kalerkantho

রবিবার। ২৮ চৈত্র ১৪২৭। ১১ এপ্রিল ২০২১। ২৭ শাবান ১৪৪২

আর্থিক খাতের সংস্কার জরুরি

এম হাফিজউদ্দিন খান   

৩ মার্চ, ২০২১ ০৩:৪২ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



আর্থিক খাতের সংস্কার জরুরি

সাম্প্রতিক কিছু কেলেঙ্কারির ঘটনার মধ্য দিয়ে আমরা দেখলাম দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ঘিরে নৈরাজ্য কত দূর ও কতটা গভীরে বিস্তৃত হয়েছে। শুধু একটি বা দুটি নয়, ব্যাংকবহির্ভূত আরো কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অবস্থাও খারাপ। সব মিলিয়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাত রীতিমতো ধুঁকছে। দিন দিন আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর খেলাপি ঋণের পরিমাণও বাড়ছে। দেশের আর্থিক খাতের প্রধান অংশ ব্যাংকিং খাতের অবস্থা গত কয়েক বছরে বেশি খারাপ হয়েছে। সব ঘটনার পেছনেই ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর প্রভাবশালীদের অনৈতিক প্রভাব বিস্তার এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে খাতকদের যোগসাজশের কথা উঠে আসছে। তাই আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রণ যাতে একেবারেই আলগা হয়ে না পড়ে তা নিয়ে সরকার এবং আর্থিক খাত সংশ্লিষ্ট সবাইকে নতুন করে ভাবতে হবে।

গত মাসে একটি সংবাদপত্রের প্রতিবেদনে জানা গিয়েছিল, করোনাভাইরাস মহামারির কারণে নতুন করে কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান খেলাপি হচ্ছে না। তার পরও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর খেলাপি ঋণ দুই বছরে প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। পরিচালনাগত অদক্ষতা এবং অনিয়মের কারণে প্রতিষ্ঠানগুলো দিন দিন দুর্বল হয়ে পড়ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বরাতে প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয়েছিল, গত বছর সেপ্টেম্বরের শেষে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১০ হাজার ২৪৫ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে, যা ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে ছিল পাঁচ হাজার ৪৬০ কোটি টাকা। ফলে অন্তত ১০টি প্রতিষ্ঠান গ্রাহকদের অর্থ সময়মতো ফেরত দিতে পারেনি। এ কারণে পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফিন্যানশিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেডে তো অবসায়কই নিয়োগ হয়। এর বাইরে টাকা ফেরত দিতে না পারা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফিন্যানশিয়াল সার্ভিসেস, এফএএস ফিন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড ও বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফিন্যান্স কম্পানি (বিআইএফসি)। এগুলো ছাড়া আরো বেশ কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগের কথা জানা যায়।

গত বছর ট্রান্সফারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) এক গবেষণায় জানা গিয়েছিল, খেলাপি ঋণ আদায়ে আমাদের কেন্দ্রীয় ব্যাংক অকার্যকর হয়ে পড়ছে। তাতে বলা হয়েছিল ব্যাংকগুলোর শাখা যত বাড়ছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনের সংখ্যা তত কমছে। আবার পরিদর্শনে পাওয়া অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতেও জটিলতা দেখা যায়। এ অবস্থায় আর্থিক খাতে সুশাসন ফেরাতে একটি কমিশন গঠনের সুপারিশ করেছিল টিআইবি। সিপিডিসহ আরো কয়েকটি প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরেই এই সুপারিশ করে আসছে। সাবেক ও বর্তমান অর্থমন্ত্রী এ ধরনের কমিশন গঠনে আগ্রহের কথা জানালেও অজানা কারণে তা বাস্তবায়িত হচ্ছে না। এমন পরিস্থিতিতে আর্থিক খাতে একটির পর একটি অনিয়ম ধরা পড়ছে। আর অনিয়মগুলোর পেছনে নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা বড় হয়ে দেখা দিচ্ছে। দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও অসাধু খাতকদের মধ্যে যোগসাজশ তৈরি হচ্ছে। পিপলস লিজিংয়ে এমনটাই দেখা গেল।

পিপলস লিজিংয়ের মামলার সূত্রে এখন জানা গেছে, পি কে হালদারের অনেক সহযোগী ছিলেন এবং তাঁরা দেশেই আছেন। কেউ কেউ আদালতে স্বীকারোক্তিও দিচ্ছেন। দেখা যাচ্ছে যে এই কুকীর্তি, অপকর্মের সঙ্গে আমাদের কেন্দ্রীয় ব্যাংকেরও কিছু কর্মকর্তা জড়িত ছিলেন। হাইকোর্ট এখন পি কে হালদারের এসব সহযোগীকে ধরছেন। যাঁরা পিপলস লিজিংয়ের খাতক, টাকা-পয়সা নিয়ে দেননি—হাইকোর্ট তাঁদের ডেকেছেন এবং অর্থ ফেরত না দিলে গ্রেপ্তার করা হবে বলেও সতর্ক করে দিয়েছেন। হাইকোর্টের এই শক্ত পদক্ষেপ খুবই ভালো, আমি স্বাগত জানাই। কিন্তু আমাদের আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ব্যাংকই তো এই শক্ত ভূমিকা নিতে পারত, নেওয়া উচিত ছিল। এটি তাদেরই কাজ। এখন হাইকোর্টের এই শক্ত অবস্থান দেশের অন্যান্য ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বেচ্ছায় খেলাপি হয়ে পড়া ব্যক্তিদের জন্য একটা শিক্ষা হতে পারে। এই ধরনের শক্ত পদক্ষেপ ছাড়া ঋণ ফেরত না দেওয়ার সংস্কৃতি বন্ধ করা যাবে না।

দুঃখজনক ঘটনা হলো, পিপলস লিজিংয়ের ঘটনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ডেপুটি গভর্নর (বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত) এবং একজন বর্তমান নির্বাহী পরিচালকের জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে এমনটি শোনা যায়নি। পাকিস্তান আমলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বেলায়ও এমনটি শুনিনি। এই প্রথম এমনটি শোনা গেল। এটি অত্যন্ত খারাপ নজির হয়ে থাকল। এর মধ্য দিয়ে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণক্ষমতা দুর্বল হওয়ার বার্তা পাওয়া গেল।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এই দুর্বলতার জন্য তাদের কিছু নীতিও দায়ী। সেটি হচ্ছে, ব্যাংকিং পরিচালনা ও ঋণ বিতরণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এমন কিছু সুযোগ-সুবিধা দিয়েছে, যা ঋণখেলাপিদের অপকর্মে উৎসাহিত করেছে। যেমন—বেসরকারি খাতে ব্যাংকগুলোতে একই পরিবার থেকে বোর্ড অব ডিরেক্টরের সদস্যসংখ্যা দুই থেকে বাড়িয়ে চার করা হয়েছে। তাঁদের মেয়াদকাল ছিল ছয় বছর। এখন তা বাড়িয়ে ৯ বছর করা হয়েছে। এ ছাড়া ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে ঋণ পুনঃ তফসিলের সুযোগ, সুদহার কমানো ইত্যাদি সুবিধা দেওয়া হয়েছে। এসব নীতির কারণে ব্যাংকগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে বাংলাদেশ ব্যাংকের। কারণ ব্যক্তির প্রভাব এখানে বড় হয়ে উঠছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এই দুর্বলতা এক দিনে তৈরি হয়নি। আমি যখন অডিটর জেনারেল ছিলাম, তখন একবার কয়েকটি ব্যাংক স্পেশাল অডিট করেছিলাম। এতে দেখেছিলাম খেলাপি ঋণ সৃষ্টি হয় মূলত ব্যাংক কর্মকর্তা ও খাতকের যোগসাজশে। দেখা গেল, একজন ঋণ নিলেন একটি ইন্ডাস্ট্রি করার জন্য। কিন্তু ইন্ডাস্ট্রি করছেন, না টাকাটা অন্য খাতে সরিয়ে ফেলছেন, সেটি দেখা হয় না। কেউ কোনো দিন দেখতে যানও না। এসব তদারকির একমাত্র প্রতিষ্ঠান হলো বাংলাদেশ ব্যাংক; যার দায়িত্বই হলো ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো চালানো এবং আইনমতো চলতে বাধ্য করা। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংককে, বিশেষ করে গত দুই বছরের মধ্যে কোনো একটি শক্ত পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি।

বাংলাদেশের আর্থিক খাতের সংস্কারের বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরেই উপেক্ষিত হয়ে আসছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে এই সংস্কার আরো জরুরি হয়ে পড়েছে। আর্থিক খাতকে অনিয়মিত থেকে বের করে আনতে ব্যাংকিং কমিশন গঠন এখন অপরিহার্য হয়ে পড়েছে, যে কমিশন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অনিয়ম চিহ্নিত করবে এবং এর সুপারিশ বাস্তবায়ন করা যাবে। সে ক্ষেত্রে কমিশন চালানোর জন্য একজন দক্ষ লোকের দরকার হবে। প্রস্তাবিত এই কমিশনের জন্য অনেক দিন থেকেই আমি খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদকে আশা করে এসেছিলাম। কিন্তু আমরা তাঁকে হারালাম। তাঁর মতোই দৃঢ়চেতা একজন মানুষের দরকার হবে প্রস্তাবিত কমিশনের জন্য। কিন্তু কমিশন গঠন কেন হচ্ছে না, তা বোঝা যাচ্ছে না। আমাদের আর্থিক খাতে দুরবস্থা জমে আছে, বিশেষ করে ব্যক্তিবিশেষের প্রভাবে বেড়ে যাচ্ছে। ব্যাংকগুলো গোষ্ঠী প্রভাবে চলছে। নির্দিষ্ট আইন-কানুন মেনে চলছে না। এদের ওপর বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে পড়ছে। এই নিয়ন্ত্রণহীনতা অত্যন্ত অশনিসংকেত দেশের আর্থিক খাতের জন্য। এরই মধ্যে অনেক ক্ষতি হয়ে গেছে। আরো ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এখন বাংলাদেশ ব্যাংক জেগে না উঠলে, সরকার স্বাধীন কমিশন গঠনের মতো কিছু শক্ত পদক্ষেপ না নিলে আর্থিক খাতে বিপর্যয় দেখা দেবে।

লেখক : সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা
অনুলিখন : আফছার আহমেদ

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা