kalerkantho

মঙ্গলবার । ৩০ চৈত্র ১৪২৭। ১৩ এপ্রিল ২০২১। ২৯ শাবান ১৪৪২

চিকিৎসার জন্য মুক্তি দাবি

কার্টুনিস্ট কিশোরের পরিবারও উৎকণ্ঠায়

এস এম আজাদ   

২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ০২:৪৮ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



কার্টুনিস্ট কিশোরের পরিবারও উৎকণ্ঠায়

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় কারাবন্দি লেখক মুশতাক আহমেদের মৃত্যুর পর একই মামলায় কারান্তরীণ কার্টুনিস্ট আহমেদ কবির কিশোরকে নিয়ে উৎকণ্ঠায় তাঁর পরিবার। একই সঙ্গে কিশোরের শারীরিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন তাঁর আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মীরা। স্বজনদের দাবি, আটকের পর কিশোরের ওপর নির্মম নির্যাতন চালানো হয়। ফলে তিনি বাঁ পা ব্যবহার করে হাঁটতে পারছেন না। বাঁ কানেও শোনেন না কিশোর। সেই কান দিয়ে ঝরছে পুঁজ। বেড়ে গেছে ডায়াবেটিস। কমেছে ওজন। তরুণ প্রতিভাবান কার্টুনিস্ট কিশোর এখন চোখেও দেখছেন কম।

আইনজীবী ও স্বজনদের দাবি, নিরাপত্তারক্ষী ও পিয়নদের সাক্ষী করে ডিজিটাল ডিভাইসে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের কথা বলে অভিযোগপত্র দিয়েছে পুলিশ। সেই অভিযোগ ‘গ্রহণযোগ্য’ না হওয়ায় ফের তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। কিশোরের ফেসবুকের পোস্ট (যেগুলোর প্রিন্ট মামলায় যুক্ত করা হয়েছে) থেকে রাষ্ট্রবিরোধী বা সরকারের দায়িত্বশীল কারো বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের প্রমাণ মিলছে না। এমন মামলায় কিশোরকে জেলে রাখায় তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। কিশোরের উন্নত চিকিৎসার জন্য দ্রুত মুক্তির দাবি করছেন স্বজনরা। মানবাধিকারকর্মীরাও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের সঠিক তদন্তের স্বার্থে কিশোরের বিরুদ্ধে অভিযোগ যাচাই এবং তাঁর উন্নত চিকিৎসার ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি তুলেছেন।

কিশোরের বড় ভাই লেখক, সাংবাদিক ও অভিনেতা আহসান কবির গতকাল কালের কণ্ঠ’র কাছে ভাইয়ের অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। কাঁপা কণ্ঠে আহসান কবির বলেন, ‘অনেক দিন পর গত ২৩ ফেব্রুয়ারি আদালতে হাজির করা হলে আমার ভাইকে দেখেছিলাম। আমি প্রথমে ওকে চিনতে পারিনি। আমি মুশতাক ভাইকে চিনেছি। পরে বুঝতে পারি কিশোর, আমার ভাই পাশে। ওর ১০ কেজি ওজন কমে গেছে। খুঁড়িয়ে হাঁটছিল। বাঁ পা ফেলতে পারে না। পুঁজ পড়ছে। বাঁ কান দিয়েও পুঁজ পড়ে। চোখে দূরের কিছু দেখে না। ডায়াবেটিসও বেড়ে গেছে। ওর সঙ্গে অনেক খারাপ কিছু হয়েছে। ওর অবস্থা খারাপ। মুশতাক ভাইয়ের মৃত্যুর পর কিশোরকে নিয়ে আমরা ভয়ে আছি। এত দিন তার কোনো চিকিৎসা হয়নি। আমরা তার চিকিৎসার জন্য আইনজীবীর মাধ্যমে আবেদন করেছি।’ জানতে চাইলে আহসান কবির বলেন, ‘গত বছরের ২ মে বাসা থেকে ওকে (কিশোর) তুলে নেওয়া হয়। ৬ মে র‌্যাব রমনা থানায় মামলা দিয়ে গ্রেপ্তার দেখায়। এ সময় তাঁকে নির্যাতন করা হয়েছে। এতে তাঁর পায়ে সংক্রমণ হয়েছে। পুলিশের এসআই মহসিন সর্দার যে অভিযোগপত্র দিয়েছেন, তাতে আমার ভাইয়ের রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের কিছু প্রমাণ হয়নি। চারটি ফেসবুকের পোস্ট প্রিন্ট করে দেওয়া হয়েছে, এমন পোস্ট করোনার সময় অনেকে দিয়েছে। কোনো জায়গায় প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি বা কারো বিরুদ্ধে কিছু নেই। একটি কার্টুনের কারণে কোনো মহল থেকে এটি করা হয়েছে। আমার ভাইকে যে অভিযোগে অভিযুক্ত করা হচ্ছে, সে সেই অপরাধ করেনি। আমার ভাই এখন অমানবিক জীবনশঙ্কায়। কিছু হলে আমার যাবে। আমাদের যাবে। তাকে বাঁচাতে হবে।’

আহসান কবির যোগ করেন, ‘মিথ্যা মামলায় গত ১১ জানুয়ারি দেওয়া অভিযোগপত্রটি পরে রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত মামলাটির অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। এখন এটি তদন্ত করছে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম। আমরা সঠিক তদন্তের আশায় আছি। এর আগে মুক্ত করে কিশোরকে জরুরি ভিত্তিতে উন্নত চিকিৎসা দিতে হবে।’

গত বছরের ৬ মে রমনা থানায় ১১ জনের নাম উল্লেখ করে এবং পাঁচ-ছয়জনকে অচেনা আসামি করে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে এ মামলা করে র‌্যাব-৩। মামলায় বলা হয়, ‘আই অ্যাম বাংলাদেশি’ ফেসবুক পেইজ থেকে রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি বা সুনাম ক্ষুণ্ন করা বা বিভ্রান্তি ছড়ানো বা এ উদ্দেশ্যে জেনেশুনে অপপ্রচার ও গুজব ছড়ানো হচ্ছে। এ পেজের অ্যাডমিন সায়ের জুলকারনাইন, আমি কিশোর, আশিক ইমরান, ফিলিপ শুমাখার, স্বপন ওয়াহিদ ও মুশতাক আহমেদ। সায়ের জুলকারনাইন সম্প্রতি আলজাজিরায় প্রচারিত তথ্যচিত্র ‘অল দ্য প্রাইম মিনিস্টারস মেন’-এর ‘সামি’ বলে জানা গেছে। কিশোর, মুশতাক ও দিদারুলকে লালমাটিয়া ও কাকরাইলের নিজ নিজ বাসা থেকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। এরপর তাঁদের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করা হয়। এর মধ্যে কারাবন্দি মুশতাক গত বৃহস্পতিবার রাতে মারা যান। দিদারুল জামিনে ও কিশোর কারাগারে আছেন। গ্রেপ্তারের পর থেকেই স্বজনরা দাবি করে আসছেন, কিশোর রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্রে জড়িত নন। তাঁর চিকিৎসার প্রয়োজন।

কার্টুনিস্ট কিশোরের আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন, ‘পুরো তদন্ত কার্যক্রম ১০৫ দিনের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু এ মামলায় পুলিশ ট্রাইব্যুনালের কাছে তদন্তের সময়সীমা বাড়ানোর কোনো আবেদন করেনি। তারা খেয়ালখুশিমতো কাজ করেছে। কিশোরের উন্নত চিকিৎসার জন্য আদালতে আবেদন করা হয়েছে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা