kalerkantho

সোমবার । ২৩ ফাল্গুন ১৪২৭। ৮ মার্চ ২০২১। ২৩ রজব ১৪৪২

থেমে গেল সৈয়দ আবুল মকসুদের সোচ্চার কণ্ঠ

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ০২:৩৩ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



থেমে গেল সৈয়দ আবুল মকসুদের সোচ্চার কণ্ঠ

মানবতাবাদকে তিনি জীবনের আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। তিনি বাহুল্য বর্জন করে সেলাইবিহীন সাদা পোশাক পরতেন মহাত্মা গান্ধীর মতো। নির্মোহভাবে নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করতেন সমসাময়িক রাজনীতি ও সমাজের নানা অসংগতি। যেকোনো অন্যায়, অবিচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে রাজপথে নেমে আসতেন। তিনি সাংবাদিক-কলামিস্ট, গবেষক ও নাগরিক আন্দোলনের নেতা সৈয়দ আবুল মকসুদ।

গান্ধীবাদী হিসেবে পরিচিত দেশের খ্যাতিমান লেখক হঠাৎ করেই চিরতরে চলে গেলেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৪ বছর।

গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় সৈয়দ আবুল মকসুদ শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন বলে তাঁর ছেলে সৈয়দ নাসিফ মকসুদ জানান। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘বিকেলে বাবার হঠাৎ শ্বাসকষ্ট শুরু হলে আমরা তত্ক্ষণিকভাবে তাঁকে স্কয়ার হাসপাতালে নিয়ে যাই। সোয়া ৭টার দিকে চিকিৎসকরা জানান, হাসপাতালে আনার আগেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে।’

সৈয়দ আবুল মকসুদ স্ত্রী, এক ছেলে ও এক মেয়ে রেখে গেছেন। তাঁর মৃত্যুতে দেশের গণমাধ্যমজগতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। গণমাধ্যমকর্মীদের কাছে তিনি ছিলেন আপনজন।

লেখক, গবেষক ও কলামিস্ট সৈয়দ আবুল মকসুদের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

এক শোকবার্তায় রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘সৈয়দ আবুল মকসুদের মৃত্য আমাদের সাহিত্যাঙ্গনের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। দেশের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে তাঁর অবদান মানুষ শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে।’

এ ছাড়া শোক জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন ও সাধারণ সম্পাদক কমরেড ফজলে হোসেন বাদশা, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদের সভাপতি হাসানুল হক ইনু ও সাধারণ সম্পাদক শিরীন আখতার, গণস্বাস্থ্যকেন্দ্রের ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম প্রমুখ পৃথক বিবৃতিতে শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন।

শোক প্রকাশ করেছেন ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন। শোকবার্তায় তিনি বলেন, ‘সৈয়দ আবুল মকসুদের মৃত্যুতে দেশ একজন বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবীকে হারাল। একজন সড়কযোদ্ধাকে হারাল। নিসচা হারাল একজন সুহৃদকে। তাঁর মৃত্যু আমাদের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি।’

সৈয়দ আবুল মকসুদ দেশের রাজনীতি, সমাজ, সাহিত্য ও সংস্কৃতিসহ সমসাময়িক বিষয় নিয়ে সংবাদপত্রে কলাম লিখে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। তাঁর রচিত বইয়ের সংখ্যা চল্লিশের বেশি। বাংলা সাহিত্যে সামগ্রিক অবদানের জন্য তিনি ১৯৯৫ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন।

সৈয়দ আবুল মকসুদের জন্ম ১৯৪৬ সালের ২৩ অক্টোবর মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার এলাচিপুর গ্রামে। তাঁর কর্মজীবন শুরু হয় ১৯৬৪ সালে এম আনিসুজ্জামান সম্পাদিত সাপ্তাহিক নবযুগ পত্রিকায় সাংবাদিকতার মাধ্যমে। এটি ছিল পাকিস্তান সোশ্যালিস্ট পার্টির মুখপত্র। পরে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির পৃষ্ঠপোষকতায় প্রকাশিত সাপ্তাহিক ‘জনতা’য় কাজ করেন কিছুদিন। পরে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থায় যোগ দেন। ২০০৮ সালের ২ মার্চ সংবাদ সংস্থার সম্পাদকীয় বিভাগে থাকা অবস্থায় চাকরি ছেড়ে দেন তিনি। এর পর থেকে তিনি বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকায় নিয়মিত কলাম লিখতেন। তিনি সমাজ, রাজনীতি, সাহিত্য-সংস্কৃতি নিয়ে কলাম লিখতেন।

সৈয়দ আবুল মকসুদ সাহিত্যিক হিসেবেও খ্যাতিমান ছিলেন। কবিতার পাশাপাশি তাঁর গুরুত্বপূর্ণ গবেষণামূলক প্রবন্ধগ্রন্থ রয়েছে। তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বুদ্ধদেব বসু, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী প্রমুখ প্রখ্যাত সাহিত্যিক ও রাজনীতিবিদের জীবন ও কর্ম নিয়ে গবেষণা করেছেন। তাঁর বইয়ের মধ্যে রয়েছে—প্রবন্ধগ্রন্থ : যুদ্ধ ও মানুষের মূর্খতা, গান্ধী, নেহেরু ও নোয়াখালী, ঢাকার বুদ্ধদেব বসু, রবীন্দ্রনাথের ধর্মতত্ত্ব ও দর্শন, প্রতীচ্য প্রতিভা, কাজী ইমদাদুল হক রচনাবলী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষা, অরণ্য বেতার, বাঙালি জাতি বাঙালি মুসলমান ও বাঙালি জাতীয়তাবাদ, রাজনীতি ও ধর্মীয় রাজনীতি, রবীন্দ্র রাজনীতি, নির্বাচিত প্রবন্ধ। জীবনীগ্রন্থ : মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর জীবন-কর্মকাণ্ড-রাজনীতি ও দর্শন, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর জীবন ও সাহিত্য, ভাসানী কাহিনী, স্মৃতিতে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, গান্ধী মিশন ডায়েরি, পূর্ববঙ্গে রবীন্দ্রনাথ, বিশ্বের শ্রেষ্ঠ দশ দার্শনিক, পথিকৃৎ নারীবাদী খায়রুন্নেসা খাতুন, মোতাহের হোসেন চৌধুরী জীবন ও সাহিত্য, হরিশচন্দ্র মিত্র। কাব্যগ্রন্থ : বিকেলবেলা, দারা শিকোহ ও অন্যান্য কবিতা ও সৈয়দ আবুল মকসুদের কবিতা।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা