kalerkantho

শুক্রবার । ৩ বৈশাখ ১৪২৮। ১৬ এপ্রিল ২০২১। ৩ রমজান ১৪৪২

চক্রের খপ্পরে যুবকের জমি

জাল দলিলে বিক্রি তিন বিঘা, পুরো ৪৫ বিঘাই গ্রাসের ফন্দি

হায়দার আলী   

৬ মার্চ, ২০২১ ০২:১২ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



চক্রের খপ্পরে যুবকের জমি

জাল দলিল তৈরি করে নামজারি ও খাজনা-খারিজ করিয়ে যুব কর্মসংস্থান সোসাইটির (যুবক) নামে রাজধানীর তুরাগ থানা এলাকায় থাকা জমির কিছু অংশ বিক্রি করে দিয়েছে একটি প্রভাবশালী চক্র। তুরাগের ধউর মৌজায় যুবকের প্রায় ৪৫ বিঘা জমির মধ্যে এই প্রক্রিয়ায় এর মধ্যে তিন বিঘা বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। এই জমির দুই ক্রেতাও স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি। বাজারমূল্য অনুযায়ী ওই জমির দাম অন্তত ৩০ কোটি টাকা। বাকি জমিও বিক্রির ফন্দি করেছে ওই চক্রটি।

সম্প্রতি কালের কণ্ঠের অনুসন্ধানে এই তথ্য জানা গেছে। প্রভাবশালীদের বানানো জাল দলিল, নামজারি ও খাজনা-খারিজের তথ্য-উপাত্ত এবং জমি বিক্রির বেশ কিছু তথ্য-প্রমাণ কালের কণ্ঠের হাতে আছে।

প্রায় দুই যুগ আগে যুবক নিবন্ধন নিয়েছিল। তখন থেকে কয়েক বছরে প্রায় তিন লাখ যুবককে বাড়ি, গাড়ি আর ব্যবসা-বাণিজ্যের স্বপ্ন দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা সঞ্চয় সংগ্রহ করে। ২০০৫ সালে যুবকের প্রতারণামূলক কার্যক্রম নিয়ে গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হতে থাকে। ২০০৬ সালে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদন্তে বেরিয়ে আসে যুবকের বিরুদ্ধে অবৈধ ব্যাংকিংসহ নানা প্রতারণার চিত্র। এরপর ২০০৯ সালে দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) পদক্ষেপ নিতে বলে বাংলাদেশ ব্যাংক।

গ্রাহকের কোটি কোটি টাকায় ঢাকা, খুলনা, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় শত শত বিঘা জমি কেনাসহ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান করেছিল যুবক-এর তৎকালীন চেয়ারম্যান আবু মোহাম্মদ সাঈদ ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক লোকমান হোসেন।

প্রতারণা ফাঁস হয়ে যাওয়ার পর যুবক-এর সম্পদ বিক্রি করে যেন কেউ পালিয়ে যেতে না পারে সে জন্য সরকার যুবক-এর লেনদেন এবং সম্পদ বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে।

কালের কণ্ঠের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ১৯৯৯ সালের ১২ আগস্ট ও ২০০০ সালের ২৪ মে তুরাগের ধউর মৌজায় ১৪২৩, ১৪৮৮, ১৯২৮ নম্বর খতিয়ানের ১২৪৮, ১২৪৯, ১২৫০ ও ১৭০১ নম্বর দাগে জমি কেনেন যুব কর্মসংস্থান সোসাইটি (যুবক)। যুবকের পক্ষে রেজিস্ট্রিকৃত ৪৭০৩ ও ২৯০৮ নম্বর দলিলে ৪৯ শতাংশ জমি কেনেন যুবকের পক্ষে চেয়ারম্যান আবু মোহাম্মদ সাঈদ। ওই দলিলে স্পষ্ট উল্লেখ আছে যুবক-এর

চেয়ারম্যান আবু মোহাম্মদ সাঈদ দলিল গ্রহীতা। কিন্তু যুবকের সেই জমিটি জালিয়াতির মাধ্যমে ভুয়া দলিল বানিয়ে যুবকের তৎকালীন চেয়ারম্যান আবু মোহাম্মদ সাঈদের স্ত্রী শাহনাজ আখতার ও তাঁর দুই মেয়ে নাজনী আমিন, সুবহা সাঈদকে ওয়ারিশ বানিয়ে বিক্রি করে দিচ্ছে তুরাগ এলাকার একটি চক্র। আসল দলিলে যুবক-এর পক্ষে গ্রহীতা আবু মোহাম্মদ সাঈদের নাম উল্লেখ থাকলেও জাল দলিলে ‘যুবক-এর পক্ষে’ কথাটি বাদ দেওয়া হয়েছে। সরাসরি গ্রহীতা হিসেবে আবু মোহাম্মদ সাঈদের নামে জাল দলিল তৈরি করা হয়েছে। যুবক-এর পক্ষে জমির গ্রহীতা প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক লোকমান হোসেনকে ক্রেতা দেখিয়েও জমির দলিল জাল করা হয়েছে। তাঁর ওয়ারিশদের নামে নামজারি ও খাজনা-খারিজ করিয়ে জমি বিক্রি করা হয়েছে। ওই তিন বিঘা গত বছরের শেষের দিকে বিক্রি করা হয়। এ ছাড়া আরো ৮-১০ বিঘা জমির দলিল এর মধ্যে জাল করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

জানা গেছে, ২০ বছর আগে এসব জমির দলিল লেখক ছিলেন এরশাদ মিয়া। সেই এরশাদ মিয়ার সই-স্বাক্ষরেই করা হয়েছে ভুয়া নতুন দলিল। তারিখ ও নম্বরসহ অনেক কিছুই ঠিক রেখেই জাল দলিল করা হয়েছে। কিন্তু খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, সেসব দলিল সম্পাদনকারী এরশাদ মিয়া কয়েক বছর আগেই মারা গেছেন। কিন্তু জালিয়াতচক্র মৃত এরশাদ মিয়াকে জীবিত দেখিয়ে ভুয়া স্বাক্ষর আর টিপসই দিয়ে জাল দলিল তৈরি করে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বেশ কয়েক বছর আগে যুবকের চেয়ারম্যান আবু মো. সাঈদ মারা যান। সেই আবু সাঈদের স্ত্রী ও কন্যার নামে জমির নামজারি ও খাজনা-খারিজ করিয়ে প্রায় তিন বিঘা জমি এর মধ্যে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় প্রভাবশালী মোয়াজ্জেম হোসেন ও মোস্তাক হোসেন এই জমির ক্রেতা। তুরাগ এলাকায় বিজিএমইএ ভবনের পেছনে থাকা এই জমির বর্তমান বাজারমূল্য প্রতি শতাংশ প্রায় ৩০ লাখ টাকা। সেই হিসাবে তিন বিঘা জমি বিক্রি করে প্রতারকচক্রটি প্রায় ৩০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই প্রতারকচক্রের হোতা তুরাগ এলাকার গোলাম রসুল রাসেল, কবির হোসেন ও নূরউদ্দিন সরকার ওরফে নূর নবী। আর এই প্রতারকচক্রকে নানাভাবে সহায়তা করছেন বলে স্থানীয় কাউন্সিলর নাসের হোসাইনের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। জাল দলিলে জমি বিক্রি এবং ভূমি অফিসের কিছু অসাধু কর্মচারীর মাধ্যমে নামজারি-খাজনা-খারিজ করিয়ে দিচ্ছে এই প্রতারকচক্র।

জাল দলিলে জমি বিক্রি এবং নামজারি ও খাজনা-খারিজ করার বিষয়টি নজরে এলে গত মাসে মিরপুর রাজস্ব সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) সৈয়দ মুরাদ হোসেনের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন যুবক-এর ধউর প্রকল্পের একসময়ের তত্ত্বাবধায়ক রফিক মোল্লা ও অফিস সহকারী সোহরাব হোসেন রবিন। তাঁরা দুজনই স্থানীয় বাসিন্দা। পাশপাশি ভুয়া দলিলে নামজারি-খাজনা-খারিজ বাতিলের জন্য তাঁরা একটি মামলাও করেছেন।

রফিক মোল্লা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এই জমিগুলো যুবক-এর পক্ষে কিনেছিলেন প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান আবু সাঈদ ও যুবক হাউজিং লিমিটেডের পক্ষে লোকমান হোসেন। কিন্তু জালিয়াতচক্র জাল দলিল বানিয়ে জমি বিক্রি করে দিচ্ছে। এর মধ্যে ১৫-২০টির মতো জাল দলিল বানিয়েছে তারা। বিক্রি করেছে তিন বিঘার মতো জমি। আরো জমি বিক্রির চেষ্টা করছে তারা।’

একই কথা বললেন যুবক-এর অফিস সহকারী সোহরাব হোসেন রবিন। তিনি বলেন, ‘শুধু যুব কর্মসংস্থান সোসাইটি আর যুবক হাউজিং অ্যান্ড রিয়েল এস্টেটের পক্ষে কথাটি বাদ দিয়ে ব্যক্তি আবু সাঈদ ও লোকমান হোসেনের নামে জালিয়াতচক্র জাল দলিল বানায়। জাল দলিলের মাধ্যমে স্থানীয় প্রভাবশালীদের কাছে জমি বিক্রিও করে দিয়েছে।’

যুবক ক্ষতিগ্রস্ত জনকল্যাণ সোসাইটির হিসাব মতে, সারা দেশে প্রতিষ্ঠানটির ছয় হাজার ১২৪ কোটি ৮০ লাখ ৬৪ হাজার টাকার সম্পদ রয়েছে। এর মধ্যে জমির পরিমাণ তিন হাজার একর। এ ছাড়া আবাসন, বনায়নসহ মোট প্রকল্প ১৮টি। ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন স্থানে অন্তত ১৮টি বহুতল বাড়িও রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিনের নেতৃত্বাধীন তদন্ত কমিশনের দেওয়া প্রতিবেদনের তথ্য মতে, সারা দেশে যুবক-এর জমি রয়েছে দুই হাজার ২০০ একর, ১৮টি বাড়ি ও ১৮টি প্রকল্প; যার আর্থিক মূল্য তিন হাজার কোটি টাকার মতো। এসব সম্পত্তি নিয়ে আদালতে একাধিক মামলা রয়েছে। মামলা মাথায় নিয়ে যুবকের বেশির ভাগ কর্মকর্তা পলাতক রয়েছেন।

তেজগাঁও ভূমি অফিসের ভূমি রেকর্ড ঘেঁটে দেখা যায়, বালাম বইয়ে যুবক হাউজিং অ্যান্ড রিয়েল এস্টেটের পক্ষে লোকমান হোসেন এবং যুব কর্মসংস্থান সোসাইটির পক্ষে চেয়ারম্যান আবু মো. সাঈদের নাম উল্লেখ আছে। যুবক-এর পক্ষে লোকমান হোসেনের নামে কেনা সাতটি আসল দলিলের সার্টিফায়েড কপি এবং নকল দলিলেরও সাত কপি রয়েছে কালের কণ্ঠের কাছে। নকল দলিলে দেখা যায় গ্রহীতা হিসেবে শুধু লোকমান হোসেন ও আবু সাঈদের নাম রয়েছে। ‘যুব কর্মসংস্থান সোসাইটি কিংবা যুবক হাউজিংয়ের পক্ষে’ কথাটি লেখা নেই।

এ বিষয়ে গতকাল শুক্রবার মিরপুর সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) সৈয়দ মুরাদ হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে ভুয়া কাগজপত্রের মাধ্যমে নামজারি, খাজনা-খারিজ করিয়ে নিয়েছিল। কিন্তু বিষয়টি জানার পর আমরা ওই নামজারি, খাজনা-খারিজ দুদিন আগে বাতিল করে দিয়েছি। শুধু তা-ই নয়, খতিয়ানে নোট রেখেছি, লাল কালি দিয়ে ডিসপুট দিয়ে রেখেছি যেন এই খতিয়ান থেকে অন্য কেউ নামজারি করতে না পারে। দলিল যাচাইয়ের টুলসগুলো আমাদের কাছে সব সময় থাকে না। জালিয়াতির বিষয়টি সব সময় ধরা কঠিন হয়ে যায়। সন্দেহ হলে সাবরেজিস্ট্রারের সঙ্গে কথা বলে নিই। তবে এই প্রতারণাটি খুবই সূক্ষ্মভাবে করা হয়েছে। যখনই জানতে পেরেছি এই জালিয়াতির ঘটনা তাত্ক্ষণিক ঊর্ধ্বতনদের সঙ্গে কথা বলে বাতিল করে দিয়েছি।’

সৈয়দ মুরাদ হোসেন আরো বলেন, এই জালিয়াতির সঙ্গে যারা জড়িত তাদের বিরুদ্ধেও মামলা করা হবে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা