kalerkantho

মঙ্গলবার । ৭ বৈশাখ ১৪২৮। ২০ এপ্রিল ২০২১। ৭ রমজান ১৪৪২

আন্তর্জাতিক মিশনপ্রধানদের কক্সবাজার সফর

স্থানীয় ও রোহিঙ্গাদের জন্য অব্যাহত সহায়তার ঘোষণা মিশনপ্রধানদের

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৬ মার্চ, ২০২১ ২০:০৬ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



স্থানীয় ও রোহিঙ্গাদের জন্য অব্যাহত সহায়তার ঘোষণা মিশনপ্রধানদের

অস্ট্রেলিয়ান হাইকমিশনার এবং জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতদের সমন্বয়ে গঠিত এক প্রতিনিধিদল বাংলাদেশের শরণার্থীসেবা কার্যক্রমে ধারাবাহিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছেন।

গত ৩-৪ মার্চের সফরকালে প্রতিনিধিরা একটি দুর্যোগপ্রস্তুতি প্রকল্প, খাদ্যসহায়তা কার্যক্রম, একটি শিক্ষাকেন্দ্র এবং একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র পরিদর্শন করেন। সেই সঙ্গে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী স্বাস্থ্যকর্মীদের সাথে রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্প ও আশ্রয়দানকারী জনগোষ্ঠীর মধ্যে কভিড-১৯ মোকাবেলা কার্যক্রমে তাদের ভূমিকা বিষয়ে আলাপ করেন।

সফরকালে বাংলাদেশে প্রথম করোনাভাইরাস শনাক্ত হওয়ার এক বছর পূর্তি হলো। তা ছাড়া ২০২০ সালের অক্টোবরে রোহিঙ্গা কার্যক্রমের দাতা সম্মেলনের পর এটিই প্রথম সফর। সেই সম্মেলনে আশ্রয়দানকারী জনগোষ্ঠী ও রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য অতিরিক্ত প্রায় ৬০০ মিলিয়ন ডলার ত্রাণ তহবিল সংস্থান হয়েছিল।

২০১৭ সালে মিয়ানমারে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে এ সংকট মোকাবেলায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সহযোগিতা দিয়ে আসছে। সেই সময়ে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ও আশ্রয়দানকারী জনগোষ্ঠীর জন্য মানবিক সহায়তা হিসেবে অস্ট্রেলিয়া ২৪০ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি অর্থ সহায়তা দিয়েছে, জাপান দিয়েছে ১৪০ মিলিয়ন ডলার, এবং বাংলাদেশের আশ্রয়দানকারী জনগোষ্ঠীসহ ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ১.২ বিলিয়ন ডলার সহায়তা নিয়ে সাড়া দিয়েছে।

কভিড-১৯ মহামারির ফলে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ এবং জনস্বাস্থ্য ও অন্যান্য জীবন রক্ষাকারী সেবাপ্রদান নিশ্চিত করতে ক্যাম্পে কর্মরত কর্মকর্তা ও সংস্থাগুলোকে বিভিন্ন উদ্ভাবনী সমাধান বের করতে হয়েছে যাতে এই ভাইরাসের বিস্তার কমিয়ে আনা সম্ভব হয়। প্রতিনিধিরা ক্যাম্প ৪-এ খাদ্য সহায়তা গ্রহণকারী সুফলভোগীদের পরিচয়পত্র স্পর্শহীনভাবে যাচাইয়ের জন্য বাংলাদেশ/জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা প্রণীত কুইক রেসপন্স (QR) কোডের একটি উদ্ভাবনী ব্যবহার প্রত্যক্ষ করেন। যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা (USAID) এবং বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচী (WFP)-এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের তহবিলের আওতায় এই দলটি কক্সবাজার জেলার প্রায় সকল শরণার্থীকে অর্থাৎ প্রতিমাসে প্রায় ৮ লাখ ৫৭ হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থীকে ব্লকচেইন লেজার ভিত্তিক ই-ভাউচারের মাধ্যমে জরুরি খাদ্য সহায়তা দিচ্ছে। কিউআর কোডের মাধ্যমে মাসিক ই-ভাউচার যাচাইয়ের ফলে স্থানীয় আশ্রয়দানকারী জনগোষ্ঠীর দোকানিদের ২১টি দোকান থেকে বিভিন্ন তাজা খাবার, যথা ডিম, শাক-সবজি ও ফলমূলসহ মৌলিক খাদ্যসামগ্রী ক্রয় করতে পারছে।

প্রতিনিধিরা ক্যাম্পের বাসিন্দাদের মধ্যে মহামারি প্রতিরোধে সুরক্ষাপন্থা বিষয়ে জরুরি তথ্যপ্রদানকারী সাহসী শরণার্থী স্বেচ্ছাসেবীদের সাথেও সাক্ষাৎ করেন। পুরো মহামারিকালে এবং মহামারির আগে শরণার্থী স্বেচ্ছাসেবীরা ক্যাম্পগুলোতে মাতৃ ও প্রসবপূর্ব স্বাস্থ্য থেকে শুরু করে মৌলিক পয়ঃনিষ্কাশন এবং সংক্রামক ব্যাধি পর্যবেক্ষণের তথ্য সংগ্রহসহ বিভিন্ন বিষয়ে জরুরি স্বাস্থ্যতথ্য প্রচার করেছেন। ক্যাম্পগুলোতে কভিডের চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা কেমন চলছে সে বিষয়ে ধারণা পেতে প্রতিনিধিদলটি তীব্র শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ চিকিৎসাকেন্দ্র- সিভিয়ার অ্যাকিউট রেসপিরেটরি ইনফেকশন আইসোলেশন অ্যান্ড ট্রিটমেন্ট সেন্টারও পরিদর্শন করেন।

চিকিৎসাকেন্দ্রের পরিচালনাকারী রিলিফ ইন্টারন্যাশনালের কর্মকর্তারা প্রতিনিধিদলকে জানান যে, কভিড-১৯ এর চিকিৎসা গ্রহণকারী প্রায় দুই তৃতীয়াংশ মানুষই আশপাশের আশ্রয়দানকারী বাংলাদেশি।

প্রতিনিধিদলটি বাংলাদেশ সরকার এবং ইন্টারসেক্টর কোঅর্ডিনেশন গ্রুপ (ISCG), বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (WFP), জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (UNHCR), আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (IOM), জাতিসংঘ শিশু তহবিল (UNICEF), বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO), শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের (RRRC) কর্মকর্তাদের সাথেও সাক্ষাৎ করেন।

অস্ট্রেলিয়ান হাইকমিশনার ব্রুয়ার বলেন, বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের আশ্রয়দানের জন্য বাংলাদেশের প্রতি আমাদের জোরালো সহায়তার কথা পুনর্ব্যক্ত করতে চাই। কভিডের ফলে গত বছর এই কক্সবাজারসহ সমস্ত জায়গায় অনেক নতুন চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি হয়েছিল। সংক্রমিতের সংখ্যার স্থিতিশীলতা এবং টিকাকার্যক্রম চালু হওয়া সত্ত্বেও মানবিক সহায়তা সংস্থাগুলো যাতে রোহিঙ্গা ও আশ্রয়দানকারী জনগোষ্ঠীর জন্য অত্যাবশ্যক সহায়তা দিতে পারে সেটা নিশ্চিত করতে আমাদেরকে আগের যেকোনো সময়ের মতোই বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষগুলোর সাথে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করতে হবে।

জাপানের রাষ্ট্রদূত ইতো বলেন, বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আমাদের সহায়তা আরো ত্বরান্বিত করা এবং আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বেসরকারি সংস্থাগুলোর সাথে সহযোগিতা জোরদার করার উদ্দেশ্যে আমরা এই যৌথ মিশনে যুক্ত হয়েছি। কক্সবাজারে মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি রাখাইন রাজ্য থেকে বিতাড়িত জনগোষ্ঠীকে অতিসত্ত্বর ফিরিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে জাপান কাজ করে যাবে। কেননা, এই সংকটের স্থায়ী সমাধান বের করা একটি অবারিত ও উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক গঠনের লক্ষ্য অর্জনে সহায়ক হবে। আমরা দৃঢ়ভাবে আশা করি, করোনাভাইরাস পরিস্থিতি উন্নতির সাথে সাথে শিগগিরই শিক্ষা কার্যক্রমসহ সকল সেবা কার্যক্রম পুনরায় চালু হবে।

সফরকালে রাষ্ট্রদূত মিলার বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় শরণার্থী বা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সহায়তা ও আশ্রয়দানকারী জনগোষ্ঠীর কথা ভুলে যায়নি। শরণার্থীদেরকে স্বেচ্ছায়, নিরাপদে, মর্যাদার সাথে ও স্থায়ীভাবে ফিরিয়ে নেবার লক্ষ্যে সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টির জন্য মিয়ানমারকে উৎসাহিত করতে আমরা আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সাথে অব্যাহতভাবে কাজ করব। সেই লক্ষ্যে, গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর, অন্যায়ভাবে গ্রেপ্তারকৃত সকলকে মুক্তি দান এবং সাংবাদিক, আন্দোলনকর্মী ও অন্যান্যদের প্রতি আক্রমণ বন্ধে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর প্রতি আহ্বানকারী সকলের প্রতি আমরা জোর সমর্থন জানাচ্ছি। এখন সামরিক বাহিনীকে সর্বোচ্চ সংযম দেখাতে হবে এবং অতিরিক্ত সহিংসতা থেকে বিরত থাকতে হবে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা