kalerkantho

বুধবার । ২৯ বৈশাখ ১৪২৮। ১২ মে ২০২১। ২৯ রমজান ১৪৪২

উচ্চশিক্ষায় বাংলার চর্চা কমছেই

শরীফুল আলম সুমন   

২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ০৩:১৫ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



উচ্চশিক্ষায় বাংলার চর্চা কমছেই

মাতৃভাষা বাংলাকে রক্ষা করতে ১৯৫২ সালে দুর্বার আন্দোলন ও ১৯৭১ সালে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে বিজয় লাভ করে বাংলাদেশ। যে মাতৃভাষা রক্ষার জন্য এত ত্যাগ-তিতিক্ষা, উচ্চশিক্ষায় সেই মাতৃভাষার চর্চা দিন দিন কমছে। বিশেষ করে বাংলা তথ্যসূত্র বই পাওয়া যায় না বললেই চলে। উচ্চশিক্ষার মূল কাজ গবেষণা হলেও বাংলা তথ্যসূত্র বইয়ের অভাবে বেশির ভাগ শিক্ষার্থীই গবেষণায় আগ্রহী হন না। এতে আমাদের দেশের উচ্চশিক্ষার উৎকর্ষ সাধন হচ্ছে না।

দেশে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত বেশির ভাগ শিক্ষার্থীই পড়ালেখা করে বাংলা মাধ্যমে। অথচ এই শিক্ষার্থীরাই যখন উচ্চশিক্ষায় আসেন তখন বাংলা তথ্যসূত্র বইয়ের চরম সংকটে পড়েন। ফলে বেশির ভাগ শিক্ষার্থীকেই অনিচ্ছা সত্ত্বেও ইংরেজি তথ্যসূত্র বইয়ের দ্বারস্থ হতে হয়। এতে অনেকেই প্রথম দিকে ঠিকমতো তাল মেলাতে পারেন না।

জানা যায়, দেশে এখন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ৪৯ আর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ১০৭। বেশির ভাগই যেহেতু নতুন বিশ্ববিদ্যালয় এবং নতুন বিষয়, ফলে সেখানে বাংলার চর্চা খুবই কম। আবার ইংরেজিভীতির কারণে অনেকেই ধার করা গবেষণাপত্র সামান্য পরিবর্তন করে নিজের বলে চালিয়ে দেন। ফলে বাংলাদেশে লাখ লাখ শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষায় অধ্যয়ন করলেও স্বল্পসংখ্যক শিক্ষার্থীর মধ্যে গবেষণা সীমাবদ্ধ থাকছে।

দেশের সাধারণ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পুরনো কিছু বিষয়ে সামান্য হলেও বাংলা তথ্যসূত্র বই পাওয়া যায়। তবে মেডিক্যাল কলেজ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, বিভিন্ন বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয় ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পুরোপুরিই ইংরেজি তথ্যসূত্র বইয়ের ওপর নির্ভর করতে হয়। আর সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন নতুন বিষয়ের শিক্ষার্থীদের কাছেও ইংরেজি তথ্যসূত্র বইয়ের বিকল্প তৈরি হয়নি।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সদস্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আলমগীর কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘উচ্চশিক্ষায় বাংলার চর্চা বাড়াতে হলে প্রয়োজনীয় বই দরকার। মৌলিক বইয়ের পাশাপাশি অনেক বই অনুবাদ করতে হবে। চীন, জাপান, কোরিয়া এই কাজগুলো করেছে। আমাদের তা করতে হবে। এ খাতে সরকারকে বিশেষ প্রণোদনা দিতে হবে।’

বর্তমানে সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিবিএ, এমবিএ, কম্পিউটার সায়েন্স, ইলেকট্রনিকস অ্যান্ড ইলেকট্রিক ইঞ্জিনিয়ারিং, রোবটিক, সমুদ্রবিজ্ঞান, টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং, ফ্যাশন ডিজাইনিংসহ বেশ কিছু বিষয়ের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আগের পুরনো কিছু বিষয়ে ইংরেজির পাশাপাশি বাংলায় লেখার সুযোগ রয়েছে। তবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সবই করতে হয় ইংরেজিতে।

সূত্র জানায়, ২০১৭ সালে ইউজিসি ফুল কমিশনের সিদ্ধান্তে সব বিশ্ববিদ্যালয়ে  ‘বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস’ এবং ‘বাংলা ভাষা ও সাহিত্য’ নামের দুটি বিষয় যোগ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ইউজিসির অনুরোধে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস রচনা করেন অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন ও অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান। আর বাংলা ভাষা ও সাহিত্য সম্পাদনা করেন জাতীয় অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম ও অধ্যাপক সৌমিত্র শেখর দে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কমপক্ষে দুই ক্রেডিট যাতে এই বিষয় দুটি পড়ানো হয়, সে ব্যাপারে নির্দেশনাও জারি করে ইউজিসি, কিন্তু বেশির ভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ই তা মানছে না।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান। তাদের একাডেমিক কাউন্সিল, সিন্ডিকেট কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ীই তারা কোর্স পরিচালনা করে। আর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো চলে ‘বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন-২০১০’ অনুযায়ী। কিন্তু আইনে কোনো কোর্সে বাংলা বিষয় যোগ করার বাধ্যবাধকতা নেই। তাই ইউজিসির পক্ষে অনুরোধই প্রধান উপায় হয়ে দাঁড়াচ্ছে। কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ইউজিসির অনুরোধ শুনলেও অনেকেই শোনেনি। আর পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অনেকেই ইউজিসির দেওয়া বিষয় দুটি যোগ করেনি।

অধ্যাপক আলমগীর আরো বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে দুটি বাংলা বিষয় পড়ানোর জন্য আমরা সুষ্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছি, কিন্তু কিছু বিশ্ববিদ্যালয় কালক্ষেপণ করছে। বিশেষ করে প্রকৌশল, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এ বিষয়ে আগ্রহী নয়। এর পরও আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করছি।’

জানা যায়, দেশের ১০৭টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে মাত্র সাত-আটটিতে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ে চার বছরের স্নাতক (সম্মান) চালু রয়েছে। প্রতিটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগ থাকলেও বাংলা বিভাগ নেই। শিক্ষকরাও শ্রেণিকক্ষে ইংরেজিতে পাঠদান করেন। এমনকি বেশির ভাগ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের নামও ইংরেজিতে। আর পাবলিক বিশ্ববিদ্যালগুলোতে বেশির ভাগ ক্লাসই নেওয়া হয় ইংরেজিতে। উভয় ধরনের বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশির ভাগ রেফারেন্স বইও ইংরেজিতে। বাংলায় ভালোমানের বই পাওয়া দুষ্কর।

রাজধানীর একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সৈয়দ শাহরিয়ার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের পরীক্ষাগুলো যেহেতু ইংরেজিতে হয়, তাই পড়ালেখাও হয় ইংরেজিতে। আর রেফারেন্স বইও হয় ইংরেজিতে। তবে এতে শুরুতে অনেক শিক্ষার্থীই সমস্যায় পড়েন।’

প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা জানান, আর্কিটেক্ট, কেমিক্যাল, সিভিল, মেকানিক্যাল বিভাগসহ বেশ কয়েকটি বিভাগের বাংলা তথ্যসূত্র বইয়ের কথা চিন্তাও করা যায় না। তবে কিছু বিষয়ে দু-একটি বই যা পাওয়া যায়, সেগুলো আক্ষরিক অনুবাদ। এসব দিয়ে তেমন একটা কাজ হয় না।

শিক্ষাবিদরা বলছেন, পৃথিবীর কোনো দেশই মাতৃভাষার চর্চা না করে এগোতে পারেনি। জার্মান, ফরাসি, জাপানি, চীনা সবাই মাতৃভাষার ব্যবহার করেই উঠেছে। আমরা মাতৃভাষার জন্য অনেক কিছু করলেও উচ্চশিক্ষার জন্য বাংলায় তথ্যসূত্র বই তৈরিতে পিছিয়ে আছি। এতে গবেষণা এগোচ্ছে না, উচ্চশিক্ষাও এগোচ্ছে না।



সাতদিনের সেরা