kalerkantho

বুধবার । ১ বৈশাখ ১৪২৮। ১৪ এপ্রিল ২০২১। ১ রমজান ১৪৪২

স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীর অঙ্গীকার

হাসান-উজ-জামান   

৫ মার্চ, ২০২১ ০২:১৭ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতির ইতিহাসে সমগ্র মার্চ মাসের গুরুত্ব অপরিসীম। দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তানি পাঞ্জাবি শাসকগোষ্ঠীর সুদীর্ঘ ২৩ বছরের আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বৈষম্যের শিকার তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ তথা বাঙালিরা পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর উপলব্ধি করে তাদের আত্মনিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ের কোনো বিকল্প নেই। এই বোধ থেকেই বাঙালি জাতি ঐক্যবদ্ধ হতে শুরু করে। ১৯৪৭ সালেই কলকাতার সিরাজউদ্দৌলা হোটেলে বসে যুবনেতা শেখ মুজিবসহ ১৪ জন বাঙালি নেতা এই মর্মে সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী সম্ভাব্য সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক নির্যাতন-নিষ্পেষণের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার কোনো বিকল্প নেই। যার প্রথম প্রতিবাদের প্রতিফলন ঘটে ১৯৫৪ সালে হক-ভাসানী-সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বাধীন যুক্তফ্রন্টের কাছে সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে মুসলিম লীগের চরম ভরাডুবি ও যুক্তফ্রন্ট গঠনের পেছনে তদানীন্তন  যুবনেতা শেখ মুজিবের বলিষ্ঠ ভূমিকার কারণে তিনি মাত্র ৩৪ বছর বয়সেই গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রিত্ব লাভ করেন।

বাঙালির মুক্তি সনদ ছয় দফার ভিত্তিতে সত্তরের নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ জয়লাভ সত্ত্বেও প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া কর্তৃক বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তানের ভাবী প্রধানমন্ত্রী ঘোষণার পরও জুলফিকার আলী ভুট্টোসহ পাঞ্জাবিদের চক্রান্ত অব্যাহত থাকে। ক্ষমতা হস্তান্তরের পরিবর্তে বাঙালিদের নিধনের যাবতীয় প্রস্তুতি অব্যাহত থাকে। প্রহসনমূলক আলোচনার নামে জাহাজে করে অস্ত্র সরবরাহ অব্যাহত থাকে।

১৯৭০ সালের ২ মার্চ স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ পূর্ব বাংলার মানচিত্র ও লাল সূর্যখচিত সবুজ পতাকা উত্তোলন করে। মার্চের প্রথম থেকেই বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে শুরু হয় হরতাল। তবে জনস্বার্থে ওষুধের দোকান, হাসপাতাল, অ্যাম্বুল্যান্স, সংবাদপত্র, আবর্জনা বহনের ট্রাক, টেলিফোন, বিদ্যুৎ, দমকল, পানি সরবরাহ হরতালের আওতামুক্ত থাকে। স্বাধীনতাসংগ্রামের পক্ষে ৫ মার্চ মসজিদ, মন্দির, গির্জাসহ সব উপাসনালয়ে প্রার্থনা অনুষ্ঠিত হয়। ৬ মার্চ বেতার ভাষণে ইয়াহিয়া খান সেনাবাহিনীর মাধ্যমে জাতিকে শায়েস্তা করার হুমকি দেন। সমগ্র জাতি এ হুমকির তোয়াক্কা না করে বিক্ষোভ ও বিদ্রোহে ফেটে পড়ে। যেহেতু রাত পোহালেই ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ, তাই অধীর আগ্রহে কৌতূহল এবং উৎসাহ-উদ্দীপনা নিয়ে প্রতীক্ষার প্রহর গুনে সমগ্র জাতি।

বাঙালির বহু কাঙ্ক্ষিত ও প্রতীক্ষিত ৭ই মার্চ দলবদ্ধভাবে জঙ্গি মিছিল ও লাঠিসোঁটা নিয়ে লাখো মানুষের ঢল নামতে থাকে তদানীন্তন রেসকোর্স ময়দান অর্থাৎ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে প্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুনতে। প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে কৃষক-শ্রমিক-ছাত্র-শিক্ষক-চাকরিজীবী জনসভাস্থলে পৌঁছেন। সবার মুখে ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হয়—তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা-মেঘনা-যমুনা। তুমি কে, আমি কে, বাঙালি বাঙালি। তোমার নেতা আমার নেতা, শেখ মুজিব শেখ মুজিব। পিণ্ডি না ঢাকা, ঢাকা ঢাকা। তোমার দেশ আমার দেশ, বাংলাদেশ বাংলাদেশ। বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো, জয় বাংলা প্রভৃতি স্লোগানে আকাশ-বাতাস মুখরিত হয়। কোনো নেতার আহ্বানে, কারো ভাষণ শুনতে এত বড় জনসমুদ্র কখনো কোথাও হয়েছে কি না জানা নেই। কোনো নেতার ভাষণ কোনো দিন জাতিকে এত উজ্জীবিত ও অনুপ্রাণিত করেনি। এটি সন্দেহাতীতভাবে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ভাষণের একটি, যা আজ জাতিসংঘের ইউনেসকো স্বীকৃত। যে ভাষণ উপস্থাপনের ক্ষেত্রে বাঙালির অবিসংবাদিত নেতার সামান্য ছন্দঃপতন ঘটেনি, যা তিনি উপস্থাপন করেন কবিতার মতো, যা ছিল সাবলীল অথচ অলিখিত। যেটি ছিল তৎকালীন সময়ের সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ। বঙ্গবন্ধু যথার্থই উপলব্ধি করেছিলেন যে আলোচনার নামে প্রহসন করে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া তথা পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বাঙালি জাতিকে নিশ্চিহ্ন করার গভীর চক্রান্তে লিপ্ত এবং বৈঠকের নামে তিনি প্রতারণার আশ্রয় নিচ্ছেন। তাই জাতিকে সর্বাত্মক প্রস্তুতি গ্রহণের আহ্বান জানাতে তিনি সামান্য ভুল করেননি। জাতি তার নেতার অগ্নিমন্ত্রে উদ্বুদ্ধ হয়ে প্রত্যন্ত গ্রামগঞ্জ, পাড়া-মহল্লা, ঘরে ঘরে যার যার সাধ্য অনুসারে পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনীর হামলা প্রতিহতের প্রস্তুতি নেয়, এ লক্ষ্যে দেশব্যাপী আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সংগ্রাম পরিষদ ও স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গঠিত হয়।

একাত্তরের ৭ই মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধুর অসহযোগ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সমগ্র বাংলাদেশে (তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান) পাকিস্তানি শাসনযন্ত্র অচল হয়ে পড়ে। সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত সব প্রতিষ্ঠান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদের স্বাক্ষরিত প্রেস বিজ্ঞপ্তি অনুসারে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে পরিচালিত হতে থাকে। সর্বত্র উত্তোলন করা হয় স্বাধীন বাংলার মানচিত্রখচিত সবুজ পতাকা। ক্ষমতায় আরোহণ ছাড়া বিশ্বের কোথাও কোনো নেতার নির্দেশে রাষ্ট্র পরিচালিত হওয়ার এমন ঘটনা বিশ্বের ইতিহাসে বিরল। বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য নেতৃত্বের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ স্বাধীনতাযুদ্ধ তথা সশস্ত্র মুক্তিসংগ্রামকে বাঙালি জাতীয়তাবাদী মহামন্ত্রে উজ্জীবিত করে সফল পরিণতির দিকে এগিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছিল।

মহান স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীর অঙ্গীকার হোক স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব বিরোধীদের সব ষড়যন্ত্র প্রতিহত করে দেশাত্মবোধ তথা দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে দেশ ও জাতিকে উন্নয়নের দ্বারপ্রান্তে এগিয়ে নেওয়ার। জাতির পিতার অসমাপ্ত স্বপ্ন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে শোষণ-নির্যাতন-নিষ্পেষণমুক্ত বাংলাদেশ বিনির্মাণে আত্মনিয়োগ করা। বঙ্গবন্ধু ঘোষিত শোষণহীন-অসাম্প্রদায়িক তথা সাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ বিনির্মাণের লক্ষ্যে আত্মনিয়োগ করা। স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী সামনে রেখে এটিই হোক সমগ্র জাতির দৃঢ় অঙ্গীকার।

লেখক : ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব, মুক্তিযোদ্ধা সংহতি পরিষদ (মুসপ)

[email protected]

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা