kalerkantho

বুধবার । ৮ বৈশাখ ১৪২৮। ২১ এপ্রিল ২০২১। ৮ রমজান ১৪৪২

দ্রুত ছড়ানোয় দুশ্চিন্তা, আশা দেখাচ্ছে টিকা

তৌফিক মারুফ   

২০ মার্চ, ২০২১ ০২:২৭ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



দ্রুত ছড়ানোয় দুশ্চিন্তা, আশা দেখাচ্ছে টিকা

মাত্র ছয় সপ্তাহ আগেও যুক্তরাজ্যে করোনা সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউয়ে দিনে মারা গেছে দেড় হাজারের বেশি মানুষ, আক্রান্ত হয়েছে কয়েক হাজার। এক সপ্তাহ ধরে মৃত্যু নেমে এসেছে ৬০-১০০ জনের মধ্যে। ইউরোপের অন্যান্য দেশে করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউ ওপরে উঠে গিয়ে আবার নামতে শুরু করেছে। এ ক্ষেত্রে ওই সব দেশের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রথম ঢেউ ধীরে ধীরে উঠে আবার ধীরে ধীরে নেমেছিল, কিন্তু দ্বিতীয় ঢেউ দ্রুত উঠে আবার দ্রুত নিচে নামছে। দ্বিতীয় ঢেউ দ্রুত নিচে নামার কারণ হিসেবে প্রধানত টিকার ইতিবাচক প্রভাব বলেই মনে করা হচ্ছে।

এ ছাড়া যুক্তরাজ্যসহ কয়েকটি দেশে আবার লকডাউন, কোনো কোনো দেশ সরাসরি লকডাউনে না গেলেও কঠোর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বলবৎ রেখেছে। যার ফলে মৃত্যুর সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে থাকা মানুষের মৃত্যু কমেছে।

দেশে দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবেলায় সরকার ইউরোপীয় দেশগুলো বিশেষ করে যুক্তরাজ্যের সাফল্যের আলোকে টিকাদান কার্যক্রম জোরালোভাবে চালিয়ে যাওয়ার কৌশল নিয়েছে। তবে সবচেয়ে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে মানুষের স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ওপর। এ লক্ষ্যে সমন্বিতভাবে কঠোর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কার্যকরের চেষ্টা চলছে।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী জাহিদ মালেক গত রাতে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দেশে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ সৃষ্টির জন্য আমার জায়গা থেকে আমি হতাশা ও আক্ষেপ প্রকাশ করে বলতে চাই, সাধারণ মানুষকে বারবার সতর্ক করা সত্ত্বেও সম্প্রতি এক শ্রেণির মানুষ কোনো ধরনের সতর্কতাই পালন করেনি। বরং অনেকে টিকা নিয়েই নিজেদের করোনাজয়ী ভেবে বেপরোয়াভাবে ঘুরে বেড়িয়েছেন। এতে নিজে যেমন সংক্রমিত হয়েছেন, অন্যদেরও করেছেন।’

মন্ত্রী বলেন, ‘যা-ই হোক, এখন আমরা দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবেলায় প্রথমত মানুষকে সতর্ক করছি এবং একই সঙ্গে টিকাদান কার্যক্রম জোরালোভাবে চালিয়ে যাওয়ার কৌশল নিয়েছি। তবে সবাইকে মনে রাখতে হবে, টিকা দেওয়ার ইতিবাচক প্রভাব হিসেবে মৃত্যুঝুঁকি কমবে, কিন্তু আর করোনা হবে না, এমনটি নয়।’ তিনি আরো বলেন, ‘সেই সঙ্গে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি অন্য সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়কে দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে সমন্বিতভাবে কঠোর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কার্যকরের চেষ্টা করছি।’

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশের পরিস্থিতির সঙ্গে ওই সব দেশের তুলনামূলক চিত্রে দেখা যায়, বাংলাদেশে করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে এখনো যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের কিছু দেশ, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের চেয়ে সংক্রমণ ও মৃত্যু অনেক কম। এমনকি দেশে কয়েক দিন ধরে দ্বিতীয় ঢেউয়ের আক্রমণ বাড়লেও মৃত্যুর ক্ষেত্রে ৪৩তম স্থানে এবং সংক্রমণে ৩৩তম অবস্থানে রয়েছে। 

যুক্তরাজ্যে দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবেলা এবং মৃত্যু ও সংক্রমণ কমানোর বিষয়ে দেশটির ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসের ইমার্জেন্সি মেডিসিন ও আইসিইউ বিশেষজ্ঞ ডা. গোলাম রাহাত খান বলেন, ‘যুক্তরাজ্যে করোনায় মারা যাওয়া বেশির ভাগ ছিলেন বয়স্ক জনগোষ্ঠী। কিন্তু দ্বিতীয় ঢেউয়ের ক্ষেত্রে দেখছি, টিকা দেওয়ার পর থেকে পরিস্থিতি ভালো হচ্ছে। গত প্রায় ছয় সপ্তাহে অনেকটা অবাক করার মধ্য দিয়ে বয়স্কদের মৃত্যু কমতে শুরু করেছে, যা খুব দ্রুত ঘটছে।’ 

এই বিশেষজ্ঞ বলেন, যুক্তরাজ্যে এখন পর্যন্ত প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠীর করোনার টিকা দেওয়া শেষ হয়েছে। বিশেষ প্রক্রিয়ায় লকডাউনও চলছে। কিছুদিন পর পর পরিস্থিতি রিভিউ করা হচ্ছে। আগামী জুন মাস নাগাদ হয়তো লকডাউন তুলে নেওয়া হতে পারে।

এদিকে ইউরোপের আরেকটি দেশ সুইডেন থেকে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. ফরহাদ আলী খান কালের কণ্ঠকে বলেন, অন্যান্য দেশে লকডাউন দিলেও সুইডেনে কখনো লকডাউন দেওয়া হয়নি। তবে কঠোর নিয়ন্ত্রণ চলছে। সব কিছু খোলা থাকলেও স্বাস্থ্যবিধি মানতে হচ্ছে সবাইকে। যেমন—রেস্তোরাঁয় তিনজনের বেশি একসঙ্গে বসতে দেওয়া হয় না।

এদিকে করোনা মোকাবেলায় বাংলাদেশ বিশ্বের কাছে প্রসংসিত হয়েছিল মাত্র কয়েক দিন আগেই। সেই  প্রশংসার রেশ না কাটতে এরই মধ্যে দ্বিতীয় ঢেউয়ের ধাক্কায় সংক্রমণ, শনাক্ত বেড়ে চলছে দ্রুত। মারাও যাচ্ছে গত দুই মাসের তুলনায় বেশি। পরিস্থিতির মুখে সরকার দেশে আবার নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বাড়াতে নানা পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে। অন্যদিকে সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ার প্রভাবে রোগীর চাপ সামাল দিতে আবারও বেসামাল অবস্থায় পড়েছে হাসপাতালগুলো। প্রয়োজনের তুলনায় হাসপাতালে আবার দেখা দিয়েছে চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী সংকট। গত বছর বাইরের বিভিন্ন জেলা-উপজেলা থেকে যে চিকিৎসকদের ঢাকায় এনে কভিড হাসপাতালে অস্থায়ী পোস্টিং দেওয়া হয়েছিল। তাঁদের সরিয়ে নেওয়ার কারণে এ সংকট দেখা দিয়েছে বলে জানিয়েছেন কয়েকটি হাসপাতালের পরিচালকরা। অন্যদিকে সাধারণ বেডের পাশাপাশি আইসিইউ বেডের সংকট নিয়েও উদ্বেগ বেড়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা বলেন, ‘আমরা আগে থেকেই  করোনাভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকির ব্যাপারে সতর্ক করেছিলাম। এক শ্রেণির মানুষ সেটা কানে নেয়নি।  তবু আমরা পরিস্থিতি অনুযায়ী নতুন করে নিয়ন্ত্রণের কৌশল নিয়ে কাজ করছি।’

নতুন পরিস্থিতিতে হাসপাতালের সংকট তুলে ধরে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. জামিল আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, কিছুদিন ধরেই আমার এখানে রোগীর ভিড় অতিরিক্ত। রোগী অনুযায়ী চিকিৎসক, নার্স নেই। ফলে নতুন রোগী নেওয়া যাচ্ছে না। গত বছর অস্থায়ীভাবে যে চিকিৎসক, নার্স দেওয়া হয়েছিল, তাঁদের ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে। বিষয়টি এরই মধ্যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরকে অবহিত করা হয়েছে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা