kalerkantho

রবিবার । ১৫ ফাল্গুন ১৪২৭। ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২১। ১৫ রজব ১৪৪২

শিক্ষা ভবনে আবার সিন্ডিকেট দৌরাত্ম্য

বদলি-পদায়ন ও নিয়োগ ঘিরে ঘুষ বাণিজ্যের চেষ্টা, ঘুরেফিরে একই কর্মকর্তারা গুরুত্বপূর্ণ পদে

শরীফুল আলম সুমন   

১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ০২:০৮ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



শিক্ষা ভবনে আবার সিন্ডিকেট দৌরাত্ম্য

শিক্ষা ভবনের বিভিন্ন দপ্তরে বদলি, পদায়ন এবং সারা দেশের স্কুল-কলেজে প্রায় চার হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ ঘিরে আবার মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে সিন্ডিকেট। মূলত ঘুরেফিরে একই কর্মকর্তারা প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে আসায় এবং একাধিক কর্মকর্তা দীর্ঘদিন ধরে এক পদে থাকায় সিন্ডিকেট করে দুর্নীতির সুযোগ পাচ্ছেন।

জানা যায়, রাজধানীর আবদুল গণি রোডে অবস্থিত শিক্ষা ভবনে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা (মাউশি) অধিদপ্তর, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর, পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর এবং প্রায় ১৫টি প্রকল্পের কার্যালয় রয়েছে। প্রায় চার বছর আগে এই ভবনের নানা কাজে সিন্ডিকেটের নেতৃত্ব দিতেন সাবেক শিক্ষামন্ত্রীর একান্ত ব্যক্তিগত সহকারী (এপিএস) মন্মথ রঞ্জন বাড়ৈ। কিন্তু দুর্নীতির অভিযোগে তাঁকে সরিয়ে দেওয়ার পর শিক্ষা ভবনে দুর্নীতির বিষয় নিয়ে তেমন আর কথা হয়নি। সাম্প্রতিক সময়ে আবার মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে একাধিক সিন্ডিকেট।

গত নভেম্বরে মাউশি অধিদপ্তরের মহাপরিচালক দপ্তরের অফিস সহায়ক (পিয়ন) মো. জুয়েলের ভয়ংকর জালিয়াতি ধরা পড়ে। চতুর্থ শ্রেণির এই কর্মচারী শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরীর স্বাক্ষর জাল করে বদলি ‘বাণিজ্য’ চালিয়ে আসছিলেন। একটি সিন্ডিকেটের অধীনে তিনি এই ‘বাণিজ্য’ করে আসছিলেন। মাধ্যমিক শাখার একজন সহকারী পরিচালক এই সিন্ডিকেটের অগ্রভাগে রয়েছেন। শুধু জুয়েলকে বরখাস্ত করা হলেও সিন্ডিকেটের মূল হোতারা রয়েছেন অধরা। এমনকি এখনো সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে প্রতিনিয়ত শিক্ষক বদলি হলেও তা ওয়েবসাইটে আপলোড করা হয় না।

একটি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির আওতায় বর্তমানে সারা দেশের স্কুল-কলেজের ২৮টি পদে চার হাজার ৩২ কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে। এর মধ্যে প্রায় ২০০ জন কর্মকর্তা নেওয়া হবে প্রদর্শক পদে। বাকি নিয়োগ তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী পদে। নিয়োগের ক্ষেত্রে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা নেওয়া হবে। এরই মধ্যে এসব পদের জন্য প্রায় ৯ লাখ আবেদন জমা পড়েছে। গত নভেম্বর থেকেই মাউশি অধিদপ্তরের একটি সিন্ডিকেট অবৈধ উপায়ে এসব পদে নিয়োগের উদ্দেশ্যে আর্থিক লেনদেন শুরু করে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় বিষয়টি আঁচ করার পর গত ১৫ ডিসেম্বর মাউশি অধিদপ্তর থেকে সতর্কতা জারি করা হয়। সেখানে বলা হয়, গত ২২ অক্টোবর নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছিল। এখন পরীক্ষা গ্রহণের প্রস্তুতি ও দাপ্তরিক কার্যক্রম চলছে। কিন্তু এরই মধ্যে প্রতারকচক্র চাকরি দেওয়ার প্রলোভন দিয়ে আবেদনকারী প্রার্থীদের সঙ্গে প্রতারণা করার চেষ্টা করছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মাউশি অধিদপ্তরের একজন পরিচালকের নেতৃত্বে একটি সিন্ডিকেট চাকরি দেওয়ার প্রলোভন দিয়ে আসছিল। সতর্কতা জারির পরও ওই সিন্ডিকেটের তৎপরতা থেমে নেই। এই চক্রের সদস্যরা এখন দ্রুততার সঙ্গে নিয়োগপ্রক্রিয়া শেষ করতে উঠেপড়ে লেগেছে।

মাউশির উপপরিচালক (প্রশাসন) মো. রুহুল মমিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পিয়ন জুয়েলের ব্যাপারে আমাদের তদন্ত চলছে। এ ছাড়া আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও তদন্ত করছে। আমরা জুয়েলকে এরই মধ্যে সাময়িক বরখাস্ত করেছি। এ ছাড়া বর্তমানে আমাদের দপ্তরের অধীন বড় নিয়োগ কার্যক্রম চলমান। আশঙ্কা থেকে আমরা সেই নিয়োগের ব্যাপারেও সতর্কতা জারি করেছি।’

শুধু মাউশি নয়, সিন্ডিকেটের হাত রয়েছে শিক্ষা ভবনের অন্যান্য দপ্তরেও। পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ) সাবেক শিক্ষা পরিদর্শক আবুল কালাম আজাদের ব্যাংক হিসাবে অস্বাভাবিক লেনদেনের অভিযোগ ওঠার পর তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হয়। তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিয়ে চাকরিচ্যুতির সুপারিশ করা হলেও সে যাত্রায় তিনি পার পেয়ে যান। বর্তমানে নারায়ণগঞ্জ মহিলা কলেজে কর্মরত হলেও ফের ডিআইএতে উপপরিচালক পদে ফিরে আসতে মাউশির সিন্ডিকেটের শরণাপন্ন হয়েছেন।

জানা যায়, মাউশির সিন্ডিকেট একজন রাজনৈতিক নেতার সহায়তায় আবুল কালাম আজাদকে ডিআইএতে পদায়ন করতে উঠেপড়ে লেগেছে। তিনি নিয়মবহির্ভূতভাবে প্রায় ১৯ বছর ওই দপ্তরে চাকরি করেছেন। তাঁর বিরুদ্ধে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শাহদাত্বার্ষিকীর অনুষ্ঠানকে অবজ্ঞা করার অভিযোগ আসায় তাঁকে শোকজ করা হয়েছিল। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শন কাজে অনিয়মে জড়িত থাকার অভিযোগ তুলে এই কর্মকর্তাকে প্রত্যাহারের আবেদন করেছিলেন ঢাকার একজন সংসদ সদস্য। বড় অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে তাঁকেই আবার প্রশাসনের উচ্চপদে বসাতে সচেষ্ট মাউশির একটি সিন্ডিকেট।

অভিযোগের বিষয়ে জানার জন্য গত বুধবার রাতে আবুল কালাম আজাদকে একাধিকবার ফোন দেওয়া হলেও তিনি তা ধরেননি।

জানা যায়, করোনার জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় গত এক বছরে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক বদলি কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও মাধ্যমিকে থেমে নেই। নিয়মিতই চলছে স্কুল-কলেজের শিক্ষক বদলি এবং জেলা-উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ও কর্মচারী বদলি। মাউশি অধিদপ্তরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসন শাখায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলির কাজ হয়। এই শাখার পরিচালক ও উপপরিচালকই বদলির মূল কাজ করেন। মাউশির বর্তমান নিয়োগের আহ্বায়ক ও সদস্যসচিবও তাঁরা দুজন। বদলিতে নানা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে এই শাখার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, মাউশির আইন শাখার শিক্ষা অফিসার (আইন-২) পদটি প্রভাষকের সমমান। কিন্তু লোভনীয় এই পদটিতে দীর্ঘদিন ধরে রয়েছেন একজন সহকারী অধ্যাপক। মাধ্যমিকে সহকারী পরিচালক (সেসিপ) এবং কলেজ শাখার একজন সহকারী পরিচালকের বিরুদ্ধে রয়েছে নানা অভিযোগ। অভিযোগ রয়েছে মাউশির উপপরিচালকের (বিশেষ শিক্ষা) বিরুদ্ধে। মাদরাসা অধিদপ্তর পৃথক হয়ে যাওয়ায় এই পদের তেমন কোনো কাজ নেই। তবে একজন দাপুটে পরিচালকের সঙ্গে সখ্য থাকায় তিনি বহাল তবিয়তে রয়েছেন।

উপপরিচালক (বিশেষ শিক্ষা) সৈয়দ মইনুল হাসান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘রেগুলার শিক্ষার বাইরে বিশেষ করে মাদরাসা শিক্ষা নিয়ে আমরা কাজ করতাম। এখন মাদরাসা অধিদপ্তর পৃথক হয়ে যাওয়ায় আমরা নানা ধরনের ইভেন্ট নিয়ে কাজ করছি। বর্তমানে তিনটি ইভেন্ট চলছে।’ এই শাখার কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কাজে ব্যস্ত থাকেন, তাঁদের ব্যাপারে কোনো অভিযোগ নেই বলে জানান তিনি।

শারীরিক শিক্ষা শাখার একজন উপপরিচালকও ব্যস্ত থাকেন নানা তদবিরে। সরকারি কলেজ শাখার উপপরিচালকের ইশারা ছাড়া হয় না কলেজ শিক্ষকদের বদলি। বেসরকারি কলেজ শাখার একজন উপপরিচালকের কাজের ধীরগতি ও ফাইল আটকে রাখার অভিযোগ পুরনো। শিক্ষা ভবনে থাকা একাধিক প্রকল্প পরিচালকের বিরুদ্ধেও রয়েছে অনিয়মের অভিযোগ। সম্প্রতি নানা অভিযোগে তিনজন প্রকল্প পরিচালককে (পিডি) সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা