kalerkantho

রবিবার। ২৮ চৈত্র ১৪২৭। ১১ এপ্রিল ২০২১। ২৭ শাবান ১৪৪২

পঞ্চম ধাপের পৌর নির্বাচন

অনিয়ম বর্জনের ভোট : সহিংসতায় সৈয়দপুরে একজনের মৃত্যু

বিশেষ প্রতিনিধি    

১ মার্চ, ২০২১ ০৩:১২ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



অনিয়ম বর্জনের ভোট : সহিংসতায় সৈয়দপুরে একজনের মৃত্যু

ভোটার ভোট দিতে গোপন কক্ষে ঢুকলেই সঙ্গী হন এই নির্বাচন কর্মকর্তা। গাজীপুরের কালীগঞ্জ পৌরসভার চৌরা নয়াবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের গতকাল সকাল ১০টার চিত্র। ছবি : কালের কণ্ঠ

বিচ্ছিন্ন সহিংসতায় একজনের মৃত্যু, ভোট বর্জন এবং নানা অনিয়মের অভিযোগের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে পঞ্চম ধাপের পৌর নির্বাচন। ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) ভোট দিতে গিয়ে বিড়ম্বনার শিকারও হয়েছেন কোনো কোনো ভোটার। ভোটে উৎসবমুখর পরিবেশও দেখা গেছে কোথাও কোথাও। সৈয়দপুরে এক ব্যক্তি নিহত হওয়ার ঘটনা সম্পর্কে  নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিব মো. হুমায়ুন কবীর খোন্দকার বলেছেন, ‘কোনো মৃত্যুই কাঙ্ক্ষিত নয়। এ জন্য আমরা সবাই দুঃখিত।’

গতকাল রবিবার সন্ধ্যায় ভোটগ্রহণ শেষে নির্বাচন ভবনের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এই মন্তব্য করেন।

নীলফামারীর সৈয়দপুর পৌরসভা নির্বাচনে কাউন্সিলর পদপ্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে একজন নিহত এবং দুজন আহত হয়েছেন। নিহত ব্যক্তির নাম ছোটন অধিকারী (৫২)। আহত হয়েছেন সৈয়দপুর উপজেলা আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি আজম আলী সরকার (৪৫) ও আওয়ামী লীগ সমর্থক সবুজ (৩০)। আহতদের মধ্যে একজনের অবস্থা গুরুতর। নিহত ছোটন অধিকারী সৈয়দপুর পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর পদপ্রার্থী নজরুল ইসলাম রয়েলের সমর্থক। পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের মুন্সিপাড়া সৈয়দপুর মহিলা কলেজ কেন্দ্রের বাইরে এই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

এ ছাড়া এ পৌরসভার নির্বাচনে ভোটগ্রহণে ব্যাপক অনিয়ম, বুথ থেকে পোলিং এজেন্টদের বের করে দেওয়া, সাধারণ ভোটারদের ভোট দিতে বাধা দেওয়া এবং প্রশাসনের পক্ষপাতিত্বের অভিযোগে নির্বাচন বর্জন করেন জাতীয় পার্টি ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মেয়র পদপ্রার্থী।

সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় পার্টির মেয়র পদপ্রার্থী সিদ্দিকুল আলম অভিযোগ করেন, শহরের ১২ নম্বর ওয়ার্ডের হিন্দু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোট কেন্দ্রে তাঁর উপস্থিতিতে পোলিং এজেন্ট সুমনা আলমকে বুথ থেকে জোর করে বের করে দেওয়া হয়। এ সময় তিনি এর প্রতিবাদ করলে তাঁকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। এই ঘটনাটি কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসারকে জানানো হলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এ ছাড়া একই ওয়ার্ডের শহীদ জিয়া নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে একজন পুলিশ কর্মকর্তা লাঙল মার্কার সমর্থক নারী ভোটারদের গায়ে হাত তোলেন। এ কেন্দ্রে ভোট দিতে আসা মনিরা জ্যোতি নামের এক নারী ভোটার বলেন, তিনি লাঙলে ভোট দিলেও নৌকা মার্কার কর্মী জনৈক ববি ভোটকক্ষের গোপন কক্ষে ঢুকে তাঁর ভোট বাতিল করে নৌকা মার্কার বোতাম টিপে দেন।

চট্টগ্রামের মিরসরাই পৌরসভায় কয়েকটি কেন্দ্রে নারী ভোটারদের অভিযোগ ছিল, তাঁদের দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষায় থাকতে হয়েছে। আঙুলের ছাপ নিয়েও অনেকে বিড়ম্বনায় পড়েন। ইভিএম নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ার ঘটনাও ঘটেছে। বগুড়া থেকেও একই ধরনের খবর পাওয়া গেছে।

মাদারীপুর পৌর নির্বাচনের ভোটগ্রহণ শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হয়েছে। ভোটারদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো।

জয়পুরহাট পৌরসভায় নানা অনিয়মের অভিযোগে ভোট বর্জন না করলেও পুনর্নির্বাচনের দাবি জানিয়েছেন বিএনপির মেয়র পদপ্রার্থী অধ্যক্ষ শামছুল হক। তাঁর অভিযোগ, নির্বাচন চলাকালে বহিরাগতদের নিয়ে এসে বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে ধানের শীষের এজেন্টদের বের করে দেওয়া হয়েছে।

বোমা বিস্ফোরণের মাধ্যমে ভয়ভীতি প্রদর্শন ও নানা অনিয়মের অভিযোগ তুলে রাজশাহীর চারঘাট পৌরসভা নির্বাচনে ভোট বর্জন করেছেন বিএনপি মনোনীত প্রার্থী জাকিরুল ইসলাম।

ঝিনাইদহের মহেশপুর পৌরসভায় ভোটকেন্দ্র থেকে এজেন্ট বের করে দেওয়ার অভিযোগ এনে বিএনপির মেয়র পদপ্রার্থী আমিরুল ইসলাম খান চুন্নু ভোট বর্জনের ঘোষণা দেন। কালীগঞ্জ পৌরসভার কাশিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রের বাইরে ভোট চাওয়াকে কেন্দ্র করে ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর পদপ্রার্থী মেহেদী হাসান সজল ও আরিফুল ইসলামের সমর্থকরা সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন। সে সময় ইসলাম হোসেন নামের এক যুবক আহত হন।

নৌকা প্রতীকের মেয়র পদপ্রার্থী ও প্রশাসনের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ ও নিরাপত্তাহীনতার কারণ দেখিয়ে দুপুর ১২টার দিকে জামালপুর পৌরসভার নির্বাচন বর্জন করেন বিএনপির মেয়র পদপ্রার্থী শাহ মো. ওয়ারেছ আলী মামুন।

গাজীপুরের কালীগঞ্জ পৌরসভায় বিভিন্ন কেন্দ্রের ভোটকক্ষে সরকারি দলের নেতাকর্মীদের অবস্থান নিতে দেখা যায়। সকাল সোয়া ১১টার দিকে শহরের কালীগঞ্জ আরআরএন সরকারি পাইলট স্কুল (পুরুষ) কেন্দ্রের ১ নম্বর বুথে এই অবস্থা দেখা যায়।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌরসভায় একটি কেন্দ্রের বাইরে ককটেলের বিস্ফোরণ, ইভিএম মেশিন বাইরে রেখে ভোট নেওয়ার চেষ্টা, গোপন বুথে অতিরিক্ত লোক থাকার ঘটনা বাদ দিলে গতকাল সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত ৪৮টি কেন্দ্রে ইভিএম পদ্ধতিতে ভোটগ্রহণ শান্তিপূর্ণভাবেই শেষ হয়েছে।

নির্বাচন কমিশন যা বলছে : নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সচিব মো. হুমায়ুন কবীর এই নির্বাচন সম্পর্কে গতকাল সন্ধ্যায় সাংবাদিকদের বলেন, ‘২৯টি পৌরসভা, চারটি উপজেলা পরিষদের উপনির্বাচন এবং জেলা পরিষদের উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। কোনো কেন্দ্রের ভোট বন্ধ করা হয়নি। আমাদের রিটার্নিং অফিসার ও মনিটরিং সেল ঘণ্টায় ঘণ্টায় যে প্রতিবেদন পাঠিয়েছে, তাতে এখন পর্যন্ত যা বুঝতে পেরেছি, দেশে যে নির্বাচন হয়েছে, তা উৎসবমুখর পরিবেশে হয়েছে।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘নির্বাচন কেমন হয়েছে, সেটি আপনারাই বলতে পারবেন। আমি তো মনে করি ভোট ভালো হয়েছে।’ নির্বাচন বর্জনের বিষয়ে নির্বাচন কমিশন সচিব বলেন, যদি কেউ নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করেন, সেটি নিতান্তই তাঁর ইচ্ছা। তিনি যদি আমাদের কাছে অভিযোগ করেন, আমরা বিষয়টি তদন্ত করে দেখব।’

ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে বিএনপির অংশ না নেওয়ার ঘোষণা নিয়ে তিনি বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন সব সময় চায়, প্রতিটি ব্যক্তি, প্রতিটি দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করুক। আমাদের কাছে যে সহযোগিতা চাইবেন, নির্বাচন কমিশন সে বিষয়ে সহযোগিতা করবে।’

মেয়র পদে যাঁরা জয়ী হলেন : পঞ্চম ধাপে ২৮টি পৌরসভায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থীরা বেসরকারিভাবে জয়ী হয়েছেন। এ ছাড়া একটিতে বিএনপি ও আরেকটিতে স্বতন্ত্র প্রার্থী জয়ী হয়েছেন। এর আগে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় মাদারীপুরের শিবচর, চট্টগ্রামের মিরসরাই ও রাউজানে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা জয় পান। আর গতকালের ভোটে ২৫টিতে জয় পেল দলটি। অন্যদিকে চারটি উপজেলা পরিষদের সব কটিতেই ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীরা চেয়ারম্যান পদে বেসরকারিভাবে নির্বাচিত হয়েছেন। এ ছাড়া স্থগিত হওয়া শরীয়তপুরের ডামুড্যা পৌরসভার দুটি কেন্দ্রের ভোটে স্বতন্ত্র প্রার্থী রেজাউল করিম বেসরকারিভাবে মেয়র নির্বাচিত হন।

পঞ্চম ধাপে মেয়র পদে নির্বাচিত আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা হলেন জয়পুরহাট সদরে মোস্তাফিজুর রহমান, চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোলে আব্দুর রশিদ, রাজশাহীর চারঘাটে একরামুল হক ও দুর্গাপুরে তোফাজ্জল হোসেন, ঝিনাইদহের মহেশপুরে আব্দুর রশিদ খান ও কালীগঞ্জে আশরাফুল আলম, যশোরের কেশবপুরে রফিকুল ইসলাম, ভোলা সদরে মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান ও চরফ্যাশনে মো. মোরশেদ, জামালপুরের ইসলামপুরে আব্দুল কাদের সেখ, মাদারগঞ্জে মির্জা গোলাম কিবরিয়া কবির ও জামালপুর সদরে ছানোয়ার হোসেন, ময়মনসিংহের নান্দাইলে রফিক উদ্দিন ভূইয়া, কিশোরগঞ্জের ভৈরবে ইফতেখার হোসেন, মানিকগঞ্জের সিংগাইরে আবু নাঈম মো. বাশার, মাদারীপুর সদরে খালিদ হোসেন, হবিগঞ্জ সদরে আতাউর রহমান সেলিম, ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদরে নায়ার কবির, চাঁদপুরের মতলবে আওলাদ হোসেন ও শাহরাস্তিতে হাজি আবদুল লতিফ, লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে গিয়াস উদ্দীন রুবেল ভাট, চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে গিয়াস উদ্দিন, বারইয়ারহাটে রেজাউল করিম ও রাঙ্গুনীয়ায় শাহজাহান সিকদার, গাজীপুরের কালীগঞ্জে এস এম রবীন হোসেন এবং নীলফামারীর সৈয়দপুরে রাফিকা আকতার জাহান।

এ ছাড়া বগুড়া সদর পৌরসভায় বিএনপির রেজাউল করিম বাদশা ও রংপুরের হারাগাছে স্বতন্ত্র প্রার্থী এরশাদুল হক বেসরকারিভাবে নির্বাচিত হয়েছেন।

উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে ফরিদপুরের মধুখালীতে আওয়ামী লীগের শহিদুল ইসলাম, কুমিল্লার দেবীদ্বারে আবুল কালাম আজাদ, রাজশাহীর পবায় ইয়াসিন আলী ও ঝিনাইদহের শৈলকুপায় শেফালী বেগম বেসরকারিভাবে নির্বাচিত হয়েছেন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা