kalerkantho

শুক্রবার । ৩ বৈশাখ ১৪২৮। ১৬ এপ্রিল ২০২১। ৩ রমজান ১৪৪২

দুই অংশের চাপে ‘ত্রাহি অবস্থা’ ড. কামালের

এনাম আবেদীন   

২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ০৩:১৪ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



দুই অংশের চাপে ‘ত্রাহি অবস্থা’ ড. কামালের

দলের দুই অংশের বিরোধ এবং তাদের পাল্টাপাল্টি চাপের কারণে গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেনের ‘ত্রাহি অবস্থা’। এ কারণে একদিকে দলের বিরোধ নিষ্পত্তি হচ্ছে না, অন্যদিকে নিজের সিদ্ধান্তও তিনি বারবার বদলাতে বাধ্য হচ্ছেন।

নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, বিরোধ নিষ্পত্তি করে ১১ সদস্যের স্টিয়ারিং কমিটি দিয়ে দল পরিচালনার কথা জানাতে সর্বশেষ গত ১৬ জানুয়ারি ড. কামাল হোসেন সংবাদ সম্মেলনের ঘোষণা দিয়েও পরে তা বাতিল করেন। ওই ঘটনার নেপথ্যে সংসদ সদস্য মোকাব্বির খান সমর্থিত অংশের হাত রয়েছে বলে মনে করে তাঁর বিরোধী বলে পরিচিত অংশটি। গণফোরামের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মহসিন মন্টু ছাড়াও সুব্রত চৌধুরী ও আবু সাইয়িদ দলে এখন মোকাব্বিরবিরোধী বলে পরিচিত। একইভাবে মন্টুকে নির্দেশনা দিয়ে আজ ২৭ ফেব্রুয়ারি জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করার সিদ্ধান্ত নিয়েও মোকাব্বিরের পরামর্শে আবারও তা বাতিল করেছেন ড. কামাল হোসেন।

তবে সংবাদ সম্মেলন বাতিলের বিষয় মানতে রাজি নন মন্টুর সমর্থকরা। তাঁরা আজ প্রেস ক্লাবে দলের বর্ধিত সভা ডেকেছেন। প্রেস ক্লাবের যে মিলনায়তন বুকিং করা হয়েছিল, সেখানেই তাঁরা এই সভা করবেন। এ অবস্থায় আজ আবার দলটির দুই পক্ষের মধ্যে নতুন করে মতবিরোধ তৈরির আশঙ্কা রয়েছে।

জানতে চাইলে ড. কামাল হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ওটা (সংবাদ সম্মেলন) বাতিল করা হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘আমি আর গণফোরামে থাকতে চাচ্ছি না। সবাই মিলে দল পরিচালনা করুক; সেটাই ভালো হবে।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বিরোধ তো চাই না। কারা এগুলো সৃষ্টি করে বুঝতে পারছি না।’

৮৫ বছর বয়সী ড. কামাল হোসেন এখন আর গণফোরামের সভাপতির পদে থাকতে আগ্রহী নন। তাঁর ঘনিষ্ঠজনদের মতে, দুই অংশের বৈঠকে চাপে পড়ে প্রায়ই তাঁকে বলতে হচ্ছে, ‘আপনারা আমাকে বাদ দিয়ে দলের দায়িত্ব নেন।’

ওই সূত্রগুলো বলছে, গণফোরামের আগামী কাউন্সিলেই দল তথা রাজনীতি থেকে ড. কামাল বিদায় নিতে চাইছেন। কিন্তু দলের দুই অংশের বিরোধে সেই কাউন্সিল পর্যন্ত সময় পার করাই এখন তাঁর জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।

অভিযোগ উঠেছে, সংসদ সদস্য মোকাব্বির খান গণফোরামকে কবজা করার জন্য তৎপরতা শুরু করেছেন। তিনি নিজে সভাপতি এবং তাঁর সমর্থক শফিকউল্লাহকে দলের সাধারণ সম্পাদক করতে আগ্রহী বলে বিরোধীরা মনে করেন। ড. রেজা কিবরিয়া সম্প্রতি পদত্যাগ করায় দলে সাধারণ সম্পাদকের পদটি শূন্য হয়েছে।

জানতে চাইলে শফিকউল্লাহ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সভাপতি এখনই কাউকে করা সম্ভব নয়। তবে সাবেক সাধারণ সম্পাদক রেজা কিবরিয়ার প্রস্তাবে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হিসেবে কামাল হোসেন স্যার আমাকে একটা অ্যাপ্রুভাল দিয়ে রেখেছেন, যদিও করোনার কারণে দলীয় কাজ আমি শুরু করতে পারছি না।’ তিনি দাবি করেন, ‘সমঝোতার কাছাকাছি গিয়ে দুই অংশের নামের সিরিয়াল নিয়ে গণ্ডগোলটা মন্টু ভাই বাধিয়েছেন। ১১ সদস্যের স্টিয়ারিং কমিটিতে তিনি ড. কামাল হোসেনকে  প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। আসলে তিনি তো এখনো সভাপতি।’

মোকাব্বিরবিরোধীদের মধ্যে আলোচনা হলো— আগামী কাউন্সিলে গণফোরামের সভাপতি হওয়ার জন্য এখনই তৎপরতা শুরু করেছেন মোকাব্বির খান। যে কারণে দুই অংশের পাঁচজন করে সদস্যের সমন্বয়ে স্টিয়ারিং কমিটি ঘোষণায় তিনি বাধা দিচ্ছেন। তাঁদের দাবি, দশজনের চূড়ান্ত নামের তালিকায় নিজের নাম এক নম্বরে এবং মোস্তফা মহসিন মন্টুর নাম তিনি দুই নম্বরে রেখেছেন। অন্যদিকে মন্টু নিজের নাম এক নম্বরে এবং মোকাব্বিরের নাম দুই নম্বরে রাখতে চাইছেন। জানা যায়, এ কারণে কামাল হোসেনসহ ১১ সদস্যের নাম চূড়ান্ত করা যাচ্ছে না। আবার ‘সক্ষমতা’র অভাবে দুই অংশের মধ্যে সমঝোতা করে নামের ক্রম ড. কামাল নিজেও ঠিক করে দিতে পারছেন না।

দু-দুবার মোকাব্বিরের পরামর্শে সংবাদ সম্মেলন বাতিল করা হয়েছে জানিয়ে মোস্তফা মহসিন মন্টু কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গণফোরামকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেও সফল হতে পারছি না। ২৭ ফেব্রুয়ারি প্রেস ক্লাবের অডিটরিয়াম বুকিং করার টাকাও কামাল হোসেন স্যার দিয়েছিলেন। অথচ এখন আবার স্থগিত করতে বলা হয়েছে।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘মোকাব্বিরের যদি যোগ্যতা থাকে, হোক না সভাপতি; জেলায় জেলায় যাক না। অনেকেরই অনেক আশা থাকে। কিন্তু নেতা নির্বাচিত হবেন আগামী জাতীয় কাউন্সিলে।’

মোকাব্বির খান অবশ্য এমন তৎপরতার কথা অস্বীকার করে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এটা অপপ্রচার এবং মহসিন রশীদ এগুলো ফেসবুকে ছড়াচ্ছেন।’ তিনি বলেন, ‘কাউন্সিল পর্যন্ত ড. কামাল হোসেন সাহেব সভাপতি থাকবেন। এরপর কাউন্সিলররা নতুন সভাপতি নির্বাচিত করবেন।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি অবশ্য বলেন, ‘ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক একজনকে করার প্রয়োজন রয়েছে।’

সাবেক নির্বাহী সভাপতি মহসিন রশীদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘অপপ্রচার নয়, আমি সত্যি কথা বলছি।’ তিনি বলেছেন, ‘একটা বৈঠকে রেজা কিবরিয়া তাঁকে সভাপতিত্ব করতে বলার পর থেকে মোকাব্বিরের মধ্যে দলের সভাপতির হাবভাব তৈরি হয়েছে। অথচ আজ পর্যন্ত তিনি কোনো জেলায় যেতে পারেননি। এমনকি নিজের নির্বাচনী এলাকায় কমিটি গঠন করতে পারেননি।’ তাঁর মতে, ‘আউট গোয়িং সাধারণ সম্পাদকের প্রস্তাব মতো শফিকউল্লাহকে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক করার সিদ্ধান্ত দলের গঠনতন্ত্র বহির্ভূত সিদ্ধান্ত।  এটা দলের নেতাকর্মীরা মেনে নেবেন না।’

১৯৯২ সালে প্রতিষ্ঠার পর গত ২৭ বছর ড. কামালের একক নেতৃত্বে পরিচালিত হয়ে আসছে গণফোরাম। ২০১৯ সালের মে মাসে গঠিত কমিটিতে দলটির সাধারণ সম্পাদক করা হয় ড. রেজা কিবরিয়াকে। গত বছর মার্চে ওই কমিটি ভেঙে দিয়ে আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হলে দলে বিরোধ তৈরি হয়। কারণ, তখন প্রভাবশালী তিন নেতা মোস্তফা মহসিন মন্টু, সুব্রত চৌধুরী, আবু সাইয়িদসহ জ্যেষ্ঠ আরো অনেককে বাদ দেওয়া হলে গণফোরামে বিরোধ তুঙ্গে ওঠে। এরপর কিবরিয়া ও মন্টু সমর্থকদের মধ্যে বহিষ্কার-পাল্টাবহিষ্কারের ঘটনা ঘটে। এমন পরিস্থিতিতে বিরোধ মীমাংসায় গত ডিসেম্বরে ড. কামাল হোসেনের সভাপতিত্বে দুই অংশের বৈঠকে ১১ সদস্যের স্টিয়ারিং কমিটির মাধ্যমে দল পরিচালনার সিদ্ধান্ত হয়। সে অনুযায়ী মন্টু সমর্থকদের মধ্য থেকে তিনি ছাড়াও আবু সাইয়িদ, সুব্রত চৌধুরী, জগলুল হায়দার আফ্রিক ও মহিউদ্দিন আবদুল কাদেরের নাম ড. কামাল হোসেনের কাছে যায়। অন্য অংশের মধ্যে মোকাব্বির খান ছাড়াও শফিকউল্লাহ, মোশতাক আহমেদ, সেলিম আকবর ও সুরাইয়া বেগমের নাম দেওয়া হয়। তবে নামের ওই দুই তালিকা একত্র করে স্টিয়ারিং কমিটি গঠন করতে গেলে কার নাম আগে-পরে যাবে তা নিয়ে বিরোধ তৈরি হয়।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা