kalerkantho

বুধবার । ১ বৈশাখ ১৪২৮। ১৪ এপ্রিল ২০২১। ১ রমজান ১৪৪২

স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীতে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা

গোলাম কবির    

৬ মার্চ, ২০২১ ০৩:২৭ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীতে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা

বয়ঃক্রম অশীতিবর্ষ পূর্ণ হয়ে এলো প্রায়। চেতন আর অবচেতনে পারিপার্শ্বিকের বিচিত্র জয়-পরাজয় দেখেছি। সে দেখার মাঝে হয়তো চাপল্য ছিল। ধীরে ধীরে ব্যক্তিগত বিজয় দেখা শুরু হলো। প্রবল প্রতিকূলতা উজিয়ে প্রায় অসম্ভবকে বাস্তবে এনে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান পাবলিক সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে প্রথম আনুষ্ঠানিক গোলামির শিকল পরলাম। অথচ আশ্চর্যের ব্যাপার, তখন অনাস্বাদিত আনন্দ অনুভব করিনি।

বাংলার মানুষের ভাষাভিত্তিক সাংস্কৃতিক চর্চা ১৯৪৭ সালের পর পরিবর্তিত, বিকৃত হতে থাকে। নজরুল ইসলামের কবিতার ব্যবচ্ছেদ শুরু হয়। ‘মহাশ্মশান’ শব্দটি উচ্ছেদ করে গোরস্তান সন্নিবেশ করে। ভাগ্যিস, কায়কোবাদের ‘মহাশ্মশান’ কাব্যটি নিয়ে আদিখ্যেতা দেখায়নি। তবে বহুল পঠিত শিশুপাঠ্য কবিতাটির ‘সকালে উঠিয়া’ কে ‘ফজরে উঠিয়া’ পড়ার নসিহত দেয়। আরো অচেনা শব্দের জঞ্জালে আমাদের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে আবিলতা নেমে আসে। ভারতের ‘আকাশবাণীর’ আদলে পদলেহীরা রেডিও পাকিস্তানের নাম ‘গায়েবী আওয়াজ’ রাখার প্রস্তাব রাখে। বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া মুক্তচিন্তার শিক্ষার্থীরা সাংস্কৃতিক মুক্তির স্বপ্ন দেখতে থাকেন। তাঁরা ভাষার অধিকারের দাবিতে রাজপথ রক্ত রঞ্জিত করেছেন। সেই পথ ধরে আমাদের স্বাধীনতা আবার দেখছি অঘটনের প্রত্যাবর্তন।

২০২১ আমাদের স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী। গত ৫০ বছরে আমরা অগ্রগতির কোন পর্যায়ে উন্নীত হয়েছি, তা দৃশ্যমান। ব্যক্তিগতভাবে আমি পুরুষানুক্রমে শিক্ষকতাসংশ্লিষ্ট। এই ৫০ বছরে শিক্ষাক্ষেত্রে আমাদের অর্জন-বিসর্জনের দিকটি না দেখলে প্রকারান্তরে নিজের অনুসৃতিকে অসম্মান করা হবে। বেশি দূর যাব না, ব্রিটিশ ভারতে ১৮১৩ খ্রিস্টাব্দ থেকে সরকারিভাবে শিক্ষার প্রতি নজর দেওয়া হলেও সে শিক্ষার উদ্দেশ্য ছিল শোষণের জন্য শাসনের মানবমেশিন তৈরি। স্বাধীন চিত্তবৃত্তি বিকাশের মাধ্যমে জাতীয় চরিত্র গঠনের উদ্যোগ ছিল না। ব্যক্তিগত সাধনায় আমাদের কৃতবিদরা কিছুটা আলো ফেলেছিলেন। তবে এ সত্য মানতেই হয়, শিক্ষার বনিয়াদ নির্মাণে শিক্ষকরা ছিলেন নির্ভেজাল।

বলছিলাম, ১৮১৩ সালে বেনিয়া সরকার শিক্ষার প্রতি নজর দিলেও হাতে গোনা কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তা সীমাবদ্ধ ছিল। তখনকার পূর্ব বাংলায় ব্যক্তি উদ্যোগে প্রাথমিক থেকে কলেজ পর্যায়ে বেশ কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। কালের চক্রে আজও সেসব প্রতিষ্ঠান টিকে থাকলেও উদ্যোক্তার নাম প্রায় বিস্মৃত। বিএল, বিএম, কেসি, এমসি, পিসি ইত্যাদি কলেজের নামের অন্তরালের আসল ব্যক্তিকে অনেকে চেনে না। এমনকি দিনাজপুরের এসএন অর্থাৎ সুরেন্দ্রনাথ কলেজের নাম প্রায় বিলুপ্ত। অথচ এসব প্রতিষ্ঠান থেকে তখনকার দিনে যাঁরা শিক্ষা অর্জন করতেন, তাঁরা অনেকেই স্মরণীয় হয়ে আছেন। লেখা বাহুল্য, আলোচ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো দেশভাগের আগেই প্রতিষ্ঠিত। দেশভাগের সময় অনেক মহকুমায় কোনো কলেজ ছিল না। আর বিশ্ববিদ্যালয় বলতে শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। একটা গুজব প্রচলিত আছে, ১৯৪৭-এর আগে নাকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আইসিএস হতে পারতেন না।

আবার পেছন ফিরে দেখি। বিভাগ পূর্বকাল থেকে পাকিস্তান আমলে আইয়ুব শাহির একটা পর্যায় পর্যন্ত মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ঐচ্ছিক বিষয়গুলোর মধ্যে আরবি, সংস্কৃত, ফারসি, উর্দু ইত্যাদি ভাষা পাঠ্যতালিকায় ছিল। আইয়ুব খান তা তুলে দিলেন। এমনকি বাংলার প্রতি শ্যেনদৃষ্টি পড়তে শুরু করল। কিছু দালাল রবীন্দ্রনাথের পরিবর্তে কবি ইকবালকে প্রাধান্য দেওয়ার পরামর্শ দিলেন। আমরা কবি ইকবাল কেন, কোনো ভাষার কবি-শিল্পীর বিরোধী নই। ওই সময়ে ইচ্ছুক শিক্ষার্থীরা বাংলা, ইংরেজির সঙ্গে ওই সব যেকোনো একটি ভাষায় ব্যুৎপত্তি লাভ করত। ভাষাসংক্রান্ত বিষয় তুলে দেওয়া হলে লাভ-ক্ষতি কী হয়েছে তার বিচার করবেন গবেষকরা। এখন শুনছি, অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে সংস্কৃত, ফারসি, উর্দু ইত্যাদি বিষয়ে অনার্স-মাস্টার্স পড়ানো হচ্ছে। মূল ভাষায় যাঁদের ধারণা নেই, তাঁরা কেমন করে উচ্চতর ডিগ্রি সংগ্রহ করেন? এসব দেখার কেউ নেই।

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর ১৮৫৮ সালে দশ শ্রেণি শেষে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষা প্রবর্তিত হয়। পাস নম্বর ইউরোপের শিক্ষার্থীদের তুলনায় অর্ধেক রাখে। কারণ বাঙালিদের নাকি মেধার আকাল। আশ্চর্য প্রহসন! আসলে মেধার অভাব নয়, সুযোগ-সুবিধার তারতম্য ছিল বলে আমাদের পূর্বপুরুষরা মেধার স্ফুরণ ঘটাতে পারেননি। তাই বলে মেধাহীন! অতীশ দীপঙ্কর, বিদ্যাসাগর, জগদীশ চন্দ্র বসু, ড. কুদরাত-এ-খুদা প্রমুখ দেখিয়ে গেছেন মেধার পরিচয়।

আইয়ুব খানের পরামর্শকরা শুধু যে ক্লাসিক ভাষাগুলো উঠিয়ে দিলেন তা-ই নয়, শিক্ষাকে বহুধাবিভক্ত করে দিলেন। মাদরাসা শিক্ষা তো ছিলই একাধিক লেবাসে। আমাদের জাতীয় শিক্ষা গ্রামের দরিদ্র বধূর মতো রয়ে গেল উপেক্ষিত।

ভাষা-সংস্কৃতির বিপর্যয়ের পথ ধরে আমাদের স্বাধীনতা এলো সীমাহীন ত্যাগের বিনিময়ে। সে দীর্ঘ ফিরিস্তি আমাদের অজানা নয়। এ-ও জানা যে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার ক্ষণটি ছিল যেন অগ্নিকুণ্ডের মাঝে অগ্নিশিক্ষার শপথ। দেশের সোনার চেয়ে দামি মাটি আর ভবন ছাড়া তেমন উল্লেখযোগ্য কী-ই বা ছিল! বঙ্গবন্ধু আমাদের শিক্ষার বেহাল সম্পর্কে ওয়াকিফহাল ছিলেন। ১৯৭২ সালের ২৫ জুলাই বংলাদেশ সরকার কর্তৃক শিক্ষা কমিশন গঠিত হলো এবং ২৪ সেপ্টেম্বর বঙ্গবন্ধু তা উদ্বোধন করেন। কমিশনের নেতৃত্বে ছিলেন ড. কুদরাত-এ-খুদা। তারপরের বছর ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশের সব প্রাথমিক বিদ্যালয় সরকারি করা হয়। বঙ্গবন্ধুর মহৎ উদ্দেশ্য ছিল বহুধাবিভক্ত শিক্ষাকে একমুখী এবং বৈষম্যহীন রূপ দিয়ে এক ছাতার নিচে প্রতিষ্ঠা করা। এখানেই শেষ নয়, শিক্ষার্থীদের জন্য পাঠ্যপুস্তক বিনা মূল্যে বিতরণ করে শিক্ষাকে সাধারণের দোরগোড়ায় উপস্থিত করেছিলেন। সেই সঙ্গে চির অবহেলিত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা পেয়েছিলেন প্রাণের স্পন্দন। ১৯৭৩ সালেই বঙ্গবন্ধুকে সাতপাঁচ বুঝিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৭৩ অ্যাক্ট প্রবর্তিত হয়। এতে স্বাধীনভাবে নিজেদের কর্মসূচি পরিচালনার দায়দায়িত্ব থাকলেও পরবর্তী সময়ে দেখা গেল শিক্ষকরা নিজেদের ভাগ্য গড়া নিয়ে রাজনীতির লেজুড়বৃত্তিতে মশগুল হয়ে গেল। ফলে সত্যিকার শিক্ষা শিকায় উঠল।

পাকিস্তানিরা শিক্ষিত ব্যক্তিদের কণ্ঠ রুদ্ধ করার জন্য প্রথম শ্রেণির কলেজগুলো সরকারের আওতায় আনে। রক্ত আর সম্ভ্রমের মূল্যে অর্জিত স্বাধীনতা ১৯৭৫ সালের আগস্টে ছিনতাই হয়ে গেলে সামরিক সরকারগুলো নামসর্বস্ব কলেজ সরকারি করে। যার ধারাবাহিকতা বন্ধ হয়নি। লেখা বাহুল্য, বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার মৌলিকত্ব যতটুকু বৃদ্ধি পেয়েছে, তা বিশ্ব র্যাংকিংয়ে আমরা কোথায় অবস্থান করছি, দেখলে লজ্জা ঢাকার জায়গা থাকে না। বঙ্গবন্ধু একটা পর্যায় পর্যন্ত বৈষম্যহীন জ্ঞানভিত্তিক শিক্ষার যে স্বপ্ন দেখতেন, আমরা কৃত্রিম দলবাজ শিক্ষক তা জলাঞ্জলি দিয়েছি। সেই সঙ্গে ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বন্যায় প্লাবিত করেছি। সরকার তুলনামূলকভাবে শিক্ষকদের বেতন কম দিচ্ছেন বলে অপবাদ দেওয়া যায় না। অবকাঠামো দৃষ্টিগ্রাহ্য হয়ে উঠলেও জ্ঞানার্জন লাভের পথ সংকীর্ণ হয়ে আসছে।

স্বাধীনতার ৫০ বছরে শিক্ষার দৃশ্যমান অবকাঠামো যতই জ্বলজ্বল করুক, আমরা শিক্ষা ব্যবসায়ীরা তার ভরাডুবির জন্য কাজ করে চলেছি। কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি আর শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানদের কীর্তি আমাদের অর্জনকে ম্লান করছে। এ জন্য এগিয়ে আসতে হবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ঋদ্ধ নিবেদিতপ্রাণ ব্রতী শিক্ষক সমাজকে। আমরা সেই আশা নিয়ে বসে আছি।

লেখক : সাবেক শিক্ষক, রাজশাহী কলেজ

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা