kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৯ বৈশাখ ১৪২৮। ২২ এপ্রিল ২০২১। ৯ রমজান ১৪৪২

বঙ্গবন্ধু যদি আজ বেঁচে থাকতেন

আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী   

১৭ মার্চ, ২০২১ ০২:৫০ | পড়া যাবে ১১ মিনিটে



বঙ্গবন্ধু যদি আজ বেঁচে থাকতেন

মহাত্মা গান্ধী ১২৫ বছর বাঁচতে চেয়েছিলেন। নিষ্ঠুর ঘাতক তাঁকে বাঁচতে দেয়নি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কত বছর বাঁচতে চেয়েছিলেন আমি জানি না। নিষ্ঠুর ঘাতকের দল তাঁকেও বাঁচতে দেয়নি। মাত্র ৫৫ বছর বয়সে তাঁর জীবনপ্রদীপ নির্বাপিত হয়। এত অল্প বয়সে তাঁর যে অর্জন তার কোনো তুলনা নেই। তিনি শত বছর বাঁচতে চাইতেন কি না জানি না; কিন্তু প্রায়ই বলতেন,   ‘আমার স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তোলার পর আমি অবসর নেব। দেশে দ্বিদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করব। তবে ক্ষমতাসীন এবং বিরোধী দল উভয়কেই রাষ্ট্রের সংবিধানসম্মত ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামো মেনে চলতে হবে।’

তিনি যে বাকশাল ব্যবস্থা প্রবর্তন করেছেন, সে সম্পর্কে বলতেন, এটা সম্পূর্ণ সাময়িক ব্যবস্থা। আমি দেশে পুঁজিবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থার বদলে শোষিতের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চাই। এই দুই ব্যবস্থার মাঝখানের অন্তর্বর্তীকালের জন্য এই অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা। বিপ্লব ছাড়া এই শোষিতের গণতন্ত্রও প্রতিষ্ঠা করা যায় না। কিন্তু এখন ক্ষমতা আমাদের হাতে। তখন শান্তিপূর্ণ পন্থায় আমলা ও পুঁজিবাদীদের হাত থেকে রাষ্ট্রযন্ত্র পরিচালনার ভার তৃণমূল পর্যায়ে জনগণের হাতে পৌঁছে দেওয়া যায় কি না তারই পরীক্ষা করছি। এটা আমার দ্বিতীয় বিপ্লব। এই বিপ্লব সফল হলেই দ্বিদলীয় সংসদীয় গণতন্ত্রে ফিরে যাব।

একদিন গণভবনে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দুপুরের আহার সেরেছি। খেতে খেতেও তিনি গল্প করছিলেন। কথার এক পর্যায়ে বললেন, ‘চৌধুরী, আই হ্যাভ ক্রিয়েটেড এ হিস্ট্রি। আই উড লাইক টু সি ইটস সাকসেস। ইফ আই ফেইল, দেন আই উইল গো টু অবলিভিয়ন ফর এ লং টাইম।’ কথাটার অর্থ, ‘চৌধুরী, আমি একটি ইতিহাস সৃষ্টি করেছি। আমি তার সাফল্য দেখে যেতে চাই। যদি ব্যর্থ হই, তাহলে দীর্ঘকালের জন্য বিস্মৃতির অন্ধকারে চলে যাব।’

তাঁর এই ভবিষ্যদ্বাণী সত্য হয়েছিল। পঁচাত্তর সালের আগস্ট মাসে তাঁকে হত্যা করার পর তাঁরই প্রতিষ্ঠিত দেশে তাঁর নামোচ্চারণও নিষিদ্ধ ছিল। দীর্ঘ ২১ বছর তিনি ছিলেন বিস্মৃতির অন্ধকারে। তারপর জাতির পিতার অতুল গৌরবে তাঁর পুনর্জন্ম ঘটেছে। জাতি বিনম্রচিত্তে গত বছর তাঁর জন্মশতবার্ষিকী পালন করেছে। শুধু বাংলাদেশে নয়, বলতে গেলে সারা বিশ্বে একজন মহানায়ক হিসেবে তাঁর জন্মশতবার্ষিকী পালিত হয়েছে। এ বছর পালিত হচ্ছে তাঁরই নেতৃত্বে সশস্ত্র যুদ্ধে অর্জিত স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী।

রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘মোর লাগি করিয়ো না শোক/আমার রয়েছে কর্ম, আমার রয়েছে বিশ্বলোক।’ এই কথা কটি যেন বঙ্গবন্ধুরও। তাঁর কর্মপ্রবাহের স্মারক স্বাধীন বাংলাদেশ। তা ছাড়া তাঁর রয়েছে বিশ্বলোক। বিশ্বের শোষিত মানুষের পক্ষে দাঁড়িয়ে ছিলেন বলেই তাঁকে বিশ্ব শান্তি পরিষদ থেকে জুলিও কুরি পুরস্কার দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে খেতাব দেওয়া হয়েছিল বিশ্ববন্ধু। ফরাসি দার্শনিক আন্দ্রে মার্লো যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ দেখতে এসেছিলেন। দেশে ফিরে গিয়ে তিনি লিখেছিলেন, ‘আমি দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে বিধ্বস্ত প্যারিস শহর দেখেছি। এখন স্বাধীনতার যুদ্ধে বিধ্বস্ত ঢাকা শহরও দেখলাম। প্যারিসের পুনর্গঠনে বহু সময় লেগেছিল। ঢাকায় পৌঁছে দেখি মুজিব নামের এক মানুষের জাদুস্পর্শে শুধু ঢাকা শহর নয়, সারা বাংলাদেশ দ্রুত নবজীবন লাভ করতে চলেছে।’

পৃথিবীর ইতিহাসে একটি বিরল ঘটনা। স্বাধীনতা অর্জনের মাত্র এক বছরের মধ্যে তিনি দেশে একটি সম্পূর্ণ অবাধ ও নিরপেক্ষ সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠান করেছেন। ওই ১৯৭২ সালেই জাতিকে অসাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রভিত্তিক এমন একটি সংবিধান উপহার দিয়েছেন, যাকে এখনো একটি শ্রেষ্ঠ সংবিধান হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

বঙ্গবন্ধুকে ইতিহাসবিদদের কেউ কেউ দিল্লির পাঠান সম্রাট শের শাহের সঙ্গে তুলনা করেন। শের শাহ সিংহাসনে ছিলেন মাত্র সাড়ে তিন বছর। তারপর শত্রুপক্ষের নিক্ষিপ্ত কামানের গোলায় আহত হয়ে তিনি মারা যান, কিন্তু এই সাড়ে তিন বছরে তিনি তাঁর সাম্রাজ্যের চেহারা বদলে দেন। তিনি সারা ভারতে গ্রান্ড ট্রান্স রোড নির্মাণ করে যোগাযোগ ব্যবস্থার অভূতপূর্ব উন্নতি ঘটান। পৃথিবীতে প্রথম ঘোড়াবাহিত ডাকব্যবস্থা প্রবর্তন করেন। পথিকদের পথকষ্ট নিবারণের জন্য সাম্রাজ্যজুড়ে পান্থশালা তৈরি করেন।

অন্যদিকে বঙ্গবন্ধুও রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিলেন মাত্র সাড়ে তিন বছর। এই সাড়ে তিন বছরে চীন ও সৌদি আরব ছাড়া বাংলাদেশের জন্য বিশ্বের বেশির ভাগ দেশের স্বীকৃতি আদায় করেন। কমনওয়েলথ ও জাতিসংঘের সদস্যপদ বাংলাদেশ লাভ করে। ভৈরবের সেতুসহ যুদ্ধবিধ্বস্ত বেশির ভাগ রাস্তাঘাট মেরামত করা হয়।

অর্থনীতির ক্ষেত্রে সমাজতান্ত্রিক আর্থিক ব্যবস্থায় পৌঁছার লক্ষ্যে মিশ্র অর্থনীতি গ্রহণ করেন। দুর্নীতি দমনের জন্য অনেক রাঘব বোয়ালকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়, কারাদণ্ড দেওয়া হয়। বিশ্বের ইতিহাসে বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গণপরিষদের ৪২ জন সদস্যের সদস্য পদ বাতিল করেন। জাতিসংঘে প্রথম বাংলায় বক্তৃতা দিয়ে বাংলা ভাষার আন্তর্জাতিক ভাষার মর্যাদা লাভের সূচনা করেন। নেহরু ও নাসেরের অবর্তমানে মার্শাল টিটো ও ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে জোটনিরপেক্ষ সম্মেলনের (ন্যাম) নেতৃত্ব গ্রহণ করেন।

সবচেয়ে বড় কথা, পূর্ব ইউরাপীয় দেশগুলোতে দীর্ঘ কমিউনিস্ট শাসনেও যে শ্রেণিসাম্য প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়নি, স্বাধীন বাংলাদেশে তিনি সেই শ্রেণিসাম্য প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। তাতে অভিজাত শ্রেণিগুলোতে তাঁর বিরুদ্ধে রীতিমতো ক্রোধ সৃষ্টি হয়েছিল। ব্রিটিশ শাসকরা তাঁদের আধিপত্যবাদী শাসন ও শোষণের স্বার্থে জমিদারি প্রথা সৃষ্টির মতো বাংলাদেশের সমাজে যেমন ছোট-বড় নানা শ্রেণি সৃষ্টি করেছিলেন, তেমনি পেশাদার শ্রেণির মধ্যেও উচ্চ ও নিচু শ্রেণি তৈরি করে সমাজে ব্যাপক বৈষম্য তৈরি করে গিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু এই শ্রেণিভেদ ও বৈষম্য দূর করার জন্য প্রথমেই পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। তিনি মেডিক্যাল কলেজে পড়া ছাত্রদের এমবিবিএস ডিগ্রি লাভ এবং মিটফোর্ড মেডিক্যাল স্কুলে পড়া ছাত্রদের জন্য নিচু ডিগ্রি লাভের ব্যবস্থা বাতিল করে সব মেডিক্যাল ছাত্রকেই এমবিবিএস ডিগ্রি লাভের ব্যবস্থা করেন। নিচু ডিগ্রির এবং নিম্ন শ্রেণির ডাক্তার তৈরি বাংলাদেশে বন্ধ হয়ে যায়। অর্থাৎ ডাক্তারদের মধ্যে শ্রেণিভেদ তিনি লোপ করেন।

একই ব্যবস্থা তিনি গ্রহণ করেন সাংবাদিকতার পেশার ক্ষেত্রেও। দীর্ঘকাল সংবাদপত্রের প্রুফ রিডারদের সাংবাদিক হিসেবে গণ্য করা হতো না। তাঁরা ছিলেন উপেক্ষিপ ও অবহেলিত শ্রেণি। বঙ্গবন্ধু তখনকার কয়েকজন প্রভাবশালী সাংবাদিকের বিরোধিতা উপেক্ষা করে সংবাদপত্রের প্রুফ রিডারদের সাংবাদিক হিসেবে ক্যাটাগরিভুক্ত করেন এবং তাঁদের সাংবাদিক হিসেবে গণ্য হওয়ার মর্যাদা দেন।

অনুরূপভাবে তিনি আইনজীবীদের মধ্যেও শ্রেণিভেদ ও শ্রেণিবৈষম্য বিলুপ্ত করেন। মুহুরি, মোক্তার, উকিল, ব্যারিস্টার—এই বিরাট ও বিভিন্ন শ্রেণিভেদ দূর করে তিনি সব আইনজীবীকে অ্যাডভোকেট এই নাম প্রদান করেন। এমনকি বিলাতফেরত ব্যারিস্টারদের পদবিও লুপ্ত করে তাঁদের অ্যাডভোকেট পদবি গ্রহণের ব্যবস্থা করেন। ফলে অভিজাত ব্যারিস্টার শ্রেণির মধ্যে ক্রোধ সৃষ্টি হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ প্রকাশ্যেই তাঁদের ক্রোধ প্রকাশ করে বলেছিলেন, ‘শেখ মুজিব কী চান? তালগাছ আর শ্যাওড়াগাছকে কি তিনি সমান করে ফেলতে চান?’

পেশাজীবী শ্রেণির মধ্যে বিভেদ ও বৈষম্য লোপের ব্যবস্থা করে তিনি সাধারণ সমাজেও শ্রেণিভেদ লোপের কথা ভাবছিলেন। নব্যধনীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে যাচ্ছিলেন। ঢাকা নগর উন্নয়ন পরিকল্পনার এক কর্তাব্যক্তিকে ডেকে এনে বলেছিলেন, ‘বাড়ি নির্মাণের পরিকল্পনায় তাঁরা যেন কাউকে ১০তলা বিল্ডিং এবং কাউকে একতলা বাড়ি নির্মাণের অনুমতি না দেন। বড়লোকেরা ১০তলা ফ্ল্যাট বানাবে আর গরিবেরা পাশে একতলা বাড়ি বানিয়ে নিচুতলার মানুষের মানসিকতা নিয়ে বাঁচবে, তা হবে না। সবাইকে একই উচ্চতার বাড়ি তৈরি করতে দিতে হবে।’

বঙ্গবন্ধুর এই ইচ্ছাকে তখন অনেকে ‘তুঘলকি ইচ্ছা’ বলে সমালোচনা করেছিলেন। কিন্তু কয়েক বছর আগে আমি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে জেনেভায় জলবায়ু সম্মেলনে গিয়েছিলাম। সেখানে শহরে বেড়াতে বেরিয়ে একটি অঞ্চলে দেখি সব বাড়ি একই উচ্চতার। গাইডকে তার কারণ জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, সুইজারল্যান্ডে সোস্যালিস্ট গভর্নমেন্ট ক্ষমতায় এসে নির্দেশ দিয়েছিলেন, বড়লোকদের ইচ্ছামতো উঁচুতলার বাড়ি তৈরির অনুমোদন দেওয়া যাবে না, সরকারের নির্দেশমতো বাড়ি তৈরি হওয়ায় কোনটি বড়লোকের বাড়ি আর কোনটি গরিবের বাড়ি তা বোঝার উপায় নেই। সেদিন জেনেভায় দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধুকে স্মরণ করেছি আর ভেবেছি বঙ্গবন্ধু আজ যদি বেঁচে থাকতেন!

আমাকে বিবিসি রেডিওর বাংলা বিভাগের তৎকালীন প্রধান জন ক্ল্লাপাম বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎকার শেষে ফিরে এসে বলেছিলেন, ‘তোমাদের বঙ্গবন্ধুকে অনেকে ডিক্টেটর বলেন। আমি তাঁর মধ্যে ডিক্টেটর হওয়ার কোনো মনমানসিকতাই খুঁজে পেলাম না। ডিক্টেটর হলে সম্ভবত তিনি ভালো করতেন।’ বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর দিনটিতে তাঁর সম্পর্কে লিখতে বসে ভেবেছি, কেন তিনি মানুষকে এত ভালোবাসলেন। যাদের ভালোবাসলেন, যাদের জন্য জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়টা জেলে কাটালেন, তারাই তার বুকে গুলি চালিয়েছে। তাঁর ১০ বছরের শিশুপুত্রের বুকে গুলি চালিয়েছে। চিলিতে সিআইএর দোসর ঘাতকরা জনগণের বন্ধু প্রেসিডেন্ট আলেন্দের বুকে গুলি চালিয়েছে। কিন্তু তাঁর স্ত্রী ও কন্যাকে রেহাই দিয়েছে। বাংলাদেশের বর্বর ঘাতকরা বঙ্গবন্ধুর স্ত্রী, পুত্র, পুত্রবধূসহ পরিবারের কাউকে রেহাই দেয়নি। এরা আজ সারা বিশ্বের মানুষের কাছে ঘৃণ্য।

বঙ্গবন্ধুর জন্মবার্ষিকীর দিনটিতে বসে ভেবেছি, আজ তিনি বেঁচে থাকলে কী হতো? হয়তো তিনি শতায়ু হতেন না। স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী দেখে যেতে পারতেন না স্বাভাবিক নিয়মেই। কিন্তু তিনি যদি শতায়ু হতেন, তাঁর নেতৃত্বে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে অর্জিত স্বাধীনতার ৫০ বছর উদযাপন পর্যন্ত বেঁচে থাকতেন, তাহলে কী হতো? আমার দৃঢ় বিশ্বাস, ঘাতকের বুলেট মাত্র ৫৫ বছর বয়সে বঙ্গবন্ধুর মৃত্যু না ঘটালে, তিনি স্বাভাবিক আয়ু পেলে আজ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চেহারা সম্পূর্ণ অন্য রকম হতো।

শোষিতের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ফলে পেটি পুঁজিবাদী গণতন্ত্রের অশ্লীল ভোগবাদী চেহারা দেখা যেত না। দুর্নীতিবাজ নব্যধনীদের আবির্ভাব ঘটত না। ঢাকায় নিউ ইয়র্কের অনুকরণে এত আকাশছোঁয়া অট্টালিকা দেখা যেত না। এই আকাশছোঁয়া অট্টালিকার সারি ঢাকা শহরের সৌন্দর্য বাড়ায়নি। শহরটিকে কংক্রিটের জঞ্জালে পরিণত করেছে। বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকলে রাজধানীসহ দেশের শহরগুলোতে ধন বৈষম্যের এমন নগ্ন প্রকাশ দেখা যেত না। সমাজের উঁচ-নিচু সর্বত্র বিয়ে থেকে জন্মদিন সব অনুষ্ঠানে ভালগার কালচারের এমন আধিক্য দেখা দিত না। বাংলা ভাষাকে বিকৃত করা সম্ভব হতো না। শহরের খাদ্য, পানীয়, আবহাওয়া, পরিবেশ সব কিছু দূষিত হতো না। দুর্নীতি সমাজের সর্বস্তরে করোনার মতো এমন ব্যাপক বিস্তার ঘটাতে পারত না।

ঢাকা হতো প্রাগ অথবা জেনেভার মতো একটি ছিমছাম পরিচ্ছন্ন শহর। অন্যান্য জেলা ও উপজেলার শহরগুলোও তাই। যেহেতু বঙ্গবন্ধুর অর্থনীতি হতো সমাজতন্ত্র ঘেঁষা, ফলে জীবিকার জন্য শহরগুলোতে গ্রামের মানুষের চলে আসার এমন ঢল দেখা যেত না। গ্রামগুলোও হতো শহরের মতো। পুঁজিবাদী একতরফা উন্নয়নের এই যে চাকচিক্য, যার কংক্রিটের পাথরের তলে চাপা পড়ে গেছে দেশের দারিদ্র্য, সেই চাকচিক্য ও দারিদ্র্য কোনোটাই বাংলাদেশে থাকত না। ব্যক্তির ভোগবাদী উন্নয়নের বদলে বাংলাদেশে সামাজিক উন্নতির ভারসাম্য সৃষ্টি হতো। তাতে পুঁজিবাদী ও ভোগবাদী সমাজের এমন রামধনু চাকচিক্য সৃষ্টি হতো না। কিন্তু এই সামাজিক উন্নতির ভিত্তি হতো খুবই মজবুত।

বঙ্গবন্ধু আজ বেঁচে থাকলে রাজনীতিতেও আসত শোষিতের গণতন্ত্রের পূর্ণ আধিপত্য। টাকা দিয়ে এমপি হওয়া যেত না। এমপি হয়ে ক্ষমতার অপপ্রয়োগ ও লুটপাটেরও কোনো সুযোগ থাকত না। তৃণমূল পর্যায়ের জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা যেত। ব্রিটিশ আমলের আমলাতন্ত্রের রাজত্ব শেষ হতো ধর্মান্ধ ও সাম্প্রদায়িক শক্তি মাথা তুলতে পারত না। শোষিতের গণতন্ত্র এবং সমাজতান্ত্রিক ধাঁচের অর্থনীতি বাংলাদেশকে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠার পথে এত দিনে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যেত।

এই স্বল্প পরিসরে আজ বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকলে কী হতো তার পূর্ণ পরিচয় দেওয়া যাবে না। বঙ্গবন্ধুর অর্থনীতি সম্পর্কে জানতে চাইলে সহৃদয় পাঠকদের বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ ড. আবুল বারকাতের বঙ্গবন্ধুর অর্থনীতি সম্পর্কিত বইটি পড়তে অনুরোধ জানাই। যাঁরা বলেন, বঙ্গবন্ধু ডিক্টেটর ছিলেন, তিনি একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন, তাঁরা ভুলের বালুচরে বিচরণ করছেন। তিনি ক্ষমতা চাইলে ছয় দফার দুই দফা বিসর্জন দিয়ে পাকিস্তানে সামরিক বাহিনীর তাঁবেদার প্রধানমন্ত্রী হতে পারতেন। তিনি তা হননি। তিনি জনগণের স্বাধিকারের প্রশ্নে অটল ছিলেন এবং একটি ধর্মনিরপেক্ষ, সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার সংগ্রামেই আত্মদান করে গেছেন।

বঙ্গবন্ধুর সেই স্বপ্নের সোনার বাংলা আমরা দেখিনি। সেই সোনার বাংলা পচনশীল পুঁজিবাদের শোষণে ও শাসনে বিপর্যস্ত বাংলা হতো না, হতো গঠনমুখী সমাজতান্ত্রিক ধাঁচের সুখী ও সমৃদ্ধ সমাজের এক প্রতিচ্ছবি। বঙ্গবন্ধু চরিত্রে ছিলেন সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট। কিন্তু পশ্চিম ইউরোপের তথাকথিত সোশ্যাল ডেমোক্রেসির পথ তিনি অনুসরণ করেননি। পূর্ব ইউরোপের রুশ সৈন্যের পাহারায় তৈরি সমাজতন্ত্রও তিনি চাননি। তিনি মার্শাল টিটোকে আলজেরিয়ায় জোটনিরপেক্ষ সম্মেলনে বলেছিলেন, ‘মার্শাল, সৈন্যবাহিনীর বুটের নিচে যে সমাজতন্ত্র তা আমি চাই না। আমি চাই সমাজতান্ত্রিক গণতন্ত্র। সেই সমাজতন্ত্র বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠার জন্য আমাকে যদি আত্মদান করতে হয় আমি করব।’

তিনি তাই করেছেন।

লন্ডন, ১৬ ফেব্রুয়ারি, মঙ্গলবার, ২০২১
শব্দ : ১৬৬৫

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা