kalerkantho

বুধবার । ১ বৈশাখ ১৪২৮। ১৪ এপ্রিল ২০২১। ১ রমজান ১৪৪২

চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার প্রস্তুতিটাই মুখ্য

ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ   

৬ মার্চ, ২০২১ ০৩:৩০ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার প্রস্তুতিটাই মুখ্য

বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্য ছিল একটি স্বাধীন দেশ গঠনের পাশাপাশি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জন এবং ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে সবার মানবাধিকার ও সামাজিক সাম্য তথা শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা করা। স্বাধীন বাংলাদেশের যাত্রা শুরুর পর নানা বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে বাংলাদেশ এখন ধারাবাহিক উন্নয়নের পথে অবস্থান করছে। ফলে আমরা একটি ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারছি। এই ধারাবাহিকতার কারণেই জাতিসংঘের স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণ তথা উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে গণ্য করার পর্যায়ে বাংলাদেশ উপনীত হয়েছে। এই ঘোষণাটা এই সময়ে এলো, যখন চলতি বছরেই বাংলাদেশ তার স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী উদযাপন করবে। তবে যে বাধা-বিপত্তি আমাদের পেরিয়ে আসতে হয়েছে, তা আমাদের সামনে থেকে সরে গেছে বলে মনে করার অবকাশ নেই।

এলডিসি থেকে বের হয়ে আসার জন্য জাতিসংঘের তিনটি বিশেষ সূচক রয়েছে, যা এরই মধ্যে আমরা সবাই জেনে গেছি। এর প্রথমটা হলো মাথাপিছু আয়; দ্বিতীয়ত মানবসম্পদ এবং তৃতীয়ত অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা। বাংলাদেশকে ২০২৪ সালে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করেছে জাতিসংঘ। তবে বাংলাদেশ সরকার ২০২৬ পর্যন্ত সময় নিয়েছে। এটাকে আমার যুক্তিসংগত সিদ্ধান্ত বলেই মনে হয়েছে। কারণ এখন থেকে প্রায় পাঁচ বছর সময়ই লাগবে এর প্রস্তুতিটা নিতে এবং উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে সক্ষমতাটা ধরে রাখাও লাগবে। অতএব তাড়াহুড়া করে তিন বছরেই চলে যাওয়া ঠিক মনে করেনি বাংলাদেশ।

এলডিসি থেকে বের হওয়ার মধ্য দিয়ে আমাদের অনেক সম্ভাবনার দরজাই খুলে যাবে। প্রথমত, এটাকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের বড় অর্জন হিসেবে বিবেচনা করা হবে। এতে বাংলাদেশ একটি উন্নয়নের টেস্ট কেস না হয়ে এটা যে মডেল কেস হিসেবে দাঁড়িয়েছে, যাতে আমাদের ভাবমূর্তিটা বৃদ্ধি পাবে। উদাহরণ হিসেবে বাংলাদেশের নাম আসবে। ছোট্ট একটা ভূখণ্ড, বিশাল জনগোষ্ঠীর দেশ। এমন দেশের এই পথে উন্নয়ন একটা বড় চ্যালেঞ্জ বটে। আর সেই চ্যালেঞ্জে বাংলাদেশ উত্তীর্ণ হয়েছে। এটা হলো এলডিসি থেকে উত্তরণের ভাবমূর্তির দিক। সম্ভাবনার আরেকটি দিক হলো দেশের ভাবমূর্তি বৃদ্ধির কারণে অবশ্যম্ভাবীভাবে এফডিআই (বৈদেশিক বিনিয়োগ) এবং বৈদেশিক ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্প্রসারণ ঘটবে। যে বিদেশি ও বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো এখানে আছে, তারা এখানে ব্যবসা বাড়াতে সচেষ্ট হবে। এই পথে আমাদের লোকদের কর্মসংস্থান ও আয়সংস্থানের ব্যবস্থা হবে। উত্তরণের আরেকটা সুফল হলো, আমাদের সভরেন ক্রেডিট রেটিং (সার্বভৌম ঋণ গ্রহণযোগ্যতা) সূচকের উন্নতি হবে। এর মানে এ দেশে বিনিয়োগ করলে মুনাফা অর্জন সম্ভব হবে—বিদেশিদের মধ্যে এই আস্থা বাড়বে। এ ছাড়া সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানেও বিদেশি বিনিয়োগ বাড়বে। এ ছাড়া আমাদের বৈদেশিক বাণিজ্যে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। আমাদের রপ্তানি শুধু আরএমজিতে নয়, অন্যান্য খাতে আরো বৃদ্ধি পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। যেমন—চামড়া, সিরামিক, ইলেকট্রনিক গুডস, হোসিয়ারি পণ্য, হাউসহোল্ড পণ্য। এর সঙ্গে আমাদের কুটির শিল্প পণ্যের আন্তর্জাতিক প্রসার ঘটতে পারে।

তবে এই সম্ভাবনা কাজে লাগাতে আমাদের অনেক পরীক্ষাও দিতে হবে। তাই প্রথমত চ্যালেঞ্জটা হবে আত্মপ্রসাদে না ভোগা। শুধু প্রচারের জন্য এই সাফল্যকে ব্যবহার করা, রাজনৈতিক সুবিধা গ্রহণ, সংশ্লিষ্টদের কৃতিত্ব নেওয়ার মানসিকতা দেখানো ঠিক হবে না। কারণ এই আত্মপ্রসাদ ও প্রচারে মনোনিবেশ করলে দুটি বিষয় ঘটবে। একটা হলো এই অর্জনটা যে সম্মিলিত প্রয়াসের জন্য সম্ভব হয়েছে তা গৌণ হয়ে পড়বে। দ্বিতীয়ত, বাধা-বিপত্তি উতরানোর ব্যাপারে মনোযোগ কমে যাবে, গাছাড়া ভাব চলে আসতে পারে। আমাদের মনে রাখতে হবে, চালক হিসেবে এখানে সরকারের যেমন ভূমিকা রয়েছে, তেমনি বেসরকারি খাত এবং সর্বসাধারণের ভূমিকাও রয়েছে। এমনকি এ ক্ষেত্রে আমাদের বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) ও সামাজিক সংস্থাগুলোরও ভূমিকা রয়েছে। কারণ উল্লিখিত সূচকগুলো অর্জনের পথে অনেক প্রকল্প সাফল্যের সঙ্গে শেষ করতে পেরেছে এই সংস্থাগুলো।

দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জটা হলো সূচকগুলোর প্রান্তিক অবস্থান। যে প্রধান তিনটা সূচক আমাদের উত্তরণ ঘটিয়েছে, সেটা ২০২১ সাল পর্যন্ত মোটামুটি সন্তোষজনক থাকবে। কিন্তু দুটি সূচক একেবারেই প্রান্তিক পর্যায়ে। যেমন—অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচকের (ইকোনমিক ভালনারেবিলিটি ইনডেক্স) কথা বলা যেতে পারে। অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা হলো অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে টেকসই করা এবং প্রকল্পগুলো যথাযথভাবে সম্পন্ন করতে পারা এবং কভিডের মতো মহামারি বা অন্য কোনো জাতীয় বা আন্তর্জাতিক বিপর্যয়ে আমাদের অর্থনীতির সহনশীলতা। উত্তরণের জন্য এই ইভিআই সূচক ৩২ বা এর নিচে এবং এলডিসিতে অন্তর্ভুক্ত হলে তা ৩৬ বা এর ওপরে থাকতে হবে। আমাদের ইভিআই সূচক এখন ২৫.২। মহামারির কারণে সম্ভবত এই সূচক কিছুটা বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এলডিসি থেকে উত্তরণের জন্য নিয়ম অনুযায়ী মানবসম্পদ সূচক (হিউম্যান এসেট ইনডেক্স-এইচএআই) ৬৬ বা এর ওপরে থাকতে হয়। বাংলাদেশের এইচএআই সূচক এখন ৭৩.২। আমরা যদি মানবসম্পদকে ব্যবচ্ছেদ করি, তাহলে দেখতে পাব ব্যবসা-বাণিজ্যে প্রযুক্তি ব্যবহার এবং নলেজ বেইস ইকোনমিতে (জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি) আমরা অনেক পিছিয়ে। সুতরাং ঝুঁকিটা থেকে যাচ্ছে।

তৃতীয় চ্যালেঞ্জটা হলো, আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা। আমাদের জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলো খুব দুর্বল। বাংলাদেশ ব্যাংকসহ বেশির ভাগ নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান এবং এক্সপোর্ট প্রমোশন ব্যুরো ও ইনভেস্টমেন্ট ডেভেলপমেন্ট অথরিটির মতো উন্নয়ন সহায়ক প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো ব্যবসাবান্ধব হতে পারেনি। এখনো ব্যবসা-বাণিজ্যে নানা রকম বাধা বিদ্যমান। নানা রকম সমস্যায় ভুগতে হয় উদ্যোক্তাদের। যেমন—নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়ে নানা কথাবার্তা হয়। যেকোনো পলিসি বা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করার মূল দায়িত্বে থাকে নিয়ন্ত্রক ও উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলো। বাজার ব্যবস্থাপনা, যেখানে প্রতিযোগিতা আছে কি না, স্বচ্ছতা আছে কি না সেটা তাদের দেখতে হয়। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। এখানে ব্যাংকগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা নেই, বেশির ভাগই গোষ্ঠীভিত্তিক চলে, ঋণ ম্যানিপুলেট করে।

চতুর্থ চ্যালেঞ্জ হলো ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে না পারা। এখনো ব্যবসা শুরুর প্রক্রিয়া অনেক জটিল। কমপক্ষে ১২ বা ১৪টা প্রতিষ্ঠান থেকে ছাড়পত্র নিতে হয়। এসব ক্লিয়ারেন্স নিতে যথেষ্ট বেগ পেতে হয় এবং সময় লাগে। এর মধ্যে জমিজমার প্রসঙ্গ যখন আসে, তখন তো আরো বেশি জটিল হয়ে পড়ে পরিস্থিতি। জমি রেজিস্ট্রেশন থেকে শুরু করে দখল বুঝে নেওয়া পর্যন্ত অত্যন্ত জটিল ও ঝামেলার কাজ হয়ে দাঁড়ায়। নিষ্কণ্টক জমি পাওয়া কঠিন এবং জমির রেজিস্ট্রেশনও জটিল প্রক্রিয়া। ফলে উদ্যোক্তারা নিরুৎসাহ হয়।

যাই হোক, সামগ্রিকভাবে আমরা যদি এই চ্যালেঞ্জগুলো উতরাতে না পারি, তাহলে ২০২৬ সাল পর্যন্ত আমরা এলডিসি উত্তীর্ণ থেকে গেলেও পরে টিকিয়ে রাখা খুব কঠিন হবে। এই পরিস্থিতিতে আমাদের কী করা দরকার? জবাবটা হচ্ছে, প্রস্তুতির বিকল্প নেই। প্রস্তুতিপর্বে আমাদের প্রথম দরকার হবে প্রতিযোগিতা ও যোগ্যতা বাড়ানো। আমাদের শিল্প-বাণিজ্য যদি প্রতিযোগিতামূলক না হয়, যোগ্য না হয়ে ওঠে, তাহলে সামনে বিপদ। আমরা তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাতের কথা বলতে পারি। ভর্তুকি দিতে দিতে এত দূর পর্যন্ত উঠিয়ে নিয়ে আসা হয়েছে এ খাতকে। তা-ও আরএমজি খাত প্রতিযোগিতা করতে পারছে না। কত দিন আপনি এটাকে জিইয়ে রাখবেন, যদি তারা নিজেরা যোগ্যতা অর্জন না করে?

দ্বিতীয় হলো শ্রমের উৎপাদনশীলতা। আমাদের শ্রমের উৎপাদনশীলতা বেশ নিচে, বিশ্বের অন্যতম নিম্নতম। তাই শ্রম সস্তা নিয়ে আমাদের বড়াই করলে চলে না। যেখানে শ্রমের উৎপাদনশীলতা কম থাকে, সেখানে বাইরের লোক আসে না। আমাদের সমপর্যায়ের অর্থনীতি ভিয়েতনামে; কিন্তু এই উৎপাদনশীলতা অনেক উঁচুতে। সেখানে যাচ্ছেও অনেকে।

তৃতীয়ত, আমাদের ফিসকাল পলিসি তথা সরকারের কর নীতি যৌক্তিক করতে হবে। অহেতুক কিছু কর আছে। আবার করপোরেট কর অনেক বেশি। আবার দেখা যাচ্ছে, অহেতুক কিছু সুবিধাও দেওয়া হচ্ছে। একটা জিনিস আমাদের লক্ষ রাখতে হবে, সেটা হচ্ছে ২০২৬ সালে যখন আসবে, তার পর থেকে আমাদের সরকারের শুল্ক আয় অনেক কমে যাবে। এখন এত ট্যারিফ বা সাপ্লিমেন্টারি ডিউটি আমদানি-রপ্তানিতে চাপিয়ে দেওয়া হয়, তা তখন দেওয়া যাবে না। অনেকটা মুক্ত বাণিজ্যের মতো একটা অবস্থার দিকে যাবে। এর ফলে সরকারের আয় কিন্তু অনেক কমে যাবে। অতএব এই শুল্ক ও কর ব্যবস্থা যদি আধুনিকায়ন করা হয় এবং আয়কর জাল বা আওতা বাড়ানো হয়, তখন কর বৃদ্ধি না করলেও চলবে। একই সঙ্গে কর ও শুল্ক ফাঁকির সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। বিভিন্ন শিল্প, বিশেষ করে আরএমজিতে ‘শুল্ক পৃষ্ঠপোষকতা’ অব্যাহত রাখা যাবে না। এখনই সম্ভব না হলেও কৃষি ভর্তুকি থেকেও পর্যায়ক্রমে সরে আসতে হবে।

চতুর্থত, দুর্নীতি ও অর্থের অপচয় রোধ করা। দুর্নীতি ও সরকারি অর্থের অপচয় সব ধরনের আর্থ-সামাজিক সূচকের ক্ষতি করে। বড় ও মহৎ উদ্যোগগুলো ধ্বংস করে। তাই তা রোধ করতেই হবে। দুর্নীতি ও সরকারি অর্থের অপচয় রোধ করতে না পারলে অনর্জিত অর্থ (সহজ উপায়ে অর্জন) অনুৎপাদনশীল খাতে ব্যয় হবে এবং মুদ্রা পাচার হবে।

অতএব উপসংহারে বলব, আমাদের কিছু সংস্কার দরকার হবে। এলডিসি থেকে বের হয়ে যাওয়া আফ্রিকার বতসোয়ানা একটা ভালো উদাহরণ সবার সামনে। তারা সংস্কার করেই সাফল্য পেয়েছিল। বিরাট কোনো পরিবর্তন তাদের করে ফেলতে হয়নি। তারা ইকোনমিক রিফর্মটা ঠিকঠাকমতো করতে পেরেছে। সুতরাং রূপক অর্থে বলি, আমাদের তো পাহাড়ে উঠতেই হবে। তাহলে শুধু আলাপ-আলোচনা করে কী লাভ? পাহাড়ে যখন উঠতেই হবে, তখন শুধু অপেক্ষা নয়, প্রস্তুতিই গুরুত্বপূর্ণ। আপনার জন্য পাহাড় তো আর ছোট হয়ে আসবে না। পাহাড়টা তো পাহাড়ই থাকবে। তাই চ্যালেঞ্জও থাকবে। শুধু আপনাকে নিজের প্রস্তুতি নিতে হবে।

লেখক : সাবেক গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক ও অধ্যাপক, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি
অনুলিখন : আফছার আহমেদ

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা