kalerkantho

শনিবার । ২৭ চৈত্র ১৪২৭। ১০ এপ্রিল ২০২১। ২৬ শাবান ১৪৪২

৭ই মার্চের ভাষণের নতুন প্রাসঙ্গিকতা

আবদুল মান্নান   

৭ মার্চ, ২০২১ ০৪:০৩ | পড়া যাবে ১১ মিনিটে



৭ই মার্চের ভাষণের নতুন প্রাসঙ্গিকতা

২০২১ সালে একটি ভিন্ন মাত্রায় এসেছে ঐতিহাসিক ৭ই মার্চ। এখন জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ পালিত হচ্ছে। ২৬শে মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তি আর গত ২৬ ফেব্রুয়ারি জাতিসংঘ বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, এক অজ্ঞাত কারণে এই বছর বিএনপি ৭ই মার্চ পালন করবে বলে ঘোষণা দিয়েছে। বিএনপির মহাসচিব বলেছেন, তাঁরা ৭ই মার্চের বক্তৃতাকে খাটো করতে চান না। তিনি হয়তো ভুলে গেছেন বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর তাঁর নেতা ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা, বাংলাদেশের প্রথম সেনাশাসক আইন করে বঙ্গবন্ধুর নাম নেওয়া নিষিদ্ধ করেছিলেন। নিষিদ্ধ করেছিলেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগসহ সব রাজনৈতিক দলের কর্মকাণ্ড। অনেক স্থানে কিছু তরুণ ৭ই মার্চের ভাষণ বাজানোর জন্য গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। যখন জিয়া জামায়াত, মুসলিম লীগ, নেজামে ইসলামসহ অন্য স্বাধীনতাবিরোধী দলগুলোকে রাজনীতি করার জন্য প্রস্তুত করেছেন, তখন তিনি সেই সব দলের সঙ্গে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকেও ঘরোয়া রাজনীতি করার অনুমতি দেন। বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে ১৯৭২ সালে সংবিধান রচিত হলে সেই সংবিধানে এসব স্বাধীনতাবিরোধী দলগুলোকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। এর আগে প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ নির্বাহী আদেশবলে এই সব দল নিষিদ্ধ করেছিলেন। জিয়া এসব স্বাধীনতাবিরোধী দলকে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি করার অনুমতি দেওয়ার আগে পাকিস্তানি নাগরিক, একাত্তরে জামায়াতে ইসলামীর আমির ও সেই সময়কালের ঘাতকদের শিরোমণি গোলাম আযমকে বাংলাদেশে আসার অনুমতি দেন।

কেমন হবে বিএনপির ৭ই মার্চ পালন তার কিছু আলামত পাওয়া যাচ্ছে। বিএনপির একজন নেতা তো বলেই ফেলেছেন, ৭ই মার্চের বক্তৃতা শুনে বাংলাদেশের মানুষ মুক্তিযুদ্ধে যায়নি, তারা জিয়ার তথাকথিত ঘোষণার জন্য অপেক্ষা করছিল। কথাবার্তা শুনে মনে হয়, বিএনপির নেতাদের ইতিহাসজ্ঞান কম। তাঁদের জানা উচিত আভিধানিক অর্থে বিশ্বের কোনো দেশে কারো ঘোষণা শুনে ফুটবল খেলার মতো মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়নি। যেকোনো মুক্তিযুদ্ধের জন্য দীর্ঘ প্রস্তুতির প্রয়োজন হয়। কোনো দেশের স্বাধীনতা বা মুক্তি কেন প্রয়োজন তার যুক্তিসংগত সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণ থাকতে হয়। সেই কারণগুলোকে জনগণের কাছে নিয়ে যেতে হয় বা জনগণ নিজ থেকেই তা উপলব্ধি করেন। মুক্তি বা স্বাধীনতার জন্য তাদের সেই প্রত্যাশা পূরণ করতে হলে চাই সংগঠন আর যোগ্য নেতৃত্ব। বিএনপির অনেক পণ্ডিত রাজনীতিবিদ আছেন। তাঁদের অনুরোধ করি, আর কিছু না হোক অন্তত যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ইতিহাস পড়ে দেখুন। বাংলাদেশেও পাকিস্তানের দীর্ঘ ২৩ বছরের শাসনকালে এই কাজটি আওয়ামী লীগ করেছে। মূল নেতৃত্বে ছিলেন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী আর শেখ মুজিবুর রহমান। একসময় মওলানা ভাসানী আওয়ামী লীগ থেকে সরে গিয়ে নিজে ন্যাপ গঠন করেন এবং ১৯৫৮ সালে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আইয়ুব খান দেশটির ক্ষমতা দখল করলে মওলানা ভাসানী তাঁকে সমর্থন করা শুরু করেন। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী পাকিস্তানি কারাগারে দীর্ঘদিন কাটানোর পর মুক্তি পেয়ে বৈরুতে ইন্তেকাল করেন। এরপর আওয়ামী লীগের হাল ধরেন দলের সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিব। কিছুদিন আবদুর রশিদ তর্কবাগীশ দলের প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেন। দলের সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিব ছয় দফা ঘোষণা করলে তিনি তাঁর সঙ্গে দ্বিমত প্রকাশ করে দল থেকে পদত্যাগ করেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হলে তিনি ও মওলানা ভাসানী সেই হত্যাকাণ্ডে তাঁদের সমর্থন প্রকাশ করেন। এই সব ইতিহাস বিএনপি নামক সংগঠনটির কজন জানেন তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। বিএনপির ৭ই মার্চ পালন উপলক্ষে দলের শীর্ষ ইতিহাসবিদ, দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও লন্ডনে পলাতক তারেক রহমান যদি ঘোষণা করেন, ‘শেখ মুজিব ৭ই মার্চ বক্তৃতা দিতে যাওয়ার আগে তাঁর পিতার সঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরে আলাপ করে যান’, তাহলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। হয়তো বিএনপির মহাসচিব এমনও বলতে পারেন, জিয়া যে লিখিত ভাষণ শেখ মুজিবকে দিয়েছিলেন তা-ই তিনি সেদিন রমনা রেসকোর্সে পাঠ করেছিলেন। গত মঙ্গলবার মির্জা ফখরুল রাজশাহীতে তাঁদের দলের এক অঙ্গসংগঠনের সভায় গণতন্ত্রের সবক দিচ্ছিলেন। সেই সভায় আবার একজন জানিয়ে দিলেন ২১ আগস্ট ছিল ১৫ই আগস্টের ধারাবাহিকতা। কী ভয়াবহ উচ্চারণ!

আসি ৭ই মার্চের সেই ঐতিহাসিক জনসভায় বঙ্গবন্ধুর ভাষণ প্রসঙ্গে। তার আগে আমাদের ওই সময়ের এক সপ্তাহ আগের ঘটনাপঞ্জির দিকে ফিরে তাকাতে হবে। ১৯৭০-এর নির্বাচনে পাকিস্তানের গণপরিষদের ৩০০টি আসনের মধ্যে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ১৬৭টি আসনে জিতে সংসদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেল। নিয়ম অনুযায়ী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নেতৃত্বে পাকিস্তানের সরকার গঠিত হবে। পাকিস্তানের সেনাশাসক ইয়াহিয়া খান ঘোষণা করলেন, ৩ মার্চ ঢাকায় সংসদ অধিবেশন শুরু হবে। সেই মতে, পশ্চিম পাকিস্তানের রাজনৈতিক দল থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা ঢাকা আসা শুরু করলেন। পাকিস্তানের সামরিক-বেসামরিক আমলাদের প্ররোচনায় বিগড়ে বসলেন পাকিস্তানের রাজনীতির চাণক্যখ্যাত পিপলস পার্টির প্রধান জুলফিকার আলী ভুট্টো। তিনি সংসদে দ্বিতীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয়ী হয়েছেন। জানিয়ে দিলেন সংসদের বাইরে সংবিধানের মৌলিক বিষয়গুলোর মীমাংসা হতে হবে। এর আগে যদি কোনো সংসদ সদস্য পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তানে সংসদ অধিবেশনে যোগ দিতে যান, তাহলে তাঁদের ঠ্যাং ভেঙে দেবেন। ইয়াহিয়া খান গেলেন ভুট্টোর লারকানার বাড়িতে। দুজনে শলাপরামর্শ করলেন কিভাবে বঙ্গবন্ধুকে সরকার গঠন থেকে ঠেকানো যায়। বাঙালিরা পাকিস্তানিদের শাসন করবে এটা তো মানা যায় না। বঙ্গবন্ধু নির্বাচনের আগেই ঘোষণা করেছেন, আওয়ামী লীগের ছয় দফাই হবে দলের নির্বাচনী ম্যানিফেস্টো। সংবিধান রচিত হবে তার ভিত্তি। ছয় দফা বঙ্গবন্ধুর কাছে সাড়ে সাত কোটি বাঙালির পবিত্র আমানত। তিনি তো তাঁদের সঙ্গে বেঈমানি করতে পারেন না। ইয়াহিয়া-ভুট্টো আঁতাত বঙ্গবন্ধুর সক্ষমতা আর তার পেছনে জনগণের সমর্থনের বিষয়টা আঁচ করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন।

সত্তরের নির্বাচন-পরবর্তীকালে বঙ্গবন্ধু নিয়মিত দলের নির্বাচিত সংসদ সদস্য আর নেতাকর্মীদের নিয়ে পূর্বাণী হোটেলে সভা করতেন। সংসদ অধিবেশন বসলে সংসদে নিজেদের কর্মকৌশল কী হবে তা নিয়ে আলোচনা করতেন। সভার পর সাংবাদিকদের সঙ্গে নিজে কথা বলতেন। এরই মধ্যে ইয়াহিয়া খান ঘোষণা করেছেন, মার্চের ৩ তারিখ ঢাকায় পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের অধিবেশন শুরু হবে। ১ তারিখ ঢাকা স্টেডিয়ামে (এখন বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়াম) পাকিস্তান বনাম ইংল্যান্ড থেকে আগত এমসিসির ক্রিকেট ম্যাচ চলছিল। দুপুর ১টার রেডিও সংবাদের মাধ্যমে জেনারেল ইয়াহিয়া খান ঘোষণা করলেন, ৩ মার্চ অনুষ্ঠেয় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করা হয়েছে। সেদিন এই একটি ঘোষণাই পাকিস্তানের কফিনে শেষ পেরেকটা টোকা হয়ে গিয়েছিল। রেডিওর খবরটা সারা দেশে অগ্নস্ফুলিঙ্গের মতো ছড়িয়ে পড়ল। পণ্ড হয়ে গেল ঢাকা স্টেডিয়ামের ক্রিকেট খেলা। হঠাৎ ঢাকা হয়ে উঠল মিছিলের নগরী। স্লোগান উঠল ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো বাংলাদেশ স্বাধীন করো’। বঙ্গবন্ধু পূর্বাণী হোটেল থেকে বের হয়ে এসে উপস্থিত সাংবাদিকদের জানালেন, জাতীয় সংসদ অধিবেশন স্থগিত করা খুবই দুঃখজনক। তিনি ঘোষণা করলেন, এর প্রতিবাদে পরদিন ঢাকা শহরে ও ৩ মার্চ সারা দেশে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল পালিত হবে। তিনি এ-ও ঘোষণা করলেন, ৭ই মার্চ রমনা রেসকোর্স ময়দানে এক জনসভায় তিনি চূড়ান্ত কর্মসূচি ঘোষণা করবেন।

এলো সেই ৭ই মার্চ ১৯৭১, রবিবার। বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালিকে আসন্ন কঠিন সময় মোকাবেলা করার পথ দেখাবেন। যেই ঝড় আসবে বলে তিনি আঁচ করছেন, সেই ঝড় মোকাবেলা করার কৌশলের কথা বলবেন। দিনের বেলায় অনেকে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তাঁর ধানমণ্ডির বাড়িতে গিয়ে দেখা করলেন। সেদিন তিনি ১০৩ ডিগ্রি জ্বরে আক্রান্ত। সবাই গিয়ে পরামর্শ দিচ্ছেন, তিনি তাঁর বিকেলের ভাষণে কী বলবেন। একসময় এলেন ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন কনসাল জেনারেল জোসেফ ফ্যারল্যান্ড। তিনি বঙ্গবন্ধুকে সাফ জানিয়ে দিলেন, তিনি যদি আজ একতরফাভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন, তাহলে তাতে তাঁর দেশ সমর্থন দেবে না। বিকেল ৩টা নাগাদ রমনা রেসকোর্স কানায় কানায় পূর্ণ। কত মানুষ সেদিন হাজির ছিলেন তা শুধু অনুমান করা যেতে পারে। কেউ বলেন ২০ লাখ, কেউ ৩০ লাখ আবার কোনো কোনো বিদেশি সাংবাদিক অনুমান করে লিখেছেন ৫০ লাখ। কবি নির্মলেন্দু গুণের ভাষায়—‘একটি কবিতা লেখা হবে আজ, তার জন্য অপেক্ষায় উত্তেজনা নিয়ে লক্ষ লক্ষ উন্মত্ত অধীর ব্যাকুল বিদ্রোহী শ্রোতা বসে আছে। ভোর থেকে জনসমুদ্রের উদ্যান সৈকতে : কখন আসবেন কবি?’

রমনা রেসকোর্সের উদ্দেশে যাত্রার প্রাক্কালে বঙ্গবন্ধু বাড়ির দোতলায়। বেগম মুজিব গায়ে হাত দিয়ে দেখলেন জ্বরটা একটু কমেছে। পাঞ্জাবির বোতামটা লাগাতে লাগাতে বললেন, ‘তুমি আজকের জনসভায় কী বলবে জানি না। তবে তোমার সামনে থাকবে তোমার জনগণ আর পেছনে বন্দুকের নল।’ ঢাকা সেনানিবাসে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী প্রস্তুত। বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষণা করার সঙ্গেই সঙ্গেই তারা বের হয়ে পড়বে। রেসকোর্সের ওপর টহল দিচ্ছে বিমানবাহিনীর হেলিকপ্টার। ধানমণ্ডির বাড়ি থেকে যিনি নিজের গাড়িতে বঙ্গবন্ধুকে রেসকোর্স ময়দানে ঘুর পথে নিয়ে আসেন তিনি বঙ্গবন্ধুর কলকাতা দিনের অনুজপ্রতিম বন্ধু হাজি গোলাম মোর্শেদ। বঙ্গবন্ধু সামনের সিটে তাঁর পাশে বসা ছিলেন। পেছনের সিটে গাজী গোলাম মোস্তাফা আর মহিউদ্দিন আহমেদ। কয়েক বছর আগে তিনি আমাকে এই তথ্যটা দিয়েছিলেন। গাড়ি যখন এলিফ্যান্ট রোডে তখন হাজি মোর্শেদ বঙ্গবন্ধুকে প্রশ্ন করলেন, ‘কী বলবেন আজ মুজিব ভাই’? ধ্যানমগ্ন বঙ্গবন্ধু মাথা তুলে বললেন, ‘জানি না। আল্লাহ আমাকে দিয়ে যাই বলায় তা বলব।’ গাড়ি যখন রমনা রেসকোর্সে প্রবেশ করল তখন চারদিকে একটা স্লোগান। ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো। জয় বাংলা।’ আমরা যারা সেদিনের সে জনসভায় উপস্থিত ছিলাম তাদের জন্য সেটি এক অবিস্মরণীয় মুহূর্ত।

সর্বসাকল্যে ১৯ মিনিটের বক্তৃতা। সেই বক্তৃতাই হয়ে গেল ‘রাজনীতির কবির অমর কবিতা’। সেই উত্তাল জনসমুদ্রকে সামনে রেখে জানিয়ে দিলেন তিনি প্রধানমন্ত্রিত্ব চান না। তিনি দেশের মানুষের অধিকার চান। এর আগে ইয়াহিয়া খান ১০ই মার্চ ঢাকায় রাজনৈতিক নেতাদের একটি সমঝোতা বৈঠক আহ্বান করেছিলেন, যা বঙ্গবন্ধু প্রত্যাখ্যান করেন। তারপর ইয়াহিয়া খান ঘোষণা করেন ২৫শে মার্চ ঢাকায় পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সভা বসবে। বঙ্গবন্ধু দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে জানালেন, তিনি শহীদের রক্তের ওপর পা দিয়ে কোনো বৈঠক অথবা সংসদ অধিবেশনে যেতে পারেন না। তিনি জানতেন যেকোনো সময় পাকিস্তান সেনাবাহিনী তাঁকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যেতে পারে। তিনি জনগণের উদ্দেশে জানিয়ে দিলেন, তিনি যদি হুকুম দিতে না-ও পারেন তাহলে তাদের কর্তব্য কী হবে। তিনি দলের ভেতরে ঘাপটি মেরে থাকা পাকিস্তানি চরদের সম্পর্কে সতর্ক করে দেন। দেশের বেসামরিক প্রশাসন কিভাবে চলবে সেই সম্পর্কে তিনি পরিষ্কার নির্দেশ দেন। সেদিন থেকে আসলে বঙ্গবন্ধু হয়ে গেলেন বাংলাদেশের বেসামরিক সরকারপ্রধান। দাবি জানানো হয় যেন সব সেনাবাহিনীকে তাদের ব্যারাকে ফেরত নিয়ে যাওয়া হয়। বক্তৃতা শেষ করলেন এই বলে, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’। কবি নির্মলেন্দু গুণের মতে, ‘সেই থেকে স্বাধীনতা শব্দটি আমাদের।’ এর চেয়ে পরিষ্কার ভাষায় স্বাধীনতা ঘোষণা আর কী হতে পারে? বঙ্গবন্ধু আজীবন নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতি করেছেন। তিনি কোনো বিপ্লবী ছিলেন না। একজন নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতিবিদ হিসেবে তিনি যদি সেদিন অন্যভাবে স্বাধীনতার ঘোষণা দিতেন, তাহলে তা হতো বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ নয়।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীর মাসে বিএনপি ও তাদের সমমনা পণ্ডিতজনদের কাছ থেকে এমন অনেক রূপকথার গল্প শোনা যাবে। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর বিএনপি অনেক চেষ্টা করেছে তাদের প্রতিষ্ঠাতা নেতাকে টেনে বঙ্গবন্ধুর সমান করতে। বাস্তবতা হচ্ছে, যতই টানাটানি করুক বঙ্গবন্ধুর হাঁটুর ওপর কাউকে টেনে তোলা সম্ভব হয়নি। আজকের এই দিনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব নামের মহামানবের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা আর অভিবাদন। ৭ই মার্চের চেতনা অমর হোক। বাংলাদেশ দীর্ঘজীবী হোক। জয় বাংলা।

লেখক : বিশ্লেষক ও গবেষক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা