kalerkantho

মঙ্গলবার । ৭ বৈশাখ ১৪২৮। ২০ এপ্রিল ২০২১। ৭ রমজান ১৪৪২

সন্দেহটাই সত্য হলো

আলী হাবিব   

৯ মার্চ, ২০২১ ০৪:০৫ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



সন্দেহটাই সত্য হলো

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি যখন স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী উপলক্ষে ১৯ দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করে, তখন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহলে এক ধরনের আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছিল। কারণ ওই ১৯ দিনের মধ্যে একটি দিন ছিল ৭ই মার্চ উপলক্ষে আলোচনাসভা। রাজনৈতিক সচেতন মহলের আগ্রহ ছিল এ কারণেই। অনেকেরই ধারণা ছিল বিএনপি বোধ হয় নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে মুক্তিযুদ্ধের পথে ফিরতে চাইছে। রাজাকারদের সঙ্গ ত্যাগ করবে। ফিরবে ইতিহাসের সত্যের পথে। কারণ ৭ই মার্চ নিয়ে কোনো অনুষ্ঠান করলে তো সেখানে বঙ্গবন্ধুর কথা আসবে। ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের কথা আসবে। ভাষণটি বিশ্লেষণ করলে বিএনপির রাজনৈতিক বিশ্বাসের জায়গাটিই তো থাকে না। তখন কী হবে। ভুল ভাঙে মার্চের প্রথম দিনেই, যখন বিএনপি তাদের মার্চের কর্মসূচি উদ্বোধন করায় তারেক রহমানকে দিয়ে। হতে পারে তারেক রহমান বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। কিন্তু ব্যক্তিটি তো আদালতের রায়ে দণ্ডিত ও পলাতক। একজন দণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামিকে দিয়ে বিএনপি কী করে স্বাধীনতা দিবসের মাসব্যাপী কর্মসূচি উদ্বোধন করায় এ প্রশ্ন তুলে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, বিএনপির ঐতিহাসিক ৭ই মার্চ পালনের কর্মসূচি ‘রাজনৈতিক ভণ্ডামি’ ছাড়া আর কিছু না।

সব কিছু মিলিয়েই দেশের রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহলে আলোচনার বিষয় ছিল বিএনপির ৭ই মার্চের আলোচনা সভাটি। টেলিফোনে কথা হচ্ছিল এক রাজনৈতিক বিশ্লেষকের সঙ্গে। তিনি মজা করে বললেন, তাঁর ধারণা, ৭ই মার্চে বঙ্গবন্ধুর দেওয়া ঐতিহাসিক ভাষণটি নিয়ে বিএনপি নেতারা নতুন কিছু তথ্য হাজির করবেন। কী সেই তথ্য? তিনি বললেন, বিএনপি নেতারা হয়তো বলবেন, বঙ্গবন্ধু জিয়াউর রহমানের সঙ্গে আলোচনা করেই ৭ই মার্চের ভাষণটি দিয়েছিলেন।

শেষ পর্যন্ত পর্যবেক্ষক মহলের সন্দেহটাই সত্য হলো। স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীর অনুষ্ঠানমালায় নতুন করে ইতিহাস বিকৃতির পথে গেল বিএনপি।

বিএনপির ৭ই মার্চের আলোচনাসভায় নতুন করে আবারও জানা হয়ে গেল দলটি তাদের প্রতিষ্ঠাতাকে অস্বীকার করতে চায়। আলোচনাসভায় বক্তৃতায় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগ অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে এই নতুন প্রজন্মকে সেই ইতিহাস থেকে বঞ্চিত করে তাদের ভ্রান্ত ইতিহাস দিচ্ছে। একটা ধারণা দিচ্ছে যে একটিমাত্র দল, একজনই মাত্র ব্যক্তি আর একটি গোষ্ঠী, যারা এ দেশের সব কিছু এনে দিয়েছে। মিথ্যা ইতিহাস দিয়ে তারা প্রজন্মকে বিভ্রান্ত করছে।’

ইতিহাস বিকৃতির নিদর্শন তো ওই দিনের আলোচনাসভায় জাতীয় প্রেস ক্লাব মিলনায়তনের ব্যানারেই ছিল। ব্যানারের একদিকে ১৯৭১ সালে উত্তোলিত মানচিত্রসংবলিত লাল-সবুজ জাতীয় পতাকা এবং অন্যদিকে ছিল জিয়াউর রহমান, খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের ছবি। আচ্ছা, ৭ই মার্চের সঙ্গে জিয়াউর রহমান, খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের যোগসূত্রটা কী? অর্থাৎ বিএনপি বঙ্গবন্ধুকে উপেক্ষা করতে গিয়ে মিথ্যাকে আশ্রয় করার পথ বেছে নিয়েছে। এখানেই শেষ নয়। ‘যুদ্ধ কাহাকে বলে? সংগ্রাম বলিতে কী বোঝায়?’ এসব বিষয়েও জাতিকে জ্ঞান দিতে পিছপা হননি মির্জা ফখরুল। বলেছেন, ‘যুদ্ধ হচ্ছে অস্ত্র হাতে সশস্ত্রভাবে আপনি একজন প্রত্যক্ষ শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করতে শুরু করেন। আর সংগ্রাম একজন মানুষ ও জাতি করে। যুদ্ধ ও সংগ্রাম এটা আমাদের দীর্ঘদিনের। যাঁরা গবেষণা করছেন, তাঁদের গবেষণায় উঠে এসেছে যে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের যে ঘোষণা, সেই ঘোষণাই সমগ্র জাতিকে উদ্দীপ্ত করেছে স্বাধীনতাযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য।’ 

এবার আরেক মির্জার কথা। এলাকার লোকজনকে সঙ্গে নিয়ে ভাষণ শুনতে গিয়েছিলেন মির্জা আব্বাস। তাঁর আশা ছিল একটা ঘোষণা আসবে। তিনি নাকি হতাশ হয়েছিলেন। তিনি বলেছেন, ‘যদি কেউ বলেন যে কোনো এক মেজরের ঘোষণায় এ দেশ স্বাধীন হয়নি; তাহলে আমরাও বলতে পারি, ৭ই মার্চের কারণে দেশ স্বাধীন হয়নি।’ ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, ‘রেসকোর্স ময়দানে ৭ মার্চ উনি ভাষণ দিলেন, স্বাধীনতার ঘোষণা এলো না।’

মির্জা ফখরুল, মির্জা আব্বাস, ইকবাল হাসান মাহমুদ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণে স্বাধীনতার ঘোষণা খুঁজে না পেলেও পাকিস্তান সামরিক গোয়েন্দা বাহিনীর এক কর্মকর্তা কিন্তু ঠিকই তা খুঁজে পেয়েছেন। তিনি তাঁর প্রতিবেদনে লিখেছেন, ‘শেখ মুজিবুর রহমান সবার সামনে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে গেলেন অথচ আমরা কিছুই করতে পারলাম না।’

দলটির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের কাছে ৭ই মার্চে বঙ্গবন্ধুর দেওয়া ভাষণটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়েছে। তিনি তাঁর লেখা এক নিবন্ধে বঙ্গবন্ধুর ভাষণটি উল্লেখ করেছেন। জিয়াউর রহমানের এই নিবন্ধটি দৈনিক বাংলা পত্রিকার ১৯৭২ সালের ২৬ মার্চ সংখ্যায় প্রথম প্রকাশিত হয়। ১৯৭৪ সালের ২৬ মার্চ নিবন্ধটি পুনর্মুদ্রণ করে সাপ্তাহিক বিচিত্রা। নিবন্ধে জিয়াউর রহমান উল্লেখ করেছেন, বঙ্গবন্ধুর ভাষণই ছিল তাঁর স্বাধীনতাসংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার প্রেরণা। তিনি লিখেছেন, ‘৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ঘোষণা আমাদের কাছে গ্রিন সিগন্যাল বলে মনে হলো। আমরা আমাদের পরিকল্পনাকে চূড়ান্ত রূপ দিলাম।’ পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সদস্যদের সম্পর্কে ওই নিবন্ধে জিয়া লিখেছেন, ‘‘আমাদের ওরা দাবিয়ে রাখত, অবহেলা করত, অসম্মান করত, বলত—‘আওয়ামী লীগের দালাল’। একাডেমির ক্লাসগুলোতেও সব সময় বোঝানো হতো—আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হচ্ছেন ওদের রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শত্রু।”

১৯৭১ সালে উচ্চশিক্ষার্থে লন্ডনে অবস্থানকারী খন্দকার মোশাররফ হোসেন অবশ্য বঙ্গবন্ধুকে অস্বীকার করতে চান না যে ‘এটা আমরা অস্বীকার করতে চাই না, ওই বক্তব্যের পেছনে সেই সময়ের অবিসংবাদিত নেতা জনাব শেখ মুজিবুর রহমান।’

মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিষয়টি বিএনপি নেতারা সব সময় উপেক্ষা করে এলেও জিয়ার লেখায় স্পষ্ট রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি তাঁর আস্থা।

‘একটি জাতির জন্ম’ নিবন্ধে জিয়াউর রহমান লিখেছেন, ‘পাকিস্তান সৃষ্টির পরপরই ঐতিহাসিক ঢাকা নগরীতে মি. জিন্নাহ যেদিন ঘোষণা করলেন, উর্দু হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা, আমার মতে, সেদিনই বাঙালি হৃদয়ে অঙ্কুরিত হয়েছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদ।’

যে জিয়াউর রহমান নিজেই লিখেছেন, ‘...বাঙালি হৃদয়ে অঙ্কুরিত হয়েছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদ।’ তিনিই আবার বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা সেজেছিলেন ক্ষমতার প্রলোভনে।

লেখক : সাংবাদিক, ছড়াকার

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা