kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৯ বৈশাখ ১৪২৮। ২২ এপ্রিল ২০২১। ৯ রমজান ১৪৪২

দখল অনিয়ম বর্জনের ভোটেও নির্বিকার ইসি

কাজী হাফিজ    

২ মার্চ, ২০২১ ০২:২৪ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



দখল অনিয়ম বর্জনের ভোটেও নির্বিকার ইসি

নির্বাচনে অনিয়ম এখন আর অস্পষ্ট নয়। সংবাদমাধ্যমে অনিয়মের প্রমাণসহ তথ্য প্রকাশ হলেও সে বিষয়ে নির্বাচন কমিশন প্রায় নির্বিকার। মাঝেমধ্যে লোক-দেখানো কিছু তদন্তের ব্যবস্থা করেই দায় সারছে কমিশন। তদন্তের ফলাফলও শূন্য।

খোদ নির্বাচন কমিশন থেকেও বলা হচ্ছে, সব নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ হয়েছে বলে কমিশন যে তৃপ্তি বোধ করে তা জনগণের উপলব্ধির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। আচরণবিধি লঙ্ঘন ও হানাহানি বর্তমানে নির্বাচনের অনুষঙ্গ হয়ে গেছে।

নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্বাচনে অনিয়মের ক্ষেত্রে দেশের আইনে কঠোর শাস্তির বিধান থাকলেও তার প্রয়োগ হচ্ছে না। হলে অনেক লোককে এখন কারাগারে থাকতে হতো।

গত ৩০ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত তৃতীয় ধাপের পৌরসভা নির্বাচনে নির্বাচন কমিশন তিনটি পৌরসভায় ভোটগ্রহণে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ তদন্তের নির্দেশ দেয়। সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং অফিসারদের এই তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু তিন পৌরসভা সম্পর্কেই একই প্রতিবেদন পাওয়া গেছে, যেখানে বলা হয়েছে কোথাও কোনো অনিয়ম হয়নি। এই তিনটি পৌরসভা হচ্ছে টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর, ঝালকাঠির নলছিটি ও সাতক্ষীরার কলারোয়া।

গত ৮ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন কমিশনার কবিতা খানম সাংবাদিকদের জানান, স্থানীয় প্রশাসনের উপস্থিতিতে বিভিন্ন ধাপে অনিয়ম, সহিংসতা, কেন্দ্র দখল, ব্যালটে সিল মারার ঘটনায় তৃতীয় ধাপের তিনটি পৌরসভার ঘোষিত বেসরকারি ফল স্থগিত করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত করে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং অফিসারদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদন পাওয়ার পর যদি দেখা যায় যে অপরাধ ঘটেছে, তাহলে যে পদক্ষেপ নেওয়া দরকার, তা নেওয়া হবে।

কবিতা খানম বলেছিলেন, ‘এ ক্ষেত্রে ফৌজদারি বা নির্বাচনী আইনে মামলা দায়ের করব। এটা আমরা করতে চাই, যাতে একটা মেসেজ যায় যে কোনো ধরণের বিশৃঙ্খলা কমিশন কঠোরভাবে দমন করতে সব ধরনের ব্যবস্থা নেবে।’

জানা যায়, পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে ওই তিন পৌরসভার ভোটগ্রহণে অনিয়মসংক্রান্ত সংবাদগুলো সম্পর্কে রিটার্নিং অফিসারদের প্রতিবেদন পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়।

এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে তিন পৌরসভার দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাচন কর্মকর্তারা গতকাল সোমবার কালের কণ্ঠকে জানান, তাঁরা তাঁদের তদন্ত প্রতিবেদন নির্বাচন কমিশনকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই পাঠিয়ে দিয়েছেন এবং তদন্তে কোনো অনিয়মের প্রমাণ মেলেনি।

ঝালকাঠির জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা ওহিদুজ্জামান মুন্সি নলছিটি পৌরসভা নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ সম্পর্কে বলেন, ‘গত ২৪ ফেব্রুয়ারি এই পৌরসভার নির্বাচনী ফলাফলের সরকারি গেজেট প্রকাশ হয়ে গেছে।’

নলছিটিতে কেন্দ্র দখল, অনিয়ম, ভোটারদের কাছ থেকে ব্যালট কেড়ে নেওয়াসহ নানা অভিযোগে আওয়ামী লীগের ‘বিদ্রোহী’ মেয়র পদপ্রার্থী কে এম মাছুদ খান ও বিএনপির মেয়র পদপ্রার্থী মো. মজিবুর রহমান নির্বাচন বর্জন করেন।

ময়মনসিংহের অতিরিক্ত আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা এবং টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর পৌরসভা নির্বাচনের রিটার্নিং অফিসার মুহাম্মদ মোশারফ হোসেন জানান, ভোটকেন্দ্রে কোনো অনিয়ম হয়নি। যা হয়েছে তা কেন্দ্রের বাইরে। তাতে ভোটকেন্দ্রে কোনো প্রভাব পড়েনি।

বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশিত সংবাদ অনুসারে ভূঞাপুরে সংঘর্ঘ, হামলা, কেন্দ্র দখলের চেষ্টায় ককটেল বিস্ফোরণ, প্রতিদ্বন্দ্বী কাউন্সিলর পদপ্রার্থীর নারী এজেন্টকে এক কাউন্সিলর পদপ্রার্থীর বেধড়ক পেটানো, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অভিযোগে দুই এজেন্ট ও যুবলীগ-ছাত্রলীগের দুই নেতাকে আটক করা হয়।

সাতক্ষীরার জেলা নির্বাচন কর্মকর্তাও তদন্তে কলারোয়া পৌরসভা নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগের প্রমাণ না পাওয়ার কথা জানান। ওই পৌরসভায় ভোটগ্রহণকালে তিন মেয়র পদপ্রার্থীর দুজন বিএনপির শেখ শরিফুজ্জামান ও আওয়ামী লীগের ‘বিদ্রোহী’ নার্গিস সুলতানা ভোট বর্জন করেন। তাঁদের অভিযোগ ছিল কেন্দ্র থেকে তাঁদের এজেন্টদের বের করে দেওয়া এবং জোর করে সরকারি দলের প্রার্থীর পক্ষে ব্যালটে সিল দেওয়া। একটি কেন্দ্রে প্রিসাইডিং অফিসারের কক্ষ বন্ধ করে ব্যালটে সিল মারারও অভিযোগ ছিল।

জানা যায়, কলারোয়া পৌরসভার নির্বাচনী ফলের গেজেট হাইকোর্টের নির্দেশের কারণে স্থগিত রয়েছে। গত ২৩ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্ট এই নির্দেশ দেন। এক মাসের মধ্যে রিট আবেদন নিষ্পত্তির জন্য নির্বাচন কমিশনকে নির্দেশ দিয়ে আদালত এ বিষয়ে কমিশনের নিষ্ক্রিয়তা কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না, জানতে চেয়ে রুল জারি করেন।

এই তিন পৌরসভা নির্বাচনের অনিয়ম তদন্ত সম্পর্কে নির্বাচন কমিশনার কবিতা খানম গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা তদন্ত প্রতিবেদন পেয়েছি। কিছু ঘটনা ঘটেছে, কিন্তু তা ভোটকেন্দ্রে কোনো প্রভাব ফেলেনি।’ ওই তিন পৌরসভা ছাড়া আর কোনো পৌরসভা নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ আমলে নিয়েছেন কি না—এই প্রশ্নে তিনি বলেন, কিছু পৌরসভার নির্বাচন স্থগিত করে পরে আবার নির্বাচন করা হয়েছে। কয়েকটি ভোটকেন্দ্রের ভোট বন্ধ করে পুনর্ভোটের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে ফল প্রকাশ স্থগিতের ঘটনা ওই তিন পৌরসভা ছাড়া অন্য ক্ষেত্রে ঘটেনি।

গতকাল কালের কণ্ঠে প্রকাশিত পঞ্চম ধাপের নির্বাচনে গাজীপুরের কালীগঞ্জ পৌরসভার চৌরা নয়াবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোটগ্রহণে প্রকাশ্যে অনিয়মের একটি ছবি ছাপা হয়। এতে দেখা যায়, সেখানে ভোটারদের ভোট দেওয়ার গোপনীয়তা রক্ষা হচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা ভোটার কাকে ভোট দিচ্ছেন, তা পর্যবেক্ষণ করছেন। বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুসারে, এই পৌরসভার বিভিন্ন কেন্দ্রের ভোটকক্ষে সরকারি দলের নেতাকর্মীদের অবস্থান নিতে দেখা যায়।

স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) নির্বাচন বিধিমালার ৭৮ নম্বর বিধানটি হচ্ছে ভোটের গোপনীয়তা রক্ষায় ব্যর্থতার শাস্তির বিধান। এতে ছয় মাস থেকে তিন বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।

এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার কবিতা খানম বলেন, ‘বিষয়টি খতিয়ে দেখা হতে পারে।’ ওই পৌরসভার রিটার্নিং অফিসার ও গাজীপুরের জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা ইস্তাফিজুল হক আকন্দ কালের কণ্ঠকে বলেন, কালীগঞ্জ পৌরসভায় স্মরণকালের মধ্যে একটি ভালো নির্বাচন হয়েছে। কোথাও কোনো অনিয়ম হয়নি। পত্রিকায় প্রকাশিত ছবি নজরে আনলে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে আমার কাছে কেউ কোনো অভিযোগ করেননি।’

নির্বাচনে অনিয়ম এবং এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের তদন্ত সম্পর্কে গতকাল নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, খোদ নির্বাচন কর্মকর্তারা নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ক্ষমতাসীনদের হাতে লাঞ্ছিত হয়েও বিচার পাননি। ‘ঝামেলা’ এড়াতে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তারা অনিয়মের ঘটনা স্বীকার করেন না। নির্বাচন কমিশনও অনিয়ম স্বীকার করতে চায় না।

নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার নির্বাচনের এই পরিস্থিতি সম্পর্কে গত ১৫ ফেব্রুয়ারি সাংবাদিকদের বলেন, সব নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ হয়েছে বলে কমিশন যে তৃপ্তি বোধ করে, তা জনগণের উপলব্ধির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। নির্বাচন ব্যবস্থাপনা এখন গভীর খাদের কিনারে।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘আমাদের দেশে নির্বাচন সম্পর্কিত যেসব কঠোর আইন আছে, তা প্রয়োগ হলে বহু লোককে জেলে থাকতে হতো। নির্বাচন কমিশন মাঝে মাঝে লোক-দেখানো কিছু তদন্ত করে। কমিশন নিজের ক্ষমতা প্রয়োগ না করে ভুক্তভোগীদের আদালতে যেতে বলে দায় সারছে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা