kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১২ ফাল্গুন ১৪২৭। ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১। ১২ রজব ১৪৪২

স্মরণ

জোহা দিবস হোক জাতীয় শিক্ষক দিবস

ড. মো. জুলকার নায়েন   

১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ০৪:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



জোহা দিবস হোক জাতীয় শিক্ষক দিবস

আজ ১৮ ফেব্রুয়ারি, ড. জোহা দিবস। ১৯৬৯ সালের এই দিনে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন প্রক্টর ও রসায়ন বিভাগের রিডার (সহযোগী অধ্যাপক) সর্বজন শ্রদ্ধেয় ড. মোহম্মদ শামসুজ্জোহা ছাত্রদের জীবন রক্ষা করতে গিয়ে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর গুলি ও বেয়নেটের আঘাতে নির্মমভাবে নিহত হন। দিনটি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের শিক্ষকমহলের কাছে এক বেদনার দিন।

 ১৯৬৬ সালের ৫-৬ ফেব্রুয়ারি লাহোরে বিরোধী দলগুলোর এক সম্মেলনে যোগদান করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব বাংলার অধিবাসীদের স্বায়ত্তশাসনের দাবিসংবলিত ছয় দফা কর্মসূচি পেশ করেন। বঙ্গবন্ধু প্রণীত ছয় দফা ও পরবর্তী সময়ে ১১ দফার দাবিতে ১৯৬৯ সালের শুরু থেকে পূর্ব পাকিস্তানে শোষণবিরোধী গণ-আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে। এরই অংশ হিসেবে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ১৯৬৯ সালের ১৭ জানুয়ারি সারা দেশে দাবি দিবস, ১৮ জানুয়ারি ঢাকা শহরে ছাত্র ধর্মঘট ও ২০ জানুয়ারি সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে ছাত্র ধর্মঘট পালন করে। ২০ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মিছিলরত অবস্থায় পাকিস্তানি পুলিশের গুলিতে ছাত্র ইউনিয়ন নেতা আসাদুজ্জামান নিহত হন।

এই সময় আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় বঙ্গবন্ধুসহ ঊর্ধ্বতন বেসামরিক কর্মকর্তাদের বিচারকাজ চলছিল। ১৫ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অন্যতম আসামি সার্জেন্ট জহুরুল হককে জেলের ভেতর গুলি করে হত্যা করে। এই হত্যার প্রতিবাদে ফুঁসে ওঠে পূর্ব বাংলার জনগণ। এরই ধারাবাহিকতায় ১৭ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের একটি প্রতিবাদী মিছিল রাজশাহী শহরে পুলিশি হামলার সম্মুখীন হয় এবং সেখানে বেশ কয়েকজন ছাত্র আহত হন। তৎকালীন প্রক্টর ড. জোহা সেখানে ছুটে যান এবং ছাত্রদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন। ওই দিন সন্ধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে শিক্ষকদের এক প্রতিবাদ সভায় বক্তৃতাকালে ড. জোহা নিজের জামায় লেগে থাকা রক্ত দেখিয়ে বলেন, ‘আজ আমি ছাত্রদের রক্তে রঞ্জিত। এরপর কোনো গুলি হলে তা ছাত্রকে না লেগে যেন আমার গায়ে লাগে।’

পরদিন ১৮ ফেব্রুয়ারি সকালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের একটি বিক্ষোভ মিছিল ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে রাজশাহী শহরের উদ্দেশে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের দিকে এগিয়ে যায়। এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের বাইরে পাকিস্তানি মিলিটারিরা সশস্ত্র অবস্থান নেয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ভাষাসৈনিক ড. জোহা মুখোমুখি অবস্থানের ভয়াবহতা স্পষ্টতই বুঝতে পারলেন। এ অবস্থায় তিনি ছোটাছুটি শুরু করলেন, একবার ছাত্রদের দিকে তাদের মিছিল নিবৃত্তের জন্য, তো অন্যবার সেনা সদস্যদের দিকে তাদের ফায়ার করা থেকে বিরত রাখার জন্য। তিনি হাত উঁচিয়ে সেনা সদস্যদের উদ্দেশে বারবার বলছিলেন, ‘প্লিজ ডোন্ট ফায়ার, দে আর স্টুডেন্টস।’ ড. জোহাসহ অন্যান্য শিক্ষকের আশ্বাসে ছাত্ররা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে ফিরছিল, ঠিক তখনই ঘটে ইতিহাসের এক জঘন্যতম ঘটনা। পাকিস্তানি সেনারা অতর্কিত গুলি শুরু করল। গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়ে গেলেন ড. শামসুজ্জোহা, আহত হলেন দায়িত্বরত আরো কয়েকজন শিক্ষক ও ছাত্র।

আহত ড. জোহাকে মিলিটারি ভ্যানে করে নিয়ে যাওয়া হয় মিউনিসিপ্যাল অফিসে। সেখানে তাঁকে চিকিৎসা না দিয়ে দীর্ঘ সময় অবহেলায় তাঁর নিথর দেহ ফেলে রাখা হয়। পরবর্তী সময়ে রাজশাহী মেডিক্যালে নিয়ে যাওয়া হয়। বিকেল ৪টার দিকে তাঁকে সার্জিক্যাল রুমে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখানেই এই মহান শিক্ষক শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

ড. জোহার মৃত্যুর খবর মুহূর্তের মধ্যেই ছড়িয়ে পড়ে সারা বাংলায়। আন্দোলন পায় এক নতুন মাত্রা। উত্তাল আন্দোলনের ফলে ২২ ফেব্রুয়ারি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করে নেয়। আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ড. জোহার মৃত্যুর মাত্র ৩৪ দিনের মাথায় দাম্ভিক আইয়ুব খান পরবর্তী সেনাপ্রধান জেনারেল ইয়াহিয়ার নিকট ক্ষমতা হস্তান্তর করতে বাধ্য হন। ইতিহাসের প্রথম শহীদ বুদ্ধিজীবীর রক্ত বৃথা যায়নি, তাঁর আত্মত্যাগের মাধ্যমেই ছয় দফা, ১১ দফার গণ-আন্দোলন গণ-অভ্যুত্থানে পরিণত হয়।

এই মহান শিক্ষকের স্মরণে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি হলের নাম দেওয়া হয় শহীদ শামসুজ্জোহা হল এবং ১৯৬৯ সালের ২২ অক্টোবর ড. জোহার পিতা মোহাম্মদ আব্দুর রশীদ কর্তৃক হলের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়। এই মহান মানুষটির মৃত্যুর ৩৯ বছর পর ২০০৮ সালে তাঁকে স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করা হয় এবং তাঁর নামে একটি স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ করা হয়। ১৮ ফেব্রুয়ারি ড. শামসুজ্জোহার শহীদ হওয়ার দিনটিকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক দিবস হিসেবে পালন করে আসছে। বহু বছর ধরে এই দিনটিকে ‘জাতীয় শিক্ষক দিবস’ হিসেবে ঘোষণার দাবি জানিয়ে আসছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারসহ দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকসমাজ; কিন্তু দুঃখের বিষয় এ দাবি পূরণ হয়নি আজও।

২০২১ বাঙালি জাতির জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ একটি বছর। আমরা পালন করছি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, স্বাধীনতার রূপকার, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী। এ বছরই পালিত হবে আমাদের গৌরবান্বিত স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী। আজ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত। জাতির জন্য আত্মদানকারী মহান শিক্ষকের শহীদ হওয়ার দিনটিকে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্মরণ করার নিমিত্তে ‘জাতীয় শিক্ষক দিবস’ হিসেবে ঘোষণার মাধ্যমে জাতি ও প্রজন্মকে এই মহান মানুষটি সম্পর্কে জানার সুযোগ তৈরি করা হোক।

লেখক : প্রাধ্যক্ষ, শহীদ শামসুজ্জোহা হল, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা