kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৯ বৈশাখ ১৪২৮। ২২ এপ্রিল ২০২১। ৯ রমজান ১৪৪২

সর্বত্র প্রবেশ করেছে বাজার অর্থনীতি

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী   

২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ০৪:০৮ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



সর্বত্র প্রবেশ করেছে বাজার অর্থনীতি

একুশে ফেব্রুয়ারিতে অনেক বৈশিষ্ট্যের প্রধান দুটি ছিল প্রভাতফেরি ও ছোট ছোট সংকলন। খালি পায়ে গান গাইতে গাইতে রওনা হতো ছেলে-মেয়েরা, খুব সকালে। শহীদ মিনারে আসত। যেত আজিমপুরের গোরস্তানে। এই অভিজ্ঞতা আগে ছিল না, মুসলমান মধ্যবিত্ত গানের ব্যাপারেই উৎসাহহীন ছিল, প্রভাতফেরি তো পরের কথা। সংকলন প্রকাশের ব্যবস্থা ১৯৫২ সালের আগে অমনভাবে দেখা যায়নি। পাড়ার ছেলেরা সংকলন ছাপত, সাংগঠনিকভাবে তা ছাপানো হতো। লেখা সংগ্রহ, ছবি আঁকিয়ে নেওয়া, প্রুফ দেখা, ছাপানো, বাঁধানো এবং যেটা সবচেয়ে জরুরি দল বেঁধে বিক্রি করা—সব কিছুতেই চমৎকার উৎসাহ দেখা যেত। এখন প্রভাতফেরিও কমেছে, সংকলনও আগের মতো নেই।

দুইয়ের মধ্যে মিল ছিল। উভয়েই ছিল স্বতঃস্ফূর্ত, প্রাণবন্ত ও প্রতিবাদী। কেউ বলে দিত না, কিন্তু জানত তরুণরা যে প্রভাতফেরিতে যেতে হবে, গান থাকবে গলায়, ব্যানার থাকবে হাতে, কালো কাপড়ে লেখা ব্যানার শহীদ স্মৃতি অমর হোক, প্রতিষ্ঠানের নাম লেখা ব্যানারও সেই সঙ্গে। জানত তারা যে সংকলন বের করা চাই সময়মতো, একুশ উপলক্ষে। প্রাণ আসত ওই স্বতঃস্ফূর্ত আন্তরিকতা থেকে এবং সব আয়োজনের মধ্যে একটা প্রতিবাদ থাকত, শান্ত অথচ দৃঢ়। প্রতিবাদ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে। প্রতিবাদ অন্যায়ের বিরুদ্ধে। একুশে ফেব্রুয়ারির এই উভয় অঙ্গে এখন যে দুর্বলতা তা মোটেই অস্বাভাবিক নয়, খোঁজাখুঁজি না করেও কারণ জানা যাবে। পরিবর্তন এসেছে আত্মগত অবস্থায়, এসেছে বৈষয়িক ব্যবস্থায়ও। বৈষয়িক পরিবর্তনের ব্যাপারটাই প্রথমে লক্ষ করা যাক।

প্রথম সত্য বোধ করি এটি যে একুশে ফেব্রুয়ারি একসময়ে যেমন অনন্য ছিল, এখন আর তেমন নেই। এমন আরো দুটি জাতীয় দিবস পেয়েছি আমরা। ১৬ই ডিসেম্বরে বিজয় দিবস। ২৬শে মার্চে স্বাধীনতা দিবস। একুশে ফেব্রুয়ারির সঙ্গে এদের মিল আছে, এগুলোও স্বাধীনতার আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। পহেলা বৈশাখও আছে। তার মূল্যও পড়ে যায়নি।

আরো বড় ব্যাপার হলো—আগের মতো আন্দোলন নেই। ওই যে স্বতঃস্ফূর্ততা, প্রাণবন্ততা ও প্রতিবাদমুখরতার কথা বললাম—এগুলো বিচ্ছিন্নভাবে আসেনি। সংকলনগুলো বিক্ষিপ্তভাবে বের হতো, তাদের মধ্যে পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল, রেষারেষি থাকত। কারটা ভালো হয়, কোনটা বেশি বিক্রি হচ্ছে—এসব নিয়ে প্রতিযোগিতা অবশ্যই ছিল। কিন্তু সবাই আবার সংলগ্নও ছিল। একই প্রবাহের ভিন্ন ভিন্ন চিহ্ন তারা, একটি অভিন্ন আন্দোলনের বিভিন্ন প্রকাশ। মালার মতো গাঁথা ছিল তারা, যে মালার ফুল নানা আকার ও রঙের; কিন্তু যার সুতো একটাই। মানতেই হবে আন্দোলনটি এখন আর আগের মতো নেই, বিশেষ করে ছাত্র আন্দোলন তো এখন রীতিমতো স্তিমিত এবং নানা জটিলতায় বেশ বিপন্ন।

কারণ হিসেবে আরেক ঘটনারও উল্লেখ করতে হবে। সেটা হলো বাজার অর্থনীতি। এই অর্থনীতি এখন সর্বত্র প্রবেশ করেছে, স্থানীয় উদ্যোগকে সে দুর্বল করে দিচ্ছে। সংকলনকেই বা রেহাই দেবে কেন? সংকলন প্রকাশের ক্ষেত্রে ঝামেলা গেছে বেড়ে। দৈনিক পত্রিকার সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে অস্বাভাবিক রূপে। তাদের মধ্যে প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বিতা; সবাই প্রতিষ্ঠিত লেখকদের কাছে যায়, লেখা চায়। লেখকদের ওপর চাপ আগের তুলনায় অনেক বেশি। একুশের সংকলনের বৈশিষ্ট্য ছিল এই যে তাতে প্রতিষ্ঠিত লেখকদের লেখা থাকত, সঙ্গে থাকত সংগঠনের তরুণ সাহিত্যসেবীদের রচনাও। দ্বিতীয় প্রকারটির গ্রহণযোগ্যতা বাড়ত প্রথম প্রকারটির উপস্থিতির কারণে। এখন নামকরা লেখকদের রচনা পাওয়া একেবারেই অসম্ভব। তরুণ লেখক দাঁড়াবে কার আশ্রয়ে? দাঁড়াতে পারছে না। তা ছাড়া খরচ বেড়েছে প্রকাশের, কারণ দৃষ্টিনন্দন না হলে কেউ ছোঁবেও না। এবং কঠিন হয়েছে বিজ্ঞাপন পাওয়া, যা ছিল সংকলনের জন্য বড় ভরসা।

বাজার অর্থনীতি সংস্কৃতির ক্ষেত্রে বড় একটা ক্ষতি করেছে এবং করতে থাকবে, যদি তাকে নিবৃত্ত না করা যায়। সেটা হচ্ছে যে সব কিছুকে সে পণ্যে পরিণত করছে। সব কিছুই ক্রয়-বিক্রয়ের ব্যাপার। টাকায় সবই সম্ভব, না থাকলে কোনো কিছুই সম্ভব নয়। ফলে দাঁড়িয়েছিল যে মানুষ মুনাফা বোঝে, আর কিছুই বোঝে না। বুঝতে চায় না। বীরত্ব যেটুকু তা অর্থোপার্জনেই সম্ভব, অন্যত্র তা অলভ্য। সংকলন বিক্রি করে কে কবে মুনাফা করেছে? বিক্রি করতে হয়েছে খরচটা কিছু পরিমাণে তুলে আনার জন্য। তার বাইরে সবটাই প্রাণের দায়ে, মুনাফার নয়। সন্তোষ ছিল সুন্দর একটি কাজ করার। লোকে প্রশংসা করত। কর্মীরা গৌরবান্বিত বোধ করত। সবটা জুড়ে একধরনের বীরত্ব ছিল।

বাজার অর্থনীতি হচ্ছে পুঁজিবাদের নতুন নাম এবং সে ওই বিচ্ছিন্নতাই সৃষ্টি করেছে, যা করার জন্য পুঁজিবাদ বিখ্যাত। আমরা এখন ভিড়ের মধ্যে বাস করি বটে, কিন্তু বন্ধুর মতো বাস করি না। বিচ্ছিন্ন থাকি। বিচ্ছিন্ন হচ্ছি। অর্জন যা করার ব্যক্তিই করবে। নিজে নিজে করবে, একাকী। আগের দিনের ‘দশে মিলে করি কাজ’ এখন আর দেখা যায় না। দেখা গেলেও সংখ্যায় খুব কম। সেই একাকিত্ব অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত।

পুঁজিবাদী সমাজেও লিটল ম্যাগাজিন বের হয়। লিটল ম্যাগাজিনগুলোর আয়তন ছোট, আয়োজনও বিপুল নয়। বিক্রি অল্প। তারা মোটেই জনপ্রিয় নয়, জনপ্রিয় হলে লিটল ম্যাগাজিন থাকত না, জাতীয় পত্রিকায় পরিণত হতো; তথাকথিত জাতীয় অর্থাৎ বহুল প্রচারিত। কিন্তু লিটল ম্যাগাজিন আসলেই বড়, দুই কারণে। এক বক্তব্য, দুই প্রতিবাদ। প্রতিটি লিটল ম্যাগাজিনের পেছনেই স্বতন্ত্র একটি বক্তব্য, একটি দৃষ্টিভঙ্গি, বিচারের একটি নিরিখ থাকে; সে জন্যই তো আত্মপ্রকাশ, নইলে কেন এত পরিশ্রম, কেন এমন নিবিষ্টতা? তাদের বক্তব্য বাজারে গৃহীত হবে না। এটা জানা আছে সম্পাদকের এবং তাঁর সঙ্গে জড়িত গোষ্ঠীর। জানেন বলেই বাজারে যান না। বাজারের পণ্যে পরিণত হতে চান না। আর এখানেই ওই সব পত্রিকার দ্বিতীয় মহত্ত্ব। তারা আপস করে না, প্রতিবাদ করে। শুধু যে প্রতিপক্ষের বক্তব্যের বিরুদ্ধে তা নয়, প্রতিবাদ বাজারব্যবস্থার বিরুদ্ধেই, ওই ব্যবস্থায় তারা যাবে না। একে তারা মানেই না। বাজারও তাদের পছন্দ করে না, একেবারেই নয়; উপেক্ষা করে, উপেক্ষার মধ্য দিয়েই ধ্বংস করে দিতে উদ্যত হয়।

একুশের সংকলনগুলো ঠিক লিটল ম্যাগাজিন নয়। এদের বক্তব্যে তেমন অভিনবত্ব ছিল না, থাকবার কথা নয়, কিন্তু প্রতিবাদটা ছিল। সংকলনটি হাতে নিয়ে মনে হতো একটি প্রাণের সংস্পর্শে আসা গেল; কিন্তু এখন আমাদের দেশে প্রতিবাদ স্তিমিত। সংকলন পাওয়া গেলেও প্রাণ পাওয়া যায় না।

আর সেখানেই আত্মগত দিকটা আসে। প্রাণের অভাব। আমি দুজন তরুণকে জানতাম। একই বয়সের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। প্রতিবছর একুশে ফেব্রুয়ারিতে একটি সংকলন প্রকাশ করত তারা। নিজেদের উদ্যোগে নয়, পাড়ার একটি সাংস্কৃতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে। সংগঠনটি আরো অনেক কাজ করত, সংকলনের দায়িত্ব দিয়েছিল ওই দুই বন্ধুকে; তারা নিজেরাও লিখত। ভালো লিখত। একজন লিখত গল্প, অন্যজন কবিতা। প্রতিবছরই আসত তারা লেখা নিতে। শীতের আভাস পাওয়া গেলেই তাদের কথা মনে পড়ত আমার। জানতাম তারা আসবে। একটি লেখা নিয়ে যেত। না দিয়ে উপায় থাকত না। খুব যত্ন করে বের করত তারা তাদের সংকলন। প্রতিটিই স্বতন্ত্র, প্রতিটিই ভিন্ন। ‘মুক্তধারা’ প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান সেই সময়ে শ্রেষ্ঠ সংকলনের জন্য পুরস্কার দেওয়ার ব্যবস্থা করেছিল, প্রতিবছরই ওই দুই বন্ধু সম্পাদিত সংকলনটি পুরস্কার পেত। পাওয়ার কথাও বটে।

কিন্তু এক বছর তারা এলো না। তার পরেও না। শুনলাম সংকলন আর বের হচ্ছে না। আরো পরে জানা গেল দুই বন্ধুই চাকরি নিয়েছে বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবক সংস্থায় এবং সেখানে তারা ভালো করেছে। এতই ভালো করেছে যে উভয়েই চাকরি পেয়ে গেছে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে। এখন বিদেশে থাকে, লেখেও, দেশেও আসে, কিন্তু সংকলন আর বের করে না।

তা তাদের আর বের করার কথাও নয়। সংকলন তো তরুণদের কাজ। তরুণদেরই নিজস্ব। তারুণ্যের প্রতীক ওই সব সংকলন এবং তরুণদের পক্ষেই শুধু সম্ভব অমন সংকলন তৈরি করা; এই কাজ বয়স্কদের নয়। সেটা ঠিক আছে। কিন্তু ওই যে তরুণরা একসময়ে ওই কাজটা করত, তারা এখন নিজেরা তরুণ নয় বলে সেটা করবে না এটা ঠিক, তবু একসময়ে তাদের যে বয়স ছিল সেই বয়সের ছেলে-মেয়েরা এখন তো আছে, তারা তো পারে পূর্বসূরিদের ঐতিহ্যকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে, সেই ঐতিহ্যকে আরো সমৃদ্ধ করতে। কই, তারা তো সেটা করছে না? সমস্যাটা এখানেই। তরুণ কি তাহলে এখন নেই, নেই তাদের তারুণ্য? আছে, অবশ্যই আছে। তরুণ এখন ঝিমায় কিংবা রংবাজি করে, অথবা চাঁদাবাজিতে নাম লেখায়, ছিনতাইয়ে ব্রতী হয়। সেই সঙ্গে চর্চা করে মাদক সেবনের। হয়তো বা মেয়েদের পেছনে লাগে। মনে করে সেটাই বীরত্ব। পাড়ায় পাড়ায় ক্লাব আছে; কিন্তু সেসব ক্লাব দেখে উত্ফুল্ল হওয়ার কারণ নেই। বেশির ভাগ ক্লাবই বখাটেপনার আখড়া। তরুণরা কি আত্মহত্যা করেছে, নাকি তাদের হত্যা করা হলো? হত্যা কিংবা বাধ্যতামূলক আত্মহত্যা।

লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা