kalerkantho

সোমবার । ১৬ ফাল্গুন ১৪২৭। ১ মার্চ ২০২১। ১৬ রজব ১৪৪২

করোনাকালে জঙ্গিরা ফের তৎপর

রেজোয়ান বিশ্বাস   

১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ০২:২৯ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



করোনাকালে জঙ্গিরা ফের তৎপর

করোনাভাইরাস মহামারির এই সময়ে আবার মাথাচাড়া দেওয়ার চেষ্টা করছে জঙ্গিরা। কয়েক মাসে পুরনো জেএমবি (জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ), নব্য জেএমবি, আনসার আল ইসলামসহ কয়েকটি জঙ্গি সংগঠনের বেশ কয়েকজন সদস্য ধরা পড়ার পর তাদের নতুন করে তৎপর হওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে। পুরনো জেএমবি, হরকাতুল জিহাদ বাংলাদেশের (হুজিবি) অনেক সদস্য এখনো মাঠে সক্রিয়। নব্য জেএমবি, আনসার আল ইসলামের সদস্যরাও বসে নেই।

গ্রেপ্তারকৃতদের জিজ্ঞাসাবাদের সূত্রে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছে, নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের জন্য জঙ্গিরা আবার ঢাকাকে বেছে নিয়েছে। সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে তারা সাংগঠনিক কার্যক্রম জোরদারের চেষ্টা করছে। পাশাপাশি অর্থ জোগাতে ব্যাংক ডাকাতির পরিকল্পনা করছে।

প্রায় পাঁচ বছর আগে গুলশানে হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলার পর আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর অভিযানে নব্য জেএমবি, আনসার আল ইসলামসহ সক্রিয় জঙ্গিদের অনেক শীর্ষ নেতা নিহত ও ধরা পড়েছেন। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর তৎপরতায় জঙ্গিরা অনেকটাই নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। এ ছাড়া জঙ্গিবাদ থেকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার কার্যক্রমও চলছে। এর মধ্যে আবার তাদের তৎপরতা বেড়ে গেছে।

গত কয়েক মাসে রাজধানীর মিরপুর এলাকা থেকে নব্য জেএমবির মিনহাজ হোসেন ও পুরান জেএমবির ‘ডাকাত দলের’ সদস্য মোজাফফর আলী ওরফে শাহীনসহ সারা দেশে অন্তত ৩৫ জন জঙ্গি ধরা পড়েছে।

গত ডিসেম্বরে পুরনো জেএমবির ‘ডাকাত দলের’ সদস্য মোজাফফর আলী ওরফে শাহীনকে গ্রেপ্তার করার পর তাদের ব্যাংক ডাকাতির পরিকল্পনা সম্পর্কে জানা যায়। এরপর গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে ব্যাংকগুলোকে আরো সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। ওই সূত্র অনুযায়ী, এই ‘দস্যু বাহিনীকে’ সংগঠিত করছেন আত্মগোপনে থাকা পুরনো জেএমবির শীর্ষ নেতা সালাউদ্দিন সালেহীন। ২০১৪ সালে ময়মনসিংহের ত্রিশালে প্রিজন ভ্যান থেকে জেএমবির তখনকার মজলিসে শুরা এই সদস্যসহ তিন জঙ্গিকে ছিনিয়ে নিয়ে যায় তাদের সহযোগীরা। অন্য দুজন হলো হাফেজ মাহমুদ ওরফে রাকিব হাসান ও জাহিদুল ইসলাম ওরফে মিজান ওরফে বোমা মিজান। রাকিব পরে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়। সালেহীন ও মিজান ভারতে পালিয়ে যায়। সম্প্রতি ভারতে বোমা মিজানের কারাদণ্ড হয়েছে।

গত ২৪ জানুয়ারি ঢাকার মিরপুর এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মিনহাজ হোসেনকে। তিনি পালিয়ে সিরিয়ায় গিয়েছিলেন। দেশে ফিরে আসার পর আবার জঙ্গিদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন। গ্রেপ্তারের পর মিনহাজ সিটিটিসি ইউনিটকে জানিয়েছেন, গত কয়েক মাসে বেশ কয়েকবার তাঁরা ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় নাশকতার চেষ্টা চালিয়েছেন। সর্বশেষ তাঁরা মিরপুর এলাকায় সংগঠিত হয়েছিলেন। তাঁরা বড় ধরনের নাশকতার পরিকল্পনা করে সংগঠিত হচ্ছিলেন।

মিনহাজের বিষয়ে জানতে চাইলে জঙ্গি কর্মকাণ্ড অনুসরণকারী সিটিটিসির উপকমিশনার সাইফুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, মিনহাজ নব্য জেএমবির সদস্যদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেছেন। তিনি সিরিয়াভিত্তিকে আন্তর্জাতিক উগ্রবাদী সংগঠন হায়াত তাহরির আল শামেরও (এইচটিএস) সদস্য।

পুরনো জেএমবির ডাকাতির পরিকল্পনা সম্পর্কে সিটিটিসির এই কর্মকর্তা বলেন, এমন তথ্য পেয়ে তদন্ত চলছে।

মিনহাজকে গ্রেপ্তারের দিনই মিরপুরের রূপনগর এলাকা থেকে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন আনসার আল ইসলামের সক্রিয় সদস্য হাসিবুর রহমান ওরফে সোহেল, মো. মোশারফ হোসেন ওরফে আতিক, রামিম হোসেন ওরফে পনির হোসেন ওরফে নাহিদুর রহমান, মো. সজিব মিয়া ওরফে খিজির, চঞ্চল হোসেন ওরফে আব্দুল্লাহকে গ্রেপ্তার করা হন। জিজ্ঞাসাবাদে তাঁদের নাশকতার পরিকল্পনার কথা র‌্যাব জানতে পেরেছে। র‌্যাবের ধারণা, একই দিন একই এলাকায় জেএমবি ও আনসার আল ইসলামের গোপন বৈঠকের উদ্দেশ্য ছিল নাশকতার পরিকল্পনা করা। দুটি বৈঠকে অন্তত ২০ জন জঙ্গি সদস্য উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ছয়জন গ্রেপ্তার হলেও বাকিরা পালিয়ে যান।

এর আগে গত ১ জানুয়ারি ঢাকাসহ দেশের পাঁচটি স্থানে অভিযান চালিয়ে আনসার আল ইসলামের সামরিক শাখার দুজনসহ ছয়জনকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। সংগঠনটির সামরিক শাখার দুই সদস্য শাকিল ইসলাম ও আশিকুর রহমান র‌্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন, তাঁরা সংগঠনটির হয়ে বোমা তৈরির কাজ করতেন। দেশে নাশকতার পরিকল্পনা করে দাওয়াতি কার্যক্রম চালাচ্ছিলেন তাঁরা।

গত ২ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পল্টন, ভাটারা ও ঢাকার বাইরে শেরপুর জেলা থেকে আনসার আল ইসলামের এক নারী সদস্যসহ আরো চার জঙ্গিকে গ্রেপ্তার র‌্যাব। তাঁরা শেরপুরে নাশকতার পরিকল্পনা করে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ বাড়াচ্ছিলেন বলে র‌্যাব জানতে পেরেছে।

গত ১০ ফেব্রুয়ারি নরসিংদীর রায়পুরা ও নারায়ণগঞ্জের মদনপুর এলাকা থেকে নাশকতার পরিকল্পনাকারী আনসার আল ইসলামের আরো দুই সদস্যকে গ্রেপ্তার করে এটিইউ। তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে সংগঠনের সদস্য বাড়াতে দাওয়াতি কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছিলেন।

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্রে জানা যায়, আনসার আল ইসলামের সামরিক শাখার প্রধান চাকরিচ্যুত মেজর সৈয়দ মোহাম্মদ জিয়াউল হক জিয়া ও তামীম আল আদনানীসহ এখনো অনেক জঙ্গি নেতা মাঠ পর্যায়ে সক্রিয় রয়েছেন।

এর আগে গত ৪ ফেব্রুয়ারি নিষিদ্ধ ঘোষিত আল্লাহর দলের সেকেন্ড ইন কমান্ড শেখ কামাল হোসেনসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করে এটিইউ।

জঙ্গিদের ব্যাংক ডাকাতির পরিকল্পনার বিষয়ে সতর্ক করার ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপত্র সিরাজুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ব্যাংকগুলোতে ডাকাতি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে প্রতিটি ব্যাংককে নিরাপত্তা নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আশিক বিল্লাহ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জঙ্গিদের স্বাভাবিক জীবনে ফেরানোর চেষ্টা চলছে। এর পরও যাদের ফেরানো যাচ্ছে না তাদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে।’

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা মনে করছেন, শুধু অভিযান চালিয়ে জঙ্গিবাদ ঠেকানো যাবে না। মগজ ধোলাইয়ের মাধ্যমে টার্গেট ব্যক্তিকে উগ্রবাদের অন্ধকার পথে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তারা মনে করে এটি তাদের আদর্শিক লড়াই। তাই অভিযানের পাশাপাশি ডি-রেডিক্যালাইজেশনের (উগ্রতা দূরীকরণে বিশেষ শিবির) মাধ্যমে উগ্রবাদের কথিত আদর্শকে মোকাবেলা করতে হবে।

জঙ্গিদের উগ্রপন্থার পথ ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর কার্যক্রমের ধারাবাহিকতায় গত ১৪ জানুয়ারি র‌্যাব সদও দপ্তরে ৯ জঙ্গি আত্মসমর্পণ করেন। এ উপলক্ষে সেখানে আয়োজিত অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, ‘জঙ্গিবাদ নির্মূল করতে না পারলেও অনেক এগিয়েছি। আবার আত্মসমর্পণের সুযোগ দিয়েও তাঁদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনছি।’

জানতে চাইলে নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ মেজর জেনারেল (অব.) এ কে মোহাম্মদ আলী সিকদার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জঙ্গিবাদ এখনো নিয়ন্ত্রণে আসেনি। ডি-র‌্যাডিকালাইজেশন স্থায়ী সমাধান নয়। উগ্র-মৌলবাদ নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে, তা নাহলে অতীতের মতো ভবিষ্যতেও তারা মাথা ব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়াবে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা