে যে এটা তিনি পশ্চিমবঙ্গের ভোটের দিকে তাকিয়ে করেছেন। এমনকি কালীপূজাটাও পশ্চিমবঙ্গের ভোটের দিনে করার একটা তাৎপর্য আছে। সেখানে এ ধরনের অনুষ্ঠানগুলো হওয়ায় বাংলাদেশ সরকারের কাছেও ভারত সরকারের কৃতজ্ঞতা অপরিসীম। বাংলাদেশে হিন্দুরা সংখ্যালঘু। সেখানেও মৌলবাদী শক্তি দ্বারা সংখ্যালঘুদের ওপর মাঝেমধ্যে আক্রমণ হয়। শেখ হাসিনা বাংলাদেশে ঢাকার রামকৃষ্ণ মিশন, চট্টগ্রামে রামকৃষ্ণ মিশন, ইসকন এবং অন্যান্য হিন্দু সংগঠনকে যেভাবে মর্যাদা দিচ্ছেন, যেভাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নরেন্দ্র মোদিকে তাঁর সফরসূচি চূড়ান্ত করতে সাহায্য করেছেন, তাতে বাংলাদেশ ও ভারতের মৈত্রীর পথ আরো সুগম, আরো সুপ্রশস্ত হবে বলে আশা করা যাচ্ছে।

সুতরাং দুটি রাজ্য আর একটি দেশ, ভারতের দুটি রাজ্য এবং বাংলাদেশ নামক একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র—এ এক ঐতিহাসিক এবং অত্যাশ্চর্য একটি ত্রিভুজ। আজকে সাংবাদিক হিসেবে মনে হচ্ছে যে আমাদের পারস্পরিক সহযোগিতা এবং পারস্পরিক সম্পর্ক একটা সুদৃঢ় এবং এক নতুন পথের দিশারি হয়ে উঠেছে।

লেখক : নয়াদিল্লিতে কালের কণ্ঠ’র বিশেষ প্রতিনিধি



সাতদিনের সেরা