kalerkantho

মঙ্গলবার । ৭ বৈশাখ ১৪২৮। ২০ এপ্রিল ২০২১। ৭ রমজান ১৪৪২

বাংলাদেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণের এক বছর

ডা. মামুন আল মাহতাব স্বপ্নীল   

৮ মার্চ, ২০২১ ০৪:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



বাংলাদেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণের এক বছর

আজ ৮ মার্চ, এ দেশে প্রথম কভিড রোগী শনাক্ত হওয়ার বর্ষপূর্তি। গত বছরের একটা সময়ে আমরা ভাবছিলাম, শেষ পর্যন্ত কভিড বোধ হয় আর এ দেশে এলো না, বিশেষ করে উহান থেকে কভিড আমদানি ঠেকিয়ে আমরা বেশ আত্মতুষ্টিতেই ভুগছিলাম। আমাদের সেই দিবাস্বপ্ন ভেঙে গিয়েছিল মার্চের এই দিনে। তারপর শুরু আমাদের দুঃস্বপ্নকাল। গত মার্চে দাঁড়িয়ে কেউ যদি একবারও বলতেন যে বছর না ঘুরতে আমরা কভিড নিয়ে এতটা স্বস্তিতে থাকব, আমি নিশ্চিত তাঁর কথাকে পাগলের প্রলাপ বলে উড়িয়ে দেওয়া মানুষের কোনো কমতি থাকত না। আজ যখন আমরা বাংলাদেশে প্রথম কভিড-১৯ রোগী শনাক্তের একটি বছর ছুঁলাম, তখন এরই মধ্যে টিকা নিয়ে ফেলেছেন ৩০ লাখেরও বেশি মানুষ। বাংলাদেশ এখন টিকাদানের সংখ্যায় কি শতাংশের হিসাবে দেশের মানুষকে টিকার কাভারেজের মধ্যে আনায় বিশ্বে অন্যতম শীর্ষস্থানীয়।

শুধু ভ্যাকসিন ব্যবস্থাপনায়ই নয়, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী পুরো কভিডের সময়টি এক হাতে সামলেছেন অপরিসীম দক্ষতায়। পৃথিবীর যে দেশগুলো একেবারে শুরুর দিকে লকডাউনে গিয়েছিল বাংলাদেশ তার অন্যতম। এ ক্ষেত্রে পৃথিবীতে শীর্ষ বিশে আমরা। পাশাপাশি লকডাউনে মানুষের জীবন আর জীবিকাকে সচল রাখার জন্য প্রণোদনা ঘোষণায়ও তিনি পৃথিবীতে অগ্রগামী। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কিংবা জাপানের অর্থনীতির আকারের তুলনায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষিত প্রণোদনাগুলো বেশি না হলেও সমানে সমান, কিন্তু অবশ্যই কম নয়। ফলে এ দেশে প্যান্ডেমিক চলাকালীন যেমন না খেয়ে মারা যাননি একজন নাগরিকও, তেমনি বার্লিন, লন্ডন কিংবা আমস্টার্ডামের মতো রাজপথে লকডাউনবিরোধী বিক্ষোভও হয়নি এ দেশে একটিও।

আবার অন্যদিকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো টানা বন্ধ রাখায় বাংলাদেশ পৃথিবীতে এখন শীর্ষ দশে। ইউরোপে দেশে দেশে আমরা দেখছি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার পর কভিডের দ্বিতীয় ধাক্কা, অথচ ওই একই সময় আমরা কভিডকে নিয়ন্ত্রণের দিকে বীরদর্পে এগিয়ে চলেছি। আর আজ যখন আমরা দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো খুলে দেওয়ার ঘোষণা দিচ্ছি, তখনো তাতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রাজ্ঞ নির্দেশনা। দেশের পাবলিক আর প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো খুলে দেওয়া হবে রোজার ঈদের ছুটির পর। কিন্তু তার আগে ভ্যাকসিন দেওয়া হবে দেশের প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী আর আবাসিক ছাত্র-ছাত্রীকে। পৃথিবীতে চলমান কভিড প্যান্ডেমিকের মধ্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার আগে এমন পদক্ষেপ নেওয়ার নজির সম্ভবত দ্বিতীয়টি নেই। অনেকে বলেন, এত লম্বা সময় বন্ধ থাকায় নাকি ধসে যাবে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা। ভুল বোঝানো হচ্ছে আমাদের কোমলমতি শিক্ষার্থীদেরও। আমার নিজের কথাই বলি। ১৯৮৭ সালে এইচএসসি পাস করে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজে আমার শিক্ষাজীবনের সূচনা ১৯৮৮ সালে আর সব প্রফেশনাল পরীক্ষায় নিয়মিত উত্তীর্ণ হয়েও ময়মনসিংহ ছাড়তে ছাড়তে ১৯৯৫ পেরিয়েছিল। নিশ্চয়ই আমি অমানুষ হইনি। যেমন অমানুষ হয়নি আমাদের ১৯৭১-পরবর্তী শিক্ষার্থী প্রজন্ম, যারা এমন একটি সময় শিক্ষিত হয়েছিল, যখন একাত্তরের ৯টি মাস বন্ধ ছিল স্বাভাবিক শিক্ষাদান আর ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছিল গুঁড়িয়ে দেওয়া শিক্ষা অবকাঠামো। আর আজ যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী, তাদের শিক্ষাজীবনও তো এই কয়েক বছর আগেও দফায় দফায় থমকে গিয়েছিল নির্বাচনের আগে-পরে জামায়াত-বিএনপির আগুন সন্ত্রাসে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ রাখা আর খোলায় এসব বিষয় নিশ্চয়ই বিবেচনায় নিয়েছেন; আর সে কারণেই তিনি ‘শেখ হাসিনা’।

কভিড প্যান্ডেমিক নিয়ন্ত্রণে নানা দেশ নানা স্ট্র্যাটেজি অবলম্বন করেছে। সুইডেন আর ব্রিটেন হার্ড ইমিউনিটির পথে হাঁটতে গিয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছে। জাপান ছিল মধ্যবর্তী জায়গায়। সব কিছু নিয়ন্ত্রিত, কিন্তু সচল। কাজে আসেনি সেটিও। ইউরোপের বেশির ভাগ দেশ খুব কড়াকড়ি লকডাউনে গিয়ে সংক্রমণের হার ৫ শতাংশের নিচে নামিয়ে এনে আত্মতুষ্টিতে ভুগেছে কিছুদিন। তারা এখন আবার লকডাউনে। সেখানটায় আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ভিশন ছিল একেবারেই অন্য রকম। তিনি একদিকে যেমন নিজে এগিয়ে এসে মানুষকে সচেতন করার মাধ্যমে কভিডকে বাগে আনার যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছেন, তেমনি অন্যদিকে ‘জীবন আর জীবিকাকে’ পাশাপাশি সচল রেখে দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়েছেন। পৃথিবীর দেশে দেশে প্রবৃদ্ধি যখন কভিডকালে ঋণাত্মকের ঘরে, তখন বাংলাদেশে তা ঈর্ষণীয় ৫ শতাংশে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, আজ থেকে বহু বছর পরে মানবজাতি যখন কভিড নিয়ন্ত্রণে নানা মডেল পর্যালোচনা করবে, তখন তারা বারবার শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে একজন শেখ হাসিনাকে।

এর বড় প্রমাণ কয়েক দিন আগেই বাংলাদেশে এশীয় ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে কভিড নিয়ন্ত্রণে তাঁর গৃহীত স্ট্র্যাটেজির জন্য তাঁকে অভিনন্দিত করেছেন। এর আরো বড় প্রমাণ গত ডিসেম্বরের শেষে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালকও কভিড নিয়ন্ত্রণে সাফল্যের জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি দিয়ে অভিনন্দন জানিয়েছেন। পাশাপাশি তিনি বিশ্বব্যাপী কভিড প্যান্ডেমিক মোকাবেলায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সহযোগিতাও কামনা করেছেন। আর যে ব্লুমবার্গ র‌্যাংকিংয়ে বাংলাদেশ শীর্ষ বিশে আসায় আমাদের এত উচ্ছ্বাস, আমি কিন্তু তা নিয়ে আজ ঠিক ততটাই বিমর্ষ। ব্লুমবার্গ যখন র‌্যাংকিংটি করেছিল, তখন বাংলাদেশে নতুন রোগীর শনাক্তের হার ছিল ১০ শতাংশের কোঠায় আর সে সময় এ দেশের ভ্যাকসিনের নাম-গন্ধও ছিল না। আজ যদি র‌্যাংকিংটি করা হতো তাহলে আমি হলফ করে বলতে পারি, আমরা এই র‌্যাংকিংয়ে শীর্ষ পাঁচেই জায়গা করে নিতাম।

এটা সত্যি যে কভিডের শুরুর দিকে স্বাস্থ্য খাতের নানা অসংগতি আমাদের মর্মপীড়ার কারণ হয়েছে, বিশেষ করে কভিড পরীক্ষার ঘাটতি, নকল পরীক্ষা, ফ্রন্ট লাইনারদের পিপিই সংকট ইত্যাদি নেগেটিভ নিউজ সে সময়টায় ছিল মিডিয়ার অনেকখানি জুড়ে। অভিযোগ উঠেছিল স্বাস্থ্য খাতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নানা দুর্নীতিরও। এর পরপরই পরিস্থিতি দ্রুত বদলাতে থাকে। স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতিবাজদের ওপর খড়্গহস্ত হয় শেখ হাসিনার সরকার। পাশাপাশি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নজরদারিতে স্বাস্থ্য খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের খেদ আর ক্ষোভগুলোও এখন দূরীভূত।

সেই দুঃস্বপ্নময় দিনগুলোকে আজকের স্বস্তির জায়গাটায় নিয়ে আসার একক কৃতিত্ব মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর। আজ যখন কানাডাপ্রবাসী কলিগদের মুখে শুনি ‘এর চেয়ে বাংলাদেশে গিয়ে ভ্যাকসিন নিয়ে আসাই ভালো’ কিংবা আজ যখন আমার চেম্বার সহযোগীরা কোভিশিল্ড নিয়ে কভিড সুরক্ষিত, অথচ ভ্যাকসিন না পাওয়ার বিড়ম্বনায় জরুরি প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও এ দেশে আসতে পারছেন না আমার কানাডীয় সহগবেষক, তখন বুঝি আমরা কতটা সৌভাগ্যবান।

লেখক : অধ্যাপক, চেয়ারম্যান, লিভার বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব
মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় এবং সদস্যসচিব, সম্প্রীতি বাংলাদেশ

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা