kalerkantho

বুধবার । ১ বৈশাখ ১৪২৮। ১৪ এপ্রিল ২০২১। ১ রমজান ১৪৪২

স্মরণ

একজন নির্মোহ বুদ্ধিজীবী

আলমগীর শাহরিয়ার   

২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ০২:২১ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



একজন নির্মোহ বুদ্ধিজীবী

৭৫ বছরের এক বর্ণাঢ্য জীবন কাটিয়ে আকস্মিকভাবে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় চলে গেলেন সৈয়দ আবুল মকসুদ। রাজনীতি, সমাজ, সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্পর্কে সচেতন পাঠক মাত্রেরই বিশেষ আগ্রহ থাকত তাঁর লেখার ব্যাপারে। অসংগতি দেখলে তিনি তাঁর সরস ভঙ্গিতে সমালোচনার বুদ্ধিদীপ্ত তীক্ষ তীরটি ছুড়তেন লেখার মধ্য দিয়ে। কোনো ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের কাছে নয়, একজন নির্মোহ বুদ্ধিজীবীর সজাগ চৈতন্যের কাছে ছিল তাঁর সব দায়।

ইতালীয় মার্ক্সবাদী দার্শনিক আন্তনিও গ্রামসি ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, উকিল, ঋণ পরামর্শক সবাইকেই বুদ্ধিজীবী বলে অভিহিত করেছেন। যাঁদের কাজ হলো ক্ষমতামুখী প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্রের পক্ষে বুদ্ধি প্রয়োগ করে নিজস্ব স্বার্থ অর্জন। সৈয়দ আবুল মকসুদকে আমরা ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির জন্য রাষ্ট্র বা ক্ষমতাসীন কারো কাছে কখনো নত হননি। ক্ষমতার অপব্যবহারের প্রতিবাদ করেছেন।

সৈয়দ আবুল মকসুদকেও আমরা সব সময় নির্যাতিত নিপীড়িত মানুষের পক্ষে দাঁড়াতে দেখেছি। অনেকবার তাঁকে জাতীয় প্রেস ক্লাবে, শহীদ মিনারে, শাহবাগে প্রয়োজনে একাই প্রতিবাদ করতে দেখেছি। প্রতিবাদী নাগরিক সত্তার দায় নিয়ে তিনি ছুটে গেছেন দেশের নানা প্রান্তে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে। যুদ্ধের বিরুদ্ধে, বর্বরতার বিরুদ্ধে, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে, সহিংসতার বিরুদ্ধে, পোশাক শ্রমিকের পক্ষে, ধর্ষিতা কোনো নারীর পক্ষে, নিরাপদ সড়কের আন্দোলনে, শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবি ও অধিকারের প্রশ্নে কথা বলতে তিনি কার্পণ্য করেননি। দাঁড়িয়েছেন অসাম্প্রদায়িক হৃদয় নিয়ে সব সময় সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে। ১৯৭৮ সালে অনুষ্ঠিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কয়েকজন প্রার্থী জাতীয় সংগীত পরিবর্তনের মতো ইস্যু তাঁদের নির্বাচনী এজেন্ডায় তুলে ধরলে একমাত্র তিনিই এই অর্বাচীনতার প্রতিবাদ করেন। আমৃত্যু তিনি প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ রক্ষার আন্দোলনেও রাজপথে সক্রিয় ছিলেন। থাকতেন সম্মুখ সারিতে। হাওরে অকালবন্যায় ভাটির মানুষের ফসল তলিয়ে গেলে তাঁকে আমরা পাশে পেয়েছি কৃষকের পক্ষে। প্রত্যক্ষ সামাজিক দায়িত্ব এড়িয়ে তিনি কোনো নিভৃতচারী লেখক বা শিল্পী ছিলেন না, নাগরিক আন্দোলনে অংশগ্রহণকে সব সময়ই স্বতঃস্ফূর্ত নৈতিক ও বিবেকি দায়িত্ব বলে মনে করতেন।

সৈয়দ আবুল মকসুদ মহাত্মা গান্ধীর অহিংস নীতিতে গভীর আস্থাশীল এক ব্যক্তিত্ব ছিলেন। শুধু বাংলাদেশ নয়, বিবেকি মানুষ হিসেবে বিশ্বের যেকোনো স্থানে সন্ত্রাস, সংঘাত, সহিংসতা তাঁকে গভীরভাবে ব্যথিত করত। ইরাকে মার্কিন হামলার প্রতিবাদে তিনি সেলাই করা কাপড় বর্জন করেন। ৯/১১-র পর ২০০৩ সালে গণবিধ্বংসী অস্ত্র আছে এই মিথ্যা অজুহাতে মার্কিনরা ইরাকে হামলা চালায় এবং পুরো পৃথিবীটাকে অশান্ত করে তোলে, লাখ লাখ মানুষ উদ্বাস্তু হয়, নিরীহ শিশু, বৃদ্ধ, যুবার মৃত্যু হয়। তারই প্রতিবাদে সৈয়দ আবুল মকসুদ দুই খণ্ড সেলাই ছাড়া সাদা চাদর পরা শুরু করেন। গান্ধীর অহিংস নীতিতে তিনি গভীরভাবে উদ্বুদ্ধ ছিলেন। ব্যক্তিগতভাবে তাঁর মুখে একদিন শোনার সৌভাগ্য হয়েছিল নিরীহ ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলের আক্রমণ ও বাস্তুহারা করার প্রতিবাদেও তিনি এই সাদা কাপড় পরা শুরু করেন। চাইতেন সংঘাত ও সহিংসতাপূর্ণ পৃথিবী নয়, মানুষের বাসযোগ্য শান্তির এক পৃথিবী হোক।

 

স্বর্ণোজ্জ্বল ষাটের প্রজন্ম সৈয়দ আবুল মকসুদ ছিলেন অসাম্প্রদায়িক মানুষ। দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনের পাশাপাশি তিনি একজন শিকড়সন্ধানী গবেষক ছিলেন। শতবর্ষী প্রতিষ্ঠান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে তাঁর অসামান্য কাজ একটি জাতির উত্থান ও বিকাশের সাক্ষ্য দেবে। ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষা’, ‘পি জি হার্টগ : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য’, ‘সলিমুল্লাহ মুসলিম হল’ তাঁর শ্রমলব্ধ গবেষণার উজ্জ্বল স্বাক্ষর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে তিনি আরো অনেক কাজ করতে চেয়েছিলেন; যদিও শতবর্ষের মাহেন্দ্রক্ষণে বিশ্ববিদ্যালয়টি তাঁকে কোনোভাবে সম্মান দেখানোর প্রয়োজন মনে করেনি। জাতি হিসেবে আমাদের অকৃতজ্ঞতা নজিরবিহীন। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে একদিন আলোর স্কুলের মুক্ত আলোচনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে তাঁর আরো গবেষণাকাজের ইচ্ছার কথা বলার পাশাপাশি বলেছিলেন অনেকেই জানেন না তিনি একজন কবি হিসেবে তাঁর সাহিত্যজীবন শুরু করেছিলেন। তাঁর কবিসত্তার সঙ্গে অনেকেরই আজ আর পরিচয় নেই। সৈয়দ আবুল মকসুদের উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে—কবিতা : ‘বিকেলবেলা’, ‘দারা শিকোহ ও অন্যান্য কবিতা’; প্রবন্ধ : ‘পূর্ববঙ্গে রবীন্দ্রনাথ’, ‘বাঙালির সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার’, ‘রবীন্দ্রনাথের ধর্মতত্ত্ব ও দর্শন’, ‘ঢাকায় বুদ্ধদেব বসু’, ‘যুদ্ধ ও মানুষের মূর্খতা’ প্রভৃতি; জীবনী : ‘মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী’, ‘গোবিন্দচন্দ্র দাসের ঘর-গেরস্তালি’, ‘সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর জীবন ও সাহিত্য’; ভ্রমণকাহিনি : ‘জার্মানির জার্নাল’, ‘পারস্যের পত্রাবলি’ প্রভৃতি। মহাত্মা গান্ধী নিয়েও তাঁর গভীর আগ্রহ ও মৌলিক গবেষণাকাজ আছে। তিনি একজন শিকড়সন্ধানী গবেষক হিসেবে বেঁচে থাকবেন।

দেশ, কাল, জাতিভেদে যেকোনো সমাজে সাধারণ পেশা বা দায়িত্ব থেকে বুদ্ধিজীবীদের দায় থাকে সবচেয়ে বেশি। কেননা জাতির বিবেকের ভূমিকা পালন করেন তাঁরা। বিশেষত যেখানে তৃতীয় বিশ্বে দুর্বল আইনের শাসন, বিচারহীনতার সংস্কৃতি, দুর্নীতিগ্রস্ত আমলাতন্ত্র, সর্বত্র দলীয় অন্ধ আনুগত্যের তোড়জোড় সে অবস্থায় সচেতন নাগরিক সমাজের সজাগ উচ্চকিত প্রতিবাদী কণ্ঠ একটি সুস্থ ও বিকশিত সমাজের পূর্বশর্ত হয়ে ওঠে। জেনে বিস্মিত হই বাংলা একাডেমি পুরস্কার ছাড়া এই কর্মবীর, নাগরিক আন্দোলনের নিঃসঙ্গ যোদ্ধা, গবেষক রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ দুটি পুরস্কারের একটিও পাননি! স্তব আর স্তুতি-সংস্কৃতিপূর্ণ সমাজে তিনি তাঁর সহজাত ব্যক্তিত্বের বিভায় কারো অর্থহীন স্তুতি করেননি। আত্মমর্যাদাসম্পন্ন এমন একজন ব্যক্তিত্বের স্থূল স্তাবক হওয়ার কথাও নয়। সে জন্যই হয়তো সময়ের বিচূর্ণ আয়নায় বারবার দেখব আমরা একজন প্রকৃত বুদ্ধিজীবীর মুখ। তাঁর মৃত্যুতে এ দেশের নাগরিক আন্দোলনের বিরাট ক্ষতি হলো। তবু তাঁর চলে যাওয়া মানে তো প্রস্থান নয়।

 লেখক : কবি ও গবেষক

[email protected]

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা