kalerkantho

বুধবার । ২৮ বৈশাখ ১৪২৮। ১১ মে ২০২১। ২৮ রমজান ১৪৪২

দেশে ১৪ বিপন্ন ভাষা রক্ষার উদ্যোগ নেই

আজিজুল পারভেজ   

২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ০৩:১৯ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



দেশে ১৪ বিপন্ন ভাষা রক্ষার উদ্যোগ নেই

বাংলাদেশে প্রধান ভাষা বাংলা ছাড়াও বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর মাতৃভাষা হিসেবে অন্তত ৪০টি ভাষার সন্ধান মিলেছে। এর মধ্যে ৩৯টি ভাষা হলো ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর। অন্যটি উর্দু। এসব ভাষার ১৪টিই বিপন্ন। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট (আমাই) পরিচালিত সমীক্ষায় এই তথ্য পাওয়া গেছে। সমীক্ষাটি করা হয়েছে পাঁচ বছর আগে, কিন্তু এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত হয়নি সমীক্ষা প্রতিবেদন। বাংলা-ইংরেজি দুই ভাষায় ২০ খণ্ডে এ প্রতিবেদন প্রকাশ করার কথা থাকলেও প্রকাশিত হয়েছে মাত্র এক খণ্ড।

মাতৃভাষা রক্ষার অঙ্গীকার নিয়ে দেশে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠিত হলেও ওই বিপন্ন ভাষাগুলো রক্ষার কোনো উদ্যোগ এখনো শুরু হয়নি। গত ছয় বছরে শুধু একটি বিপন্ন ভাষা রক্ষার জন্য ডিজিটাল মডেল তৈরি করা হলেও পূর্ণাঙ্গভাবে সংরক্ষণের কাজ থেমে আছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রক্ষার উদ্যোগ না নিলে কালের পরিক্রমায় হারিয়ে যাবে ওই ভাষাগুলো। বিপন্ন ভাষাগুলোর মধ্যে একটি ভাষায় কথা বলেন মাত্র চারজন। তাঁরা এখন জীবিত আছেন কি না, সেটাও জানা নেই। তাঁদের মতে, ভাষা পরিস্থিতি প্রতিনিয়ত বদলাচ্ছে। কোনো সমীক্ষা প্রতিবেদন যথাসময়ে প্রকাশিত না হলে তা গুরুত্বই হারিয়ে ফেলে।

১৯৫২ সালের ভাষাসংগ্রামের স্মৃতিবাহী একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে জাতিসংঘের স্বীকৃতি পায় ১৯৯৯ সালে। এরপর উদ্যোগ নিলেও প্রায় এক দশক পর ২০১০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট। প্রতিষ্ঠানটির প্রথম বড় উদ্যোগ হিসেবে বাংলাদেশের বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর অবস্থান ও ভাষা-পরিস্থিতির তথ্য অনুসন্ধানের জন্য একটি কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। ‘বাংলাদেশের নৃভাষাবৈজ্ঞানিক সমীক্ষা’ শীর্ষক এই কর্মসূচি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ড. মো. সাইফুর রশীদ ও হাসান এ শফি এবং ভাষাবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক সৌরভ সিকদারের নেতৃত্বে পরিচালিত হয়। তিন কোটি ৮৯ লাখ ৪৩ হাজার টাকা ব্যয়ে ২০১৪ ও ২০১৫ সালে সারা দেশে মাঠপর্যায়ে সমীক্ষাটি চালানো হয়।

ওই সমীক্ষায় ৪০টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর তথ্য-উপাত্ত সংগৃহীত হয়, যাদের নিজস্ব মাতৃভাষা আছে। ওই ভাষাগুলো হলো অহমিয়া, বম, চাক, চাকমা, গারো, হাজং, ককবরক, কানপুরী, খাড়িয়া, খাসি, খিয়াং, খুমি, কোচ, কোডা, কোল, কন্দ, কুরুখ, লিঙ্গম, লুসাই, মাদ্রাজি, মাহলে, মালতো, মণিপুরি মৈতৈ, মণিপুরি বিষ্ণুপ্রিয়া, মারমা, ম্রো, মুণ্ডারি, নেপালি, ওড়িয়া, পাংখোয়া, লালেং বা পাত্র, রাখাইন, রেংমিত্চা, সাদ্রি, সাঁওতালি, সৌরা, তঞ্চঙ্গ্যা, থর, তেলেগু ও উর্দু। এর মধ্যে ১৪টি ভাষাকে বিপন্ন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যদিও অন্যান্য সূত্রে বিপন্ন ভাষার সংখ্যা আরো বেশি বলে জানা যায়।

দেশের বিপন্ন ভাষাগুলো হচ্ছে খাড়িয়া (জনসংখ্যা আনুমানিক এক হাজার), সৌরা (আনুমানিক এক হাজার, তবে এ ভাষায় কথা বলে মাত্র চারজন), কোডা (৬০০ থেকে ৭০০), মুণ্ডারি (৩৮ হাজার ২১২), কোল (আনুমানিক দুই হাজার ৮৪৩), মালতো (আনুমানিক আট হাজার), কন্দ (৬০০ থেকে ৭০০), খুমি (তিন হাজার ৩৬৯), পাংখোয়া (দুই হাজার ২৭৪), রেংমিত্চা (আনুমানিক ৪০), চাক (দুই হাজার ৮৩৫), খিয়াং (তিন হাজার ৮৯৯) লালেং/পাত্র (দুই হাজার ৩৩) ও লুসাই (৯৫৯ জন)।

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ৪০টি ভাষার মধ্যে মাত্র আটটির নিজস্ব বর্ণমালা আছে। সেগুলোর মধ্যে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, গারো ও সাদ্রি—এই পাঁচ ভাষায় প্রাক-প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের জন্য পাঠ্য বই রচনা করেছে জাতীয় পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড।

প্রায় ১০০ বছর পর বাংলাদেশে ভাষা সমীক্ষা করা হয়েছে। এর আগে ব্রিটিশ আমলে জর্জ আব্রাহাম গ্রিয়ার্সন ১৯০৩-১৯২৮ সাল পর্যন্ত সময়ে Linguistic Survey of India-এর মাধ্যমে এক ধরনের ভাষা জরিপ করেছিলেন।

ভাষাবিজ্ঞানীদের মতে, নিকট ভবিষ্যতে যে ভাষার লুপ্ত হওয়ার বা মৃত্যু ঘটার আশঙ্কা রয়েছে, সেই ভাষাকেই বিপন্ন ভাষা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ভাষা বিপন্ন হওয়ার প্রধান তিনটি কারণ হচ্ছে প্রত্যক্ষ গণহত্যা, গোষ্ঠীগত আধিপত্য বা প্রাধান্য বিস্তার ও বহিরাগত ভাষা শিক্ষা। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বের প্রায় ছয় হাজার ভাষার মধ্যে দুই হাজার ৫০০টি বিপন্ন। প্রতি ১৪ দিনে একটি ভাষার মৃত্যু হচ্ছে।

ভাষা বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর ভাষা বিপন্ন হওয়ার কারণ হচ্ছে ওই ভাষাভাষী জনসংখ্যা কম। আবার জনসংখ্যা থাকলেও ওই ভাষায় কথা বলা লোকের সংখ্যা আরো কম। এ ছাড়া লিখনবিধি না থাকায় শিক্ষাদান, জ্ঞানচর্চা, লিখিত যোগাযোগ না হওয়া; আর্থ-সামাজিক ও পেশাগত সুবিধার জন্য বাংলা, ইংরেজিসহ অন্য ভাষা গ্রহণ; প্রধান ভাষা তথা বাংলার প্রভাব—এসব কারণে বিপন্ন হচ্ছে অনেক ভাষা।

‘বাংলাদেশের নৃভাষাবৈজ্ঞানিক সমীক্ষা’ কর্মসূচির পরিকল্পনা অনুসারে সমীক্ষা প্রতিবেদন ১০ খণ্ড বাংলা ও ১০ খণ্ড ইংরেজি মুদ্রিত আকারে প্রকাশ করার কথা। কিন্তু গত পাঁচ বছরে বাংলায় মাত্র এক খণ্ড প্রকাশিত হয়েছে। বাকিগুলো এখনো আলোর মুখ দেখেনি। নৃভাষাবৈজ্ঞানিক সমীক্ষা প্রতিবেদন যেখানে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিতই হয়নি সেখানে পরবর্তী পদক্ষেপ তথা বিপন্ন ভাষাগুলোকে রক্ষার উদ্যোগ গ্রহণ তো দূরের কথা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো বিপন্ন ভাষাকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে সেই ভাষার প্রামাণ্যকরণ (ডকুমেন্টেশন) জরুরি। একটি ভাষাকে ডিজিটাল ডকুমেন্টেশন করা গেলে ওই ভাষাটি টিকে থাকবে অনন্তকাল।

আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং কালের কণ্ঠকে বলেন, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট সমীক্ষা পরিচালনার মাধ্যমে একটি বড় কাজ করেছে। কিন্তু এরপর আর কোনো অগ্রগতি নেই। তাদের সমীক্ষার তথ্য বলছে, ১৪টি ভাষা বিপন্ন, যেগুলো বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর। এগুলো রক্ষা করার উদ্যোগ না নিলে হারিয়ে যাবে। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের কাজ হলো বিশ্বের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মাতৃভাষা রক্ষা করা। তারা অন্তত দেশের বিপন্ন ভাষাগুলো রক্ষা করুক।

সঞ্জীব দ্রং বলেন, দেশের আদিবাসীদের বিপন্ন ভাষা রক্ষার জন্য একটি আদিবাসী ভাষা একাডেমি প্রতিষ্ঠা করা উচিত।

দেশের বিপন্ন ভাষাগুলোর মধ্য থেকে সিলেটে পাত্র সম্প্রদায়ের ভাষা লালেংকে প্রামাণ্যকরণের উদ্যোগ নিয়েছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট। ভাষা সংরক্ষণের সফটওয়ার ‘ইল্যান’ ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠানটি একটি মডেল তৈরি করেছে ২০১৯ সালে, কিন্তু ওই ভাষা সংরক্ষণের পূর্ণাঙ্গ কাজটি সম্পন্ন করা হয়নি। লালেং ভাষা প্রামাণ্যকরণের পরিকল্পনা অনুসারে ‘ডিজিটাল করপস’ তৈরি হওয়ার কথা। ওই ভাষার ব্যাকরণ ও লালেং-বাংলা-ইংরেজি ত্রিভাষিক অভিধানও প্রণয়ন করার কথা। ওই ভাষার রূপ-মাধুর্য ও তথ্য অডিও-ভিডিও আকারে ওয়েবসাইটেও যুক্ত করার কথা।

বিপন্ন ভাষা সংরক্ষণের কাজ শুরু না হওয়ার বিষয়ে ভাষাবিজ্ঞানী ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. জীনাত ইমতিয়াজ আলীর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, বিপন্ন ভাষাগুলো সংরক্ষণের জন্য আগামী বছর থেকে গবেষক নিয়োগ করা হবে। সমীক্ষা প্রতিবেদন এখনো প্রকাশিত না হওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এই কাজগুলো সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। সমস্যা হলো, বিশেষজ্ঞ কমিটির সদস্যদের মধ্যে একজন যদি কোনো তথ্য নিয়ে দ্বিমত প্রকাশ করেন তাহলে আবার মাঠ পর্যায়ে গিয়ে সেই তথ্য সংগ্রহ করতে হয়।

আব্রাহাম গ্রিয়ার্সনের ভাষা জরিপে প্রায় ৫০ বছর লাগার বিষয়টি উল্লেখ করে ড. জীনাত জানান, এ বছরের মধ্যে সমীক্ষা প্রতিবেদনের আরো দুটি খণ্ড বের হবে।



সাতদিনের সেরা