kalerkantho

মঙ্গলবার । ৭ বৈশাখ ১৪২৮। ২০ এপ্রিল ২০২১। ৭ রমজান ১৪৪২

দিল্লির চিঠি

উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়ার প্রতিজ্ঞা

জয়ন্ত ঘোষাল   

১ মার্চ, ২০২১ ০৩:৪৮ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়ার প্রতিজ্ঞা

আজ ১ মার্চ।
১৯৭১ সালের ১ মার্চের ইতিহাস আজ মনে করার পবিত্র দিন। এই দিনটিতে খুব দুঃখজনকভাবে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আগা মুহাম্মদ ইয়াহিয়া খান ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি সাসপেন্ড করে দিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে তখন আওয়ামী লীগের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন হয়ে গেছে। সমগ্র পূর্ব পাকিস্তান নতুন বাংলাদেশ গঠনের জন্য প্রস্তুত। সব কিছু জেনেও জেনারেল আগা মুহাম্মদ ইয়াহিয়া খান সংসদ সাসপেন্ড করে দিলেন, যাতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ক্ষমতাসীন হতে না পারেন। আজ গণতন্ত্রকে হত্যার সেই চেষ্টার কথা মনে করতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে এটাও আমাদের মনে পড়ে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আন্দোলন এর ফলে আরো তুঙ্গে উঠল। এক সপ্তাহের মধ্যেই ৭ই মার্চ শেখ মুজিবকে গ্রেপ্তার করা হলো। আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রনেতারা বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়ে দিলেন। রেসকোর্স ময়দানে শেখ মুজিবের সেই ঐতিহাসিক ভাষণে প্রথম শোনা গেল জয় বাংলার স্লোগান। তিনি বললেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’

তাহমিমা আনামের বিখ্যাত ঐতিহাসিক উপন্যাস ‘এ গোল্ডেন এজ’ পড়ছিলাম। বাংলাদেশে জন্ম তাহমিমা আনামের। এই উপন্যাসটি মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে লেখা। সেই ১ মার্চের কথা এই উপন্যাসে অসাধারণভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। কমনওয়েলথ পুরস্কারপ্রাপ্ত এই বইটি প্রকাশিত হয়েছিল ২০০৭ সালের ৮ জানুয়ারি। কিন্তু আজ এত বছর পরও মুক্তিসংগ্রামের সেই কাহিনি পড়লে রোমাঞ্চিত হতে হয়। আমি ভারতীয়। ১৯৭১ সালে আমি বালক। কিন্তু বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত মুক্তিযোদ্ধাদের লেখা, বিভিন্ন সাংবাদিক ও ঐতিহাসিকদের লেখা বই পড়ি। ভারতীয় বিভিন্ন সাংবাদিকের লেখা থেকেও জানতে পারি, কিভাবে অপারেশন সার্চলাইট হয়েছিল। ২৬শে মার্চ সব অত্যাচারকে মিথ্যা প্রমাণিত করে বাংলাদেশে নতুন যুগের সূচনা হলো। এখন মুজিববর্ষ চলছে। বঙ্গবন্ধুর স্মৃতির চর্চা ভারত-বাংলাদেশে যৌথভাবে হচ্ছে। সেই উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ঢাকায় যাচ্ছেন। আবার বাংলাদেশের রাষ্ট্র গঠনেরও ঐতিহাসিক স্মৃতির উদযাপন চলেছে। এই পরিস্থিতিতে ভবিষ্যতের পথনির্দেশিকা তৈরির প্রয়োজনীয়তাও দুই দেশ অনুভব করছে।

কয়েক দিন আগে ভাষা দিবস এবং বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন নিয়ে ভালো আলোচনা শুনছিলাম সম্প্রীতি বাংলাদেশের মঞ্চে। পরদিন ছিল আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের পাক্কালে পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায় সঞ্চালিত আলোচনায় উঠে এলো, মাতৃভাষার সঙ্গে একটি দেশের স্বাধীনতা ও রাষ্ট্র গঠন কিভাবে সম্ভব হয়েছে বাংলাদেশে। আলোচনাটা শুনতে শুনতে আমি ভাবছিলাম, পৃথিবীর আর অন্য কোনো রাষ্ট্র সম্ভবত নেই, যারা ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে তাদের জাতিসত্তার পরিচয় প্রতিষ্ঠিত করেছে। কেন জানি না, আমার মনে হয়, সম্ভবত সেই কারণেই যেভাবে পাকিস্তান মৌলবাদের শিকার হয়েছে, যেভাবে অন্য বহু রাষ্ট্র ধর্মান্ধতার শিকার হয়েছে; বাংলাদেশকে সেই রকমভাবে মৌলবাদী রাষ্ট্রে পরিণত করার চেষ্টা হলেও সেটা কিছুতেই সম্ভব হয়নি। তার জন্য যে রকম বঙ্গবন্ধুর বলিদান আছে, আবার একটা ভাষার আইডেনটিটি, ধর্মীয় আইডেনটিটিকে পাশে রেখে এগোতে পেরেছে। সব সময়ই এই আলোচনা হয়, বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে একটা পরিচিতি বা সত্তার সংঘাত আছে। বাংলাদেশের একজন মানুষ আগে মুসলমান, তারপর বাঙালি? না আগে বাঙালি, তারপর মুসলমান? এ দুটি সত্তার সংঘাত আছে। যদি থেকেও থাকে তার পরও এ দুটি সত্তার সমন্বয় সাধন করে তাকে গোটা পৃথিবীর সঙ্গে যুক্ত করে সামনের দিকে এগোনোর চেষ্টা দীর্ঘদিন ধরে করে চলেছেন বঙ্গবন্ধুর উপযুক্ত কন্যা শেখ হাসিনা। সেটার জন্য আজ বাংলাদেশের এই আর্থিক অগ্রগতি। আয়তনে বাংলাদেশ ছোট হওয়া সত্ত্বেও গোটা বিশ্বের কাছে আর্থিক বৃদ্ধির হার নজর কেড়েছে। বিশ্বব্যাংক থেকে শুরু করে অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংগঠন ও সংস্থা ভালো রিপোর্ট দিচ্ছে। অমর্ত্য সেনের মতো অর্থনীতিবিদ বাংলাদেশের আর্থিক বিকাশের ভূয়সী প্রশংসা করছেন। দারিদ্র্য মোচনের চেষ্টার ব্যাপারে আরেকজন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায় বারবার বাংলাদেশের উদাহরণ টেনে আনছেন। তখন মনে হয়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আন্দোলনের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়নি।

বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকলে বাংলাদেশের আর কী ভালো হতো, আর কতটা ভালো হতো, ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্কের কী পরিণতি হতো—এ ধরনের হাইপোথেটিক্যাল আলোচনায় আমার আগ্রহ কম। গোটা পৃথিবীতেই অনেকের মধ্যে এ ধরনের আলোচনা কাজ করে। অনেক বইও লেখা হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ যদি না হতো, তাহলে পৃথিবীর চেহারা কেমন হতো। কিংবা হিটলার যদি না জন্মাতেন, তাহলে ইউরোপের কী রূপরেখা হতো। এগুলো আরামকেদারায় বসে এক ধরনের একাডেমিক চর্চার পরিসর। কিন্তু এর থেকে অনেক জরুরি যখন এই মুহূর্তে পৃথিবীজুড়ে গণতন্ত্র বিপন্ন হচ্ছে, চারদিকে সামরিক অভ্যুত্থান হচ্ছে; শুধু তো পাকিস্তান নয়, মিয়ানমারে সামরিক শাসন হয়ে গেল। শ্রীলঙ্কায় যখন নানা রকমের রাজনৈতিক টালমাটাল চলছে এবং নেপালে যখন অস্থিরতা দেখা যাচ্ছে, তখন বাংলাদেশ এত বাধা-বিপত্তির মধ্যেও শুধু যে এগোচ্ছে তা-ই নয়; শুধু রাজনীতির প্রেক্ষাপটে নয়, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক মঞ্চ থেকেও চেষ্টা চলছে বাংলা ভাষাকে আরো ছড়িয়ে দেওয়ার এবং নানা রকমের কর্মসূচি গ্রহণ করার।

কাজেই ১৯৭১ সালের মুক্তি আন্দোলন, স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন, সবশেষে মাতৃভাষা বাংলাকে গোটা পৃথিবীতে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য বাংলাদেশের বিভিন্ন দূতাবাস সক্রিয় হয়ে উঠেছে। সেদিন বাংলাদেশ সম্প্রীতি সংলাপে বেলজিয়াম ও ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মাহবুব হাসান সালেহ ছিলেন। তিনি একসময় দিল্লিতে বাংলাদেশ উপ-হাইকমিশনার ছিলেন। সেদিন তিনি এই আলোচনায় অংশ নিয়ে বললেন, কূটনীতিতে ‘সফট পাওয়ার’ বলে একটা কথা আছে। সংস্কৃতি হলো ‘সফট পাওয়ার’। বাংলা ভাষাকে শুধু সাহিত্যে নয়, চলচ্চিত্র ও বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া যায়। বাংলাদেশের মানুষ পৃথিবীজুড়ে রয়েছে। বাঙালি রয়েছে আরো অনেক। সব মিলিয়ে যদি বাংলা ভাষাকে নিয়ে একটি মঞ্চ থেকে, একটি প্ল্যাটফর্ম থেকে আরো এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়, তাহলে হয়তো একাত্তরের যে সাধনা, সেই সাধনা শুধু একটি স্মৃতিচর্চা বা অতীতাসক্তিতে না থেকে আগামী দিনে আর্থ-সামাজিকভাবে ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক এবং দুই দেশেরই অর্থনৈতিক অগ্রগতি হবে। এই উপমহাদেশের আর্থিক অগ্রগতির একটি রোডম্যাপ তৈরি করা সম্ভব হবে। সেটাই হবে আজকের দিনের সবচেয়ে বড় কর্তব্য। সেখানে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা সংগ্রাম হবে চলার পাথেয়।

মার্চ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের মাস। ১৯৭১ সালের ১ মার্চও ছিল সোমবার। আর এ দিনটা এই জন্য ভয়ানক স্মৃতি। ১৯৭০ সালে আওয়ামী লীগ বিপুল ভোটে জিতেছে। তাদের ক্ষমতায় আসার কথা। তা সত্ত্বেও ১ মার্চ পার্লামেন্ট মুলতবি করে দেন জেনারেল ইয়াহিয়া খান। তারপর গোটা পরিস্থিতি আরো উত্তাল হয়ে যায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শুধু নয়; ৯ মার্চ চট্টগ্রাম বন্দরে কোনো রকমভাবে জাহাজে জিনিস না তোলার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন আন্দোলনকারীরা। ১০ মার্চ জাতিসংঘের সামনে বাঙালিরা প্রতিবাদ বিক্ষোভে মুখর হয়ে ওঠে। ২৬শে মার্চ একটি ভয়াবহ আন্দোলন শুরু হয়। ২৫শে মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে সেনাবাহিনীর অপারেশন সার্চলাইট শুরু হয়। আর ২৫শে মার্চ মধ্যরাতে সেনা অভিযান শুরু হওয়ার পরপরই ২৬শে মার্চ বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার আগে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। তারপর এক লম্বা ইতিহাস।

আজ এই মার্চে আসুন আমরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই। ভারত আর বাংলাদেশ, আমরা দুটি দেশ মিলে সেই আগামী দিনগুলো উজ্জ্বল ভবিষ্যতের পথে নিয়ে যাই।

লেখক : নয়াদিল্লিতে কালের কণ্ঠ’র বিশেষ প্রতিনিধি

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা