kalerkantho

মঙ্গলবার । ৩০ চৈত্র ১৪২৭। ১৩ এপ্রিল ২০২১। ২৯ শাবান ১৪৪২

রাফির রহস্যঘেরা মৃত্যু

‘কোনটি আমার ছেলের কবর তা-ও জানাতে পারেনি’

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ০৩:৪৯ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



‘কোনটি আমার ছেলের কবর তা-ও জানাতে পারেনি’

‘কোনো তদন্তই হয়নি। আমি অনেক খুঁজে যখন লাশ উদ্ধারের খবর পেলাম, তখন থানায় গেছি। জুতা দেখে বুঝতে পেরেছি ওটা আমার মানিকের লাশ। ওরা আগেই আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের মাধ্যমে দাফন করেছে। কবরের হদিসটাও কেউ রাখেনি। কোনটি আমার ছেলের কবর তা-ও জানাতে পারেনি।’ থেমে থেমে বলছিলেন মনোয়ারা হোসেন। কাঁপাকণ্ঠ বারবার কান্নায় থেমে আসছিল। আবার বলেন, ‘আমার ফেরেশতার মতো ছেলেটাকে কারা মারল তার তো তদন্ত হওয়া দরকার। আমি তো জানতে চাই কেন মরল আমার ছেলেকে?’

মনোয়ারা হোসেন একজন মা। তাঁর ছেলে সাদমান সাকিব রাফি (২৩)। প্রায় দেড় মাস আগে নিখোঁজ হয়েছিলেন। সন্তানের খোঁজ না পেয়ে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন তিনি। আলামত দেখে সন্দেহ করে পুলিশ মনোয়ারাকে জানিয়েছেন, হয়তো জঙ্গি দলে চলে গেছেন তাঁর ছেলে। তবে বসে থাকেননি এই মা। নিজেই খুঁজে বের করেন ক্লু। একটি অজ্ঞাতপরিচয় লাশ, যেটি দাফন হয়েছে বেওয়ারিশ হিসেবে—সেই লাশের ছবি ও জুতা দেখে সন্তান বলে শনাক্ত করেন এই নারী। গত সোমবার সন্তানের লাশ দাফনের বিষয়ে নিশ্চিত হলেও কবর শনাক্ত করতে না পারায় এখন কেঁদে বুক ভাসাচ্ছেন এই মা। গতকাল বুধবার কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘নিখোঁজের পর এই হত্যার ঘটনা নিয়েও হচ্ছে না কার্যকর তদন্ত।’

তিনি সন্তানের খুনিদের গ্রেপ্তারের দাবি জানান। তবে পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, ‘রাফিকে হত্যা করা হয়েছে—এমন কোনো আলামত প্রাথমিকভাবে পাওয়া যায়নি। এ কারণে ঘটনাটি আত্মহত্যা কি না তা-ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’

জানতে চাইলে হাতিরঝিল থানার ওসি আব্দুর রশিদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পরিচয় না পাওয়ায় আঙুলের ছাপসহ ডিএনএ প্রফাইল রেখে বেওয়ারিশ হিসেবে ছেলেটির লাশ দাফন করা হয়। তার মা এসে শনাক্ত করার পর আমরা কিছু তথ্য জানতে পেরেছি। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি বাতিল নিয়ে তাঁর ব্যক্তিগত হতাশা ছিল। ওই হতাশা থেকে ছেলেটি আত্মহত্যাও করতে পারে। তার শরীরে হত্যার আলামত ছিল না। ময়নাতদন্ত রিপোর্ট পেলে নিশ্চিত হওয়া যাবে।’

রাফির মা মনোয়ারা হোসেন জানান, রাফি গত ১৩ জানুয়ারি বাসা থেকে বেরিয়ে নিখোঁজ হয়। এ ঘটনায় ভাটারা থানায় জিডি করেন তিনি। ১৪ জানুয়ারি হাতিরঝিল লেক থেকে অজ্ঞাতপরিচয় এক যুবকের মরদেহ উদ্ধার করেছিল পুলিশ। ময়নাতদন্তের পরে দীর্ঘদিন মরদেহটি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পড়ে ছিল। গত ১১ ফেব্রুয়ারি আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম বেওয়ারিশ হিসেবে মরদেহটি দাফন করে। নিখোঁজের পর থেকে প্রতিদিনই রাফির মোবাইলে ফোন করতেন মনোয়ারা। গত ২৮ জানুয়ারি রাফির সিম চালু পাওয়া যায়। এক নারী ফোন রিসিভ করে জানান, হাতিরঝিল এলাকায় ঝাড়ু দেওয়ার সময় তিনি সিমটি কুড়িয়ে পেয়েছেন। ওই ঘটনার দুই ঘণ্টা পর তিনি আবার সিমটি বন্ধ করে দেন। রাফির পরিবারের পক্ষ থেকে বিষয়টি পুলিশকে জানানো হলে, পুলিশ সদস্যরা ওই নারীর অবস্থান শনাক্ত করেন এবং পরবর্তী সময়ে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। তবে রাফির বিষয়ে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। থেমে থাকেননি মনোয়ারা। হাতিরঝিল থানায় নিজে গিয়ে খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন—১৪ জানুয়ারি পুলিশ হাতিরঝিলে অজ্ঞাতপরিচয় এক যুবকের মরদেহ পায়। ১১ ফেব্রুয়ারি আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম বেওয়ারিশ হিসেবে লাশটি দাফন করে।

স্বজনরা জানায়,  তিন ভাই-বোনের মধ্যে রাফি ছোট। তাঁর জন্ম এবং বেড়ে ওঠা সৌদি আরবে। তিন বছর আগে রাফি মালয়েশিয়ার এশিয়া প্যাসিফিক ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হন। ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে ঢাকায় আসার পর করোনা পরিস্থিতির কারণে তিনি আর ফিরে যেতে পারেননি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা