kalerkantho

বুধবার । ১ বৈশাখ ১৪২৮। ১৪ এপ্রিল ২০২১। ১ রমজান ১৪৪২

দিল্লির চিঠি

বাংলাদেশ ও ভারতকে পাশাপাশি থাকতে হবে

জয়ন্ত ঘোষাল   

৯ মার্চ, ২০২১ ০৪:১৩ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



বাংলাদেশ ও ভারতকে পাশাপাশি থাকতে হবে

২৬ ও ২৭ মার্চ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশ সফরে যাচ্ছেন। এবার এই ঢাকা সফরকে কেন্দ্র করে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয়ে ব্যাপক তৎপরতা দেখা দিয়েছে। ঢাকা ও ভারত—এই দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক হোমওয়ার্ক দারুণভাবে শুরু হয়ে গেছে। রবীন্দ্রনাথের সেই বিখ্যাত কথাটা আরেকবার ব্যবহার করলে বোধ হয় দোষ হবে না, ‘আরম্ভের আগেও আরম্ভ থাকে। সন্ধের প্রদীপ জ্বালানোর আগে বিকেলের সলতে পাকানো।’ এখন এই সলতে পাকানোর কাজ শুরু হয়ে গেছে।

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্কর ঢাকা সফর করে এলেন। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেনের সঙ্গে তাঁর সুদীর্ঘ বৈঠক হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও জয়শঙ্করের সম্পর্ক অত্যন্ত মধুর। পররাষ্ট্রসচিব হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা ভারতের পক্ষ থেকে বাংলাদেশে হাইকমিশনার ছিলেন। তিনিও ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফরের পেছনে একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। এবারের প্রধানমন্ত্রীর সফর এমন একটা সময়ে হচ্ছে, যখন পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচন আসন্ন। পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচন শুরু হচ্ছে ২৭ মার্চ। আর প্রধানমন্ত্রী ২৬ মার্চ ঢাকা পৌঁছে ২৭ মার্চ গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পৈতৃক বাড়ি দেখতে যাচ্ছেন। এমনটাই ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানাচ্ছে।

শুধু তা-ই নয়, প্রধানমন্ত্রী এই সফরে ওরাকান্দিতেও ঘুরে আসতে চান। ১৮১২ মতান্তরে ১৮১১ সালের ১১ মার্চ ওরাকান্দিতে মতুয়া ধর্মমতের প্রবক্তা হরিচাঁদ ঠাকুরের জন্ম। তাঁর বাণী ও নির্দেশাবলি তাঁরই পুত্র গুরুচাঁদ ঠাকুরের হাত ধরে গোটা বাংলায় ছড়িয়ে পড়েছিল। তাঁরও জন্মস্থান ওরাকান্দিতে। প্রত্যন্ত এই গ্রাম মতুয়া সম্প্রদায়ের কাছে সর্বোচ্চ মর্যাদার তীর্থস্থান। সেখানে একটি মন্দির আছে, যেটি প্রধানমন্ত্রী গিয়ে দেখতে চান। হরিচাঁদ-গুরুচাঁদকে প্রণাম করে এলে পশ্চিমবঙ্গের মতুয়া সম্প্রদায় প্রধানমন্ত্রীর প্রতি বিশেষভাবে সন্তোষ প্রকাশ করবে—এমনটাই মনে করছে বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব। সুতরাং প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের দ্বিপক্ষীয় কূটনৈতিক সম্পর্কের পাশাপাশি তিনি পশ্চিমবঙ্গের মতুয়া সম্প্রদায়ের কাছেও একটা বার্তা দিতে আগ্রহী বলে অনেকে মনে করছেন। কিন্তু এটা তো হলো একটা খুব ক্ষুদ্র দিক, যেটা ভারতের একটা অঙ্গরাজ্যের নির্বাচনের সঙ্গে যুক্ত। শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে মতুয়াদের তীর্থস্থানে যাওয়া সম্ভব হবে কি না এখনো চূড়ান্তভাবে তার নিশ্চয়তা ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দিচ্ছে না। তার কারণ সেখানে হেলিপ্যাড নেই। হেলিকপ্টার নামাতে অসুবিধা। সেখানে পৌঁছানোর রাস্তায় অনেক নিরাপত্তাজনিত দিক আছে। ঢাকা এ ব্যাপারে উৎসাহিত হলেও ভারতের এসপিজির নিরাপত্তা দল এখনো এই সফরের কোনো ক্লিয়ারেন্স দেয়নি।

তবে এবারের ভারতের প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফর সম্পর্কে বলা যায় যে প্রধানমন্ত্রী প্রথম থেকেই যেভাবে ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ককে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন, সেখানে বিজেপির কোনো ক্ষুদ্র রাজনীতি তার সঙ্গে যুক্ত নয়। পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে নরেন্দ্র মোদির সংঘাত হতে পারে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তিস্তা চুক্তির ক্ষেত্রে বাদ সাধাতেই চুক্তিটি সম্পাদন করতে নরেন্দ্র মোদি বা বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব পারেননি। এটা যেমন সত্য। আবার এটাও সত্য যে নরেন্দ্র মোদি এবারের সফরে গিয়েও এই কথাটা জানাবেন, যেটা এরই মধ্যে জয়শঙ্করের মাধ্যমে শেখ হাসিনাকে জানানো হয়েছে, যে তিস্তা চুক্তি সম্পাদনা এখনো না হলেও তিস্তা নদীর চুক্তি বিষয়ে ভারতের যে কমিটমেন্ট, সেই কমিটমেন্ট থেকে ভারত সরে আসেনি। তাদের অবস্থানগত কোনো পরিবর্তন হয়নি। চুক্তি যাতে হয়, আশা করা যায় তার জন্য সব রকমের চেষ্টা নতুন উদ্যোগে নরেন্দ্র মোদি শুরু করবেন। পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের কী ফল হয় তা কেউ জানে না। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী ফল যা-ই হোক না কেন এবং যে দল আসুক না কেন, প্রধানমন্ত্রী মনে করছেন পরবর্তী সময়ে তিস্তা চুক্তি সম্পাদন করা একেবারেই অসম্ভব হবে না।

তবে এবারের সফরের আগে মনে রাখতে হবে, ভারত-বাংলাদেশ গত বছর ডিসেম্বর মাসে একটা ভার্চুয়াল সামিট করেছিল। সেখানে গত সেপ্টেম্বরে জয়েন্ট কনসালটেটিভ কমিশনের দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা বৈঠক করেছিলেন। পররাষ্ট্রসচিবরা এবং তার সঙ্গে বিদ্যুৎসচিব, স্বরাষ্ট্রসচিব, পুলিশপ্রধান, বিএসএফ, বাংলাদেশের বিজিবি এবং প্রতিরক্ষা বিভাগের মধ্যে একটা আলাপ-আলোচনা ও বৈঠক হয়েছিল।

শেখ হাসিনার ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করে জয়শঙ্কর বলেছেন, বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নতি হচ্ছে। সেটা দুই রাষ্ট্রের মধ্যে সম্পর্ককে, নেতৃত্বকে আরো এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। এই অঞ্চলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে তার প্রতিফলন হচ্ছে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে। এটা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষে বা মুজিববর্ষে একদিকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ৫০ বছর, আরেক দিকে আমাদের দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কেরও ৫০ বছর। এই উদযাপনের জন্য প্রধানমন্ত্রী গেলেও এই উদযাপন সামনে রেখে সুদূর-অতীতের স্মৃতিচারণা নয়, আগামী দিনে কিভাবে এই সম্পর্ককে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায় তার জন্য বাস্তবের মাটিতে দাঁড়িয়ে সব রকমভাবে দুই দেশের মধ্যে এবার আলাপ-আলোচনা হবে। সেই কারণে প্রধানমন্ত্রীর ঢাকা সফর এবার অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

জয়শঙ্কর ঢাকায় গিয়ে বলেছেন, করোনা কূটনীতির ক্ষেত্রেও প্রতিষেধক দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে। এই প্রতিষেধক দেওয়ার বিষয়টা বন্ধ হচ্ছে না। তার একটা পথনির্দেশিকা তৈরি করা হয়েছে। সেটা বাংলাদেশকে পাঠানো হচ্ছে। বাংলাদেশ সেরাম ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়া থেকে প্রতিষেধক কিনছে। সেটা বাংলাদেশের মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। সেগুলোকে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে ফ্রি অব কস্ট। সেটা অত্যন্ত যোগ্যতার সঙ্গে শেখ হাসিনা গ্রামাঞ্চলে পৌঁছে দিচ্ছেন, সে কথা জয়শঙ্কর স্বীকার করেছেন। তিনি মুক্তকণ্ঠে বলেছেন, তিস্তা ছাড়াও অন্য নদীগুলোর ক্ষেত্রেও ওয়াটার রিসোর্স সেক্রেটারিরা আলাপ-আলোচনা করবেন এবং আলাপ-আলোচনা করেছেন। কিছুদিন আগে দিল্লিতেও আলাপ-আলোচনা হয়ে গেছে।

সব মিলিয়ে এখন এক উৎসবের পরিবেশ। দিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনও একটি অনুষ্ঠান করে, ভারত-বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের পরিপ্রেক্ষিতে মুজিববর্ষ এবং ১৯৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধের অর্ধশতবর্ষ পালনের ব্যবস্থা করেছেন। আলোচনাসভা এবং নানা রকম সাংস্কৃতিক কার্যকলাপ দুই দেশেই হচ্ছে এবং আরো হবে।

এ রকম একটা পরিস্থিতিতে একটা কথাই বলা যায়, করোনা-উত্তর কূটনীতি নিয়ে এবং প্রতিষেধকের বণ্টন নিয়ে গোটা পৃথিবী ব্যস্ত। যখন চীন ও ভারতের  মধ্যে আপাতত একটা সংঘর্ষ-বিরতি দেখা যাচ্ছে, ভারত-পাকিস্তানের মধ্যেও একটা সংঘর্ষ-বিরতির সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে; তবু ভারত কিন্তু চীন-পাকিস্তান অক্ষ নিয়ে খুব সতর্ক। বাংলাদেশের জিওস্ট্র্যাটেজিক পজিশন সম্পর্কে এই মুহূর্তে নরেন্দ্র মোদি বিশেষভাবে ওয়াকিফহাল। সুতরাং এই পরিস্থিতিতে ভারত চাইছে, উপমহাদেশে শান্তি আসুক। শেখ হাসিনাও চাইছেন দুই দেশের মধ্যে শান্তির বাতাবরণ সৃষ্টি  করতে। শুধু তা-ই নয়, এই উপমহাদেশে শান্তির পরিবেশ রচনার চেষ্টাও চলছে। কিন্তু গোটা উপমহাদেশের পরিস্থিতি যা-ই হোক না কেন, বাংলাদেশ ও ভারতকে পাশাপাশি থাকতে হবে। সেটা ভারত যে গভীরভাবে চাইছে, সেই বার্তাটা দেওয়াই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির এই আসন্ন সফরের সব থেকে বড় লক্ষ্য।

লেখক : নয়াদিল্লিতে কালের কণ্ঠ’র
বিশেষ প্রতিনিধি

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা