kalerkantho

বুধবার । ১ বৈশাখ ১৪২৮। ১৪ এপ্রিল ২০২১। ১ রমজান ১৪৪২

যুক্তরাষ্ট্রের অ্যান্টি-এশিয়ান সহিংসতা কী বার্তা দেয়?

অ্যান আনলিন চেং   

৪ মার্চ, ২০২১ ০৪:০৯ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



যুক্তরাষ্ট্রের অ্যান্টি-এশিয়ান সহিংসতা কী বার্তা দেয়?

গত বছরের মার্চ মাসে নিউ ইয়র্কে ২৩ বছর বয়সী এক কোরীয় নারীকে করোনাভাইরাসের জন্য দায়ী করে তার মুখে ঘুষি মারা হয়। যুক্তরাষ্ট্রে ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে আরো অনেক ঘটনা ঘটে, যাতে এশিয়ান-আমেরিকানদের থুথু নিক্ষেপ, মারধর, হত্যা, এমনকি রাসায়নিকের সাহায্যে হামলা করা হয়।

এ ধরনের মহামারিসংক্রান্ত সহিংসতার প্রেক্ষাপটে অ্যাডভোকেসি সংগঠনগুলো এশিয়ান-আমেরিকানদের বিরুদ্ধে সহিংসতা ও হয়রানির ঘটনা নথিভুক্ত করা শুরু করে। ‘স্টপ এপিআই হেট’ নামের একটি সংস্থা ২০২০ সালে দুই হাজার ৮০০টি সহিংসতার অভিযোগ পেয়েছে, যার মধ্যে ২৪০টি শারীরিক নিপীড়ন। এ ছাড়া এএপিআই ইমার্জেন্সি  রেসপন্স নেটওয়ার্ক গত বছর কভিড সংশ্লিষ্ট বিদ্বেষের ঘটনা শনাক্ত করার কাজ শুরুর পর থেকে তিন হাজারের বেশি অভিযোগ পায়।

নতুন বছরে এসেও দেখা গেল, সহিংসতা চলছে। জানুয়ারিতে সানফ্রান্সিসকোতে ৮৪ বছর বয়স্ক এক থাই নাগরিক রাস্তায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান। অকল্যান্ডের চায়না টাউনে ৯১ বছর বয়সী এক ব্যক্তিকে মারধর করে মাটিতে ফেলে দেওয়া হয়। এসব ঘটনার খুব সামান্যই জাতীয় পর্যায়ের সংবাদ হিসেবে গুরুত্ব পায়। ফলে অ্যান্টি-এশিয়ান সহিংসতার স্বল্পমাত্রার ঢেউ আমেরিকার বর্ণবাদী সহিংসতা হিসেবে আড়ালেই থেকে যায়।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বর্ণবাদী সহিংসতা শুধু সাদা-কালোর বিষয় নয়; কিন্তু ইস্যুটাকে এভাবেই দেখা হয়। প্রকৃতপক্ষে সমাজের স্তরে স্তরে ভিকটিমাইজেশন (কাউকে শিকারে পরিণত করা) ও পরোক্ষ শত্রুতাই হলো আমেরিকান বর্ণবাদের চিত্র। তবে অ্যান্টি-এশিয়ান সহিংস ঘটনাগুলোর ক্ষেত্রে যেহেতু অপরাধীরা কৃষ্ণাঙ্গ, তাই অন্যরা আফ্রিকান-আমেরিকানদের অপরাধীকরণের কারণ নিয়ে খুবই অস্বস্তিবোধ করেন।

এ ক্ষেত্রে আমরা সমাজবিজ্ঞানী উইলিয়াম পিটারসেনের জনপ্রিয় করে তোলা ‘মডেল মাইনোরিটি’ মিথকে (অগ্রসর মানসিকতার সংখ্যালঘুদের নিয়ে জনশ্রুতি) ধন্যবাদ দিতে পারি। এই জনশ্রুতি অনুযায়ী দীর্ঘদিন ধরেই এশিয়ান-আমেরিকানদের শ্বেতাঙ্গ ঘনিষ্ঠ মনে করা হয়। এই জনশ্রুতি ব্যবহার করে অন্য সংখ্যালঘুদের খোঁচা দেওয়া হয়। অথচ এশিয়ান-আমেরিকানরা কখনোই শ্বেতাঙ্গ ক্লাবের সদস্য হতে পারে না। তাদের ক্রমাগত বর্ণবাদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়; অথচ আমেরিকান বর্ণবাদী সমীকরণে তারা গণ্য হয় না। ভাবখানা এমন, এশিয়ান-আমেরিকানরা কি আহত হলো নাকি যথেষ্ট আহত হলো যে আমাদের জাতীয় মনোযোগ আকর্ষণের দাবি করতে পারে? তাই প্রশ্ন হচ্ছে, ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা দিয়ে কিভাবে একটা বর্ণবাদী আচরণকে মূল্যায়ন করা যায়? অথচ আমেরিকান রাজনীতি ও সংস্কৃতিতে এশিয়ান-আমেরিকানরা এক অদ্ভুত জায়গায় অবস্থান করছে। যদি তারা আদৌ জাতীয় চেতনায় মিশে যেতে যায়, তাহলে তাদের বিদেশি হুমকি (এশিয়ান টাইগার, গুপ্তচর বা  রোগের বাহক) অথবা অন্য সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে বর্ণবাদের অজুহাতের প্রিজম হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

সাম্প্রতিক সময়ে অ্যান্টি-এশিয়ান সহিংসতাগুলোর জন্য আংশিকভাবে দায়ী করা যেতে পারে আমাদের সাবেক প্রেসিডেন্টকে, যিনি অব্যাহতভাবে ‘চীনা ভাইরাস’ এবং এমনকি ‘কুংফু ফ্লু’ নিয়ে কথা বলেছিলেন। তবে এটাও ঠিক যে এশিয়ান বংশোদ্ভূত লোকদের বিরুদ্ধে এ দেশে দীর্ঘদিন ধরে যে পদ্ধতিগত ও সাংস্কৃতিক বর্ণবাদের চর্চা রয়েছে, সেটা না থাকলে ট্রাম্প এ ধরনের ঘৃণাকে পুঞ্জীভূত করতে পারতেন না।

অর্থাৎ আমাদের ইতিহাসই এ ক্ষেত্রে জট পাকিয়ে আছে।  আমাদের খুব কম লোকই জানে এখানে দাসপ্রথার মাধ্যমে একই পরিবারের অনেকেই সম্পদ অর্জন করেছিল, চীনে আফিম বাণিজ্য  থেকে লাভবান হয়েছিল। ১৮৭১ সালে লস অ্যাঞ্জেলেসের ‘নিগ্রো গলিতে‘ অন্তত ১৭ জন চীনা বাসিন্দাকে টার্গেটেড ভিকটিম বানানো হয়েছিল, যা  আমেরিকার ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ গণপিটুনির ঘটনাও; তা-ও খুব কম লোকই জানে। আবার ভুটানিজ ও বার্মিজ-আমেরিকানদের ৩০ শতাংশের বেশি দারিদ্র্যের হারের বিষয়টিও ‘মডেল মাইনোরিটি’ মিথের কারণে  আড়ালে পড়ে যায়।

প্রশ্ন হচ্ছে, যখন এশিয়ান-আমেরিকান দুর্ভোগের কথা আসে তখন আমেরিকানরা কি তা জানতে চায়? এই পরিস্থিতিতে পরামর্শ দেওয়াটা খুব  বোকার মতো মনে হতে পারে যে আমাদের পরস্পরকে শেখা উচিত, মূল্য দেওয়া উচিত। আমাদের পরস্পরকে দোষারোপের বদলে শ্রদ্ধা জানানোর জন্য নিজেদের  দেশবাসী সম্পর্কে জানা উচিত। তা না করে আমরা যদি এখনো জাতিগত এবং সাংস্কৃতিক বৈষম্যকে নিদারুণভাবে বৈধতা দিয়ে যাই, তাহলে সেটা স্বল্প মেয়াদে সংস্কারকে ত্বরান্বিত করতে পারে বটে; কিন্তু তা দীর্ঘমেয়াদি সাম্প্রদায়িক সংহতির রাজনীতিকে পরিপুষ্ট করবে, যা বারবার বিস্ফোরিত হয়।

প্রগতির প্রতি আগ্রহের কারণে অতীত বর্ণবাদী সমস্যা অতিক্রম করার আকাঙ্ক্ষা আমাদের রয়েছে। কিন্তু একটি স্থায়ী, অবর্ণনীয়, কখনো পরস্পরবিরোধী বর্ণবাদ যে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করেছে, তার মোকাবেলা অনেক কঠিন কাজ। অথচ এর পরিবর্তে আমরা আঘাতের মাত্রা এবং আঘাতপ্রাপ্ত ব্যক্তির শ্রেণি পরিচয় নিয়ে অধিক মনোযোগী হয়ে পড়ি। তাই সমাধানহীন দুঃখ এবং স্বীকৃতিহীন বর্ণবাদী ধারাবাহিকতা আমাদের সামাজিক সম্পর্কগুলোকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে। এখন আমেরিকান গণতন্ত্রের চ্যালেঞ্জ হচ্ছে নিজের আত্মস্বার্থ অন্যের স্বার্থের সঙ্গে অনিবার্যভাবে জড়িত থাকার বিষয়টি গভীরভাবে দেখতে শেখা। কিন্তু এই পাঠ কি আমেরিকানরা গ্রহণ করতে প্রস্তুত?

এশিয়ান-আমেরিকানরা অন্যদের সমীহ করতে করতে ক্লান্ত। সত্যটা হচ্ছে, খুব কম লোকই শুনছে। তবু আমরা শুধু আমাদের সত্য কথা বলা চালিয়ে  যেতে পারি, জানাশোনাটা চালিয়ে যেতে পারি। এমনকি শুধু নিজেদের জন্য যে আমরা এখানে আছি।

সূত্র : দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস
লেখক : প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটির ইংরেজি ও আমেরিকান স্টাডিজের অধ্যাপক
ভাষান্তর ও সংক্ষেপণ : আফছার আহমেদ

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা