kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৭ বৈশাখ ১৪২৮। ১০ মে ২০২১। ২৭ রমজান ১৪৪২

যে কলমে বাংলাদেশের স্মৃতি ধরে রেখেছেন মুন

‘বঙ্গবন্ধু ছিলেন সময়ের চেয়ে অনেক এগিয়ে’

কূটনৈতিক প্রতিবেদক    

১৬ মার্চ, ২০২১ ০৩:২৮ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



যে কলমে বাংলাদেশের স্মৃতি ধরে রেখেছেন মুন

বাংলাদেশের সঙ্গে জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব বান কি মুনের ‘ফাউনটেন পেনের’ কথা কূটনৈতিক মহলে অনেকেরই জানা। গতকাল সোমবার দুপুরে এক বক্তব্যে তিনি আবারও জানালেন, ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধুর সরকারের সময় তিনি ছিলেন ভারতে কোরিয়া দূতাবাসের একজন নবীন কূটনীতিক। বাংলাদেশের সঙ্গে কোরিয়ার কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের সুপারিশ করে কোরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে রাষ্ট্রদূতের পাঠানো চিঠির খসড়া তিনিই লিখেছিলেন। আর দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের দলিল সই করতে ব্যবহার করা হয়েছিল বান কি মুনের পুরনো ‘ফাউনটেন পেন’। তিনি গতকাল বলেন, ‘আজও সেই ফাউনটেন পেন আমি সংগ্রহে রেখেছি। খুব ব্যক্তিগত স্মারক হিসেবে আমি সেটি নিজের কাছে রেখেছি।’

মুজিববর্ষ উপলক্ষে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আয়োজিত ধারাবাহিক বক্তব্যের অংশ হিসেবে গতকাল বক্তব্য দেন বান কি মুন। বিষয় ছিল ‘বঙ্গবন্ধু : বাংলাদেশের আত্মা’। ঢাকায় ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে সেই বক্তৃতা অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে বক্তব্য দেন মুন। তিনি বলেন, ‘এত বছর পরও আমাদের দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের অনুষ্ঠানের কথা মনে পড়ে।’

মুন বলেন, ‘পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধের পর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থা ছিল খুব নাজুক। আমার এখনো মনে পড়ে, প্রথম দিন থেকেই বাংলাদেশের সরকারি কর্মকর্তারা দেশের

উন্নয়নের চেষ্টা করছিলেন। তাঁদের চেষ্টা ছিল যেন অফিসের এক পৃষ্ঠা কাগজেরও অপচয় না হয়। তরুণ একজন কূটনীতিক হিসেবে আমার কাছে এটি ছিল অত্যন্ত নাড়া দেওয়ার মতো বিষয়।’

ওই ঘটনা কোরিয়ায় এবং মহাসচিব হিসেবে জাতিসংঘে দায়িত্ব পালনের সময় ১০ বছর নবীন কূটনীতিকদের কাছে তুলে ধরেছেন বলে জানান বান কি মুন। তিনি বলেন, ‘এটি সত্যি গল্প। এই সমৃদ্ধ চেতনাই বাংলাদেশকে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ থেকে পুনর্গঠনে সহায়তা করেছে। বাংলাদেশের এই উদাহরণ আমি মাথায় রেখেছি।’

বান কি মুন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রসঙ্গে বলেন, নেতৃত্ব ও উত্তরাধিকারের জন্য শেখ মুজিবকে সব সময় স্মরণ করা হবে। শেখ মুজিব আধুনিক বাংলাদেশের জনক, আশা সৃষ্টিকারী মহান নেতা। সত্তরের দশকের প্রথম দিকে বাংলাদেশ সফরের সময়ই বঙ্গবন্ধুর এসব গুণ তাঁর (মুন) কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল।

তিনি বলেন, ‘শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন একজন দূরদৃষ্টিসম্পন্ন বিরল নেতা। তিনি নবীন বাংলাদেশকে উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে সহযোগিতা করেছেন। তিনি ছিলেন মানবাধিকারে চ্যাম্পিয়ন। সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশের ক্ষেত্রে তিনি সাম্য প্রতিষ্ঠায় কাজ করেছেন। তিনি তাঁর সময়ের চেয়ে অনেক এগিয়ে ছিলেন।’

বান কি মুন বলেন, ভাষা ও সাংস্কৃতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনেরও কেন্দ্রে ছিলেন বঙ্গবন্ধু। জনগণের ক্ষমতায়ন, স্বাধীনতা, স্বশাসনের অধিকার প্রতিষ্ঠায় তিনি সরাসরি নেতৃত্ব দিয়েছেন।

জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব বলেন, “মানবাধিকারের প্রতি শেখ মুজিবুর রহমানের অঙ্গীকার কেবল বাংলাদেশেই সীমিত ছিল না, বরং বিশ্বের অন্যত্র নিপীড়িতদের পর্যন্ত তা বিস্তৃত ছিল। বঙ্গবন্ধুর প্রভাব ও ‘লিগ্যাসি’ বাংলাদেশের সীমা ছাড়িয়ে বহুদূর পর্যন্ত গেছে।”

উপনিবেশবিরোধী, ক্ষুধামুক্ত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবস্থার প্রতি বঙ্গবন্ধুর জোরালো নীতির কথাও উল্লেখ করেন বান কি মুন। তিনি বলেন, ক্ষুধামুক্ত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়ে প্রথম দিকে যাঁরা ভেবেছিলেন বঙ্গবন্ধু তাঁদের একজন। তাঁর এসব ভাবনা ও নীতি কোটি মানুষকে চরম দারিদ্র্য থেকে মুক্ত হতে সহায়তা করেছে। সেই নীতি অনুসরণ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে দ্রুত অগ্রগতির দেশে পরিণত হয়েছে।

বান কি মুন গত ১২ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক টাইমস পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় বিখ্যাত প্রতিবেদক ও কলাম লেখক নিকোলাস ক্রিস্টোফের নিবন্ধের কথা উল্লেখ করে বলেন, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কত দ্রুত অগ্রগতি করেছে তার উল্লেখ আছে ওই নিবন্ধে।

বান কি মুন জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনাকে চ্যাম্পিয়ন হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, জলবায়ু অভিযোজনে বাংলাদেশ আজ দৃষ্টান্ত। বিশেষ করে, ঘূর্ণিঝড়ে হতাহতের সংখ্যা বাংলাদেশ নাটকীয়ভাবে কমাতে পেরেছে। ১৯৭০ সালে ভোলায় ঘূর্ণিঝড়ে তিন লাখ লোকের মৃত্যু হয়েছিল। ২০১৯ সালে শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় ফণীতে মৃত্যু হয় এক শর নিচে।

বঙ্গবন্ধুর ‘লিগ্যাসি’ অনুসরণ করেই বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে বলে উল্লেখ করেন বান কি মুন। তিনি বিশ্বাস করেন, বাংলাদেশ আগামী দিনগুলোতে সক্ষমতার আরো উদাহরণ সৃষ্টি করবে।

বান কি মুন তাঁর বক্তব্যের শেষ দিকে বলেন, কভিড-১৯ মৌলিক ‘কানেক্টিভিটিকে’ হুমকিতে ফেলেছে। ক্রমবর্ধমান অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। এখন মানবাধিকার, দারিদ্র্য ও অসাম্যের বিরুদ্ধে লড়াই, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা ও অভিযোজনকে সবার অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী উপলক্ষে বাংলাদেশকে অভিনন্দন জানিয়ে বান কি মুন বলেন, ‘বাংলাদেশ দীর্ঘজীবী হোক।’

অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম, পররাষ্ট্রসচিব মাসুদ বিন মোমেন, দক্ষিণ কোরিয়ায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত আবিদা ইসলাম ও বাংলাদেশে দক্ষিণ কোরিয়ার রাষ্ট্রদূত লি জ্যাং-কিউন বক্তব্য দেন।



সাতদিনের সেরা