kalerkantho

শুক্রবার । ৩ বৈশাখ ১৪২৮। ১৬ এপ্রিল ২০২১। ৩ রমজান ১৪৪২

দেশে করোনা কী কারণে শীতে কম গরমে বেশি পর্যবেক্ষণের তাগিদ

তৌফিক মারুফ   

৫ মার্চ, ২০২১ ০২:০৭ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



দেশে করোনা কী কারণে শীতে কম গরমে বেশি পর্যবেক্ষণের তাগিদ

দেশে শীতে করোনা সংক্রমণ বেড়ে যেতে পারে—এমন আশঙ্কা থাকলেও সেটা হয়নি। বরং ধারাবাহিকভাবে কমছিল। শীত বিদায় নেওয়ার পর গরমের আবহ ফিরতেই সংক্রমণ আবার বাড়তির দিকে। এর মধ্যে মাসখানেক হলো গণটিকাদানও চলছে। তাহলে করোনা সংক্রমণ আবার বাড়ছে কেন তার কারণ খোঁজার তাগিদ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

সাধারণভাবে যা দেখা যাচ্ছে, সেটা হলো টিকা দেওয়া শুরুর পর যেন সব মহলেই স্বস্তির পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। যদিও টিকা নেওয়ার পরও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার জন্য বলছেন বিশেষজ্ঞরা। কিন্তু হঠাৎ করেই মানুষের মধ্যে বিনোদনমূলক ভ্রমণ, সামাজিক-সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, রাজনৈতিক সভা-সমাবেশে উপস্থিতি করোনাকালের আগের অবস্থায় ফিরতে শুরু করেছে, যেখানে মানুষ স্বাস্থ্যবিধি মানার তোয়াক্কা করছে না। শারীরিক দূরত্ব তো দূরের কথা, মাস্ক ব্যবহারও ছেড়ে দিতে শুরু করেছে মানুষ।

এই চিত্রের বিপরীতে দেশে করোনা পরীক্ষা মাঝে কিছুটা কমলেও আবার বাড়তে শুরু করেছে। মানুষ উপসর্গ নিয়ে পরীক্ষার জন্য ছুটছে। আর পরীক্ষা বাড়লেই বাড়ছে শনাক্ত।

গত মাসে যেখানে দৈনিক শনাক্ত ৩০০ জনের নিচে নেমে গিয়েছিল, তা এখন আবার ৬০০-এর ওপর উঠে গেছে। বিষয়টিকে জনস্বাস্থ্যবিদরা দেখছেন শঙ্কার চোখে। তাঁরা বলছেন, দেশ এখনো করোনার ঝুঁকির মধ্যেই আছে। সতর্কতা অবলম্বন না করলে টিকা নেওয়ার পরেও যেকোনো সময় পরিস্থিতি আবার খারাপ হতে পারে। কারণ টিকা নিলেই যে সংক্রমণ ঘটবে না, এমন নয়।

গত বছরের মতো এবারও গরমকালে দেশে করোনা সংক্রমণ বাড়ে কি না তার দিকে নজর রাখতে বলেছেন কেউ কেউ।

করোনাভাইরাস সংক্রমিত রোগী শনাক্তের তথ্য থেকে দেখা যায়, গত ১৩ ফেব্রুয়ারি পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টার হিসাবে শনাক্ত নেমে গিয়েছিল ২৯১ জনে। এর আগে ৭ ফেব্রুয়ারি ছিল ২৯২ জন। এর কাছাকাছি সময়ে আরো চার দিন শনাক্ত ছিল ৩০০ জনের নিচে। এর পর থেকেই আবার তা বাড়তে থাকে। কিন্তু গত তিন দিনের হিসাবে দেখা যায়, গত মঙ্গলবার শনাক্ত ছিল ৫১৫ জন, বুধবার ছিল ৬১৪ জন ও গতকাল ছিল ৬১৯ জন। শুধু শনাক্তই নয়, উপসর্গ নিয়ে করোনা পরীক্ষার ল্যাবগুলোতেও ভিড় বেড়েছে। গত মঙ্গলবার নমুনা পরীক্ষা হয়েছে ১৫ হাজার ৩২৫ জনের, বুধবার হয়েছে ১৬ হাজার ৪১৪ জনের এবং গতকাল বৃহস্পতিবার হয়েছে ১৬ হাজার ১৪৪ জনের।

তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ১৪ ফেব্রুয়ারি ভালোবাসা দিবস ও পহেলা ফাল্গুন বা বসন্ত উৎসব, একুশে ফেব্রুয়ারি ঘিরে ঢাকাসহ সারা দেশেই ঘরের বাইরে মানুষের ঢল নামে। কক্সবাজারে পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড়ও ছিল। এর পর থেকে আবার সংক্রমণ বাড়ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শক ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. এম এ ফয়েজ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘করোনা থেকে রক্ষায় কী করণীয় তা এখন আর কারোই অজানা নয়। কিন্তু দুঃখজনক ব্যাপার হচ্ছে, সবাই জেনেশুনেও বিপজ্জনক আচরণ করছে। স্বাস্থ্যবিধি থেকে সবাই যেন দূরে সরে যাচ্ছে। কিন্তু সবার মনে রাখা উচিত—এখনো দেশে সংক্রমণ আছে, প্রতিদিন শনাক্ত ও মৃত্যু ঘটছে। বরং সংক্রমণ প্রতিরোধের কার্যক্রমগুলো থেমে যাচ্ছে।’ তিনি বলছেন, মানুষ যেভাবে স্বস্তি বোধ করছে, বিষয়টি আসলে এখনো ততটা স্বস্তির পর্যায়ে যেতে পারেনি। যার প্রমাণ মিলছে পরীক্ষা ও শনাক্ত বেড়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে। যদি পরীক্ষা ও শনাক্ত কমে যে পর্যায়ে নেমেছে সেখান থেকে আর ঊর্ধ্বমুখী না হতো এবং আরো নিচে নামত তবে বলা যেত ঝুঁকি নেই। এখন কোনো অবস্থাতেই তা বলা যাচ্ছে না।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বাংলাদেশ কার্যালয়ের ১ মার্চ প্রকাশিত সর্বশেষ সাপ্তাহিক প্রতিবেদনের (২০২১ সালের অষ্টম সপ্তাহ) তথ্য বলছে, আগের সপ্তাহের (সপ্তম সপ্তাহ) তুলনায় দৈনিক শনাক্ত ৩.৮ শতাংশ বেড়েছে। এর মধ্যে ঢাকা মহানগরীতে সর্বোচ্চ ৫৭.৩ শতাংশ শনাক্ত হয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ওই প্রতিবেদন অনুসারে, দেশে চল্লিশোর্ধ্ব জনগোষ্ঠীর ৭.৫ শতাংশের করোনার টিকা দেওয়া হয়েছে। যাদের মধ্যে ঢাকা মহানগরীতে জনগোষ্ঠীর ১৮.৪ শতাংশ টিকা নিয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক ডা. বে-নজীর আহম্মেদ বলেন, ‘আগে ধারণা ছিল শীতপ্রধান দেশগুলোর মতোই বাংলাদেশেও শীতকালেই ইনফ্লুয়েঞ্জার প্রকোপ ঘটে। কিন্তু বাস্তবে আমরা দেখেছি এর উল্টো, বিশেষ করে আমাদের এখানে গরমকালেই বেশি ইনফ্লুয়েঞ্জা দেখা দেয়। একইভাবে আমাদের আশঙ্কা ছিল, করোনা আমাদের দেশে শীতের সময় বেড়ে যাবে। কিন্তু আমরা দেখলাম উল্টো কমে গেছে। আবার এখন গরমের মতো আবহাওয়ায় আসতে না আসতেই বাংলাদেশ ভারত এবং আরো কিছু গরমপ্রধান দেশে বাড়তে শুরু করেছে। গত বছর আমাদের দেশে পিক ছিল ভর গরমের সময়ে। ফলে একটা চিন্তা তো আছেই যে আমাদের এখানে এবারও গরমে করোনা বেড়ে যায় কি না।’ তিনি আরো বলেন, ‘গতবারের অভিজ্ঞতা মাথায় রেখেই আমাদের আগাম সতর্ক থাকা দরকার, যাতে গরমে সংক্রমণ বেড়ে গেলে যেন সেটা মোকাবেলা করা যায়। আর যদি না বাড়ে তবে তো সমস্যা থাকবে না। ফলে সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ার কারণ পর্যবেক্ষণ করা এখনো খুবই জরুরি।’

সর্বশেষ তথ্য অনুসারে, গতকাল পর্যন্ত দেশে মোট করোনার টিকা নিয়েছেন ৩৫ লাখ ৮১ লাখ ১৬৯ জন। এর মধ্যে গতকাল এক দিনে টিকা নিয়েছেন এক লাখ ২১ হাজার ১০ জন। মোট টিকাগ্রহীতার পাঁচ লাখ ৪৩ হাজার ৬১৬ জনই ঢাকা মহানগরীর।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা