kalerkantho

শুক্রবার । ১০ বৈশাখ ১৪২৮। ২৩ এপ্রিল ২০২১। ১০ রমজান ১৪৪২

সেলাই করা খোলা মুখ

ভয় করিনি জয় করেছি করোনাকে

মোফাজ্জল করিম   

১৩ মার্চ, ২০২১ ০৩:৫৯ | পড়া যাবে ১৪ মিনিটে



ভয় করিনি জয় করেছি করোনাকে

অবশেষে মনে হচ্ছে মস্তিষ্কের কোষগুলো সক্রিয় হতে শুরু করেছে। হাত-পা-মাথা ও শরীরের বাকি সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গও যেন আড়মোড়া ভেঙে জেগে উঠছে। জাগবে না কেন? আর কত ঘুমানো যায়। সেই গত বছরের নভেম্বর মাসের ২৬ তারিখ ভোর সোয়া পাঁচটায় করোনা-ভূতটা হঠাৎ আচমকা এক ঘুসিতে আমাকে ধরাশায়ী করে দিল। আমি মোটামুটি সুস্থ-সবল মানুষটা অন্যান্য দিনের মতো ভোরবেলা শয্যা ত্যাগ করে প্রক্ষালনাদি সারতে কেবল পা বাড়িয়েছি গোসলখানার ভেতর, এমন সময় অদৃশ্য করোনা-ভূতের আচমকা আক্রমণে আমি ছোটবেলার সেই মোহন সিরিজের ভাষায় যাকে বলে একেবারে পপাত ধরণিতল। আমি ভাবলাম আমার বোধ হয় হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকজাতীয় কিছু হয়েছে। কিন্তু কই সে রকম কোনো উপসর্গ তো দেখতে পাচ্ছি না। বুকের বাঁ পাশ, ডান পাশ বা ‘আমার বুকের মধ্যিখানে মন যেখানে হৃদয় যেখানে’ কোথাও তো কোনো ব্যথা-ট্যথা নেই। স্ট্রোক করলে তো আমার জ্ঞান হারাবার কথা। আমি তো জ্ঞান হারাইনি। সব সময় যেমন জ্ঞানবুদ্ধি বিচার-বিবেচনার ঘাটতি ছিল আমার তেমনি আছে। আমি জোরে চিৎকার দিয়ে মশামাছি-তেলাপোকা-টিকটিকি ব্যতীত এই ফ্ল্যাটের অন্য অধিবাসী আমার একমেবাদ্বিতীয়ম সহধর্মিণীকে ডাক দিলাম। কিন্তু স্যরি, আমার স্বরযন্ত্রের সাউন্ড সিস্টেম কাজ করল না, গলা দিয়ে কেবল পাতিহাঁসের মতো ফ্যাঁঁসফ্যাঁস আওয়াজ বের হলো। পরক্ষণেই টের পেলাম এটা লোকাল নয়, গ্রিড সমস্যা। আমার সারা শরীরেই পাওয়ার ফেইলিওর হয়ে গেছে। সেই পাষাণশয্যা থেকে কোনো মতে উঠে বসলেও দাঁড়াতে পারলাম না। ফলে বিদ্যাসাগরীয় ভাষায় ওই যে বলে না চলচ্ছক্তিহীন তেমনি অবস্থায় পড়ে থাকতে হলো বেশ কিছুক্ষণ। একজন সুস্থ-সবল মানুষ হঠাৎই বাংলাদেশের অবলা অক্ষম গ্রাম্যবালার মতো হয়ে গেল। তবে এভাবে জড়ীভূত হয়ে বেশিক্ষণ থাকতে হলো না। বোধ হয় ঘণ্টাখানেক। আমি নিজেকে লুলা ফকিরের মতো ঘষটাতে ঘষটাতে পাশের ড্রয়িংরুমের মাঝামাঝি জায়গায় নিয়ে আসতে পারলাম। কিন্তু কিছুতেই কোনো চেয়ারে বা সোফায় উঠে বসতে পারলাম না। হঠাৎ একসময় পাশের কামরার বাতি জ্বলে উঠল এবং ফেরেশতার মতো নাজিল হলেন আমার স্ত্রী। এরপরের দৃশ্যাবলি ঘটতে থাকল দ্রুত। ভদ্রমহিলার ফোন পেয়ে ড্রাইভার এবং ঘটনাচক্রে ঢাকায় অবস্থানরত আমার ডাক্তার জামাই মোস্তফা তৌফিক আহমেদ উসাইন বোল্টের গতিতে ছুটে এসে আমাকে ছোঁ মেরে নিয়ে তুলল গাড়িতে। আর বোধ হয় মিনিট তিরিশেক পরে আমি নিজেকে আবিষ্কার করলাম অ্যাপোলো হাসপাতালের (নতুন নাম এভারকেয়ার। নামটা আমার খুব একটা পছন্দ না। আমার কেন জানি মনে হয় ছাপাখানার ভূতের কারণে অথবা কোনো বিটলে ছোকরার বিটলেমিতে ওটা সহজেই নেভারকেয়ার হয়ে গিয়ে এই বিখ্যাত হাসপাতালটির মান-ইজ্জত ডোবাতে পারে।) ইমার্জেন্সিতে। একটু পরে দুপুরের দিকে আমার ডাক্তার মেয়ে কান্তা সিলেট থেকে হাঁপাতে হাঁপাতে সেখানে এসে হাজির। সে ফোনে খবর পেয়েই নেক্সট ফ্লাইটে চলে এসেছে ঢাকায়।

আজকাল যেকোনো হাসপাতালের চৌকাঠ ডিঙানোর সঙ্গে সঙ্গে রোগীকে সর্বাগ্রে করোনা পরীক্ষা দিতে হয়। আমারও সেই পরীক্ষা হলো, সঙ্গে হৃদয়ঘটিত এবং মস্তিষ্কের সুস্থতার বিষয়েও। সারা দিন শুয়ে শুয়ে ‘বোর’ হতে হতে, অপেক্ষাকৃত নবীন ডাক্তার-নার্সদের ছোট ছোট হুকুম-আহকাম শুনতে শুনতে সন্ধ্যার বেশ কিছুক্ষণ পর পরীক্ষার রেজাল্ট জানা গেল। রেজাল্ট পাসও না, ফেলও না। সেটা কী রকম? হার্ট ও স্ট্রোক পেপারে এক শতে এক শ, তবে করোনা পেপারে লাড্ডু। আমি করোনা পজিটিভ। পজিটিভ? কোনো কিছু পজিটিভ হলে তো খুশি হওয়ার কথা। কিন্তু তা না। চিকিৎসাশাস্ত্রে সব পজিটিভ পজিটিভ নয়। ডাক্তারি পরীক্ষায় রোগীর শরীরে আপত্তিকর কোনো কিছুর উপস্থিতি ধরা পড়লে বলা হয় পজিটিভ। আর ধরা না পড়লে নেগেটিভ। তার মানে যেন পাস করলে তুমি ফেল, আর ফেল করলে পাস! সে যাই হোক, সারা দিন অপেক্ষার পর জানলাম আমি আজ আর বাসায় ফিরতে পারব না। ঠিক আছে। তাহলে পরীক্ষা দিয়ে যখন চাকরি পেয়ে গেলাম তাহলে এখন নিয়োগপত্র দিয়ে বলুন, আমার পোস্টিং কোথায়। অর্থাৎ কোন ওয়ার্ড বা কেবিনের সৌন্দর্যবর্ধন করব আমি।

অ্যাপোলো হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়ে দিলেন, স্যরি, আমাদের এখানে করোনা ওয়ার্ডে কোনো সিট খালি নেই, একেবারে টইটম্বুর অবস্থা। কোনো কেবিনও খালি নেই। করোনা শনাক্ত হয়ে যাওয়া রোগীকে আর ইমার্জেন্সিতেও রাখা যাবে না। অতএব, এতদ্দণ্ডেই খোদা হাফেয। রাত তখন প্রায় ন’টা। সারা দিনের খাতির-যত্নের পর এখন এত রাতে মেহমানকে বলা হচ্ছে, রাস্তা মাপেন। সঙ্গে আবার সার্টিফিকেট দিয়ে দিচ্ছেন: সাবধান! ইনি করোনা রোগী। এর ধারেকাছেও কেউ আসবেন না।

এই প্রসঙ্গে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং অন্য অনেক দেশের মতো আমরাও বাংলাদেশে ‘সোশ্যাল ডিস্ট্যানসিং’ বা সামাজিক দূরত্ব রক্ষা করার কথা বলে আসছি করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের সময় থেকে। আরো বলছি ঘন ঘন কঠিন অথবা তরল সাবান দিয়ে হাত ধুতে হবে। (সাবান কোম্পানিরা মাশাল্লাহ ফোকটে ভালোই কামিয়ে নিচ্ছে!)। ঘরের বাইরে বের হলে সারাক্ষণ অবশ্যই মুখোশ পরে থাকতে হবে। (মুখোশ শব্দটিকে বাংলা অভিধান থেকে অচিরেই বোধ হয় তাড়িয়ে দেবে ইংরেজি ‘মাস্ক’ শব্দটি, যেভাবে ‘টয়লেট’ ও ইদানীংকালে উড়ে এসে জুড়ে বসা ‘ওয়াশরুম’ শব্দ দুটি তাদের বাংলা প্রতিশব্দটিকে খেদিয়ে গ্রামাঞ্চলে পাঠিয়ে দিয়েছে। অবশ্য ভূমিকা এক হলেও মানতে হবে ‘ওয়াশরুম’ শব্দটি নিঃসন্দেহে অনেক মার্জিত রুচির পরিচায়ক)।

আমার আপত্তি ‘সামাজিক দূরত্ব’ কথাটির ব্যাপারে। এর মানে কী? এর মানে কি উচ্চবিত্ত-নিম্নবিত্ত, উচ্চপদে আসীন ও আসনবিহীন সাধারণ মানুষ, সমাজের মগডাল আলোকিত করা মন্ত্রী-মিনিস্টার-আমলা-শিল্পপতি ও ভূমিতলে অবস্থানরত চাষাভুষা-কুলিকামিনদের মধ্যে, এককথায় ধনী ও গরিবের মধ্যে, ক্ষমতাধর ও ক্ষমতাহীনদের মধ্যে দূরত্ব মেনে চলতে হবে? বড়লোকদের সমাজ ও গরিবলোকদের সমাজের মধ্যে এমনিতেই আবহমানকাল ধরে সারা বিশ্বে যে দূরত্ব বিদ্যমান আছে, যে তুল্যমূল্য মেনে চলার অলিখিত বিধান চলে আসছে সৃষ্টির আদিকাল থেকে, সেটাকেই স্বীকৃতি দিয়ে করোনার মোকাবেলা করতে হবে? তাহলে মহানবী (সা.) থেকে শুরু করে পৃথিবীর সব মহামানব ‘গাহি সাম্যের গান—/যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা-ব্যবধান’ (কাজী নজরুল ইসলাম) বলে যে ধনী-গরিব, সাদা-কালো, সবল-দুর্বল সব মানুষকে কাছে টানবার, ভালোবাসবার বাণী শুনিয়ে গেলেন, তা এই করোনাকালে, এই ইন্টারনেট যুগে, এসে মিথ্যা হয়ে গেল? নিশ্চয়ই না। মহাপুরুষদের অমরবাণী মিথ্যা হতে পারে না। কিন্তু ‘সামাজিক দূরত্ব’ মেনে চলার নির্দেশ দিয়ে সমাজের বিভাজনটাকেই যেন প্রতিষ্ঠিত করার ইঙ্গিত দিচ্ছি আমরা।

আসলে যে কথাটি বলতে চাওয়া হচ্ছে তা সামাজিক নয়, শারীরিক দূরত্ব। হাটে-বাজারে যাবেন, যান, ট্রেনে-বাসে, মসজিদে-মন্দিরে-গির্জায় বসবেন, বসুন, সভা-সমিতি-মানববন্ধন করবেন, করুন, কিন্তু প্লিজ, গায়ে গা লাগিয়ে দাঁড়াবেন না, বসবেন না, হাঁটবেন না, চলবেন না। অর্থাৎ হাঁটতে-বসতে-চলতে শারীরিক দূরত্বটা বজায় রাখুন। যাকে ইংরেজিতে বলবেন ‘ফিজিক্যাল ডিস্ট্যানসিং’, ‘সোশ্যাল ডিসট্যানসিং’ নয়। সত্যি বলতে কী, সামাজিক দূরত্ব কথাটার ব্যাপারে আমার দারুণ একটা অ্যালার্জি আছে। সে জন্যই এত কথা বলা।

স্যরি, আবেগানুভূতিসঞ্জাত একটি বিষয় নিয়ে কথা বলতে গিয়ে আমার মূল বিষয় যে করোনাযুদ্ধ তা থেকে দূরে সরে গিয়েছি। এটা বয়সের (৮০ ছুঁই ছুঁই) দোষ বলতে পারেন। আবার কভিড-১৯-এর অনেক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার একটি প্রতিক্রিয়াও বলতে পারেন। সে যাই হোক। এভারকেয়ার কর্তৃপক্ষ নেভারকেয়ার হয়ে উঠে ‘উচ্ছেদ’ অভিযান শুরু করার আগেই আমার সুকন্যা ডা. ইশরাত জাহান করিম কান্তা ও সুজামাতা ডা. মোস্তফা তৌফিক আহমেদ তড়িঘড়ি করে রাত ন’টার দিকে আমাকে নিয়ে তুলল বাড্ডা এলাকায় নবপ্রতিষ্ঠিত একটি হাসপাতালে। এর নাম অ্যা এম জেড (অ্যামেজিং মেডিক্যাল জোন) হাসপাতাল। এর আগে এই হাসপাতালের নামও শুনিনি। বাইরে থেকে চাকচিক্যহীন হাসপাতালটি দেখে অ্যামেজিং বা বিস্ময়বিহ্বল হয়ে পড়ার মতো কিছু আছে বলে মনে হলো না। বরং কেমন পদ্মলোচন-পদ্মলোচন মনে হলো। এর পরিচালনার দায়িত্বে আছেন অধ্যাপক রোবেদ আমিন, আমার প্রয়াত বন্ধু ও সহপাঠী অধ্যাপক মোঃ ইদ্রিসের ছেলে ডা. মোঃ সায়েম প্রমুখ কয়েকজন অপেক্ষাকৃত তরুণ ডাক্তার, যাদের প্রায় সবাই কান্তা-তৌফিকের সহপাঠী অথবা সমসাময়িক। এত রাতে আমাকে ওই করোনা-প্রধান হাসপাতালের আইসিইউতে একটি সিটে নিয়ে তোলা হলো। ওই আইসিইউতে আরো প্রায় ১২-১৪ জন রোগী ছিলেন আগে থেকেই। আমার জন্য একটি অতিরিক্ত বেড দেয়ালের গা ঘেঁষে কোনো মতে ঠেলেঠুলে জুড়ে দেওয়া হলো। পারিপার্শ্বিক অবস্থা দেখে আর যাই হোক পুলকিত বোধ করার কোনো কারণ ছিল না। তবে ডাক্তার, নার্স, ওয়ার্ডবয় সবাই দেখলাম দৌড়াদৌড়ি, ছোটাছুটি করে পরিস্থিতি সামাল দিতে তৎপর।

একে অসুস্থ শরীর, তায় আবার হাসপাতাল। ঘুম আসছিল না। কখন জানি বোধ হয় একটু তন্দ্রার মতো এসেছিল। শুনলাম কে যেন আমাকে জিজ্ঞেস করছেন আমি ঘুমিয়ে পড়েছি কিনা। কী ব্যাপার? না, আমাকে শিফট করা হবে দোতলায় হাইডিপেনডেন্সি ইউনিট (এইচডিইউ)-এ। ওটা আবার ওই রাতেই উদ্বোধন করা হলো। আমিই ওটার প্রথম রোগী। (না না আমাকে দিয়ে ফিতেটিতে কাটানো হয়নি, কোনো ফুলের তোড়া-টোড়া দিয়েও অভ্যর্থনা জানানো হয়নি। আসলে আমি তো তখন দাঁড়াতেই পারছিলাম না।)

পরদিন সকালে আরো চার-পাঁচজন রোগী এসে গেলেন ওখানে। ডাক্তার-নার্সদের ব্যস্ততাও গেল বেড়ে। রোগীদের ওষুধপত্র, সেবা-শুশ্রূষা, খাওয়া-দাওয়া চলল ঘড়ির কাঁটা ধরে ধরে। ডাক্তার-নার্স সবার মধ্যে আন্তরিকতা এবং সেবার মনোভাব হৃদয়স্পর্শী। দেখে মনে হতো, এরা হাসপাতালের রোগী নয়, যেন নিজেদের পরিবারের আপনজনদের সেবা করছেন। বুঝলাম, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সব চিকিৎসক সব স্বাস্থ্যকর্মীকে এই দুর্যোগকালে দারুণ রকম অনুপ্রাণিত, উদ্দীপ্ত করতে সক্ষম হয়েছে। এতে রোগী হিসেবে আমি অন্তত আশ্বস্তবোধ করেছি যে আই অ্যাম ইন দ্য সেইফেস্ট হ্যান্ডস। আমি যেন আমার সন্তানের সেবা, মায়ের আদর, বোনের যত্ন পেয়েছি এই ক্ষণিকের বন্ধুদের কাছে।

আমাদের দেশের চিকিৎসাব্যবস্থায় অনেক ঘাটতি রয়েছে, রয়েছে অনেক অক্ষমতা, অসম্পূর্ণতা। এটা কেউ অস্বীকার করেন না, করার কথাও না। আফটার অল, দেশটা তো আর ইউরোপ-আমেরিকা কিংবা জাপান-অস্ট্রেলিয়া না যে সকল অসম্পূর্ণতা সকল চাহিদা রাতারাতি সম্পদের পাহাড় দিয়ে দূর করে ফেলতে পারব। তবে সম্পদশালী দেশগুলোতে বিত্তের প্রাচুর্যের পাশাপাশি যে কোনো ধরনের সেবায় আরেকটি যে অপরিহার্য উপাদানের অবশ্যম্ভাবী উপস্থিতি লক্ষ করা যায় তা হচ্ছে চিত্তের ঈষদুষ্ণ পরশ, যার পোশাকি নাম আন্তরিকতা। আমাদের দুর্ভাগ্য, আমাদের সরকারি বেসরকারি আধাসরকারি নিম সরকারি সব সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠানে—তা সেটা জনপ্রশাসন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, আইন-শৃঙ্খলা যাই হোক না কেন—এই আন্তরিকতাটুকুর এই হৃদয়ের ছোঁয়াটুকুর অভাব বড় তীব্রভাবে অনুভূত হয়। এমনকি যেসব প্রতিষ্ঠানে প্রাচুর্য ও অর্থবিত্তের ছড়াছড়ি সেখানেও হৃদয়ের উষ্ণতাটাই অনুপস্থিত। যেন ওপেন হার্ট সার্জারি করে হৃদয় নামক বালাইটিকে এবং সেই সঙ্গে কোমল অনুভূতিগুলোকে কেটে বাদ দিয়ে ফেলা হয়েছে।... অ্যা এম জেড হাসপাতালের ডাক্তার-নার্স-ওযার্ডবয়রা সবাই তরুণ, সবাই নবীন বলে কিনা জানি না—হৃদয়ের উষ্ণতাটা পেয়ে আমি দ্রুত সেরে উঠলাম।

৩০ নভেম্বর দুপুরে আমাকে স্থানান্তরিত করা হলো কেবিনে। আমি তখন বেশ সুস্থ। আমার অক্সিজেন লেভেল, নাড়ির গতি, খাওয়ার রুচি ইত্যাদিতে দশে দশ পাওয়ার মতো অবস্থা। আর জ্বরজারি, শ্বাসকষ্ট, বুকে ব্যথা ইত্যাদি তো শুরু থেকেই ছিল না, মাশাল্লাহ আজও নেই। কেবিনে একটা অতিরিক্ত বেড পেতে আমার আপত্তি সত্ত্বেও শুরু থেকেই আমার ডাক্তার মেয়ে আমার সঙ্গে থাকা শুরু করল। সে লক্ষ্য রাখত সার্বক্ষণিক পরিচর্যার দিকে। আইসিইউতে থাকতে সে সকালে আসত, যেত রাতে আমাকে খাইয়ে-দাইয়ে, ঘুম পাড়িয়ে। আর ওর মাকে আমরা তার নিরাপত্তার কারণে হাসপাতালে খুব একটা আসতে দিতাম না। তিনি বাসা থেকে আমার কিছু কিছু পছন্দের খাবার রান্না করে পাঠিয়ে দিতেন ড্রাইভারকে দিয়ে।

তারপর ডিসেম্বরের ৩ তারিখ কর্তৃপক্ষ আমাকে ছুটি দিয়ে দিলেন, বললেন, হাসপাতালে থাকার আর দরকার নেই, যান বাড়ি যান, বাড়ি গিয়ে আইসোলেশনে থাকুন, পুরোপুরি বিশ্রামে থাকুন, খাওয়া-দাওয়া করুন। কান্তা অবশ্য আমাকে ঢাকা থাকতে দিল না। ঢাকায় নাকি করোনার দাপট বেশি। তা ছাড়া ঢাকায় থাকলে নাকি যত্নআত্তি হবে না। অতএব ধানমণ্ডিতে গিয়ে তাড়াতাড়ি একটা ব্যাগ গুছিয়ে কান্তার সঙ্গে গাড়িতে করে রওনা দিলাম সিলেট। তখন সন্ধ্যা ছয়টার মতো বাজে। সিলেটে কান্তাদের বাসায় পৌঁছাতে পৌঁছাতে রাত দুটো।

২.

শুরু হলো করোনার শেষ পর্ব। কান্তাদের বিশাল ফ্ল্যাটে আমরা মাত্র তিনজন–আমি, কান্তা ও তৌফিক। ওদের একমাত্র সন্তান গাজীপুর আইইউটির প্রথম বর্ষের ছাত্র ইশমাম দাদির সঙ্গে ঢাকায়। সিলেট পৌঁছার দিন দুয়েকের মাথায় দুঃসংবাদ : কান্তা-তৌফিক দুজনেই কভিড-১৯ আক্রান্ত। অর্থাৎ আমরা তিনজন তিন কামরায় আইসোলেশনে। ১২ তলা দালানটিতে বাইরের কারো যাওয়া-আসা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। আমাদের সময় কাটে নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা বলে, পত্রিকা পড়ে, টিভি দেখে। আমার নাতির আবার ওই বয়সেই বাংলা-ইংরেজি বইয়ের কালেকশন খুবই ভালো। কোনো কাজকর্ম না থাকায়, লেখালেখিতেও ক্লান্তি লাগায় বইটই পড়ে সময় কাটালাম ওখানে। অসুখের পর থেকে ঘুম হতো না ভালো। সারা রাত ঘুমের হাতে-পায়ে ধরে সাধাসাধি করতাম। তবে শুরু থেকেই কোথা থেকে আমাকে রাক্ষুসে ক্ষুধায় পেয়ে বসেছিল। কান্তারা সেই সুযোগ নিল পুরোপুরি। ফলে আমার ওজন এক মাসে বেড়ে গেল পাঁচ কেজি।

দেখতে দেখতে একরকম গৃহবন্দি অবস্থায় কেটে গেল মাসখানেক। তারপর একদিন তিনজনেরই আবার করোনা টেস্ট হলো এবং তিনজনেরই আলহামদুলিল্লাহ রেজাল্ট হলো নেগেটিভ। কিন্তু আজ প্রায় সাড়ে তিন মাস পরও শারীরিক দুর্বলতাটা কিছুতেই যাচ্ছে না আমার। কর্মস্পৃহা নেই মোটেই। সারা দিন শুধু কুঁড়ের বাদশাহ হয়ে শুয়ে থাকতে ইচ্ছে করে। অথচ রাত-দিন চোখে ঘুম নেই বললেই চলে।

 শেষ করার আগে অভিজ্ঞতা থেকে দু-একটি কথা বলতে চাই। আমি বা আমরা তো আল্লাহর রহমতে সেরে উঠলাম ঠিকই; কিন্তু ওই সময়ে কত আপনজন, কত বিখ্যাত ব্যক্তির মৃত্যুসংবাদ যে পেতে হলো। প্রতিটি দুঃসংবাদ তখন সমগ্র চৈতন্যকে দুমড়ে-মুচড়ে দিত। আল্লাহপাক তাঁদের সকলকে, সকলের আত্মাকে অনন্ত শান্তি দান করুন। আমিন।

আর ব্যক্তিগত উপলব্ধি হলো পবিত্র কুরআন শরিফের একটি আয়াত : কল্লু নাফসিন যাইকাতুল মাউত (প্রত্যেক জীবিত প্রাণীকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে)। অতএব এই অমোঘ সত্যকে নিয়ে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। শেকসপিয়ার বাবাজি চার শ বছর আগেই তো সোজাসাপ্টা হিসাব দিয়ে গেছেন : টু ডাই, টু স্লিপ নো মোর। (হ্যামলেট, ৩য় অঙ্ক, ১ম দৃশ্য)। আমি সেই প্রথম দিন থেকে আজ অব্দি করোনাকে নিয়ে খুব একটা শঙ্কিত বা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত নই। সেই পুরনো ইংরেজি গানের কলি, যার মর্মকথা ছাত্রজীবন থেকে গত সাত দশক ধরে আমার ভালো লেগে এসেছে, আমি বরং তাই আঁকড়ে থাকতে চাই : ক্যায় স্যারা স্যারা/হোয়াটএভার উইল বি উইল বি/দ্য ফিউচার ইজ নট আওয়ারস টু সি।

পাদটীকা : কোনো উপদেশ-টুপদেশ নয়। এগুলো যারা দেবার তারা তো রোজ নিয়মমাফিক দিয়েই যাচ্ছেন। আর যারা কানে দিয়েছি তুলো/পিঠে বেঁধেছি কুলো নীতিতে বিশ্বাসী তারা যেন কসম খেয়েছেন ‘মাস্ক পরব না, হাত ধোবো না, শারীরিক দূরত্ব মানব না—দেখি কী করতে পারেন করেন।’

করোনা আমাদের নতুন করে মনে করিয়ে দিল আমরা কত বিশৃঙ্খল, যথেচ্ছাচারী একটি জাতি। আমরা ব্যক্তিগত ও জাতীয় জীবনে আইন-কানুন-শৃঙ্খলা না মানলে একদিন দেখব আমরা দুই পা এগিয়ে তিন পা পিছিয়ে পড়েছি। সেটাই কি চাই আমরা?

আজকের নিবন্ধটি অ্যা এম জেড হাসপাতালের আমার সন্তানতুল্য নিবেদিতপ্রাণ নবীন ডাক্তার ও স্বাস্থ্যকর্মীদের কৃতজ্ঞতার সঙ্গে উৎসর্গ করতে চাই। তারা হচ্ছে : অধ্যাপক রোবেদ আমিন, অধ্যাপক আহমেদুল কবীর স্বপন, ডা. মোহাম্মদ সায়েম, ডা. সুরভী, ডা. সানজিদা, ডা. মোস্তাকিম, ডা. সজীব, সিস্টার বৃষ্টি, সিস্টার ফারজানা এবং স্বাস্থ্যকর্মী হাসান ও নাসিম। তারা সবাই দীর্ঘজীবী ও সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হোক। তাদের সেবাদানের মাধ্যমে এ দেশ আরো সমৃদ্ধ হোক ও দেশের মানুষের নয়নের মণি হোক তারা।

লেখক : সাবেক সচিব, কবি
[email protected]

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা