kalerkantho

রবিবার। ২৮ চৈত্র ১৪২৭। ১১ এপ্রিল ২০২১। ২৭ শাবান ১৪৪২

ফ্ল্যাট ঋণ জালিয়াত চক্রে ইসির পাঁচ কর্মী

এস এম আজাদ   

১৩ মার্চ, ২০২১ ০৩:২৪ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ফ্ল্যাট ঋণ জালিয়াত চক্রে ইসির পাঁচ কর্মী

ভুয়া নথিপত্র তৈরি করে ফ্ল্যাট কেনার নামে ব্যাংকসহ আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণের নামে অর্থ হাতিয়ে নেওয়া চক্রের সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) কমপক্ষে পাঁচ কর্মী জড়িত। তাঁরা টাকার বিনিময়ে এনআইডি সার্ভারে একজনের তথ্যের স্থানে অন্যজনের তথ্য ও ছবি আপলোড করে দিতেন। আর জালিয়াতির কাজটি শেষ হলেই ওই নকল ছবি ও তথ্য সরিয়ে ফেলার ব্যবস্থা করতেন।

গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) তদন্তে বেরিয়ে আসা ইসির ওই পাঁচ কর্মী হলেন পিয়ন সাজ্জাদ, কর্মী আজিজ ও সাফিন আহমেদ সাফি, তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী শাহজাদ এবং কম্পিউটার অপারেটর শাহাদাত। সম্প্রতি ইসি বিভিন্ন অভিযোগে ৪৪ কর্মীকে সাময়িক বহিষ্কার করেছে। তাঁদের মধ্যে এই চক্রের অন্তত দুজন রয়েছেন। ফ্ল্যাট কেনাবেচার নামে জালিয়াতির কারবার চালাতে আল আমিন ওরফে জামিল শরীফ ও খ ম হাসান ইমাম ওরফে বিদ্যুৎ নামের দুই ব্যক্তি অফিস খুলে বসেন। আর আব্দুল্লাহ আল শহীদ নামে কথিত এক সাংবাদিক ভুয়া এনআইডি তৈরির ঠিকাদারি কাজ করেন। ইসির অস্থায়ী সার্ভার ভবনের পাশে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের নিরাপত্তাকর্মী বিপ্লব মিয়া ইসি কর্মীদের দিয়ে অপকর্ম করিয়ে নেন। চক্রটি একের পর এক জালিয়াতি করে ঢাকায় ১১টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণের নামে ২০ কোটি টাকার বেশি হাতিয়ে নিয়েছে।

একে একে ২৪টি ফ্ল্যাটের ঋণের নামে এই অর্থ আত্মসাতের বিষয়টি ধরা পড়েছে ঢাকা ব্যাংকের পক্ষ থেকে দায়ের হওয়া মামলার তদন্তে। গত ৭ ডিসেম্বর খিলগাঁও এবং ১২ ডিসেম্বর পল্টন থানায় এসব মামলা করা হয়।

জালিয়াতির এসব ঘটনায় এরই মধ্যে ৯ জন গ্রেপ্তার হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে বিপ্লব গত ১ মার্চ ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন। আল আমিন ওরফে জামিল শরীফ, খ ম হাসান ইমাম ওরফে বিদ্যুৎ, আব্দুল্লাহ আল শহীদ, রেজাউল ইসলাম ও শাহ জামানকে আদালতের নির্দেশে তিন দিনের রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে দোহারের নির্বাচন কমিশন অফিসের প্রকল্পের কর্মী সাফিন এবং মূসা ও সাইফুল কবির নামে দুই সহযোগীকে গ্রেপ্তার করেছে ডিবি পুলিশ। 

নির্বাচন কমিশন সচিব হুমায়ুন কবির খন্দকার সাংবাদিকদের বলেন, ‘পুরো বিষয়টি জেনে তদন্ত করে দেখা হবে। কোনো সংস্থা অফিশিয়ালি বিষয়গুলো জানালে আমরা তদন্ত করে অবশ্যই দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব।’

ডিবি পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার এ কে এম হাফিজ আক্তার বলেন, সম্প্রতি এনআইডি বিভাগ থেকে তাঁদের চিঠি দেওয়া হয়েছে। তাতে জানানো হয়েছে, ভুয়া এনআইডি তৈরি ও অন্যান্য জালিয়াতিতে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগে তারা ৪৪ জন কর্মচারীকে বরখাস্ত করেছে। গ্রেপ্তার হওয়া চক্রের কেউ কেউ বরখাস্তের তালিকায় রয়েছেন।

ঢাকা ব্যাংকের পক্ষ থেকে করা মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, ঋণগ্রহীতা কিস্তি পরিশোধ না করায় নোটিশ দিয়ে শেষে তারা মামলা করে। ওই মামলা করা হয় ভুয়া ফ্ল্যাট মালিক বা ক্রেতার বিরুদ্ধে। জড়িত করা হয় বিক্রেতাকেও। মামলার তদন্তে নেমে নির্দিষ্ট ঠিকানায় বিক্রেতা ও ক্রেতার হদিস পায়নি ডিবি। এর সূত্র ধরে শুরু হয় তদন্ত। বেরিয়ে আসে প্রতারণার কাহিনি।

সূত্র মতে, ঢাকা ব্যাংকের দুটি ঘটনা ছাড়াও চক্রটি যমুনা ব্যাংক থেকে তিনটি, এনআরবিসি ব্যাংক থেকে একটি, ডাচ্-বাংলা ব্যাংক থেকে একটি, সিটি ব্যাংক থেকে একটি, পুরনো ইউনিয়ন ব্যাংক থেকে তিনটি, ওয়ান ব্যাংক থেকে দুটি, ফার্স্ট লিজিং থেকে পাঁচটি, পিপলস লিজিং থেকে তিনটি, প্রিমিয়ার লিজিং থেকে একটি এবং ফনিক্স লিজিং থেকে একটি হোম লোন নিয়েছে। এসব ঋণের একেকটির পরিমাণ ৬০ লাখ থেকে দুই কোটি টাকা পর্যন্ত।

গ্রেপ্তারকৃত ছয় প্রতারকের মধ্যে হোতা হলেন আল আমিন ওরফে জামিল শরীফ ও খ ম হাসান ইমাম ওরফে বিদ্যুৎ। আল আমিন আগে ইনস্যুরেন্স কম্পানিতে চাকরি করতেন। হাসান ইমাম ছিলেন রি-রোলিং মিলের কর্মী। আব্দুল্লাহ আল শহীদ একটি নামসর্বস্ব অনলাইন পত্রিকার প্রধান সম্পাদক পরিচয়ের আড়ালে ভুয়া এনআইডি তৈরি করে দেওয়ার কাজ করতেন। রেজাউল ইসলাম ও শাহ জামান জাল ট্রেড লাইসেন্স ও টিন সার্টিফিকেট তৈরিতে সহায়তা করতেন। তাঁরা গাউসুল আজম মার্কেটে প্রিন্টের ব্যবসা করেন। আর বিপ্লব মিয়া ইসলামিক ফাউন্ডেশন ভবনের নিরাপত্তাকর্মী।

জাল এনআইডি তৈরি হলে আল আমিন ও বিদ্যুৎ তা আব্দুল্লাহ আল শহীদের মাধ্যমে বিপ্লবের কাছে দিতেন। বিপ্লব এনআইডি ভবনে যাওয়া-আসার সূত্রে পরিচিত ছিলেন পিয়ন সাজ্জাদ, কর্মী আজিজ ও সাফিন, তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী শাহজাদ এবং কম্পিউটার অপারেটর শাহাদাতের সঙ্গে। দোহারের নির্বাচন কমিশন কার্যালয়ের প্রকল্পের কর্মী সাফিন এবং মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া কার্যালয়ের জাকিরকে দিয়েই নকল এনআইডি তৈরি করতেন বিপ্লব। এ পর্যন্ত ৫০ থেকে ৬০টি নকল এনআইডি তৈরি করেছেন তিনি। এ জন্য তিনি নিতেন ৫০ থেকে ৭০ হাজার টাকা করে।

যেভাবে প্রতারণা : তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, প্রতারকচক্রের সদস্যরা প্রথমে কোনো একটি ব্যাংকের শাখাকে টার্গেট করেন। ফ্ল্যাটের বিপরীতে ঋণ নেওয়ার কথা বললে ব্যাংক কর্মকর্তারা সেই ফ্ল্যাট ভিজিট করতে চান। প্রতারকরা আগে থেকেই একটি ফ্ল্যাট বিক্রির সাইনবোর্ড ঠিক করে ব্যাংক কর্মকর্তাদের সেখানে নিয়ে যান। পরবর্তী সময়ে প্রতারকদলের সদস্যরা সেই বিক্রেতার জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি নিয়ে আসেন। সেই এনআইডির ছবি পরিবর্তন করে ভুয়া এনআইডি তৈরি করে ব্যাংকে জমা দেন। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ সেই এনআইডি সার্ভারে যাচাই করে ঠিক দেখতে পেয়ে ঋণ অনুমোদন করে দেয়।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা